kalerkantho


সড়ক নালা বেহাল নেই বাতি ডাস্টবিন

লিমন বাসার, বগুড়া   

১ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



সড়ক নালা বেহাল নেই বাতি ডাস্টবিন

বগুড়া পৌরসভার বাদুরতলা এলাকার বাসিন্দা আব্দুল মান্নান। পেশায় তিনি প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার। পৌর এলাকার রাস্তাঘাটের করুণ অবস্থা দেখে সম্প্রতি স্বেচ্ছায় তিনি পৌরসভার কাছে একটি আবেদন করেছেন। সেখানে তিনি মেয়রের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছেন, ‘আপনি শহরবাসীর দুর্ভোগ কমাতে যথাযথ নিয়মে দরপত্র আহ্বান করে মেরামত কাজ শুরু করুন। প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান বিনা শর্তে আমি দেব। পৌরসভার অর্থ ছাড় (বরাদ্দ মিললে) হলে আমাকে সেই টাকা বিনা সুদে পরিশোধ করবেন। অথবা আমাকে দায়িত্ব দিন, আমি মাত্র তিন মাসে আমার নিজস্ব যন্ত্রপাতি ও লোকবল দিয়ে পৌর এলাকার সব রাস্তা মেরামত করে শহরবাসীর দুর্ভোগ লাঘব করব।’

বগুড়া পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, এমন প্রস্তাব দিয়ে আব্দুল মান্নানের পাঠানো চিঠিটি মেয়রের হস্তগত হয়েছে প্রায় এক মাস আগে। কিন্তু তিনি কোনো সিদ্ধান্ত দেননি। অথচ প্রথম শ্রেণির এই পৌরসভায় এখন রাস্তাঘাট ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার এতটাই করুণ অবস্থা যে যানবাহন দূরের কথা পায়ে হেঁটে পথ চলাই দায়।

বগুড়া পৌরসভাটি প্রায় দেড় শ বছরের প্রাচীন। গুরুত্বের কারণে প্রথম শ্রেণির পৌরসভার মর্যাদা লাভ করেছে ৩৬ বছর আগে। যথারীতি পৌরবাসী পৌরকর থেকে শুরু করে যাবতীয় কর দিচ্ছে প্রথম শ্রেণির মতোই। কিন্তু জনগণকে সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে বগুড়া পৌরসভা একেবারেই তৃতীয় শ্রেণির মতো।

প্রায় ৭০ বর্গকিলোমিটারের বিশাল এলাকার এই পৌরসভায় ২১টি ওয়ার্ডে সমস্যার শেষ নেই। কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেয়ে প্রতিনিয়ত মানুষের দুর্ভোগ শুধু বাড়ছেই। প্রয়োজনীয় ডাস্টবিন না থাকায় শহরের বিভিন্ন এলাকা পরিণত হয়েছে আবর্জনার ভাগাড়ে। শহরে বৈদ্যুতিক বাতির স্বল্পতা, পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন সুবিধা না থাকা, অবৈধ রিকশা ও সিএনজিচালিত টেম্পো চলাচলে নিয়মনীতি না থাকা এখন একটা স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, গৃহস্থালির বর্জ ফেলা হয় রাস্তার পাশের নালা কিংবা সড়কের ওপর। আবাসিক এলাকায় গড়ে উঠেছে লাইসেন্সবিহীন অবৈধ ক্লিনিক। এগুলোর বর্জও ফেলা হচ্ছে যেখানে-সেখানে। বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা আবর্জনা অনেক সময় দুই-তিন দিনেও পরিষ্কার করা হয় না। অর্থের বিনিময়ে কিছু প্রতিষ্ঠান বাড়ি বাড়ি গিয়ে আবর্জনা সংগ্রহ করলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা একেবারেই নগণ্য।

শহরের ব্যস্ততম এলাকা সাতমাথা, জজ কোর্ট, নিউ মার্কেট, কাঁঠালতলা, রাজাবাজার, ফতেহআলী, শেরপুর ও গোহাইল রোডের সংযোগ মুখে দেখা যায় আবর্জনার স্তূপ। নালাগুলো দীর্ঘদিনেও পরিষ্কার করা হয় না। উৎকট গন্ধ প্রতিনিয়ত পরিবেশ দূষিত করছে। বস্তির ছেলেমেয়েরা এখনো নালা কিংবা রাস্তার পাশে খোলা জায়গায় মলমূত্র ত্যাগ করছে। শহরে একাধিক এলাকায় এখনো ব্যবহার হয় খোলা পায়খানা।

শহরের বাদুরতলা কড়িতলা থেকে শুরু করে আজিজুল হক কলেজ পর্যন্ত রাস্তাটি এখন আর চেনা যায় না। এটি দেখলে কালো পানির পুকুর মনে হবে। অথচ এ সড়কেই আন্তজেলা বাস টার্মিনাল, হকার্স মার্কেট, বেশ কয়েকটি ট্রান্সপোর্ট এজেন্সিসহ রেলস্টেশনের একটি অংশ রয়েছে। সারা বছরই কাদা-পানিতে একাকার থাকে রাস্তাটি। পৌরসভার অনেক স্থানেই ফুটপাত দখল করে দোকানঘর নির্মাণ করা হয়েছে। বাড়িঘর করা হচ্ছে রাস্তা সংকুচিত করে। নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করে নির্মাণ করার কারণে ভেঙে ভরাট হয়ে গেছে নালা। শহরে সৌন্দর্য বর্ধনের নামে বিভিন্ন সড়কের মোড়ে তৈরি করা ফ্লাওয়ার গার্ড (বাগান তৈরির স্থান) এখন ভেঙে আগাছায় পূর্ণ হয়ে গেছে। শহরে এ ধরনের ফ্লাওয়ার গার্ড রয়েছে শতাধিক।

জানা গেছে, আগে বগুড়া পৌরসভার আয়তন ছিল ১৪ দশমিক ৭৬ বর্গকিলোমিটার। এরপর কোনো সুযোগ-সুবিধা না বাড়িয়েই হঠাৎ করেই তিন গুণ বাড়ানো হয় শহরের আয়তন। ২০০৬ সালের নতুন সীমানা অনুসারে এখন পৌর এলাকা ৬৯ দশমিক ৫৬ বর্গকিলোমিটার। নতুন এই বর্ধিত এলাকা এখন রাজশাহী সিটি করপোরেশনের চেয়েও বড়। সিলিমপুর, মালগ্রাম, কৈগাড়ি, হরিগাড়ি, ইসলামপুর, ছোট বেলাইল, বড় বেলাইলসহ ৪৮টি মৌজা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বর্ধিত এলাকায়।

পৌরসভার একজন জনপ্রতিনিধি বলেন, ‘আমরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েছি। মানুষকে বলেছি এলাকার উন্নয়ন করার কথা। আগে ইউনিয়ন পরিষদ থাকতে আমাদের যতটুকু ক্ষমতা বা উন্নয়নকাজ করার অধিকার ছিল, এখন তাও নেই। মানুষের কাছে আবারও ভোট চাইতে গেলে এবার আমাদের হাতে তারা মুলা ঝুলিয়ে দিবে।’ তিনি জানান, তাঁরা কোনো প্রকার নাগরিক সুবিধা দিতে পারছেন না এলাকার মানুষকে। কিন্তু জমি নিবন্ধন থেকে শুরু করে সব কিছুই পৌরসভার নির্ধারিত ফি দিয়ে করতে হচ্ছে।

সাবগ্রাম এলাকার বাসিন্দা মীর হোসেন অভিযোগ করে বলেন, ‘আমাদের এলাকায় পৌরসভার কোনো বৈদ্যুতিক বাতি নেই। সন্ধ্যা নামলেই ভূতুড়ে এলাকায় পরিণত হয় রাস্তাঘাট। পানির কোনো লাইন নেই। নেই ময়লা-আবর্জনা ফেলার ডাস্টবিন। শিশুদের বিনোদনের কোনো ব্যবস্থা নেই। এলাকায় ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় অল্প বৃষ্টিতেই হাঁটুপানি জমে যায় রাস্তাঘাটে। অভিযোগ নিয়ে পৌরসভার মেয়রের কাছে গেলে তিনি সময় দেন না। আমাদের সঙ্গে কথা বলেন না। তা হলে আমরা যাব কার কাছে?’

নিশিন্দারা মধ্যপাড়ার বাসিন্দা আকবর হোসেন জানান, পৌরসভায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কারণে যথারীতি পৌরকর দিতে হচ্ছে তাঁদের। জমি নিবন্ধন করতেও ফি দিতে হচ্ছে চার গুণ বেশি। তাঁর প্রশ্ন, ‘আমাদের লাভ কী? আমরা কেন সব সুযোগ-সুবিধা পাব না?’

আকবর হোসেন জানান, চলতি বাজেটেও পৌরসভা এলাকায় কর বাড়ানো হয়েছে প্রায় পাঁচ গুণ। কোনো সুযোগ-সুবিধা না পেলেও তাঁদের সেটা মেনে নিতে হচ্ছে।

গণ্ডগ্রাম এলাকার মোস্তাক আহম্মেদ বলেন, ‘গ্যাস নাই, পানি-বিদ্যুৎ কিছুই নাই। হামাকেরে গেরামের মধ্যে অনেক আস্তাই (রাস্তা) এখনো মাটির। তার পরও হামরা কই পৌরসভার নাগরিক। এই পৌরসভা হামাকেরে দরকার নাই। ইংকা সুযোগ লেওয়ারও দরকার নাই।’

দুর্ভোগ নিয়ে কথা হয় পৌরসভারই বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে। তাঁরা জানান, পৌর এলাকায় ময়লা-আবর্জনা ফেলার জন্য ২০০০ সালের পর থেকে কোনো নতুন ডাস্টবিন তৈরি হয়নি। তবে কয়েকটি ডাম্পিং পয়েন্ট তৈরি হয়েছে। এখন বাসাবাড়ি থেকে ভ্যানে করে ময়লা এসব পয়েন্টে নিয়ে আসা হয়। আবর্জনা ফেলার জন্য পৌরসভার নিজস্ব চারটি ট্রাকের মধ্যে এখন তিনটিই অচল। ভাড়া করা হয়েছে আরো চারটি ট্রাক। পাঁচটি ট্রাক দিয়ে বিশাল আয়তনের পৌরসভার ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করা সম্ভব না।

পৌরসভার যান্ত্রিক বিভাগের তথ্যমতে, এখন পাঁচটি হাইড্রোলিক ট্রাক ও একটি বিম লিস্ট ট্রাক রয়েছে। যেগুলো চালু রয়েছে তার মধ্যে একটি দিয়ে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি মেরামত করা হয়।

পৌরসভার কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহাবুল বলেন, জনবল ও গাড়ির সমস্যা দূর করা না হলে জনদুর্ভোগ কমানো সম্ভব নয়।

বেসরকারি সংস্থা ‘বকুল সমাজ উন্নয়ন কেন্দ্র’ পৌরসভার আবর্জনা পরিষ্কার করে সহযোগিতা করছে। এ সংস্থার নির্বাহী পরিচালক মিম আক্তার জানান, তাঁদের তিনটি ট্রাক, ছয়টি ভ্যান ও ২১ জন কর্মী মাঠে রয়েছে।

এত সব সমস্যা নিয়ে কথা হয় বগুড়ার পৌর মেয়র মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বর্ধিত এলাকাগুলোর জন্য যে পরিমাণ সাপোর্ট দরকার সেটা আসলে পৌরসভার নেই।’

আর শহরে উন্নয়ন করতে হলে ট্যাক্স বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করেন মেয়র। শহরে রাস্তাঘাট মেরামত, যানজট নিরসন ও ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার কেন হচ্ছে না জানতে চাইলে জবাবে পৌর মেয়র বলেন, ‘বিশাল আকারের এই পৌরসভায় যত দিন লোকবল ও যানবাহন বাড়ানো না যাবে তত দিন এসব সমস্যা সমাধান হবে না। এখনো যতটুকু সম্ভব চেষ্টা করা হচ্ছে। অচিরেই সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে।’

ব্যক্তি উদ্যোগে পৌরসভার রাস্তা মেরামত প্রসঙ্গে মেয়র বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের পরামর্শ নিয়ে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’


মন্তব্য