kalerkantho


মেলা

পাখির জন্য ভালোবাসা

নওশাদ জামিল   

২৪ ডিসেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



পাখির জন্য ভালোবাসা

মিরপুরে বোটানিক্যাল গার্ডেনে আয়োজিত মেলায় পাখি অবমুক্ত করা হয়। ছবি : শেখ হাসান

তবু প্রাণ-প্রকৃতির কাছে মানুষ যায়। গাছের ছায়া আর পাখির কলকাকলি—এই অনবদ্য রূপে মগ্ন থাকে মানুষের মন।

রাজধানীর মিরপুরের জাতীয় উদ্যান বোটানিক্যাল গার্ডেনে আয়োজন করা হয়েছে পাখিমেলা। এ উদ্যানে রয়েছে প্রায় ১৭০ প্রজাতির পাখি। ফলে ছুটির দিন গতকাল শুক্রবার সকাল থেকেই ছিল পাখিপ্রেমিকদের ভিড়।  

উদ্যানে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ল পাখপাখালির আলোকচিত্র। কত রকমের পাখির ছবি যে রয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। তবে ছবিতে পাখি দেখে কি আর মন ভরে? কিছু দূর এগোতেই দেখা গেল সারি বেঁধে টেলিস্কোপে জ্যান্ত পাখি দেখছে দর্শনার্থীরা। গাছের ডালে, পাতার ফাঁকে দেখা যাচ্ছে পাখি। দর্শনার্থীরা দিনভর দেখল সেসব পাখির সৌন্দর্য, কান পেতে শুনল কলকাকলি।

পাখির প্রজনন বৃদ্ধি, সংরক্ষণ এবং পাখি শিকারের বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য গতকাল দিনভর জাতীয় উদ্যানে হয়ে গেল ভিন্নধর্মী পাখিমেলা।

দেশে পাখিশুমারির তিন দর্শক পূর্তিতে বিলুপ্তপ্রায় পাখি সংরক্ষণ ও পাখির জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরির দাবিতে আয়োজন করা হয়েছিল দিনব্যাপী এ মেলার।

বন বিভাগ, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন এবং বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের যৌথভাবে আয়োজিত এ মেলায় শুধু পাখি দেখা ও চেনা নয়, ছিল বিরল প্রজাতির পাখির আলোকচিত্র প্রদর্শনী, ভিডিও শো, পাখিবিষয়ক বিভিন্ন বই ও ম্যাগাজিনের প্রদর্শনী। ছিল পাখি ও প্রকৃতিবিষয়ক লোকগীতি। জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে এটিই ছিল প্রথম পাখিমেলা। সারা দিনই ছিল উত্সুক এবং প্রকৃতি ও পাখিপ্রেমী মানুষের মিলনমেলা।

বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা পাখিবিদ ইনাম আল হক বলেন, ‘পাখিমেলার মাধ্যমে জনগণের মাঝে সচেতনতা তৈরি করাই আমাদের লক্ষ্য। বর্তমানে দেশে প্রায় ৭০০ প্রজাতির পাখি রয়েছে। হারিয়ে গেছে, চিরতরে বিলুপ্ত হয়েছে অসংখ্য জাতের পাখি। পাখিকে টিকিয়ে রাখতে, প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখতে পাখির প্রতি বিশেষ ভালোবাসা দেখানো জরুরি। মানুষের মধ্যে এ ভালোবাসা তৈরি করতেই এ ধরনের মেলার আয়োজন। ’

এর আগে সকাল ১০টায় একঝাঁক পাখি অবমুক্ত করে মেলার উদ্বোধন করেন প্রধান বন সংরক্ষক ইউনুস আলী। উদ্বোধনী পর্বে ছিল ভিন্নধর্মী উদ্যোগ। খাঁচায় বন্দি নানা জাতের পাখি। একটি কিংবা দুটি নয়। প্রায় ৩০০ নানা জাতের পাখি। সাভারের কবিরপুর থেকে এ পাখিগুলো উদ্ধার করে বন বিভাগের কর্মকর্তারা নিয়ে আসেন এ মেলায়। মুনিয়া, টিয়া, ঘুঘুসহ নানা জাতের পাখি। ছিল বিরল প্রজাতির শঙ্খচিল। গোপন খবরের ভিত্তিতে গতকাল সকালে সাভার থেকে বন বিভাগের অপরাধ দমন ইউনিটের কর্মকর্তারা খাঁচাবন্দি পাখি উদ্ধার করেন। এর কয়েক ঘণ্টা পর ওই পাখিগুলো নিয়ে আসা হয় মিরপুরের জাতীয় উদ্যানে। গতকাল পাখিমেলার উদ্বোধনী পর্বে সেসব পাখি অবমুক্ত করা হয়। ৩০৪টি বিভিন্ন প্রজাতির পাখি উড়িয়ে দেওয়া হয় উদ্যানের আকাশে। এর মধ্যে ১৮১টি মুনিয়া, ৮২টি ঘুঘু, ৩৫টি লালমাথা টিয়া, পাঁচটি টিয়া ও একটি শঙ্খচিল রয়েছে।

একঝাঁক পাখি উড়িয়ে মেলা উদ্বোধনের পর শুরু হয় বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। জাতীয় উদ্যানের আন্তর্জাতিক উদ্যান অংশ থেকে এ শোভাযাত্রা উদ্যানের ফটক হয়ে আবার ফেরে মেলাস্থলে। এতে অংশ নেয় নানা বয়সের অসংখ্য মানুষ। শোভাযাত্রায় রং-বেরঙের ফেস্টুন, ব্যানার ব্যবহার করে পাখিপ্রেমীরা। তাতে দেখা যায় পাখি রক্ষার তাগিদে নানা স্লোগান। এর মধ্যে রয়েছে ‘পাখি প্রকৃতির অমূল্য রতন/বিপন্ন পাখি রক্ষায় হই সচেতন’, ‘পাখি রক্ষায় করি পণ/নিরাপদ রাখি জল ও বন’, ‘পাখি হত্যা বন্ধ করি/জলজ সম্পদ রক্ষা করি’, ‘দেশের আইন মেনে চলি/পাখি শিকার বন্ধ করি’ ইত্যাদি।  

প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মুকিত মজুমদার বাবু বলেন, পাখি শুধু প্রকৃতির জীবন্ত অলংকার নয়, মানুষেরও পরম বন্ধু। কিন্তু সচেতনতার অভাবে আমরা বন উজাড় করছি, ধ্বংস করছি পাখির আবাস। পরিবার থেকেই পাখিবিষয়ক শিক্ষাটা জরুরি, তেমনি জরুরি পাখির প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন। পাখি শিকার যেমন জঘন্য অপরাধ, তেমনি অপরাধ পাখির ডিম নষ্ট করা, পাখির আবাস নষ্ট করা—মানুষকে বিষয়টি বোঝাতে হবে। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে প্রচার চালাতে হবে। তিনি বলেন, ‘পাখি প্রাকৃতিক বন সৃষ্টির কারিগর। আমাদের যতটুকু বনভূমি থাকা দরকার ছিল, তা নেই। ফলে পরিবেশের ভারসাম্যও হুমকির মুখে। এ অবস্থায় পাখি বনায়ন সৃষ্টিতে দারুণ ভূমিকা রাখে। পরিবেশের ভারসাম্য ঠিক রাখে। ’

পাখিমেলায় ছিল নানা প্রতিষ্ঠানের স্টল। বন বিভাগের স্টলে দেখা যায় বিভিন্ন পাখির রেপ্লিকা। স্টলের সামনে যেন বসে আছে বসন্তবাউড়ি, কালালেজ জৌরালি, খয়রাপাখ মাছরাঙা, গাঙচিলসহ নানা জাতের পাখপাখালি। শিশু-কিশোররা এসব পাখি দেখে খুব আনন্দ পায়।

মেলায় ঘুরে দেখা যায়, শিশু-কিশোররা টেলিস্কোপে পাখি দেখে যারপরনাই বিস্মিত, আনন্দিত। পাখি দেখতে দেখতে ওদের মুখ থেকে বের হচ্ছিল নানা বিস্ময়সূচক ধ্বনি। ছয় বছরের তানিম বলল, ‘গাছের ডালে, পাতার আড়ালে আমি দুইটি পাখি দেখেছি। কী সুন্দর!’

পাখিমেলায় সপরিবারে ঘুরতে এসেছিলেন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান তাম্রলিপির স্বত্বাধিকারী এ কে এম তারিকুল ইসলাম। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রকৃতি, পরিবেশ ও পাখি রক্ষার দাবিতে এ মেলার আয়োজন সত্যি প্রশংসার দাবিদার। ছোটবেলায় আমরা প্রচুর পাখি দেখতাম বাড়ির চারপাশে। এখন পাখি দেখতে পাওয়া সুভাগ্যের বিষয়। দিন দিন পাখি কমছে, বিলুপ্ত হচ্ছে নানা জাতের পাখি—পরিবেশের জন্য তা হুমকিজনক বিষয়। তাই পাখি রক্ষা ও পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য সর্বমহলে সচেতনতা বাড়াতে হবে।


মন্তব্য