kalerkantho


রাজশাহী আইএইচটি

হামলায় জড়িত ২০, বহিষ্কার ৪

ঘটনা তদন্তে কমিটি মামলা হয়নি এখনো

রফিকুল ইসলাম, রাজশাহী   

৮ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



হামলায় জড়িত ২০, বহিষ্কার ৪

রাজশাহী ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজির (আইএইচটি) ছাত্রীদের ওপর হামলার ঘটনায় ছাত্রলীগের অন্তত ২০ জন নেতাকর্মী অংশ নেয়। অথচ গত বুধবারের ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত অভিযোগে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ বহিষ্কার করেছে মাত্র চার নেতাকে।

এমনকি হামলার ঘটনায় গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। এ নিয়ে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়েছে।

চার নেতাকে বহিষ্কারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রাজশাহী মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি রকি কুমার ঘোষ। গণধর্ষণের হুমকির বিচার ও নিরাপত্তা চেয়ে অধ্যক্ষের কার্যালয় থেকে ফেরার পথে বুধবার সকালে ছাত্রীদের ওপর ওই হামলা হয়। এতে অন্তত আটজন আহত হয়। ঘটনার পর থেকেই রাজশাহী আইএইচটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। হামলায় জড়িত সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় ইনস্টিটিউট খোলার পরে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা ফের হয়রানির শিকার হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। গতকাল কালের কণ্ঠকে সে আশঙ্কার কথা জানিয়েছে হামলার শিকার শিক্ষার্থীরাও।  

হামলার ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি করা হয়েছে।

আইএইচটির সহযোগী অধ্যাপক আনোয়ারুল ইসলামকে কমিটির সভাপতি করা হয়েছে। কমিটিকে শিগগিরই প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আইএইচটির অধ্যক্ষ সিরাজুল ইসলাম কমিটি গঠনের কথা নিশ্চিত করে জানান, দ্রুত তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রাজশাহী মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি রকি কুমার ঘোষ জানান, ছাত্রীদের ওপর হামলার ঘটনায় আইএইচটি শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি জাহিদুল ইসলাম জাহিদ, সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন তুহিন, সহসভাপতি মিজানুর রহমান ও ফয়সাল হোসেনকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বুধবার সন্ধ্যায় এ চারজনকে বহিষ্কারের জন্য কেন্দ্রের কাছে সুপারিশ করেছিল রাজশাহী মহানগর ছাত্রলীগ।

প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, বুধবারের হামলায় ছাত্রলীগের অন্তত ২০ নেতাকর্মী অংশ নেয়। বহিরাগত কয়েকজনও ছিল। আইএইচটি থেকে পাস করে বের হয়ে গেছেন এমন শিক্ষার্থীও ছিলেন বেশ কয়েকজন। কিন্তু তাঁদের মধ্যে কেবল চারজনকে বহিষ্কারের সুপারিশ করে মহানগর ছাত্রলীগ। এতে বাকিরা পার পেয়ে যায়।  

বিভিন্নভাবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হামলায় অংশ নেন আইএইচটি শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি জাহিদুল ইসলাম জাহিদ, সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন তুহিন, সহসভাপতি মিজানুর রহমান ও ফয়সাল হোসেন, কর্মী রনি, আজম, বিশাল, কাইয়ুম আলী, আকাশ হোসেন, সাইদ হাসান, মাহমুদ হাসান, সাগর হোসেন, স্মরণ, নাহিদ বহিরাগত জনি, সাজু, সায়েম, মাহমুদসহ অন্তত ২০ জন। তারা দুটি ভাগে ভাগ হয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করে। একদল প্রথমে হামলা করে ছাত্রীদের ওপর। এই দলের নেতৃত্বে ছিলেন ছাত্রলীগের সভাপতি জাহিদ ও সাধারণ সম্পাদক তুহিন। তাঁদের সঙ্গে সহসভাপতি মিজানুর ও ফয়সাল, কর্মী নাহিদ, জাকির, মাহমুদ ও সাইদ হাসান ছিলেন। তাঁদের হামলা থেকে ছাত্রীদের উদ্ধার করতে গেলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় অন্যরা। এ সময় কাইয়ুম হাসুয়া নিয়ে ধাওয়া করে রেডিও থেরাপি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী এমরান আলীকে। মারধরে আহত হন ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থী জোহরুল ইসলাম, ল্যাব মেডিসিন বিভাগের শিক্ষার্থী গাফফার হোসেন ও ফিজিও থেরাপি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মিজানুর রহমান। হামলার পরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতেও হামলাকারীদের কয়েকজনকে চিহ্নিত করা গেছে। কিন্তু গতকাল পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়নি।

হামলার শিকার নাবিলা, রুপা, মোহনা, নিসা, এমরান আলী, জু্ঁই, মীমসহ অন্য শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করছে, আইএইচটি শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি জাহিদ, সাধারণ সম্পাদক তুহিন ছাড়াও অন্তত ২০ জন নেতাকর্মী হামলায় অংশ নেয়। অথচ বহিষ্কার করা হয়েছে মাত্র চারজনকে। হামলাকারীরা প্রতিষ্ঠানটি খোলার পরে আবারও ফিরে আসবে দাপটে। তখন তারা ফের হয়রানি করতে পারে। এ নিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে শিক্ষার্থীদের মাঝে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রতিষ্ঠানটির কয়েকজন শিক্ষক দাবি করেন, প্রতিষ্ঠান খোলার পরে স্বরূপে ফিরে আসবে হামলাকারীরা। চারজন বাদে অন্যদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন। এমনকি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও কোনো মামলা করা হয়নি। ফলে সহজেই পার পেয়ে যাবে হামলাকারীরা।

সংশ্লিষ্টরা জানায়, জাহিদ ও তুহিনসহ তাদের সঙ্গীরা পদ পাওয়ার পর থেকেই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারী এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের নানাভাবে হয়রানি, হোস্টেলের সিটবাণিজ্য, ছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করা ছাড়াও নানা অপকর্মে জড়িত ছিল। তাদের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষের কাছে নানাভাবে লিখিত ও মৌখিক অভিযোগও করা হয়েছে। তবে লাভ হয়নি কোনো। উল্টো বিপাকে পড়তে হয়েছে অভিযোগকারীদের।  

তুহিনের বিরুদ্ধে চাঁদা চেয়ে মারপিটের হুমকি এবং বিভিন্নভাবে হয়রানির অভিযোগ করেছিলেন প্রতিষ্ঠানটির কম্পিউটার অপারেটর আলীমুদ্দীন মুন্সি। ২০১৪ সালের ওই ঘটনার পর তুহিনের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা এখন পর্যন্ত নেননি অধ্যক্ষ।

এ নিয়ে জানতে চাইলে অধ্যক্ষ সিরাজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি এখানে নতুন এসেছি। তাই অনেক বিষয়ে এখনো অবগত হতে পারিনি। তবে বুধবারের  ঘটনা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। কারা এর সঙ্গে জড়িত, তা তদন্ত করে বের করা হবে। এরপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’


মন্তব্য