kalerkantho


চিকিৎসকরা আসেন ইচ্ছামতো!

পার্থ সারথি দাস, ঠাকুরগাঁও   

১৩ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



চিকিৎসকরা আসেন ইচ্ছামতো!

সকাল সাড়ে ৮টা। ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালের বহির্বিভাগে কোনো রোগীকে দেখা গেল না। টিকিট কাউন্টারের সামনে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করতে দেখা গেল দুজন কর্মচারীকে। জরুরি বিভাগে গিয়ে দেখা মিলল একজন স্টাফ নার্সের। কিন্তু কোনো চিকিৎসক নেই।

সকাল ৮টা ৫০ মিনিট। বহির্বিভাগের টিকিট কাউন্টারের সামনে অপেক্ষা করতে দেখা গেল শিশু কোলে এক নারীকে। লাঠি হাতে অপেক্ষা করছেন আরেক ব্যক্তি। মনি নামের ওই নারী জেলার রানীশংকৈল উপজেলার সান্ধ্যরাই গ্রামের বাসিন্দা। এক বছর বয়সী শিশুসন্তানকে নিয়ে সকাল ৭টার দিকে এসেছেন শহরে। তিনি প্রথমে গেছেন সদর হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. শাহজাহান নেওয়াজের বাসায়। শিশুটিকে দেখার পর চিকিৎসক তাকে হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দেন। হাসপাতালে এসে তিনি টিকিটের জন্য অপেক্ষা করছেন বলে জানান মনি। কিন্তু তখনো টিকিট কাউন্টার খোলা হয়নি।

লাঠি হাতে বসে থাকা ব্যক্তির নাম তফির উদ্দীন। বয়স প্রায় ৬৭ বছর। তিনি শহরের মুসলিমনগরের বাসিন্দা। বুকের ব্যথা নিয়ে এসেছেন হাসপাতালে চিকিৎসক দেখাতে। কিন্তু চিকিৎসকের দেখা মেলেনি।

ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালের এসব চিত্র গতকাল মঙ্গলবার সকালের। এ ছাড়া সরেজিমনে গিয়ে হাসপাতাল ঘুরে নানা অনিয়মের চিত্র নজরে এসেছে এ প্রতিবেদকের।

সকাল ৯টা। বেশ কয়েকজনকে হাসপাতালে ঢুকতে দেখা গেল। তাদের কেউ রোগী, কেউ চিকিৎসাধীন রোগীর স্বজন। যারা চিকিৎসা নিতে এসেছে তারা এদিক-সেদিক ঘোরাঘুরি করে চিকিৎসকের খোঁজ করছে।

সকাল ৯টা ১০ মিনিট। সাদা টুপি পরা একজনকে হাসপাতালে ঢুকতে দেখা গেল। এদিক-সেদিক তাকিয়ে তিনি চলে গেলেন হাসপাতাল ভবনের দোতলায়। কিছুক্ষণ পর সালোয়ার-কামিজ পরা এক নারীকে দেখা গেল পান চিবাতে চিবাতে একজনের সঙ্গে ভেতরে ঢুকলেন। তাঁদের পেছন পেছন টুপি পরা লোকটি দোতলায় পুরুষ ওয়ার্ডে ঢুকলেন। সেখানে বেশ কয়েকজন রোগীর সঙ্গে কথা হলো তাঁর। আর নারীটি গেলেন নিচতলার মহিলা ওয়ার্ডে। তিনিও বেশ কয়েকজন রোগীর খোঁজখবর নিলেন।

সকাল সাড়ে ১০টা। তখনো চিকিৎসকদের কক্ষে তালা ঝুলতে দেখা গেল। এরই মধ্যে হাসপাতালে বেড়ে গেছে লোকসমাগম। কেউ এসেছে চিকিৎসা নিতে, কেউ এসেছে রোগীর সঙ্গে, কেউ বা চিকিৎসাধীন রোগী দেখতে।

চিকিৎসা নিতে আসা সবাই অপেক্ষা করছে। কারণ তখনো জরুরি বিভাগ ও বহির্বিভাগের টিকিট কাউন্টার ছাড়া চিকিৎসকদের কক্ষের তালা খোলাই হয়নি।

শিশু বিভাগে ঢু মেরে দেখা গেল সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. শাহজাহান নেওয়াজ আর কনসালট্যান্ট (মেডিসিন) ডা. মো. তোজাম্মেল হক চিকিৎসাধীন রোগীদের দেখছেন এবং ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছেন। তাঁদের দুজন ছাড়া হাসপাতালের অন্য কোনো চিকিৎসককে দেখা যায়নি।

সকাল ১১টা। হাসপাতালে রোগীদের ভিড় বাড়লেও চিকিৎসকরা অনেকেই অনুপস্থিত। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ডা. আবুল কাসেম, ডা. শেখ মাসুদ, ডা. শাহাদাত হোসেন, ডা. রেজাউল করিম, ডা. হাবিবুর রাসেল, ডা. এম আর রেজা, ডা. মেহেদী হাসান, ডা. রোকনুল হক, ডা. তানিয়া আফরিনসহ কয়েকজন চিকিৎসক প্রায়ই হাসপাতালে আসেন সকাল ১১টার পরে। কোনো কোনো দিন তাঁদের অনেকেই আসেন দুপুর ১২টারও পরে। অর্থাৎ সময় মেনে চিকিৎসকদের অনেকেই হাসপাতালে আসছেন না। তাঁরা আসেন নিজের ইচ্ছা মতো, চলেও যাচ্ছেন নিজের ইচ্ছা মতো।

বহির্বিভাগ থেকে টিকিট কেটে চিকিৎসকের অপেক্ষায় রয়েছেন ৩০-৪০ জন রোগী। কাউন্টারেও তখনো টিকিটের জন্য সারিতে আছেন অনেক রোগী।

সালমা বেগম নামের একজন রোগী জানান, এক ঘণ্টা ধরে তিনি চিকিৎসকের জন্য অপেক্ষা করছেন। সাড়ে ১১টা বেজে গেলেও চিকিৎসক আসেননি।

সফিকুল ইসলাম নামের আরেক রোগী জানান, সকাল সাড়ে ৯টায় হাসপাতালে এসেছেন তিনি। সঙ্গে স্ত্রীকে নিয়ে এসেছেন, অপেক্ষা করছেন চিকিৎসকের জন্য।

রোখসানা বেগম জানান, তিনি মাসখানেক আগে একবার এসেছিলেন। তখনো এমন দুর্ভোগে পড়েছিলেন তিনি। রোখসানা আক্ষেপ করে বলেন, ‘রোগীরা সময়মতো এলেও ডাক্তার বাবুরা আসেন তাঁদের ইচ্ছে মতো।’

চিকিৎসকদের এমন অনিয়মের ব্যাপারে জানতে চাইলে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. শামীম আরা নাজনীন কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। তিনি বলেন, এ বিষয়ে তিনি অবগত নন। তবে এ সমস্যা তিনি সমাধানের চেষ্টা করবেন।

দুপুর ১২টা। এবার দেখা গেল অন্য চিত্র। চিকিৎসকদের কক্ষের সামনে রোগীদের দীর্ঘ সারি। চিকিৎসক নেই। কিন্তু রোগী দেখে ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছেন মৌসুমী আক্তার নামের একজন শিক্ষানবিশ চিকিৎসক।

খোঁজ নিয়ে জানা গেল, শুধু মৌসুমী আক্তার নন, চিকিৎসকদের অনুপস্থিতিতে তাঁর মতো আরো কয়েকজন শিক্ষানবিশ চিকিৎসক রোগী দেখেন। এমন অবস্থা অনেক দিন ধরেই চলে আসছে।

এবার দেখা গেল ভিন্ন এক চিত্র। ডা. মিজানুর রহমান তাঁর কক্ষে রোগী দেখছেন, ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছেন। তাঁর কক্ষে অনেকক্ষণ ধরে রয়েছেন টুপি পরা সেই ব্যক্তি। পরিচয় জানতে চাইলে তিনি প্রথমে চিকিৎসকের লোক এবং পরে নিজেকে রোগী হিসেবে পরিচয় দিলেন। অবশ্য অন্য একজনের কাছে তাঁর আসল পরিচয় পাওয়া গেল। নাম শামীম, চিকিৎসকদের প্রশ্রয়ে হাসপাতালে দীর্ঘদিন ধরে ওষুধ সরবরাহ এবং বিভিন্ন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী নিয়ে যান। হাসপাতালের লোকজন তাঁকে দালাল বলে।

জানতে চাইলে ডা. মিজানুর রহমান বলেন, তিনি ওই ব্যক্তিকে চেনেন না। কিন্তু নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের এক কর্মচারী জানান, এমন ঘটনা এখানে নতুন কিছুই নয়। অনেক দিন ধরে বেশ কয়েকজন চিকিৎসকের সহায়তায় শামীমের মতো আরো ১০-১৫ জন দালাল হাসপাতাল দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। তারা গ্রাম থেকে আসা রোগীদের আরো উন্নত চিকিৎসা ও সস্তায় ওষুধ, চিকিৎসক দেখিয়ে দেওয়ার প্রলোভন দিয়ে বিভিন্ন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যায়। এসব দালালের মধ্যে বেশ কয়েকজন নারীও রয়েছে। ক্লিনিক মালিকরা দালালদের কমিশন দিয়ে থাকেন।

হাসপাতালে এসব অনিয়ম এবং দালালদের দৌরাত্ম্যের বিষয়ে কথা হয় ঠাকুরগাঁওয়ের সিভিল সার্জন ডা. আবু মো. খায়রুল কবিরের সঙ্গে। তিনি বলেন, সঠিক সময়ে হাসপাতালে আসা এবং দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে তিনি একাধিকবার চিকিৎসকদের নিয়ে বৈঠক করেছেন। তার পরও মাঝেমধ্যে এমন অনিয়ম হচ্ছে।

এসব ব্যাপারে আরো কঠোর হবেন বলে জানান সিভিল সার্জন।

এ ছাড়া চিকিৎসকদের অনুপস্থিতিতে শিক্ষানবিশ ইন্টার্ন চিকিৎসকদের রোগী দেখা এবং ব্যবস্থাপত্র দেওয়ার ব্যাপারে তিনি অবগত নন বলে জানান সিভিল সার্জন। তিনি বলেন, ‘যদি এমন হয়ে থাকে তাহলে তা খুবই খারাপ ও দুঃখজনক। এ ব্যাপারে ইন্টার্নদের সতর্ক করে দেওয়া হবে।’ দালালদের দৌরাত্ম্য কমাতে পুলিশের সহায়তা নিয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘শিগগিরই হাসপাতাল দালালমুক্ত হবে।’

৫০ শয্যার ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালের যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৭ সালে। পরে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর এটিকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। বর্তমানে গড়ে প্রতিদিন ৫০০-৫৫০ রোগী এ হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিতে আসে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ১০০ শয্যায় উন্নীত হলেও হাসপাতাল চলছে ৫০ শয্যার জনবল দিয়ে। ৪১টি চিকিৎসক পদ থাকলেও আছেন ২১ জন।

 

 

 

 


মন্তব্য