kalerkantho


শীতলপাটি

সুদিন ফেরার পালা

ইয়াহইয়া ফজল, সিলেট   

৭ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



সুদিন ফেরার পালা

জাতীয় জাদুঘরে শীতলপাটি মেলায় পাটি বুনছেন শিল্পীরা। মঙ্গলবার তোলা ছবি। ছবি : কালের কণ্ঠ

আবহমান বাংলার অনন্য নিদর্শন সিলেটের শীতলপাটি এখন বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। ইউনেসকোর স্বীকৃতির ঘোষণাটি এমন সময়ে এলো যখন যথাযথ উদ্যোগ, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব আর অবহেলায় ঐতিহ্যের শীতলপাটি হারিয়ে যাওয়ার পথে। তবে বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি অর্জনের মধ্য দিয়ে যথাযথ উদ্যোগের মাধ্যমে শীতলপাটির সুদিন ফিরে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

সিলেটের বুননশিল্পের ইতিহাসে ঐতিহ্যবাহী নাম শীতলপাটি। ঠিক কোন সময় থেকে সিলেটে এই পাটি তৈরি ও বিপণন শুরু হয়েছিল তার সঠিক তথ্য না থাকলেও অপূর্ব নির্মাণশৈলীর কারণে তা বহু আগে থেকেই দেশ-বিদেশে সমাদৃত। সময়ের ব্যবধানে যথাযথ উদ্যোগ ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ঐতিহ্যবাহী এই শীতলপাটি আজ বিলুপ্তির পথে। একসময় যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, সুইডেন ও যুক্তরাজ্যে রপ্তানি হলেও এখন তা বন্ধ রয়েছে। শীতলপাটির সঙ্গে জড়িত কারিগররাও ভিন্ন পেশা বেছে নিচ্ছে। অথচ সরকারি সহযোগিতা পেলে এ শিল্পের মাধ্যমে প্রতিবছর বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব।

সিলেটে শীতলপাটির কদর সাধারণ গৃহস্থালি থেকে নগরের বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট পর্যন্ত বিস্তৃত। গ্রাম-শহর-নির্বিশেষে শীতলপাটির অপরিহার্যতা এখনো ফুরাবার নয়। হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে শীতলপাটি দেওয়ার রেওয়াজ আজও প্রচলিত। তা ছাড়া আধুনিক গৃহসজ্জার কাজে চমৎকার বুননের শীতলপাটির ব্যবহারও দিন দিন বেড়ে চলেছে।

সিলেট অঞ্চল এই পাটির জন্য বিখ্যাত। বরিশাল, টাঙ্গাইল, কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর অঞ্চলেও এই পাটি বুননের কাঁচামাল বেতগাছ জন্মে এবং পাটিও পাওয়া যায়।

শীতলপাটির দাম নির্ধারণ হয় এর বুনন নৈপুণ্যের ওপর ভিত্তি করে। ইতিহাস বলছে, আগেকার দিনে পাটি যত চিকন হতো দামও তত বাড়ত। এই নিয়ম এখনো আছে দাম নির্ধারণে। নবাবী আমলে সিলেটি শীতলপাটি ২০ টাকা থেকে শুরু করে ৮০-৯০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। বর্তমান সময়ে একেকটি শীতলপাটির দাম ৩০০ টাকা থেকে ১১-১২ হাজার টাকা পর্যন্ত।

‘মুরতা’ নামের একবীজপত্রী উদ্ভিদের ছাল থেকে এই শীতল পাটি তৈরি করা হয়। সিলেটের গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ, বিশেষ করে বালাগঞ্জের প্রায় সর্বত্র ‘মুরতা’ পাওয়া যেত। বনজঙ্গল কেটে আবাদ ও জনসংখ্যার আধিক্যের কারণে ‘মুরতা’ বন বিলীন হয়ে যাচ্ছে। পৃষ্ঠপোষকতার অভাব এবং প্রজন্মের ব্যবধানের কারণে গ্রামীণ নারীরা যারা শৌখিনতা ও হাতের কাজ প্রদর্শন কিংবা প্রয়োজন বিবেচনায় পাটি তৈরি করত তারা এখন আর তা করে না।

শীতলপাটির কাঁচামালের উৎস উদ্ভিদকে সিলেট অঞ্চলে কোথাও ‘মোর্তা’ আবার কোথাও ‘মোর্তাবেত’ বলা হয়। বেত জাতীয় এই উদ্ভিদের বৈজ্ঞানিক নাম মারেন্টা ডিকোটোমা। এই উদ্ভিদের উচ্চতা প্রায় সাড়ে চার ফুট বা পাঁচ ফুট। জলা বা ডোবার আশপাশে অগভীর পানি বা নরম মাটিতে এই উদ্ভিদের চাষ হয়। মোর্তার স্বাভাবিক রং ক্রিম। তবে পাটিতে কালো, বাদামি, মেরুন, নীল ইত্যাদি রঙের নকশাও তোলা হয়। কৃত্রিম রং ব্যবহারের পাশাপাশি বেতিকে দীর্ঘদিনের জন্য কাদা মাটিতে পুঁতে কালো রং ধরানো হয়। ঘষে ঘষে ওপরের আবরণ তুলে করা হয় বাদামি রং। তেধারা, দোধারা, চিউনী, বোটনি, তেসরী, আড়া খাড়া—নানা ধরনের বুননে শীতলপাটি তৈরি হয়। শিল্পীর নিপুণতায় বুননের নকশায় শীতলপাটিতে ফুটে ওঠে গাছ, পাখি, মসজিদ, হরিণ, বাঘ, পাশার ছক, হাতি, কখনোবা বাংলাদেশের মানচিত্র।

গ্রামীণ জীবনে শীতলপাটির ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। জায়নামাজ, বিছানার চাদরের পরিবর্তে গরমের দিনে এই পাটি ব্যবহার করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে অনেকে। সিলেটে খাবারের চাটাই, গায়ে হলুদ, মেহেদিসন্ধ্যা, বরের আসন এবং অভিজাত উপহারের তালিকায় শীতলপাটির স্থান শীর্ষে। অভিজাত বাসাবাড়ি, হোটেল রেস্তোরাঁর ইন্টেরিয়র ডেকোরেশনে এই পাটির নকশা ব্যবহার করা হয় আভিজাত্য বাড়াতে। সিলেটবিষয়ক বই-ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদেও লুপ্তপ্রায় শীতলপাটির নকশার ব্যবহার দেখা যায়। দেশি-বিদেশি পর্যটকরা সিলেটে এলে শীতল পাটি সংগ্রহের চেষ্টা করেন। ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্যে শীতলপাটির কদর সবচেয়ে বেশি।

ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটি তৈরির সূতিকাগার সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলা। এ ছাড়া রাজনগর, বড়লেখায়ও এই পাটি বুননের কারিগর রয়েছে। তবে বালাগঞ্জের শীতলপাটি বিশেষ ঐতিহ্যের দাবিদার। ব্রিটিশ আমলে ভিক্টোরিয়ার রাজপ্রাসাদে স্থান লাভ করেছিল বালাগঞ্জের গৌরীপুরের শিল্পীদের তৈরি একটি শীতলপাটি। ১৯০৬ সালে রাজনগর থানার যুদরাম দাস কলকাতার শিল্প প্রদর্শনীতে শীতলপাটি প্রদর্শনের জন্য স্বর্ণপদক লাভ করেছিলেন। সে সময়টাতে রাজনগর ও বালাগঞ্জ অভিন্ন অঞ্চল ছিল।

১৯৮২ সালে জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ কারুশিল্পীর পুরস্কারে ভূষিত হন বালাগঞ্জের পাশের বিলবাড়ী গ্রামের পাবন জয় দাস। ১৯৯১ সালে বিশ্বের কারুশিল্পের এক প্রদর্শনী ইতালির রাজধানী রোমে অনুষ্ঠিত হয়। বালাগঞ্জের পাশের বিল গ্রামের সনীন্দ্র দাস শীতলপাটির কারুশিল্পী হিসেবে বালাগঞ্জ থানার প্রতিনিধিত্ব করেন।

শীতলপাটি বুননে যথেষ্ট শৈল্পিক কৃতিত্ব প্রদর্শন করে বালাগঞ্জের শিল্পীরা দেশি-বিদেশি সুধীজনের ভূয়সী প্রশংসা কুড়িয়েছে। শীতলপাটি বুননে বালাগঞ্জের পশ্চিম গৌরীপুর ইউনিয়নের তেঘরিয়া গ্রামের রয়েছে সুখ্যাতি। তা ছাড়া থানার আতাশন, গৌরীপুর, শ্রীনাথপুর, চানপুর, কুমারগাঁও তিলকচানপুর গ্রামে তৈরি পাটিরও খ্যাতি রয়েছে। শীতলপাটি তৈরির শিল্পী পরিবারগুলোতে মহিলা ও পুরুষ এবং উপযুক্ত ছেলেমেয়েরাও এই পেশায় জড়িত। এ ক্ষেত্রে মহিলারাই তা তৈরি করে। তবে বালাগঞ্জের শীতলপাটির যে নাম-ডাক ছিল সেই ঐতিহ্য বিলুপ্ত হতে চলেছে।

কালের পরিক্রমায় এই পেশায় জড়িতদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন সামগ্রীর বাজার দখলের কারণে সংকুচিত হয়ে এসেছে শীতলপাটির বিক্রয় ও বিপণন। চাহিদা কমে যাওয়ায় অনেকেই বাধ্য হয়ে এ পেশা ছেড়ে দিয়েছে। যারা টিকে আছে তারা অর্থাভাবকে সঙ্গী করেই টিকে আছে। রেঙ্গার হরি বাবু ও বারিন্দ্র দাস, বড়লেখার অশ্বিনী বাবু, দাসের বাজারের সদয় বাবু, বালাগঞ্জের কোকিল দাস ও প্রমেশ দাস শৈল্পিক শীতলপাটি তৈরির একসময়ের নামকরা কারিগর। তাঁদের অপূর্ব বুননের শীতলপাটি ঘরে ঘরে স্থান করে নিলেও তাঁরা রয়ে গেছেন অবহেলিত। সামান্য বেত দিয়ে অপূর্ব নকশাখচিত পাটি তৈরি করলেও পারেননি জীবনকে নকশার সাজে সাজাতে। পরিবার-পরিজনরাও বাড়ির উঠোনে দিনের পর দিন পাটি তৈরি করে সহযাত্রীর জীবনের সঙ্গে একীভূত করেছে নিজেদের। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এই শিল্পের ভবিষ্যৎ হয়ে পড়েছে এখন অনিশ্চিত। এই পেশায় জড়িতদের দাবি—রাষ্ট্রীয়ভাবে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ, সহজ শর্তে ঋণদান এবং সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করলে শীতলপাটি দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে ব্যাপক অবদান রাখবে। একই সঙ্গে শীতলপাটি রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় ও দেশীয় ঐতিহ্যের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে।

এদিকে শীতলপাটির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিপ্রাপ্তির খবর সিলেটে গতকাল ছিল সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। নগরের দরগা গেট এলাকার শীতলপাটি বিক্রেতা জহির আহমদ বললেন, এই স্বীকৃতির ফলে মানুষের মধ্যে শীতলপাটি সম্পর্কে আগ্রহ বাড়বে। বিক্রি বাড়লে শ্রমিকরাও ন্যায্য মজুরি পাবে। ফলে এই শিল্প আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।

সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি খন্দকার সিপার আহমদ বললেন, ‘এই স্বীকৃতির ফলে শীতলপাটিকে ঘিরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন করে আগ্রহের সৃষ্টি হবে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও আগ্রহী হবেন এই ক্ষেত্রে বিনিয়োগে।


মন্তব্য