kalerkantho


টয়লেট জরাজীর্ণ নোংরা দরজাও নেই কোনোটির

আয়শা সিদ্দিকা আকাশী, মাদারীপুর   

৮ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



টয়লেট জরাজীর্ণ নোংরা দরজাও নেই কোনোটির

মাদারীপুর শহরের ২ নম্বর শকুনী এলাকার বি এম লিটনের স্ত্রী লাবণী খান জেলার সদর হাসপাতালে আছেন তাঁর দুই মাস বয়সী ছেলেকে নিয়ে। তাঁর ছেলে রাইয়ানের ঠাণ্ডাজনিত সমস্যা।

লাবণী খান অভিযোগ করে বলেন, ‘বেশ কয়েক দিন ধরে আমার ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালে আছি। প্রথম দিন ছেলেকে কর্তব্যরত নার্স পায়ে ক্যানোলা পরিয়ে ইনজেকশন দিয়েছেন। পরের দিন ইনজেকশন দেওয়ার সময় বাচ্চা অনেক কান্নাকাটি করলেও নার্সরা কোনো গুরুত্ব দেননি। দ্বিতীয় দিনও একই অবস্থা। ইঞ্জেকশন দেওয়ার সময় খুব কান্নাকাটি করেছে ছেলেটা। এভাবে দুই দিন পার হয়ে যায়। আমি ও আমার মা বারবার বলার পরও নার্সরা কোনো গুরুত্ব দেন না। ছেলে আরো বেশি অসুস্থ হয়ে পড়লে এবং কান্নাকাটি বেশি করলে নার্স ক্যানোলা খুলে ফেলেন। তখন দেখা যায়, পায়ের ওই জায়গাটি ভেজা এবং লালচে ঘায়ের মতো হয়ে গেছে।

এভাবে আরো সময় থাকলে হয়তো আমার ছেলের পায়ে সমস্যা হতো। ’

লাবণী আরো বলছিলেন, ‘ডাক্তার এসে বলেন ওর (শিশু) কোনো উন্নতি হয়নি। তাই ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিতে হবে। তখন আমি বলি, ওর শরীরে তো ইনজেকশনের কোনো ওষুধ যায়নি, ভালো হবে কিভাবে। পরে সদর হাসপাতালেই থেকে যাই। এখন আমার ছেলের অবস্থা ভালো। ঠাণ্ডা অনেকটা কমেছে। নার্সদের এ অবহেলার কারণে আমার ছেলের কত বড় ক্ষতি হতো, তা ভাবলেই গা শিউরে ওঠে। ’

গতকাল বৃহস্পতিবার তৃতীয় দিনের মতো মাদারীপুর সদর হাসপাতালে সরেজমিনে ঘুরে নার্সদের অবহেলা, খারাপ ব্যবহার ও শিক্ষানবিশ নার্সদের ইনজেকশন দিতে বারবার চেষ্টার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগ করেছে রোগী ও তাদের স্বজনরা।

মাদারীপুর সদর উপজেলার ছিলারচর গ্রামের রোমান গাছি মারামারিতে আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন ক্ষতস্থান ড্রেসিং করিয়ে আয়া টাকা চায়। তাদের টাকা না দিলে ড্রেসিং করে না। এটা সরকারি হাসপাতাল, এখানে কেন টাকা লাগবে বুঝি না। ’

মাদারীপুর শহরের শকুনী এলাকার গৃহবধূ ইসরাত বেগম অভিযোগ করে বলেন, ‘আমার ছেলের বয়স এখন আট মাস। যখন ৪৫ দিন বয়স, তখন সদর হাসপাতালে গিয়ে বিসিজি টিকা দিই। সেই টিকা দেওয়ার পর আমার ছেলে অসুস্থ হয়ে পড়ে। তখন তাকে ঢাকায় নিয়ে ডাক্তার দেখাই। সেই ডাক্তার বলেন, মেয়াদোত্তীর্ণ টিকা দেওয়ায় অসুস্থ হয়েছে শিশুটি। বর্তমানে আমার ছেলের চিকিৎসা চলছে। ’ মেয়াদোত্তীর্ণ টিকা ও একই সিরিঞ্জ দিয়ে অনেককে টিকা দেওয়া হয় বলেও তিনি অভিযোগ করেছেন।

হাসপাতালে রোগীদের খাবারের ব্যাপারেও অভিযোগের শেষ নেই। নিম্নমানের খাবার দেওয়া এবং অনেক রোগীই খাবার পায় না বলে অভিযোগ আছে।

খাবার না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন মাদারীপুর সদর উপজেলার মাদ্রা গ্রামের সোবাহান মোল্যা। তিনি বলেন, ‘হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি। এক দিন পার হলেও এখন পর্যন্ত হাসপাতাল থেকে কোনো খাবার পাইনি। ’

এক রোগীর আত্মীয় মহিষেরচর গ্রামের ফারুক, সেলিম, আয়মন নেছাসহ অনেকেই জানান, হাসপাতালের খাবারের মান খুবই খারাপ। হাসপাতাল থেকে খাবার দিলেও তাঁরা দোকান থেকে কিনে এনে রোগীদের খাওয়াচ্ছেন।

অন্য অভিযোগগুলো অস্বীকার করলেও খাবারের ব্যাপারে মাদারীপুর সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. শশাঙ্ক চন্দ্র ঘোষ বলেন, ‘হাসপাতালটি ১০০ শয্যার। তাই আমাদের খাবারও সেই পরিমাণ থাকে। কিন্তু প্রায় সময় হাসপাতালে দেড় শ বা কখনো এরও বেশি রোগী ভর্তি থাকে। তখন নতুন রোগীদের খাবার দেওয়া সম্ভব হয় না। পুরনো রোগী চলে গেলে তখন নতুনদের দেওয়া হয়। ’

আরএমও আরো বলেন, ‘খাবারের ব্যাপারে রোগীদের অভিযোগ আছে। কিন্তু এটা ঠিকাদার সরবরাহ করে থাকে। তাই এ ব্যাপারে আমাদের কিছু করার নেই। ’

হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে দেখা যায়, টয়লেটগুলোর খুবই জরাজীর্ণ অবস্থা। কয়েকটি টয়লেটের দরজাও নেই। কোনোটির দরজা আছে, কিন্তু বন্ধ করার ব্যবস্থা নেই। পানি ব্যবহারের জন্য যে পাত্র ব্যবহারের জন্য রাখা আছে, সেটা খুবই নোংরা ও পুরনো।

মাদারীপুর সদর উপজেলার মহিষেরচর গ্রামের ওমর ফারুক বলছিলেন, তিনি পেট ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। শান্তিমতো টয়লেট করা যায় না। কারণ টয়লেটের দরজা নেই। পরিবেশও নোংরা। এমন অভিযোগ করেছে অসংখ্য রোগী ও রোগীর স্বজনরা।

এ ব্যাপারে মাদারীপুরের সিভিল সার্জন ডা. দিলীপ কুমার দাসও বললেন, ‘মহিলাদের ব্যবহারের জন্য টয়লেটের অবস্থা খুবই জরাজীর্ণ। দেয়ালের অবস্থাও ভালো নয়। এটি নতুন করে তৈরি করা দরকার। এ ছাড়া কয়েক দিন আগে টয়লেটে দুটি নতুন দরজা লাগানো হয়েছে। আরো প্রয়োজন। এ ব্যাপারে গণপূর্ত বিভাগে দুবার চিঠি দেওয়া হলেও কোনো কাজ হয়নি। তাই এখানে আমাদের করার কিছু নেই। ’

এ বিষয়ে জানতে মাদারীপুরের গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু ছালেহ মোহাম্মদ ফিরোজকে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন জানায়, মারামারি বা অন্য কোনো কারণে হাসপাতাল থেকে সনদ নিতে গেলে টাকা দিতে হয়। এ ছাড়া টাকার বিনিময়ে উল্টাপাল্টা সনদ দেওয়া হয় বলেও তারা অভিযোগ করে।

কয়েক মাস আগে হাসপাতালে অনুষ্ঠিত একটি সুধী সমাবেশেও জোরালোভাবে টাকার বিনিময়ে উল্টাপাল্টা সনদ দেওয়ার অভিযোগ করে একাধিক ব্যক্তি।

তবে এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সিভিল সার্জন ডা. দিলীপ কুমার দাস ও আরএমও ডা. শশাঙ্ক চন্দ্র ঘোষ।

ডা. শশাঙ্ক বলেন, ‘এগুলো মিথ্যা অভিযোগ। যারা সুবিধা নেওয়ার জন্য হাসপাতাল থেকে মিথ্যা ও অসত্য সার্টিফিকেট চেয়েও পায়নি তারাই মূলত ক্ষিপ্ত হয়ে এ অভিযোগ করেছে। ’

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, মাদারীপুর সদর হাসপাতালটি ১৮৭৬ সালে স্থাপন করা হয়। পরে ৫০ শয্যা থেকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। বতর্মানে ২২ জন অনুমোদিত চিকিৎসক পদের মধ্যে আছেন ১৭ জন, ৭৯ জন নার্সের মধ্যে  আছেন ৬২ জন, ৬৭ জন তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর মধ্যে ৫০ জন কর্মরত আছেন।

তবে খুব শিগগির আড়াই শ শয্যার কার্যক্রম চালু হবে। এরই মধ্যে ভবন নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। অন্য আনুষঙ্গিক কাজগুলো চলছে এখন।

আরএমও ডা. শশাঙ্ক চন্দ্র ঘোষ বলেন, ‘এরই মধ্যে অনেক যন্ত্রপাতিও চলে এসেছে। তাই আশা করছি এটি চালু হলে রোগীদের অনেক কষ্ট ও নানা সমস্যা কমবে। বর্তমানে ডাক্তার, স্টাফ, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, রোগ নির্ণয়ের যন্ত্রপাতিসহ অনেক কিছুই প্রয়োজনের তুলনায় কম আছে। তাই সেবা দিতে অনেক সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। আশা করছি আড়াই শ বেড চালু হলে অনেক সমস্যাই কমে যাবে। রোগীদের সেবার মানও বাড়বে। ’


মন্তব্য