kalerkantho


প্রদর্শনী

গ্যালারি চিত্রকে অদেখা মাধুরী

নওশাদ জামিল   

১ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



গ্যালারি চিত্রকে অদেখা মাধুরী

রাজধানীর গ্যালারি চিত্রকে আবদুর রাজ্জাকের শিল্পকর্ম ঘুরে দেখছেন অতিথিরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

দিনটি ছিল ২০০৫ সালের ২৩ অক্টোবর। শিল্পী আবদুর রাজ্জাক যশোরে একটি শিল্পকর্মশালা পরিচালনা করছিলেন। ছবি আঁকছিলেন নিবিষ্ট মনে। অকস্মাৎ নীরব ঘাতক হৃদরোগের হানা। ছবি আঁকতে আঁকতেই তিনি ঢলে পড়েন। শিল্পী হয়তো মুহূর্তেই বুঝতে পেরেছিলেন আর বেশিক্ষণ বেঁচে থাকা হবে না! ক্যানভাসে তাত্ক্ষণিক এঁকেছিলেন নিজের শেষ চিত্র। কোদাল-টুকরি আর নিজ কবরের প্রতিকৃতি এঁকে বুঝিয়ে দিয়ে দেন তা। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই তিনি পাড়ি জমান না-ফেরার দেশে।

বরেণ্য চিত্রশিল্পী ও ভাস্কর আবদুর রাজ্জাকের জীবনের শেষ চিত্রকর্মটি এখন শোভা পাচ্ছে রাজধানীর গ্যালারি চিত্রকে। এই প্রথমবারের মতো তাঁর চিত্রকর্মটি দেখার সুযোগ মিলছে। শিল্পী আবদুর রাজ্জাকের বহু অদেখা ও বিরল চিত্রকর্ম নিয়ে চিত্রকে শুরু হয়েছে তাঁর একক চিত্রপ্রদর্শনী। ১৯৫১ সাল থেকে ২০০৫ পর্যন্ত আঁকা চিত্রকর্ম ও ভাস্কর্য দিয়ে সাজানো হয়েছে এই আয়োজন।

শিল্পী আবদুর রাজ্জাকের বিভিন্ন সময় আঁকা ১২০টি চিত্রকর্ম নিয়ে আয়োজিত হয়েছে এই প্রদর্শনী। তাঁর অদেখা এসব চিত্রকর্মকে শিল্পবোদ্ধা ও শিল্পানুরাগীরা বলছেন অদেখা মাধুরী। শিল্পীর দুর্লভ সেই মাধুরী দেখতে গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় গ্যালারি চিত্রকে ছিল শিল্পরসিকদের উপচেপড়া ভিড়।

আবদুর রাজ্জাক বাংলাদেশের প্রথম প্রজন্মের চিত্রশিল্পী। একই সঙ্গে ভাস্কর্য, ছাপচিত্রসহ শিল্পের নানা মাধ্যমে রয়েছে তাঁর অগ্রণী ভূমিকা। বরেণ্য এই শিল্পী ছিলেন চারুকলা ইনস্টিটিউটের দ্বিতীয় ব্যাচের শিক্ষার্থী। তাঁর নেতৃত্বেই এখানে ১৯৬৩ সালে ভাস্কর্য বিভাগ খোলা হয়। তাঁর হাত ধরেই প্রসারিত হয় দেশের ভাস্কর্য চর্চা। ২০০৫ থেকে ২০১৭ সাল—মৃত্যুর এক যুগ পরও বিস্মৃত হননি শিল্পী, স্মরণের বাইরে যায়নি তাঁর সৃজনকর্ম।

আবদুর রাজ্জাক ছিলেন বহুমাত্রিক শিল্পী। চিত্রকলা, ছাপচিত্র ও ভাস্কর্য—তিনটি মাধ্যমেই তিনি ছিলেন সাবলীল। তেলরং, জলরং ও অ্যাক্রিলিকে তিনি প্রচুর কাজ করেছেন। এঁকেছেন বিখ্যাত অনেক নিসর্গ চিত্র। প্রকৃতির রূপরস ও ব্যঞ্জনাকে নতুন ভঙ্গিমায় প্রকাশ করেছেন তিনি। এ জন্য তাঁকে প্রকৃতিপ্রেমিক বলা হয়। শিল্পী রাজ্জাক চিত্রকলায় যেমন তরল ও সচল, ভাস্কর্যে ততটাই দৃঢ় ও উড্ডীন। ছাপচিত্রে পাথর ও ধাতব পাত্রের অন্তরের ভাষা শিল্পী সমপরিমাণে ব্যঞ্জনা করে প্রকাশ করেছেন।

শিল্পী আবদুর রাজ্জাকের সুযোগ্য ছেলে আসিফ আহমেদ একজন চিত্র সংগ্রাহক। বাবার রেখে যাওয়া চিত্রকর্মগুলো যক্ষের ধনের মতো আগলে রেখেছেন তিনি। এসব চিত্রকর্ম এত দিন দেখার তেমন সুযোগও ছিল না। আসিফ আহমেদের সংগ্রহে থাকা চিত্রকর্ম নিয়ে আয়োজিত পক্ষকালব্যাপী একক প্রদর্শনীর সুবাদে এবার শিল্পী আবদুর রাজ্জাকের দুর্লভ চিত্র দেখা ও সংগ্রহের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

গ্যালারিতে প্রবেশ করতেই ডান দিকে চোখে পড়বে ১৯৯৮ সালে তেল রঙে আঁকা শিল্পীর নিজেরই ছবি। এরপর একে একে নানা রঙের, নানা বর্ণের ভুবনে ভেসে চলার পালা। একে একে দেখা মিলবে শহর, গ্রাম থেকে শহরে পরিণত হতে যাওয়া সহজ-সরল নাগরিক জীবন। যেমন রয়েছে তাঁর দেখা ১৯৭৫ সালের রায়েরবাজার। বর্তমানের রায়েরবাজারের সঙ্গে সেই চিত্রের দুস্তর তফাত। মুগ্ধ হতে হয় এই রায়েরবাজার সিরিজের ছবিগুলো দেখে। ১৯৫২ সালের চকবাজারের চিত্রও রয়েছে প্রদর্শনীতে। মিশ্র মাধ্যমে আঁকা এই চিত্রকর্মটিও বর্তমান চকবাজারের সঙ্গে মিল খায় না।

মন ভালো করে দেয় এমন বেশ কিছু ল্যান্ডস্কেপ রয়েছে প্রদর্শনীতে। দেখা মিলবে বেশ কিছু সেলফ পোর্ট্রেট, নারী মডেল, মুক্তিযুদ্ধ, নদ-নদী, নৌকা, ফুল, গরু, উৎসব, হালচাষ, রাগান্বিত গরু, শীতের সকালের খেজুর গাছ, খেয়াঘাট, ইটের ভাটা, পাহাড়, সুন্দরবন, বাগান, শহুরে জীবনে পায়েচলা পথ ইত্যাদি। তবে বিশেষভাবে মুগ্ধ করে শিল্পীর দেখা ও তুলির আঁচড়ে উঠে আসা রাজধানীর ফুলার রোড, যমুনা নদী, বুড়িগঙ্গা, সিলেট, বন্দরনগর চট্টগ্রাম ইত্যাদি চিত্রকর্ম। 

হেমন্তের সন্ধ্যায় গতকাল এই প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। বিশেষ অতিথি ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলাম ও শিল্পী অধ্যাপক রফিকুন নবী। সভাপতিত্ব করেন শিল্পী সৈয়দ জাহাঙ্গীর। গ্যালারির নির্বাহী পরিচালক মুনিরুজ্জামান এবং আবদুর রাজ্জাকের ছেলে আসিফ আহমেদও এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

প্রদর্শনী উপলক্ষে একটি সুদৃশ্য ক্যাটালগ প্রকাশ করেছে গ্যালারি চিত্রক। তাতে ‘রাজ্জাক স্যার’ ও ‘আবদুর রাজ্জাক : বহুমাত্রিক’ শিরোনামে দুটি নিবন্ধ লিখেছেন রফিকুন নবী। প্রদর্শনী চলবে ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত প্রদর্শনী সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।



মন্তব্য