kalerkantho


আকায়েদ স্ত্রীকে উগ্রপন্থী বই পড়তে বলতেন

শ্যালককেও জিজ্ঞাসাবাদ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৪ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



আকায়েদ স্ত্রীকে উগ্রপন্থী বই পড়তে বলতেন

যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পরই চরমপন্থী আদর্শের ফাঁদে পড়েন নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটানে বাস টার্মিনালে বিস্ফোরণের ঘটনায় জড়িত সন্দেহে আটক বাংলাদেশি আকায়েদ উল্লাহ। স্ত্রীকে তিনি বলতেন, কারাবন্দি জঙ্গি নেতা জসিম উদ্দীন রাহমানীর ধর্মীয় বই পড়তে। স্ত্রী পড়েননি। গতকাল বুধবার পর্যন্ত আকায়েদের ব্যাপারে তদন্ত করে এই পর্যন্ত তথ্য পেয়েছে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, বাবার মৃত্যুর পর থেকে ধর্মীয় বিষয়ে ঝুঁকে পড়েন আকায়েদ। পরে ইন্টারনেটের মাধ্যমে ‘সেলফ র্যাডিকালাইজড’ হন।

সিটিটিসি ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম গতকাল ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে সাংবাদিকদের বলেন, ‘এখন পর্যন্ত দেশে আকায়েদের কোনো জঙ্গি কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে তাঁর শ্বশুর-শাশুড়ি এবং স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে যতটা বুঝতে পেরেছি, আমেরিকায় গিয়েই ইন্টারনেট থেকে সে র্যাডিকালাইজড হয়েছে; অর্থাত্ সেলফ র্যাডিকালাইজড। কথা বলার জন্য তাঁর শ্যালককে ডেকে আনা হয়েছে।

প্রয়োজনে আরো অনেককে ডেকে আনা হতে পারে।’ তিনি আরো বলেন, গত সেপ্টেম্বরে আকায়েদ দেশে আসে নবজাতক সন্তানকে দেখতে। দেশে আসার পর শিশুসন্তান ও স্ত্রীর সঙ্গেই বেশি সময় কাটান।

এক প্রশ্নের জবাবে মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘ধারণা করা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ইন্টারনেটের মাধ্যমেই আকায়েদ উগ্রবাদে ঝুঁকেছেন। তিনি জড়িত ছিল কি না সে ব্যাপারে সেখানকার দক্ষ তদন্তকারীরা সঠিক তথ্য বের করবেন বলে আশা করছি। অনানুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি তারা জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে অনেক বাঙালি থাকে। এ কারণে বিষয়টি আমাদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ। আনুষ্ঠানিকভাবে সহযোগিতা চাইলে তদন্তকারীদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে।’  

মনিরুল ইসলাম বলেন, ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আগে আকায়েদের কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না—সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। সিটি কলেজে বিবিএ পড়া অবস্থায় সে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যায়, তার ভাইয়ের কাছে। যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে পরিবর্তন হয়েছে এমন ধারণা দিয়ে মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘সে তার স্ত্রীকে নিয়মিত জসিম উদ্দীন রাহমানীর বই পড়ার পরামর্শ দিত। তবে তার স্ত্রী সেই বই পড়েনি। বাসায় রাহমানীর বইপত্রও পাওয়া যায়নি।’ দেশে এসে ওই তরুণ যাদের সঙ্গে মিশতেন, তাদের সম্পর্কেও পুলিশ তথ্য সংগ্রহ করছে জানিয়ে মনিরুল বলেন, ‘এখানে তার চেনা-পরিচিতদের মধ্যে র্যাডিকালাইজড হয়েছে—এমন কারও তথ্য আমাদের অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি।’ 

সিটিটিসি সূত্র জানায়, আকায়েদের সহপাঠীসহ বেশ কয়েকজনকে নজরদারিতে রেখেছে পুলিশ। এখন পর্যায়ক্রমে তাদের সঙ্গে কথা বলা হবে। একই সঙ্গে দেশে আসার পর আকায়েদ কোথায় যেতেন, কী করতেন তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

গত সোমবার নিউ ইয়র্কে বিস্ফোরণ ঘটনায় আকায়েদ উল্লাহর সংশ্লিষ্টতা পায় নিউ ইয়র্ক পুলিশ। বিস্ফোরণে তার শরীর পুড়ে যাওয়ার পাশাপাশি জখম হয়েছে। এখন আকায়েদ হাসপাতালে আছেন বলে জানা যায়। আকায়েদের বাড়ি বাংলাদেশের চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে। তিনি আমেরিকায় প্রথমে ট্যাক্সিক্যাব চালালেও পরে একটি আবাসন নির্মাতা কম্পানিতে বিদ্যুত্ মিস্ত্রির কাজ নেন। 

২০১৩ সালে ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দার হত্যাকাণ্ডের পর আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের তত্পরতার খবর আলোচনায় আসে। সংগঠনটির তাত্ত্বিক নেতা রাহমানী ওই মামলার রায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়ে কারাভোগ করছেন। ২০১৫ সালের মে মাসে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম নিষিদ্ধ হওয়ার পর এর সদস্যরা আনসার আল ইসলাম নামে তত্পরতা শুরু করলে চলতি বছর মে মাসে এ সংগঠনকেও নিষিদ্ধ করা হয়।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের একাধিক সূত্র কালের কণ্ঠকে জানিয়েছে, আকায়েদ আটকের পর দেশে তাঁর জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। গত মঙ্গলবার আকায়েদের স্ত্রী, শ্বশুর ও শাশুড়িকে জিজ্ঞাসাবাদের পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। গতকাল তাঁর শ্যালককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এরই মধ্যে দেশে আকায়েদের সহপাঠীসহ ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের তালিকা করেছেন তদন্তকারীরা। বিভিন্ন পর্যায়ের খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজনে আরো কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস আকায়েদ আটকের ব্যাপারে অনানুষ্ঠানিকভাবে পুলিশকে জানিয়েছে। তদন্তকারীরা আনুষ্ঠানিকভাবে সহযোগিতা চাইলেও সিটিটিসি সব ধরনের সহায়তা করবে বলে জানান দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা।

 


মন্তব্য