kalerkantho


হাত বাড়ালেই মিলছে ভয়ংকর ‘চানার ডাল’

ইয়াহইয়া ফজল, সিলেট   

৮ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



হাত বাড়ালেই মিলছে ভয়ংকর ‘চানার ডাল’

রাত সাড়ে ৮টা পেরিয়ে গেছে। নগরের কোর্ট পয়েন্ট এলাকার ফুট ওভারব্রিজের মধুবন মার্কেটের সামনের সিঁড়ি বেয়ে উঠতেই চোখ আটকাল এক কোণে। কিছুটা এগোতেই বোঝা গেল, মাথা লুঙ্গিতে ঢেকে মুখোমুখি বসা দুজন। আরো কাছাকাছি হতেই পরিষ্কার হলো বিষয়টি, মাদক সেবন করছে দুই নারী। বেশভূষা বলে দিচ্ছে তারা ফুটপাতের বাসিন্দা।

নগরের কেন্দ্রস্থলে রীতিমতো নগরবাসীর নাকের ডগায় বসে মাদক সেবনের এই চিত্র এখন যত্রতত্র। ব্যস্ত জিন্দাবাজার এলাকায় শত মানুষের ভিড়ে কিংবা কাজিরবাজার সেতুতে সন্ধ্যায় নির্দোষ বিনোদনের খোঁজে ঘুরতে আসা মানুষের ভিড়ে কৌশলে হাত বদল হচ্ছে ইয়াবা। সবার চোখের সামনে ক্রেতার হাতে ইয়াবা তুলে দিচ্ছে বিক্রেতা। কৌশলের কারণে পাশের মানুষও টের পায় না।

প্রায় সারা দেশে ‘বাবা’ নামে পরিচিতি পাওয়া মাদকদ্রব্য ইয়াবা ট্যাবলেট সিলেটে ‘চানার ডাল’ (ছোলার ডাল) সাংকেতিক নামে চলে। হাত বাড়ালেই ইয়াবা পাওয়া গেলেও তা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কৌশলে বেচাকেনা করার কারণে এর বিরুদ্ধে অভিযান চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে বলে স্বীকার করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরও।

জানা গেছে, একসময় সিলেটে গাঁজা, হেরোইন, ফেনসিডিল, ড্যান্ডি ও মদের বিস্তার ছিল। কিন্তু এখন ইয়াবার স্রোতে সেসব মাদকদ্রব্য বিলীন হওয়ার পর্যায়ে।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, সিলেটে ইয়াবা সেবন ও বেচাকেনার সঙ্গে নগরের অভিজাত ও দরিদ্র শ্রেণির মানুষ জড়িত। মধ্যবিত্ত সমাজে এটি সে তুলনায় কম ছোবল বসিয়েছে। নগরের চিহ্নিত মাদক স্পটগুলোতে সাধারণত নিম্নবিত্ত বা দরিদ্র শ্রেণির মাদকাসক্তদের আনাগোনা। আর অভিজাত শ্রেণির জন্য নগরজুড়ে রয়েছে ইয়াবার ভ্রাম্যমাণ ‘বিপণন নেটওয়ার্ক’। মোবাইল ফোনের একটা কলেই হাতে পৌঁছে যাচ্ছে ইয়াবা ট্যাবলেট।

জানা গেছে, ইয়াবা বেচাকেনার জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে কাজিরবাজার সেতুকে। এখানে আসে মূলত তরুণ ইয়াবা আসক্তরা। তাদের বড় অংশই সিলেটের বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণ।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সন্ধ্যা নামলেই দামি দামি মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কারে করে তারা কাজিরবাজার সেতুর দক্ষিণ পাশের খোজারখলাসংলগ্ন ‘মার্কাজ পয়েন্ট’ এলাকায় জড়ো হতে শুরু করে। সাদা চোখে দেখলে মনে হবে বন্ধুরা মিলে নির্দোষ আড্ডা দিচ্ছে। কিন্তু এরই মাঝে হাত বদল হয়ে যায় ইয়াবা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী কালের কণ্ঠকে বলেন, সাধারণত দীর্ঘদিন ধরে যারা ইয়াবায় আসক্ত তারা এখানে ইয়াবা বিক্রির সঙ্গে জড়িত। মূলত নিজের মাদকের চাহিদা মেটাতেই তারা এ কারবারে জড়িয়ে যায়।

জানা গেছে, ইয়াবার পাইকারি বিক্রেতারা অভিজাত শ্রেণির এসব তরুণকে নিশানা করে। প্রথমে তাদের আসক্ত করে এবং পরে তাদের দিয়েই নতুন ক্রেতা শ্রেণি সৃষ্টি করে। নতুন ক্রেতাদের কাছে ইয়াবা পৌঁছে দেওয়ার কাজও তখন তাদের দিয়ে করানো হয়।

কিভাবে ক্রেতাদের হাতে নিরাপদে ইয়াবা পৌঁছে যায় সে বিষয়ে জানালেন সম্প্রতি মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্র থেকে ফেরা এক শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, ‘নতুন কেউ ইয়াবা সংগ্রহ করতে চাইলে তাকে প্রথমে বিক্রেতার পরিচিত কারো রেফারেন্স দিয়ে যোগাযোগ করতে হয়। সে ক্ষেত্রে নির্ধারিত মোবাইল ফোন নম্বরে কল দিয়ে বলতে হয়, অমুক আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছে। এ রকম ফোন পেলে নতুন ক্রেতাকে সাধারণত বিক্রেতা নির্দিষ্ট স্থান উল্লেখ করে আসতে বলে। ক্রেতা এলে বিক্রেতা নিশ্চিত হওয়ার পর দ্রুত এসে কথা বলার ছলে ইয়াবা হাতে তুলে দেয়। টাকার বিষয়টি আগেই নির্ধারণ করা থাকে। ক্রেতা ইয়াবা হাতে নিতে নিতে টাকা গুঁজে দেয় বিক্রেতার হাতে। এত দ্রুত সময়ে এটা ঘটে যে পাশে কেউ থাকলেও টের পায় না।’

ওই শিক্ষার্থী জানান, ক্রেতা বিশ্বস্ত হয়ে গেলে তাকে আর ইয়াবা নিতে আসতে হয় না, তখন ঠিকানা বললেই সেখানে পৌঁছে যায়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইয়াবা বিক্রেতাদের অনেকেই একাধিক মোবাইল ফোনসেট সঙ্গে রাখে। একটি সচল থাকলেও বাকি ফোনসেটগুলোর ব্যাটারি খুলে সেখানে ইয়াবা রাখে। আবার অনেকে দিয়াশলাইয়ের বাক্সে ইয়াবা বহন করে। তবে ইদানীং বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহার করে ইয়াবা বেচাকেনা হচ্ছে। বিলাসবহুল প্রাইভেট কার পুলিশ সাধারণত আটকায় না। এই সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছে ইয়াবা কারবারে জড়িতরা। মোবাইল ফোনে অবস্থান জানিয়ে দিলেই হলো, অল্প সময়ের মধ্যেই ইয়াবা পৌঁছে যায় ক্রেতার হাতে। এ ক্ষেত্রে কয়েকজন ক্রেতার প্রতিনিধিত্ব করে একজন ক্রেতা। অর্থা অন্তত ১০টি ইয়াবা কিনলে গাড়িতে করে নগরের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে দেওয়া হয়।

গত ১ অক্টোবর নগরের রিকাবী বাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১৭ লাখ টাকার মাদকসহ দুই কারবারিকে আটক করে র‌্যাব। এ সময় তাদের ব্যবহৃত বিলাসবহুল গাড়ি থেকে ১৫ লাখ ৯ হাজার টাকার ইয়াবা ও দুই লাখ ৩০ হাজার টাকার হেরোইন উদ্ধার করা হয়।

সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সিলেটের চালিবন্দর, বাররুতখানা পয়েন্ট, বালুচর এলাকার আলুরতল, আম্বরখানা পয়েন্টের পূর্ব পাশে নারিকেল-চিঁড়ার দোকানগুলোর আশপাশে, মজুমদারী বিমান অফিসের গেট, পীর মহল্লা, চৌকিদেখির আখড়ার গলি, বিমানবন্দরের মূল প্রবেশপথের আশপাশ, রিকাবী বাজার, মেডিক্যাল রোডসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় ইয়াবা বিক্রির ভ্রাম্যমাণ স্পট রয়েছে। ইয়াবা সেবনকারীরা মোবাইল ফোনে হোয়াটসঅ্যাপসহ নানা অ্যাপস ব্যবহার করে বিক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে।

ইয়াবা সেবন ও বিক্রির সঙ্গে সিলেটের ধনাঢ্য পরিবারের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরাও জড়িত বলে জানা গেছে। এসব ক্ষেত্রে ইয়াবা হাতবদলের স্থান হিসেবে নগরের বিভিন্ন বিপণিবিতানগুলো তাদের প্রথম পছন্দ। সাধারণ মেকআপ বক্সে করেই মেয়েরা ইয়াবা বহন করে বলে নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও ইয়াবার থাবা পড়েছে। সাধারণ মূল গেটের আশপাশে এবং কুমারগাঁও তেমুখি এলাকা থেকে ইয়াবা সংগ্রহ করে থাকে সেবনকারীরা। তেমুখি-সংলগ্ন সাফত উল্লাহ ফিলিং স্টেশন ও মিষ্টান্ন বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ফুলকলির আশপাশে ইয়াবা বিক্রেতারা অবস্থান করে।

অন্যদিকে নিম্নবিত্ত শ্রেণির ইয়াবা আসক্তদের গন্তব্য সিলেটের চিহ্নিত মাদক স্পটগুলো। যেমন—নগরের কাস্টঘর, রেলওয়ে স্টেশন এলাকা।

রেলস্টেশন এলাকায় অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা গেছে, এই এলাকায় ইয়াবা বিক্রির কাজে নারী ও পুরুষের পাশাপাশি শিশুদেরও ব্যবহার করা হয়। পুরুষরা দিয়াশলাইয়ের বাক্সে করে, নারীরা জুতার গোড়ালির দিকে বিশেষ ব্যবস্থায় ইয়াবা বহন করে। তবে শিশুদের ক্ষেত্রে এত কৌশলের প্রয়োজন হয় না। সাধারণত সন্দেহের ঊর্ধ্বে থাকায় তারা কাগজের পুঁটলিতে ভরে প্যান্টের পকেটে করে অনায়াসে ইয়াবা বহন করতে পারে।

সিলেট রেলস্টেশন এলাকায় মাদক ব্যবসার বড় নিয়ন্ত্রক দক্ষিণ সুরমার আহমেদপুরের মো. শহীদুল ইসলাম শহীদ ও তার স্বজনরা। গত ১৯ জুলাই র‌্যাব অভিযান চালিয়ে শহীদ ও তার স্ত্রীসহ চারজনকে আটক করে। এ সময় তাদের কাছ থেকে চার লাখ টাকা মূল্যের ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়। তবে কিছুদিন পর জেল থেকে বেরিয়ে এসে সে আবারও মাদক ব্যবসায় সক্রিয় হয়ে ওঠে। এর আগেও একাধিকবার তাকে আটক করা হয়। এ ছাড়া দক্ষিণ সুরমার ধরাধরপুরের রুহেল, ভার্তকলা এলাকার শাহীন, দক্ষিণ সুরমার সাবিহা, একই এলাকার নাছিমা, রেবা, রহিম, রেলস্টেশনের পার্শ্ববর্তী চান্দের বাড়ি এলাকার বৈদেশিক ডাকঘরের পাশের আনোয়ার, ঝাড়ু, হক, বাগানী, রাবিয়াসহ বেশ কয়েকজন মাদক কারবারে জড়িত।

জানা গেছে, দক্ষিণ সুরমা এলাকায় মাদকের বড় কারবারি স্থানীয় এক সাবেক জনপ্রতিনিধি। তাঁর ছত্রচ্ছায়ায় এলাকার মাদক কারবারের একটা অংশ পরিচালিত হয়।

এ ছাড়া নগরের ছিন্নমূল শিশুরা ড্যান্ডি নামে এক ধরনের নেশায় আসক্ত হচ্ছে। নগরের রেলস্টেশন এলাকা থেকে শুরু করে বন্দরবাজার এলাকায় এটি পরিচিত চিত্র।

সিলেটে ইয়াবার ব্যাপক বিস্তৃতির বিষয়টি স্বীকার করেছেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, সিলেটের অতিরিক্ত উপপরিচালক মো. জাফরুল্লাহ কাজল। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ইয়াবা আকারে ছোট হওয়ায় এটি বহন করতে নানা কৌশল অবলম্বন করে বহনকারীরা। আখ, পেঁয়াজ, বিভিন্ন সবজি বা বিভিন্ন যন্ত্রাংশের ভেতর করে বহন করলে সহজে শনাক্ত করা সম্ভব হয় না।’

ইয়াবার ছোবল থেকে তরুণসমাজকে রক্ষা করতে অভিযানের পাশাপাশি সচেতনতা তৈরি করার ওপর জোর দেন জাফরুল্লাহ কাজল। তিনি বলেন, ইয়াবার হাত থেকে তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে মা-বাবাকে সচেতন হওয়াটা জরুরি। সন্তান কী করছে, কোথায় যাচ্ছে, টাকা কোথায় খরচ করছে এসব বিষয়ে খোঁজ না রাখায় তারা সহজেই সর্বনাশা পথে পা বাড়ায়, বিশেষ করে উচ্চবিত্ত শ্রেণির সন্তানরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (গণমাধ্যম) জেদান আল মুসা বলেন, ‘ইয়াবাসহ মাদকদ্রব্য নির্মূলে পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কাজ করে যাচ্ছে। নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। মাদকদ্রব্য নির্মূলে আমরা কিছুদিন ধরে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছি।’



মন্তব্য