kalerkantho


খুলনা যুবলীগ নেতৃত্বহীন

কাউন্সিল হয় না ১৪ বছর, দলাদলি চরমে পৌঁছেছে

কৌশিক দে, খুলনা   

১২ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



১৪ বছর ধরে কাউন্সিল না হওয়ায় খুলনায় আওয়ামী যুবলীগের কর্মকাণ্ড মুখ থুবড়ে পড়েছে। মহানগর যুবলীগের আহ্বায়ক কমিটি হয়েছে সাত বছর আগে। কিন্তু কাউন্সিল না হওয়ায় নেতাকর্মীদের মাঝে হতাশা বিরাজ করছে। ১৪ বছর আগে করা জেলা যুবলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এখন মূল দলের হয়ে কাজ করছেন। ফলে জেলা যুবলীগ নেতৃত্বশূন্য হয়ে আছে। জেলার ৯টি উপজেলা কমিটির একটিরও মেয়াদ নেই। ফলে সরকার সমর্থক এই যুব সংগঠনটির কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি নতুন নেতৃত্বপ্রত্যাশীরা হতাশ হয়ে পড়েছেন।

এদিকে আগামী বছরের জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে নগর কমিটির সম্মেলন হতে পারে বলে জানিয়েছেন মহানগর নেতারা। তবে জেলা যুবলীগের বেহাল অবস্থা কবে কাটবে এ নিয়ে দায়িত্বশীল কেউ কিছু বলতে পারেননি।

যুবলীগের হাল ধরতে আগ্রহী একাধিক সাবেক ছাত্রনেতা বলেছেন, দীর্ঘ ১৪ বছরে আগের কমিটির নেতারা অনেকে যুব থেকে বুড়ো হয়ে গেছেন, কেউ কেউ মৃত্যুবরণ করেছেন, আবার কেউ চাকরিতে স্থায়ী হয়েছেন। তার পরও সংগঠনে কাউন্সিলের খবর নেই। আগামী সিটি করপোরেশন ও জাতীয় নির্বাচনের আগে এ অবস্থার পরিবর্তন না হলে দল ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

যুবলীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলা জানা গেছে, ২০০৩ সালের এপ্রিলে সর্বশেষ খুলনা মহানগর যুবলীগের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। কাউন্সিলে অ্যাডভোকেট আনিসুর রহমান পপলু সভাপতি ও আলী আকবর টিপু সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এরপর একই বছরের ২৭ জুলাই ৯১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা হয়। ওই সময় অন্তঃকোন্দল চরমে পৌঁছালে ২০০৪ সালের শেষের দিকে কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়। এর চার বছর পর ২০০৮ সালের ৬ জানুয়ারি আরেকটি সম্মেলনের লক্ষ্যে অ্যাডভোকেট আনিসুর রহমান পপলুকে আহ্বায়ক, মো. মনিরুজ্জামান সাগর ও হাফেজ মো. শামীমকে যুগ্ম আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের কমিটি করা হয়। ৯ মাস পর ৪৮ জনকে সদস্য করে ৫১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ আহ্বায়ক কমিটি করা হয়। সংগঠনের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তিন মাসের মধ্যে এই কমিটির কাউন্সিল আয়োজন করার কথা থাকলেও দীর্ঘ সাত বছরে তা হয়নি। আর এ সময়ের মধ্যে বর্তমান কমিটির তিন সদস্য যথাক্রমে তানজীর আশরাফ যুথী, নাসিম সরদার ও এফ এম আবুল কামাল মারা গেছেন। সংগঠনের যুগ্ম আহ্বায়ক হাফেজ মো. শামীম, তসলিম আহম্মেদ আশা মূল দলে পদ পেয়েছেন। বিমান সাহা বর্তমানে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে চাকরিরত। এ ছাড়া অনেক সদস্য নিষ্ক্রিয়, তাঁরা পারতপক্ষে দলীয় কর্মকাণ্ডে অংশ নেন না। পাঁচ থানা ও ৩৬টি ওয়ার্ড মিলিয়ে নগর যুবলীগের আওতাভুক্ত ৪১টি সাংগঠনিক ইউনিট রয়েছে। কার্যনির্বাহী কমিটির সভা হয়েছে মাত্র তিন-চারটি। এর মধ্যে তিন-চার বছর আগে সর্বশেষ এক সভায় পাঁচ থানা কমিটি বিলুপ্ত করে আহ্বায়ক ও দুজন যুগ্ম আহ্বায়কের সমন্বয়ে তিন সদস্যের কাউন্সিল প্রস্তুতি কমিটি করা হয়। দীর্ঘদিন কাউন্সিল বা নতুন কমিটি না হওয়ায় ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীরা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছেন। আর এই সুযোগে কিছু ব্যক্তি টেন্ডারবাজি, দখলবাজিসহ নানা কাজের মাধ্যমে সংগঠন ও দলের ইমেজ নষ্ট করছে।

খুলনা মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি শফিকুর রহমান পলাশ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ছাত্রলীগ করে এখন যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে রয়েছি। কিন্তু দীর্ঘদিন কাউন্সিল বা নতুন কমিটি না হওয়ায় তৃণমূলের কর্মীরা হতাশ ও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন। একমাত্র কেন্দ্রীয় কমিটিই এ অবস্থা থেকে সংগঠনকে রক্ষা করতে পারে। এ বিষয়ে তাঁরা তত দ্রুত পদক্ষেপ নেবেন ততই সংগঠনের জন্য ভালো হবে।’

নগর আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট আনিসুর রহমান পপলু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কাউন্সিল করতে আমরা আন্তরিক। এ জন্য কাজ করে চলছি। ওয়ার্ড কমিটি নিয়ে কাজ চলছে। আশা করছি, নতুন বছরের জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে কাউন্সিল করতে পারব। তবে এতে সংগঠনে স্থবিরতার অভিযোগ সঠিক নয়।’

অন্যদিকে ২০০৩ সালের ২৫ মে খুলনা জেলা যুবলীগের সর্বশেষ ত্রিবার্ষিক কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে কামরুজ্জামান জামাল সভাপতি ও আক্তারুজ্জামান বাবু সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এর প্রায় পাঁচ-ছয় মাস পর ৭১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা হয়। জেলা যুবলীগের বর্তমান সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডও অনেকটা স্থবির। ৯টি উপজেলা ও ৬৮ ইউনিয়নে কমিটির মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে। ২০১৫ সালের ১৫ নভেম্বর জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পদ পেয়েছেন কামরুজ্জামান জামাল ও আক্তারুজ্জামান বাবু। ফলে অভিভাবকশূন্য সংগঠনটিতে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের অনুসারী হিসেবে দুজন করে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক দায়িত্ব পালন করছেন। 

সূত্র জানায়, বর্তমানে কামরুজ্জামান জামালের অনুসারী জেলা যুবলীগের ২ নং সহসভাপতি অধ্যাপক জুলফিকার আলী জুলু বর্তমানে জেলার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এবং ২ নং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সরদার জাকির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যদিকে আক্তারুজ্জামান বাবুর অনুসারী ৭ নং সহসভাপতি আজিজুল হক কাজল ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এবং ১ নং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাস্টার সেলিম মাসুদ ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। দুই গ্রুপের দুজন করে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সম্পাদকের দায়িত্ব পালনই বলে দেয় সংগঠনে গ্রুপিং চরম পর্যায়ে। এ দুই পক্ষই আবার নিজেদের ‘আসল’ দাবি করে আসছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলা যুবলীগের পদ প্রত্যাশী একাধিক নেতা জানান, ‘ধান্ধাবাজি ছাড়া এখন আর যুবলীগ নেতাদের কোনো কাজ নেই। আমরা এখন অসহায়। একসময় ছাত্ররাজনীতি করলেও এখন কী করব বুঝতে পারছি না। দ্রুত নতুন কমিটি না হলে আগামী জাতীয় নির্বাচনে আমাদের খেসারত দিতে হবে।’

জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সাংগঠনিক সম্পাদক ও জেলা যুবলীগের সভাপতি কামরুজ্জামান জামাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গঠনতন্ত্রে মূল দলে স্থান পেলে আর অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা যায় না। এখন ভারপ্রাপ্ত হিসেবে সিনিয়র নেতারা দায়িত্ব পালন করছেন। তার পরও দীর্ঘদিন কাউন্সিল না হওয়ায় সংগঠনে স্থবিরতা রয়েছে। এ বিষয়ে দ্রুত কেন্দ্রীয় নেতাদের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। আমরা চাই নতুনদের নেতৃত্বে যুবলীগ ফের গতি পাক।’

জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আখতারুজ্জামান বাবু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জেলা যুবলীগে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দুজন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক দায়িত্ব পালন করলেও আমাদের অব্যাহতি দেওয়ায় সংগঠনে সংকট রয়েই গেছে। এ অবস্থায় কেন্দ্রীয় কমিটির উচিত দ্রুত কমিটি ভেঙে দিয়ে নতুন কমিটি করা। এতে সংগঠনের মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। এখন যারা সংগঠনে কাজ করছেন তাঁরাও উত্সাহিত হবেন।’

 



মন্তব্য