kalerkantho


দিনদুপুরে চুরি হয় ওয়ার্ডে

হায়দার আলী বাবু, লালমনিরহাট   

২০ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



দিনদুপুরে চুরি হয় ওয়ার্ডে

হাসপাতালের একটি পুরনো ভবন ভেঙে সেখানে শুরু হয়েছে একটি আটতলা ভবন নির্মাণের কাজ। ফলে ওই ভবনের পাশে থাকা সাইকেল-মোটারসাইকেল গ্যারেজটি সরিয়ে এনে অস্থায়ীভাবে বসানো হয়েছে মূল ভবনের ঠিক সামনে। গত শনিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ওই গ্যারেজে মানুষের জটলা দেখা যায়। ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢুকে দেখা গেল, গ্যারেজের চালার খুঁটির সঙ্গে পিঠমোড়া করে বেঁধে রাখা হয়েছে প্রায় ২৫ বছর বয়সী এক যুবককে। মাঝেমধ্যে দু-একজন নানা প্রশ্ন করছে, সদুত্তর না পেলে দিচ্ছে পিটুনি। উপস্থিত লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, কিছুক্ষণ আগে হাসপাতালের তিনতলায় ভর্তি থাকা এক রোগীর মোবাইল ফোনসেট চুরি করে সে চম্পট দেওয়ার চেষ্টা করছিল। কিন্তু পালাতে পারেনি। পরে ওই রোগীর স্বজনদের পক্ষ থেকে থানায় মামলা করা হয় এবং যুবকটিকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

লালমনিরহাট সদর হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলোতে দিনদুপুরে চুরির মতো ঘটনা আরো ঘটেছে কি না, সে ব্যাপারে গতকাল রবিবার অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা গেল, মাঝেমধ্যেই ওয়ার্ড থেকে রোগী বা তাদের স্বজনদের মূল্যবান জিনিস চুরি হয়ে থাকে। শুধু ওয়ার্ড থেকেই নয়, হাসপাতালের সামনে থেকেও সাইকেল-মোটরসাইকেল চুরির ঘটনা ঘটে মাঝেমধ্যে। রাতের বেলা চুরি আরো বেড়ে যায়। রাত হলে আবার হাসপাতাল ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে আনাগোনা শুরু হয় মাদকসেবীদের। চুরি-ছিনতাইয়ের পাশাপাশি মাদক সেবনের নিরাপদ স্থান হিসেবেও ব্যবহার করে থাকে হাসপাতালকে। একাধিক রোগী, হাসপাতালকর্মী ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে এসব তথ্য।

হাসপাতালের ফটকে কথা হয় সদর উপজেলার নয়ারহাট এলাকার আব্দুল মান্নানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘মাসখানেক আগে বাইসাইকেলে করে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে অসুস্থ এক আত্মীয়কে দেখতে এসেছিলাম। তখন বিকেল বেলা। সাইকেলটি তালা মেরে হাসপাতালের বাইরের দেয়ালে হেলান দিয়ে রেখে নিচতলার জরুরি বিভাগে ঢুকেছি। মিনিট পাঁচেক পর এসে দেখি সেটি গায়েব।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতাল এলাকার এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘রাতের অন্ধকার নামার সাথে সাথেই হাসপাতালটি চলে যায় মাদকসেবীদের দখলে। হাসপাতাল ভবনের বিভিন্ন কোনা, ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় অনেক মাদকসেবী গাঁজা-ফেনসিডিলের মতো মাদক গ্রহণের পাশাপাশি কেউ কেউ রোগী বা তাদের স্বজনদের জিনিসপত্র চুরি-ছিনতাই করে নিয়ে যায়।’

হাসপাতালের মহিলা ওয়ার্ডে ভর্তি এক রোগীর স্বজন সাহিদা বেগম দাবি করেন, ‘ভর্তি রোগীদের স্বজন ছাড়াও যখন-তখন বিভিন্ন লোকজন ওয়ার্ডে ঢুকে ঘোরাফেরা করে। ফলে নারীদেরও এক ধরনের ভয়ের মধ্যে থাকতে হয়।’

জেলা সদরসহ পাঁচ উপজেলার প্রায় ১৫ লাখ মানুষের জন্য ১০০ শয্যার হাসপাতালটিতে আজ পর্যন্ত কোনো নিরাপত্তা বা নৈশপ্রহরীর কোনো পদই সৃষ্টি করা হয়নি। আর যেখানে মঞ্জুরীকৃত পদই নেই সেখানো তো সরকারিভাবে নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ দেওয়ার প্রশ্নই নেই। এ অবস্থায় পুরো হাসপাতালই এখন বলতে গেলে চলছে অরক্ষিত অবস্থায়। শনিবার রাত ও গতকাল রবিবার সকালে সরেজমিনে ঘুরেও পাওয়া গেছে এর সত্যতা। আবার খোদ সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবুল ফাত্তাহ মো. আহসান আলীর মুখ থেকেও ‘অরক্ষিত’ শব্দটি শোনা গেছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, লালমনিরহাট সদর হাসপাতালটি চালু হয়েছিল ৩১ শয্যা নিয়ে। পরে সেটি ৫০ এবং আরো পরে ১০০ শয্যায় রূপান্তরিত হয়। শুরুতেই যেমন হাসপাতালের মঞ্জুরীকৃত বিভিন্ন পদের সঙ্গে নিরাপত্তা প্রহরীর পদ রাখা হয়নি, তেমনি রাখা হয়নি আয়া বা ওয়ার্ড বয়েরও কোনো পদ। আজ পর্যন্ত নিরাপত্তা প্রহরী, আয়া, ওয়ার্ড বয় ও বাগান পরিচর্যাকারীর কোনো পদই সৃষ্টি করা হয়নি। চতুর্থ শ্রেণির এসব পদের মধ্যে শুধু সরকারিভাবে আছে একটি পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পদ, যাকে দিয়ে ২৪ ঘণ্টা পুরো হাসপাতাল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে মনে করেন হাসপাতালের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। গত দুই দিন তিনতলা হাসপাতাল ভবন ও এর আশপাশে ঘুরেও এর সত্যতা মিলেছে।

কেবিন ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা গেছে, দুই পাশে মুখোমুখি একেকটা কেবিন। আর এর মাঝখানের চলাচলের পথের বিভিন্ন স্থানে জমে আছে পানি, আছে নানা ধরনের ময়লা। কেবিনে থাকা রোগীর বিছানার ব্যবহৃত চাদর বাইরে এনে ফেলে রাখা হয়েছে। গতকাল কেবিনে থাকা এক রোগীর স্বজনের সঙ্গে একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মীর বাগিবতণ্ডা হতে দেখা গেছে। পরে ওই পরিচ্ছন্নতাকর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তিনি মাসিক দেড় হাজার টাকার বিনিময়ে অস্থায়ীভাবে সেখানে কাজ করেন, যা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দেয়। রোগীর স্বজনদের কাছে থেকে তিনি ‘বকশিশ’ চেয়ে নেন।

আর ওই রোগীর স্বজন নিজের পরিচয় না দিয়ে অভিযোগ করেন, কক্ষ পরিষ্কারের নামে তাঁর কাছ থেকে বেশি টাকা দাবি করেছেন ওই পরিচ্ছন্নতাকর্মী।

হাসপাতালের আন্ত বিভাগের বিভিন্ন ওয়ার্ডে দেখা গেছে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ। নেই কোনো আয়া-ওয়ার্ড বয়।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকারিভাবে হাসপাতালে কর্মরত আছেন একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী। আর বেসরকারিভাবে কাজ করছেন আরো তিনজন। তবে এই চারজনও যথেষ্ট নয়, সেখানে প্রয়োজন অন্তত ১২ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী। এ ছাড়া কয়েক বছর ধরে ইউনিসেফের অর্থায়নে একটি সংস্থার মাধ্যমে ওয়ার্ড বয়, আয়া ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে মোট আটজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তবে গত অক্টোবর থেকে আর বরাদ্দ না দেওয়ার বিষয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে আন্তর্জাতিক সংস্থাটির পক্ষ থেকে। এর পরও যদি টাকা দেয়—এমন আশায় গতকাল পর্যন্ত কাজ করেছেন ওই আটজন।

এসব বিষয়ে কথা হয় তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবুল ফাত্তাহ মো. আহসান আলীর সঙ্গে। তিনিও পরিচ্ছন্নতাকর্মী, আয়া-ওয়ার্ড বয়ের পদ না থাকায় নানামুখী সমস্যার কথা জানান। নিরাপত্তাকর্মী না থাকায় পুরো হাসপাতাল যে এক প্রকার অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে সেটিও অনেকটা অকপটে স্বীকার করেছেন তিনি। এসব বিষয় সমাধানে দিনের পর দিন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানোসহ চিঠি দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি, তবু হয়নি সমাধান।

এর পরও স্থানীয় সংসদ সদস্য, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও পৌর মেয়রসহ কয়েকজনের সহায়তায় কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবী কাজ করছেন বলেও জানান ডা. আবুল ফাত্তাহ। তিনি বলেন, ‘সরকারিভাবে ওই পদগুলো এখন পর্যন্ত সৃষ্টিই করা হয়নি। এর পরও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সহায়তায় মাসিক দেড় থেকে দুই হাজার টাকায় আপাতত কাজ করছে কয়েকজন। আর পৌর মেয়র নতুন করে দুজন পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে সকাল-বিকাল হাসপাতালে পাঠানোর আশ্বাস দিয়েছেন।’


মন্তব্য