kalerkantho


গাড়িতে পিষ্ট ফৌজিয়ার স্বপ্ন মেধা প্রাণ

নোয়াখালী প্রতিনিধি   

২০ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



গাড়িতে পিষ্ট  ফৌজিয়ার স্বপ্ন মেধা প্রাণ

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের অষ্টম ব্যাচের স্নাতক (সম্মান) শেষ বর্ষের মেধাবী ছাত্রী ফৌজিয়া মুসলিম। আগের তিন বর্ষেই প্রথম শ্রেণিতে প্রথম তিনি। আগামী মাসে তাঁদের শেষ বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষা। গত ১৬ নভেম্বর বিদায় অনুষ্ঠানও হয়ে গেছে। সেই ফৌজিয়াই গতকাল রবিবার জীবন থেকে বিদায় নেন।

বাড়ি থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যাওয়ার পথে তাঁর অটোরিকশাকে পেছন থেকে আরেকটি অটোরিকশা ধাক্কা দিলে রাস্তায় ছিটকে পড়েন ফৌজিয়া। মুহূর্তেই বিপরীত দিক থেকে আসা একটি পিকআপের চাপায় থেমে যায় তাঁর জীবন। গতকাল দুপুরে নোয়াখালীর সোনাপুর-সুবর্ণচর সড়কের ঠক্কর মোড় এলাকায় ঘটে মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনা।

ইতিমধ্যে বাগদানও হয়েছিল ফৌজিয়ার। আগামী ৫ জানুয়ারি বিয়ের পিঁড়িতে বসার কথা ছিল তাঁর।

ফৌজিয়া নোয়াখালী জেলা শহরের দত্তেরহাটসংলগ্ন সাহাপুরের ঠিকাদার মুসলিম উদ্দিনের মেয়ে। তিন ভাইয়ের একমাত্র বোন ছিলেন ফৌজিয়া। স্কুলজীবন থেকেই মেধাবী হওয়ায় পরিবারের মধ্যমণি ছিলেন তিনি। এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ ৫ পাওয়া ফৌজিয়ার ইচ্ছা ছিল তাঁর প্রিয় এই বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজ বিভাগে শিক্ষক হওয়ার।

ফৌজিয়ার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে বিশ্ববিদ্যালয়সহ এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে।

খবর পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. অহিদুজ্জামান, উপ-উপাচার্য ড. আবুল হোসেনসহ বিভাগীয় প্রধান, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাঁদের বাড়িতে গিয়ে শোকার্ত পরিবারকে সমবেদনা জানান। ওই সময় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি কেউ।

ওই সময় ফৌজিয়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, আহাজারি করতে করতে ফৌজিয়ার বাবা বলছেন, ‘আমার সব কিছু শেষ হয়ে গেল। সব স্বপ্ন শেষ, বাগদান হয়ে গেছে, পরীক্ষা শেষে ধুমধাম করে তাঁর বিয়ে দেব। সব শেষ হয়ে গেল।’ পরক্ষণেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন মুসলিম উদ্দিন।

বাড়িতে ছুটে আসা ফৌজিয়ার সহপাঠীদের দেখা গেল কাঁদছেন আর আক্ষেপ করছেন। এভাবে তাঁদের বান্ধবীকে হারাতে হবে তা তাঁরা কখনো চিন্তাও করেননি। মাত্র তিন দিন আগে বিদায় অনুষ্ঠান হয়েছে তাঁদের। সেই ফৌজিয়ার যে জীবনের বিদায় হবে তা ভাবতে পারছেন না সহপাঠীরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, গত ১৬ নভেম্বর ফার্মেসি বিভাগের অষ্টম ব্যাচের বিদায় অনুষ্ঠানে উপাচার্যের হাত থেকে ক্রেস্ট নিয়েছিলেন ফৌজিয়া। আগামী মাসে তাঁদের চূড়ান্ত পরীক্ষা ছিল।

শিক্ষক আল মামুন জানান, দুর্ঘটনার পর আশপাশের লোকজন ফৌজিয়াকে প্রথমে কাছের একটি বেসরকারি হাসপাতালে এবং পরে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যায়। তখন চিকিৎসকরা জানান—ফৌজিয়া আগেই মারা গেছেন।

সুধারাম থানার ওসি আনোয়ার হোসেন জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পিকআপটি আটক করেছে। এ ব্যাপারে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

ওসি জানান, পরিবারের আবেদনে ফৌজিয়ার লাশ ময়নাতদন্ত ছাড়াই স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

ফার্মেসির বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের এ যাবৎকালের সবচেয়ে ভালো ফলাফলধারী ফৌজিয়া। গত বৃহস্পতিবার তাঁকে যে ফার্মেসি বিভাগ থেকে শেষ বিদায় দিয়েছিলাম এটি যে তাঁর জীবনের শেষ বিদায় হবে তা ভাবতে পারিনি। এই মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না।’

ড. মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম জানান, পড়ালেখা শেষে ফৌজিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেওয়ার কথা ছিল। আগামী ১০ ডিসেম্বর তাঁদের চূড়ান্ত পরীক্ষা শুরু হবে। সে জন্য তিনি ভালো প্রস্তুতি নিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসছিলেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মুশফিক হোসেন বলেন, ‘ফৌজিয়ার মতো মেধাবী ছাত্রীকে শুধু আমরা হারাইনি, নোয়াখালীর একটি সম্পদ অকালে ঝরে পড়ল। এ দায়ভার আমাদের সকলের।’

জানাজার সময় ফৌজিয়ার ছোট ভাই নোয়াখালী কলেজের ছাত্র আদনান তাঁর বোনের মতো আর কাউকে যেন এভাবে অকালে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যেতে না হয় সেই ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী জানান, ফৌজিয়াকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল। মাথায় গুরুতর আঘাত লাগায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে তাঁদের ধারণা।

গতকাল রাত সোয়া ৮টার দিকে বাড়ির সামনে ফৌজিয়ার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, নোয়াখালী পৌরসভার মেয়র শহিদ উল্লাহ খান সোহেল, নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি অধ্যক্ষ খায়রুল আনম সেলিম, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থী ছাড়াও এলাকাবাসী অংশ নেয়। পরে বাড়ির পাশে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর লাশ দাফন করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে আজ শোক পালন : ফৌজিয়ার মৃত্যুতে আজ সোমবার নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শোক পালন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে সকালে কালো পতাকা উত্তোলন, শিক্ষক, ছাত্রছাত্রী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কালো ব্যাজ ধারণ এবং বিভাগে বিশেষ দোয়ার আয়োজন।



মন্তব্য