kalerkantho


কোন্দলের চার কারণ

কাউকে আটক বা গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ

নূপুর দেব, চট্টগ্রাম   

৮ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



কোন্দলের চার কারণ

চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজের ছাত্র ও মহানগর ছাত্রলীগের সহসম্পাদক সুদীপ্ত বিশ্বাস খুন হওয়ার পেছনে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের চারটি সম্ভাব্য কারণের কথা বলছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতারা।

কারণগুলো হলো পক্ষ বদল, আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টায় সক্রিয় না থাকা, কলেজের ছাত্রসংসদ নির্বাচন ও ছাত্রলীগের কমিটি গঠনের তৎপরতা চালানো এবং সাবেক-বর্তমান নেতাদের সমালোচনা করে ফেসবুকে লেখালেখি।

সিটি কলেজ ছাত্রলীগ ও ছাত্রসংসদের সাবেক ও বর্তমান বিভিন্ন পর্যায়ের বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে আলাপ করে গতকাল শনিবার এসব তথ্য পাওয়া গেছে। গত শুক্রবার সকালে মহানগরীর বাসা থেকে ডেকে নিয়ে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয় সুদীপ্ত বিশ্বাসকে। তবে এ ঘটনায় পুলিশ গতকাল পর্যন্ত কাউকে আটক বা গ্রেপ্তার করার কথা জানায়নি। অবশ্য একটি সূত্র বলছে, সুদীপ্তকে বাসা থেকে ডেকে নেওয়া যুবককে শুক্রবার রাতেই সদরঘাট থানা পুলিশ আটক করেছে। কিন্তু পুলিশ কাউকে বাঁচানোর জন্য বিষয়টি স্বীকার করছে না। এ বিষয়ে জানতে গতকাল সদরঘাট থানার ওসি মর্জিনা আকতারের সঙ্গে কয়েক দফা মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তিনি ফোন ধরেননি।

তবে নগর পুলিশের উপকমিশনার (দক্ষিণ) এস এম মোস্তাইন হোসেন গতকাল সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে বিভিন্ন ক্লু পাওয়া যাচ্ছে। তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তবে এখনো বলার মতো কিছু পাইনি। পেলে জানানো হবে।’

হত্যাকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে এস এম মোস্তাইন হোসেন বলেন, ‘আমরা ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক, পারিবারিকসহ বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখছি। মামলায় অজ্ঞাতনামা ছয়-সাতজনকে আসামি করা হয়েছে।’

একজনকে আটক করা এবং ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মোস্তাইন হোসেন বলেন, ‘সুদীপ্ত হত্যার ঘটনায় এখনো কেউ আটক বা গ্রেপ্তার হয়নি। অভিযোগ সত্য নয়।’

কোন্দলের কারণ : সিটি কলেজ শাখা ছাত্রলীগের বর্তমান ও সাবেক নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় তিন যুগ ওই কলেজে ছাত্রলীগের রাজনীতি বর্তমান মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী ও তাঁর অনুসারীদের নিয়ন্ত্রণে। তবে ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সেখানে মহিউদ্দিনবিরোধী নগরীর দুই সংসদ সদস্য ডা. আফছারুল আমীন ও এম এ লতিফের অনুসারীরাও ক্যাম্পাসে ঢোকে।

ছাত্রলীগ নেতারা বলছেন, সিটি কলেজে এখনো শক্ত অবস্থানে মহিউদ্দিন পক্ষ। তবে বর্তমানে মহিউদ্দিনের বিপক্ষে একটি গ্রুপ আবার সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। আফছারুল আমীনের অনুসারী ছাত্রলীগের অংশটি নিয়ন্ত্রণ করেন ওই কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও বর্তমান আলকরন ওয়ার্ড কাউন্সিলর তারেক সোলাইমান সেলিম। এই অংশের সঙ্গে রয়েছেন লালখানবাজার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সিটি কলেজ ছাত্রলীগের আরেক সাবেক সভাপতি দিদারুল আলম মাসুম।

আর মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী মহানগর আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক মশিউর রহমান চৌধুরী ওই কলেজে বড় একটি অংশ (ছাত্রলীগ) নিয়ন্ত্রণ করেন। মশিউর বর্তমানে কানাডায় রয়েছেন।

ছাত্রলীগ সূত্রে জানা গেছে, মহানগর ছাত্রলীগের রাজনীতি দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রিত হয়ে আসছে সরকারি সিটি কলেজ ও বেসরকারি ওমরগণি এমইএস কলেজ থেকে। এ দুই কলেজের ছাত্রলীগের প্রভাবশালী নেতারাই সব সময় মহানগরের পাশাপাশি বিভিন্ন থানা, ওয়ার্ড ও কলেজ পর্যায়ে ছাত্রলীগ নিয়ন্ত্রণ করেন। সর্বশেষ মহানগর ছাত্রলীগের কমিটির সভাপতি ইমরান আহমেদ ইমু সিটি কলেজের ছাত্র এবং সাধারণ সম্পাদক নুরুল আজিম রনি এমইএস কলেজের ছাত্র।

এ পর্যন্ত যাঁরা খুন হলেন : ১৯৮১ সাল থেকে এ পর্যন্ত সিটি কলেজের ছয়জন নেতা খুন হয়েছেন। এর মধ্যে ১৯৮১ সালে সিটি কলেজ ছাত্রলীগ সমর্থিত তৎকালীন ছাত্রসংসদের এজিএস তবারক হোসেনকে কলেজের বাইরে নগরের চকবাজার এলাকায় চট্টগ্রাম কলেজের সামনে শিবির ক্যাডাররা হত্যা করে। এরপর ১৯৮৮ সালের আগস্টে একই কলেজের ছাত্রসংসদের জিএস কামালউদ্দিনকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে দুর্বৃত্তরা হত্যা করে। এ ছাড়া ১৯৯৪ সালে নগরের লালদিঘি এলাকায় এহেসানুল হক মনি, ১৯৯৬ সালে পাঁচলাইশ এলাকায় ওই কলেজ ছাত্রসংসদের ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক সিনাউল হক আশিক এবং ১৯৯৯ সালে ২৪ মার্চ টাইগারপাস এলাকায় সিটি কলেজ ছাত্রসংসদের জিএস আমিনুল হক স্বপনকে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করা হয়। সর্বশেষ এই কলেজের গণিতে স্নাতকোত্তরের (মাস্টার্স) ছাত্র ও মহানগর ছাত্রলীগের সহসম্পাদক সুদীপ্ত বিশ্বাসকে কলেজের পেছনে দক্ষিণ নালাপাড়া বাসা থেকে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হলো।

সুদীপ্ত হত্যার পেছনের কোন্দল : নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চট্টগ্রাম নগর ও সিটি কলেজ ছাত্রলীগের একাধিক সাবেক ও বর্তমান নেতা জানান, মহানগর ছাত্রলীগের প্রথম কমিটিতে (সর্বশেষ) সুদীপ্তর নাম ছিল না। এতে মহিউদ্দিন চৌধুরী অনুসারীরাই গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে আসেন। এরপর ওই কমিটির বিরুদ্ধে আন্দোলনের একপর্যায়ে মহিউদ্দিনবিরোধী একটি অংশের নেতাদের সুপারিশ থেকে সুদীপ্ত নগর ছাত্রলীগের কমিটির সহসম্পাদকের পদ পান। সহসম্পাদকের পদ পাওয়ার পর তাঁকে দিয়ে ওই কলেজের ছাত্রলীগের একটি গ্রুপ তৈরির চেষ্টা করা হয়। কিন্তু সেখানে মহিউদ্দিনের অনুসারীরা বেশি হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে না গিয়ে সুদীপ্ত সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন।

একপর্যায়ে ওই পক্ষটি তাদের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। ২০১০ সালে কলেজ ছাত্রলীগের সর্বশেষ কমিটি হয়েছিল। দুই বছরের এ কমিটি এখনো বহাল। একইভাবে ২০০৬ সালের পর ছাত্রসংসদের নির্বাচনও বন্ধ। সুদীপ্ত কলেজের নতুন কমিটি গঠনে সক্রিয় ছিলেন। এতে একটি পক্ষ তাঁর বিরুদ্ধে যায়। ছাত্রলীগের দুই পক্ষই একক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করে। এর পাশাপাশি ফেসবুকে বিভিন্ন স্ট্যাটাস ও কমেন্ট দিয়ে সুদীপ্ত বিভিন্ন অনিয়ম ও সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে লেখালেখি করেন।

এদিকে সুদীপ্ত হত্যার ঘটনায় নগরের লালখান বাজারকেন্দ্রিক আধিপত্য বিস্তার করা বেশ কয়েকজন সন্ত্রাসীর নাম আলোচনায় আসছে। তাদেরকে ওই এলাকার এক প্রভাবশালী নেতা মদদ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

লালখান বাজার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সিটি কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি দিদারুল আলম মাসুম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সুদীপ্ত অসম্ভব ভালো ছেলে। তার সঙ্গে আমার ভালো যোগাযোগ ছিল।’

এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে অনেকে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে যাচ্ছে; কাদা ছোড়াছুড়ি করছে অভিযোগ করে দিদারুল আলম মাসুম বলেন, ‘তাকে যারা হত্যা করেছে, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার জন্য আমি প্রশাসনকে অনুরোধ করছি।’

মাসুম অভিযোগ করেন, সুদীপ্ত খুন হওয়ায় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক চৌধুরী মহিবুল হাসান তাঁকে ফোন করে তাঁর (মাসুম) অনুসারীরা সুদীপ্তকে হত্যা করেছে উল্লেখ করে তাঁকে শাসান।

তবে এ ব্যাপারে জানতে চৌধুরী মহিবুল হাসানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন ধরেননি।

মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি ইমরান আহমেদ ইমু বলেন, ‘কলেজকে অস্থিতিশীল করতে একটি পক্ষ মরিয়া হয়ে উঠেছে। কী কারণে সুদীপ্তকে হত্যা করেছে, তা চিহ্নিত করে অবিলম্বে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।’

সিটি কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শাহ আলম ইমন বলেন, ‘চট্টগ্রামের ছাত্ররাজনীতিতে সিটি কলেজ হচ্ছে রাজনীতি শেখার পাঠশালা। সুদীপ্ত এমন এক ছেলে ছিল, যে সবাইকে নিয়ে মেতে থাকত। সে চাইত সব সময় গণতান্ত্রিক চর্চা হোক রাজনীতিতে।’

সিটি কলেজে ছাত্রলীগের প্রভাবশালী সাবেক নেতাদের দূরত্ব ও একত্র না হওয়ার কারণে কমিটি গঠন করতে না পারলেও সম্প্রতি এ নিয়ে তোড়জোড় শুরু হয়েছে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।

ফেসবুকে সুদীপ্তর লেখালেখি : গত ৪ অক্টোবর বিকেল ৩টা সাত মিনিটে ফেসবুকে নিজের দেওয়া এক স্ট্যাটাসে সুদীপ্ত লিখেছিলেন, ‘প্রজা ছাড়া রাজার দাম যেমন নেই তেমনি কর্মী ছাড়া নেতারও দাম নেই। কর্মীদের বিদ্রোহ দরকার নতুন কিছু প্রাপ্তির জন্য।’

আগের দিন ৩ অক্টোবর দুপুর ১টা ২২ মিনিটে দেওয়া এক পোস্টে লেখেন, ‘ওয়ান-ইলেভেনে অনেককেই দেখি নাই রাজপথে...ও সরি এটা বললে আবার অন্যায়...।’

২৬ সেপ্টেম্বর ফেসবুকে তিনি লেখেন, ‘এবার প্রিয় নেত্রীর জন্মদিন পুরনো ছাত্রলীগ নেতা বাদ দিয়ে নতুন নেতৃত্ব দিয়ে উদ্‌যাপন করা হোক।’

তাঁর ১৪ সেপ্টেম্বরের পোস্টে দেখা যায়—সেখানে তিনি লেখেন, ‘ক্ষমতাবানদের উদ্দেশ্যে ক্ষমতা দেখিয়ে হয়তো ছোটদের ওপর নির্যাতন করতে পারবেন, কিন্তু ছোটরা যদি ঘুরে দাঁড়ায়, মানসম্মান হিমালয়ে যাবে।’

গত বুধবার রাত ৭টা ৫০ মিনিটে সুদীপ্ত ফেসবুকে লেখেন, ‘সুস্থ হোক মানসিকভাবে অসুস্থ রোগীগুলো...।’

ফেসবুকে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে সুদীপ্তর সর্বশেষ পোস্ট ছিল— ‘অপেক্ষায় রইলাম...।’


মন্তব্য