kalerkantho


অস্ত্রোপচার হয় না চক্ষু বিভাগে

আসাদুজ্জামান দারা, ফেনী   

৮ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



অস্ত্রোপচার হয় না চক্ষু বিভাগে

সকাল ৮টা। ফেনী শহরের সুলতানপুর এলাকায় জেলা সদর হাসপাতাল। তখনো কেউ আসেনি। গতকাল শনিবার সকালে সরেজমিনে হাসপাতালে গিয়ে জানা গেল, মূলত সাড়ে ৮টার আগে কাজকর্ম শুরু হয় না।

এরপর কয়েক ঘণ্টা অবস্থান করে হাসপাতালে চিকিৎসাসেবায় অনিয়ম, সুবিধা-অসুবিধার নানা চিত্র দেখা গেছে। সকাল সাড়ে ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে হাসপাতালের নতুন ভবনের নিচতলায় নিজ কক্ষে প্রবেশ করেন সিনিয়র কনসালট্যান্ট (শিশু) আশুতোষ দাস, কনসালট্যান্ট ডা. জাহাঙ্গীর আলম, ডা. গাজী গোলাম মোস্তফা, দন্ত বিভাগের সার্জন ডা. কাজী মোহাম্মদ ইস্রাফিল ও কার্ডিওলজির সদর উদ্দিন শামীম। এরপর ৯টা থেকে সাড়ে ৯টার মধ্যে প্রবেশ করেন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. এ এম ছিদ্দিকী, গাইনি বিভাগের ডা. তাহিরা খাতুন রোজী, ডা. হুমায়ুন কবির, ডা. জয়দেব সাহা, ডা. মোশাররফ হোসেন, কার্ডিওলজির কনসালট্যান্ট ডা. আব্দুল মতিন ও শিশু বিভাগের ডা. খোন্দকার জহিরুল হাসান।

সকাল ১০টার পর হাসপাতালের পুরনো ভবনের দোতলায় বসেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সার্জারির ডা. মরফুদুল ইসলাম, ডা. গাজী মজিবুর রহমান, ডা. কামরুজ্জামান, মেডিসিন বিভাগের ডা. ডি এম সাজ্জাদ হোসেন, ডা. রাজীব বিশ্বাস, ডা. প্রশান্ত কুমার শীল, ডা. শহিদ উল্যাহ দিদার ও চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. ব্রজগোপাল পাল। ওই ভবনের দোতলায় বসেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। তাঁরা সকালে এলেও দুপুর ১২টার পর নিজেদের কক্ষে আসেন।

হাসপাতালে বেশ কয়েকজন রোগীর সঙ্গে কথা হয়। তারা মনে করে, চিকিৎসকরা সকাল ৮টায় রোগী দেখা শুরু করলে ভালো সেবা পাওয়া যেত।

জানা গেছে, হাসপাতালে অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ না থাকায় প্রতিনিয়ত ভোগান্তিতে পড়ে রোগীরা। ছোটখাটো হাড় ভাঙার চিকিৎসা পেলেও বড় ধরনের সমস্যার ক্ষেত্রে চিকিৎসা পাওয়া যায় না। পুরনো ভবনের তিনতলায় অর্থোপেডিক ওয়ার্ড অনেকটা ফাঁকা পড়ে আছে।

দুপুর ১২টার দিকে পুরনো ভবনের বাইরে দেখা হয় ষাটোর্ধ্ব পেয়ার আহমদের সঙ্গে। তাঁর বাড়ি ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলার বাঁশপাড়ায়। তিনি ওই দিন সকালে রিকশা থেকে পড়ে গিয়ে পা ভেঙে ফেলেন। এরপর স্বজনরা তাঁকে ছাগলনাইয়ার একটি ক্লিনিকে নিয়ে এক্স-রে করিয়ে ভালো চিকিৎসার জন্য ফেনীতে নিয়ে আসে। কিন্তু এখানে অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ নেই। তিনি জানান, স্বজনরা তাঁকে শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করার প্রক্রিয়া চালাচ্ছে।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, নোয়াখালী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও ঢাকা থেকে চিকিৎসক এসে ফেনীর কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা দিচ্ছেন। রোগীরা বাধ্য হয়ে ওই সব হাসপাতালে যাচ্ছে।

বিষয়টি স্বীকার করে আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. অসীম কুমার সাহা জানান, দেড় বছর ধরে সিনিয়র কনসালট্যান্ট অর্থোপেডিক পদটি শূন্য রয়েছে। এতে করে রোগীরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছে।

একই হাল চক্ষু বিভাগেও। ছোটখাটো অস্ত্রোপচারও এখানে হয় না। এই বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট (চক্ষু) পদটি এখনো শূন্য বলা চলে। ছাগলনাইয়া উপজেলা কমপ্লেক্স থেকে ডা. ব্রজগোপাল পালকে নিয়ে এসে এখানে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাঁকে প্রতি মঙ্গলবার ছাগলনাইয়া গিয়ে সেখানে রোগী দেখতে হয়।

দুপুর ১টা। হাসপাতালের পুরনো ভবনের দোতলায় কথা হয় ধর্মপুরের সামছুর রহমানের সঙ্গে। তিনি জানান, কয়েক দিন আগে তিনি চোখের ছানি চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে এসেছিলেন। কিন্তু ডা. ব্রজগোপাল পাল তাঁকে জানান, এখানে এই ছানির অস্ত্রোপচার হয় না। তিনি পরে ফেনীর অন্য একটি বেসরকারি হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করেন।

ডা. ব্রজগোপাল পাল বলেন, ‘সদর হাসপাতালে কোনো ধররের চোখের অপারেশন হয় না। এখানে প্রয়োজনীয় ইকুইপমেন্ট নেই। তাই অপারেশন করতে পারছি না।’ তিনি বলেন, যাদের অস্ত্রোপচার বেশি দরকার তাদের বাইরের হাসপাতালে করতে হচ্ছে।

এ বিষয়ে আরএমও ডা. অসীম কুমার সাহার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমাদের চক্ষু বিভাগে কিছু যন্ত্রপাতি রয়েছে। কিছু যন্ত্রপাতির স্বল্পতা রয়েছে।’ তবে এখানে অপারেশন করা বা না করার বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি। এ বিষয়ে সিভিল সার্জন ডা. হাসান শাহরিয়ার কবিরের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন তিনি। ডা. অসীম বলেন, এই হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্বে রয়েছেন সিভিল সার্জন। তবে সিভিল সার্জন ডা. হাসান শাহরিয়ার কবির ছুটিতে থাকায় এ ব্যাপারে তাঁর বক্তব্য জানা যায়নি।

হাসপাতালে বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে স্বীকার করে আরএমও বলেন, ‘নানা সংকট সত্ত্বেও আমরা চিকিৎসকরা প্রতিদিন ইনডোরে প্রায় ৪০০ ও আউটডোরে প্রায় এক হাজার রোগীকে প্রতিদিন চিকিৎসা দিচ্ছি।’ তিনি আরো বলেন, ‘ফেনীর ছয়টি উপজেলা ছাড়াও কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম, চট্টগ্রামের মিরসরাই, খাগড়াছড়ির রামগড়, নোয়াখালীর সেনবাগ ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার রোগীরাও এখানে এসে সেবা নিচ্ছে। মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে ঘটা দুর্ঘটনায় আহত রোগীরা জরুরি চিকিৎসা নিতে এখানেই আসে। ফলে সব মিলিয়ে আমাদের অনেক সময় হিমশিম খেতে হয়। তবু আমরা সকলকে সেবা দিতে বদ্ধপরিকর।’

আরএমও বলেন, ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারী স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য। তিনি নিজে এই হাসপাতালের বিভিন্ন বিষয় তদারকি করছেন, মাঝেমধ্যে খবরও নিচ্ছেন। এ কারণে সবাই সজাগ থাকার চেষ্টা করে।

চিকিৎসকদের দেরিতে আসার বিষয়ে ডা. অসীম কুমার সাহা বলেন, এখন ফিঙ্গারিং পদ্ধতিতে ডিজিটালি হাজিরা গ্রহণ করা হচ্ছে। কে কখন আসছে তা সহজেই বোঝা যাচ্ছে। তাই এ ব্যাপারে গাফিলতির কোনো সুযোগ নেই। তিনি আরো বলেন, এখন কে কখন প্রবেশ করছে তা সিভিল সার্জন কার্যালয়ে বসে তদারক করা যায়।



মন্তব্য