kalerkantho


বহু মনোনয়নপ্রত্যাশী আ. লীগে, বিএনপির ‘আশা’ নতুন মুখ

রফিকুল ইসলাম, রাজশাহী   

১ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



বহু মনোনয়নপ্রত্যাশী আ. লীগে, বিএনপির ‘আশা’ নতুন মুখ

রাজশাহীর পুঠিয়া ও দুর্গাপুর উপজেলা জাতীয় সংসদের ৫৬ নম্বর নির্বাচনী এলাকা। এটি জেলার ছয়টি আসনের মধ্যে ৫ নম্বর। ১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত উপজেলা দুটিতে ব্যাপক রাজনৈতিক সহিংসতা ছিল। এখন আগের মতো আর বড় ধরনের রাজনৈতিক সহিংসতা নেই। কিন্তু ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও সংসদের বাইরে থাকা বিএনপি—দুই দলেই অভ্যন্তরীণ কোন্দল রয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে আগামী নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার দৌড়ে। দুই দলেই মনোনয়নপ্রত্যাশীর ছড়াছড়ি। তবে আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বর্তমান সংসদ সদস্যকে এগিয়ে রাখছে। অন্যদিকে বিএনপির সাবেক এক স্থানীয় জনপ্রতিনিধির পাল্লা ভারী। তাঁকে নিয়ে ইতিমধ্যে দলটির স্থানীয় নেতাকর্মীরা আশাবাদী হয়ে উঠেছে।

১৯৯১ সালের নির্বাচনে এ আসন থেকে নির্বাচিত হন জেলা আওয়ামী লীগের নেতা তাজুল ইসলাম মোহাম্মদ ফারুক। ১৯৯৬ সালে তাঁকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য হন বিএনপি নেতা নাদিম মোস্তফা। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পরে পালিয়ে যান নানা কারণে বিতর্কিত বিএনপির এ সংসদ সদস্য। ২০০৮ সালের নির্বাচনে নাদিমের পরিবর্তে বিএনপি থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয় পুঠিয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মণ্ডলকে। তবে তিনি আওয়ামী লীগ নেতা শিল্পপতি কাজী আব্দুল ওয়াদুদ দারার কাছে পরাজিত হন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিনা ভোটে আবার সংসদ সদস্য হন দারা।

আওয়ামী লীগ : পুঠিয়া আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সংসদ সদস্য কাজী আব্দুল ওয়াদুদ দারা দ্বিতীয়বার সংসদ সদস্য হওয়ার পরে দলের বিভেদ প্রকাশ্যে আসে। এ কারণে তাঁর বাড়ির কাছের পুঠিয়া পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী ছাড়াও বিদ্রোহী প্রার্থী ছিল। দুর্গাপুরেও রয়েছে একই অবস্থা। সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দলের কোন্দল এখন আরো প্রকট হয়েছে। যে কারণে একাদশ সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নের জন্য মাঠে নেমে পড়েছেন আধা ডজন নেতা।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এরই মধ্যে জনসংযোগে নেমে পড়েছেন বর্তমান সংসদ সদস্য আব্দুল ওয়াদুদ দারা, সাবেক সংসদ সদস্য জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য তাজুল ইসলাম মোহাম্মদ ফারুক, দুর্গাপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও দলের জেলা শাখার সহসভাপতি আব্দুল মজিদ, রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান ও দলের জেলা শাখার স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক মুনসুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক আহসানুল হক মাসুদ, জেলা যুবলীগের সহসভাপতি ওবাইদুর রহমান।

তাঁদের মধ্যে এখনো সংসদ সদস্য দারার অবস্থানই মাঠপর্যায়ে শক্তিশালী বলে দাবি করেছে দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীদের অনেকেই। তারা বলছে, সংসদ সদস্য সময় পেলেই ছুটে যাচ্ছেন এলাকায়। উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড ছাড়াও সামাজিক, সাংস্কৃতিক কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন তিনি।

তবে জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আব্দুল মজিদ দাবি করে বলেন, ‘সংসদ সদস্য দারার সঙ্গে কোনো নেতাকর্মী নেই। পুঠিয়া ও দুর্গাপুরের মানুষ এখন পরিবর্তন চায়। সেই পরিবর্তনের জন্য আমরা মাঠে আছি। মাঠে থেকে নেতাকর্মীদের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছি। এখন দল যাঁকে মনোনয়ন দেবে তাঁর হয়েই আমাদের কাজ করতে হবে।’



আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হতে চান জানিয়ে মজিদ বলেন, ‘দুই বার ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ও একবার উপজেলা চেয়ারম্যান হয়েছি বিপুল ভোটের ব্যবধানে। এবার পুঠিয়া-দুর্গাপুরের মানুষের মাঝে আরো বৃহদাকারে সেবা করার মানসিকতা নিয়ে মাঠে নেমেছি। জনগণের পাশে থেকে দলকে গুছিয়ে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি। আশা করছি দল আমাকে এবার মনোনয়ন দেবে।’

তাজুল ইসলাম ফারুক বলেন, ‘দল যাঁকে মনোনয়ন দেবে তাঁর হয়েই আমরা কাজ করব। তবে দারার কারণে পুঠিয়া-দুর্গাপুরে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আজ দ্বিধাবিভক্ত। এটির অবসান হওয়ার দরকার। তাই সাধারণ মানুষ নতুন নেতৃত্বের আশায় বুক বেঁধে আছে। আমিও দীর্ঘদিন ধরে মাঠে কাজ করে যাচ্ছি। তৃণমূলের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছি। এ অবস্থায় দল যদি আমাকে আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন দেয়, তাহলে অবশ্যই জয়ী হব বলে বিশ্বাস রাখি।’

স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের রাজশাহী শাখার সভাপতি অধ্যাপক মনসুর রহমান বলেন, ‘আমি গতবারেও প্রার্থী ছিলাম। দীর্ঘদিন ধরেই পুঠিয়া-দুর্গাপুরের মানুষের সঙ্গে আছি। আমি একজন পরীক্ষিত রাজনীতিবিদ। কাজেই আগামী নির্বাচনে দল আমাকে মূল্যায়ন করবে বলে আমি বিশ্বাস করি।’

জেলা আওয়ামী লীগের আরেক নেতা আহসানুল হক মাসুদ বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন ধরেই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতি করে আসছি। এখন পুঠিয়া-দুর্গাপুরের মানুষের পাশে থেকে কাজ করে যাচ্ছি। সাধারণ মানুষও আমার পাশে আছে। এ অবস্থায় দল আমাকে মনোয়ন দিলে আমি নির্বাচনে জয়ী হব বলে বিশ্বাস করি।’

সংসদ সদস্য দারা বলেন, ‘আওয়ামী লীগ একটি বড় দল। এখানে অনেক নেতা আছে। সবাই যে যার মতো করে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে—এটাই স্বাভাবিক। তবে যাদের দলে অবস্থান নেই, তারাই গিয়ে বিভেদ সৃষ্টি করছে। আমি কোনো বিভেদ সৃষ্টি করিনি। দলের নিকট থেকে সুবিধা নিয়ে এখন দু-একজন নেতা দলের মধ্যেই বিভেদ সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন পেলে এলাকার জনগণ আবারও উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে, জননেত্রী শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করতে আমাকেই নির্বাচিত করবে।’

দারা বলেন, ‘আমি সব সময় মানুষের পাশে থেকে রাজনীতি করে গেছি। সাধারণ মানুষ ও দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীরাই আমার প্রাণশক্তি। এদের নিয়েই আমি রাজনীতি করি। আমার বাবাও ছিলেন পুঠিয়া আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। কাজেই আমাদের নাড়িতেই রয়েছে রাজনীতি। আমরা জনগণের মূল্যায়ন করি। শুধু নির্বাচনকেন্দ্রিক নয়, আমি কাজ করে যাচ্ছি দলের জন্য, সাধারণ মানুষের জন্য। এটি পুঠিয়া-দুর্গাপুরের মানুষ জানে।’

বিএনপি : এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পাওয়ার দৌড়ে আছেন সাবেক সংসদ সদস্য নাদিম মোস্তফা, দুর্গাপুরের দেলুয়াবাড়ি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি গোলাম সাকলাইন, জেলা কমিটির সহসভাপতি নজরুল ইসলাম মণ্ডল, পুঠিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন জুম্মা, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আবু বকর সিদ্দিক ও দুর্গাপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র সাইদুর রহমান মন্টু।

দলীয় নেতাকর্মীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পুঠিয়া ও দুর্গাপুরে একসময়ে ব্যাপক জনপ্রিয় নেতা ছিলেন নাদিম মোস্তফা। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়কাল থেকে তিনি এলাকা ছাড়া। এ অবস্থায় বিএনপির নেতাকর্মীরা হয়ে পড়েছে ছন্নছাড়া। নাদিম মোস্তফার অবর্তমানে দলের প্রার্থী করার মতো তেমন কোনো নেতাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না ২০০৮ সালের নির্বাচনে। শেষমেশ সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মণ্ডলকে মনোনয়ন দেয় বিএনপি। কিন্তু তিনি সেই নির্বাচনে দারার কাছে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। এরপর থেকে তিনিও আর এলাকার নেতাদের খোঁজখবর রাখেননি। ফলে নেতাকর্মীরা বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েন। বিএনপির এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে আগামী নির্বাচনে এবার প্রার্থী হিসেবে নতুন মুখ আসার সম্ভাবনা দেখছে দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। সে ক্ষেত্রে দুর্গাপুরের দেলুয়াবাড়ি ইউনিয়ন চেয়ারম্যান গোলাম সাকলায়েনকেই এগিয়ে রাখছে অনেকে। তাঁর হয়ে এরই মধ্যে মাঠে নেমেছে সাবেক সংসদ সদস্য নাদিম মোস্তফার কাছের লোকেরাও।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মী বলে, এবার নতুন মুখ না এলে নির্বাচনে জয় পাওয়া বিএনপির জন্য কঠিন করে তুলবে দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীরাই। কারণ দীর্ঘদিন ধরে নেতৃত্বহীন পুঠিয়া-দুর্গাপুরের কর্মী-সমর্থকদের একজোট করায় বড় সমস্যা হবে এলাকা ছাড়া নেতাদের কাছে। এতে করে বিমুখ নেতাকর্মীদের নির্বাচনমুখী করা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে বিএনপির জন্য।

দুর্গাপুরের মাড়িয়া এলাকার এক নেতা বলেন, যেসব প্রার্থী মাঠে নেমেছেন, তাঁদের মধ্যে তরুণ নেতা এবং সাবেক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম সাকলায়েন আলোচনার ঝড় তুলেছেন সাধারণ ভোটারদের মাঝে। তিনি এরই মধ্যে পুঠিয়া-দুর্গাপুরের নেতাকর্মীদের সংগঠিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আগামী দিনে বিএনপিকে একজোট করতে এখানে নতুন মুখের কোনো বিকল্প নেই।

দুর্গাপুর উপজেলা শাখা বিএনপির সাবেক সভাপতি আশরাফুল কবির বুলু বলেন, ‘ক্লিন ইমেজের নেতা সাকলায়েন গত উপজেলা নির্বাচনেই ঝড় তুলেছিলেন নেতাকর্মীদের মাঝে। তবে অল্পের জন্য পরাজিত হন তিনি। এরপর সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে এলাকায় নানাভাবে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে গণসংযোগসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। ফলে দুর্গাপুর ও পুঠিয়া বিএনপির নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশই গোলাম সাকলায়েনকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।’

জানতে চাইলে গোলাম সাকলায়েন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার প্রতি সাধারণ মানুষের অগাধ আস্থা রয়েছে। দলের নেতাকর্মীরাও আমাকে কাছে টেনে নেন খুব সহজেই। এই অবস্থায় আগামী নির্বাচনে দল আমার প্রতি আস্থা রাখলে আমি জয়ী হতে পারব বলে বিশ্বাস রাখি। আর সেই লক্ষ্যেই আমি এগিয়ে যাচ্ছি।’ তিনি আরো বলেন, ‘পুঠিয়া ও দুর্গাপুরের বিএনপি নেতাকর্মীদের সংগঠিত করাই আমার মূল চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ নিয়ে আমি এরই মধ্যে অনেকটা এগিয়ে গেছি। এখন আমাকে কাছে পেয়ে আবার নতুন করে যেন প্রাণ ফিরেছে বিএনপিতে।’

এ আসনে বিএনপির আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী নজরুল ইসলাম মণ্ডল বলেন, ‘২০০৮ সালে যখন সবাই পলাতক, তখন আমি নেতাকর্মীদের পাশে থেকে নির্বাচন করেছি। তবে সামান্য ভোটে পরাজিত হয়েছিলাম। সেই থেকে জনগণের সঙ্গেই আছি। এবারও দল আমার প্রতি আস্থা রাখবে বলে বিশ্বাস করি।’

জানতে চাইলে সাবেক সংসদ সদস্য নাদিম মোস্তফা বলেন, ‘আমি পুঠিয়া-র্দুগাপুরবাসীর জন্য যা করে দিয়েছে তা ১০০ বছরেও অন্য কোনো এমপি করতে পারবে বলে বিশ্বাস করি না। কারণ আমি রাজনীতি করেছি সাধারণ মানুষ নিয়ে। সাধারণ মানুষই হচ্ছে আমার শক্তি। তাদের চাওয়া-পাওয়ার মূল্যায়ন করেছি সব সময়। আগামী দিনেও তাদের জন্যই রাজনীতি করতে চাই। এই অবস্থায় দল আমাকে মনোনয়ন দিলে পুঠিয়া-দুর্গাপুরের অসমাপ্ত কাজগুলো আমি করে দিতে চাই।’



মন্তব্য