kalerkantho


বিচার দাবিতে উত্তাল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

অধ্যাপক হত্যায় শিবির নেতা আটক, মামলা ডিবিতে

নিজস্ব প্রতিবেদক ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি, রাজশাহী   

২৫ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



বিচার দাবিতে উত্তাল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে হত্যার প্রতিবাদে এবং বিচার দাবিতে শিক্ষক সমিতি গতকাল ক্যাম্পাসে প্রতিবাদ মিছিল করে। ছবি : কালের কণ্ঠ

প্রিয় শিক্ষকের নির্মম হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ও বিচার দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চেয়ে গতকাল রবিবার সকাল থেকে ক্যাম্পাসে অবস্থান কর্মসূচি, বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ ও মানববন্ধন করেছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। জড়িতদের গ্রেপ্তারে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছেন ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থীরা। গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ক্লাস-পরীক্ষা হয়নি। আজ সোমবারও হবে না।

অধ্যাপক ড. এ এফ এম রেজাউল করিম সিদ্দিকী হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে শনিবার রাতে এক যুবককে আটক করেছে পুলিশ। আটক হাফিজুর রহমান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েরই লোক প্রশাসন বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র এবং মহানগরের ১৯ নম্বর ওয়ার্ড শাখা শিবিরের সেক্রেটারি। গতকাল এ হত্যা মামলার তদন্তভার দেওয়া হয়েছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশকে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক এ এফ এম রেজাউল করিম সিদ্দিকী সবার কাছে ‘আর কে স্যার’ নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন। প্রিয় স্যারের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে গতকাল সকাল ১০টায় শোক মিছিল বের করেন ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যারিস রোড থেকে শুরু হয়ে ক্যাম্পাস ঘুরে সিনেট ভবনের সামনে আয়োজিত সংক্ষিপ্ত সমাবেশে মিলিত হয়। সমাবেশে বক্তব্য দেন ইংরেজি বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক মাসউদ আখতার, অধ্যাপক মো. শহীদুল্লাহ ও অধ্যাপক মো. জহুরুল ইসলাম।

অধ্যাপক মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। গত ১২ বছরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চারজন শিক্ষক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এসব হত্যাকাণ্ডের এখনো সুষ্ঠু বিচার হয়নি। আমরা আর মিথ্যা আশ্বাসে বসে থাকতে চাই না। আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাব।’

সমাবেশ শেষে বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে পাঁচ মিনিট প্রতীকী অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। কর্মসূচিতে প্রায় দুই শতাধিক শিক্ষক-শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন। পরে দুপুর ১২টার দিকে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থীরা ফের প্যারিস রোডে জড়ো হয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। কর্মসূচি চলে দুপুর ২টা পর্যন্ত। 

কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী অনিমা বলেন, ‘স্যার কখনো কোনো ধর্ম বিশ্বাসের বিরোধিতা করেননি। কোনো ব্লগও লিখতেন না। অথচ এখন বলা হচ্ছে, তিনি নাস্তিক ছিলেন, ব্লগার ছিলেন। আমরা স্পষ্ট বলে দিচ্ছি, এসব ট্যাগ লাগিয়ে এ হত্যাকে বৈধ করার চেষ্টা করবেন না। এসব ট্যাগ লাগিয়ে কেউ হত্যাকাণ্ডকে ভিন্ন খাতে নিতে চাইলে আমরা মানব না।’

স্বাক্ষর নামের এক শিক্ষার্থী স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগে ইংরেজি পড়ার অভ্যাস ছিল না। ক্লাসে সবার পেছনে বসতাম। তাই স্যারদের লেকচার বুঝতে অসুবিধা হতো। একমাত্র আর কে স্যারই শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে বাংলায় ক্লাস নিতেন।’

আরেক শিক্ষার্থী অনিন্দিতা বলেন, ‘আমরা চাই, স্যারের হত্যাকাণ্ড নিয়ে যেন কোনো ধোঁয়াশা তৈরি না হয়। প্রকৃত খুনিরা যেন আড়ালে চলে না যায়।’

প্রিয় সহকর্মীর হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনের সামনে থেকে মৌন মিছিল বের করে। মিছিলটি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক ঘুরে সিনেট ভবনের সামনে গিয়ে শেষ হয়। পরে সেখানে মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়। সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক শাহ আ জ ম শান্তনুর সঞ্চালনায়  সেখানে বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মুহম্মদ মিজানউদ্দিন, উপ-উপাচার্য অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান, সাবেক উপাচার্য ড. এম সাইদুর রহমান খান, শিক্ষক সমিতির সভাপতি ড. মো. শহীদুল্লাহ, সাবেক সভাপতি অধ্যাপক আনন্দ কুমার সাহা প্রমুখ।

উপাচার্য অধ্যাপক মুহম্মদ মিজানউদ্দিন বলেন, ‘নিয়মিত শিক্ষক হত্যার কারণে ক্যাম্পাসে এবং শিক্ষকদের মধ্যে আতঙ্কের পরিবেশ বিরাজ করছে। নিয়মিত শিক্ষক খুন হচ্ছে, কিন্তু হত্যাকারীরা ধরা পড়ে না, তাদের বিচার হয় না।’

মিজানউদ্দিন আরো বলেন, ‘এমন একজন শিক্ষককে হারিয়ে তাঁর পরিবার, ইংরেজি বিভাগ ও এ বিশ্ববিদ্যালয়ে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে তা অপূরণীয়। এখন মনে হচ্ছে, আমরা হত্যার মিছিলে আছি। যেভাবে শিক্ষক ও মুক্তমনাদের হত্যা করা হচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে, এবার আমাদের সবাইকে হত্যা করা হবে। আমরা আইনের শাসন দেখতে চাই। এই বিশ্ববিদ্যালয় শান্ত হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত ড. সিদ্দিকীর হত্যাকারীদের আমাদের সামনে হাজির করা না হবে এবং যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করা না হবে।’

হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে শাস্তির দাবিতে সকাল সাড়ে ১১টার দিকে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রগতিশীল ছাত্রজোট। একই দাবিতে দুপুর ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে প্রতিবাদী সমাবেশ করে বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক জোট। সমাবেশে বক্তব্য দেন শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক শাহ আ জ ম শান্তনু, ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক মলয় কুমার ভৌমিক, বাংলা বিভাগের অধ্যাপক পি এম সফিকুল ইসলাম প্রমুখ।

বক্তারা বলেন, ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন বড় একটা দুর্যোগ চলছে। বারবার শিক্ষক হত্যা হচ্ছে। কিন্তু কারণ বের করতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আমাদের ভয়ের সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে এবং প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠতে হবে।’

হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি বিকেল ৫টার দিকেও নগরীর জিরো পয়েন্টে মানববন্ধনের আয়োজন করে।

ইংরেজি বিভাগে সংবাদ সম্মেলন : অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকীর হত্যা মামলার তদন্ত দ্রুত শেষ করে দ্রুতবিচার ট্রাইব্যুনালে জড়িতদের বিচার করার দাবি জানিয়েছেন ইংরেজি বিভাগের শিক্ষকরা। দুপুর দেড়টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ কলা ভবনে ইংরেজি বিভাগ আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে ইংরেজি বিভাগের সভাপতি ড. মাসউদ আখতার বলেন, ‘অধ্যাপক সিদ্দিকী কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারী ছিলেন না। সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তাঁর বিচরণ ছিল। আমরা হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি। এ ক্ষেত্রে আমরা প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেপ্তার ও বিচার দাবিতে গতকাল থেকে তিন দিন ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন ও পূর্ণ দিবস কর্মবিরতি পালন এবং সপ্তাহব্যাপী মানববন্ধন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে ইংরেজি বিভাগ। আজ বিভাগে শোকসভা অনুষ্ঠিত হবে।

সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন সহযোগী অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মামুন। উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক মো. শহীদুল্লাহ, অধ্যাপক শেহনাজ ইয়াসমীন, অধ্যাপক জহুরুল ইসলাম, অধ্যাপক শহীদুর রহমান প্রমুখ।

বিভাগের সংবাদ সম্মেলনের পর শিক্ষক হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানিয়ে পাঁচ দাবিতে একই স্থানে সংবাদ সম্মেলন করে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থীরা। তারা হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেপ্তারে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম বেঁধে দেন। 

সন্দেহভাজন একজন আটক : হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে শনিবার রাতে নগরীর ছোটবোনগ্রাম এলাকার নিজ বাসা থেকে হাফিজুর রহমান নামের ওই শিক্ষার্থীকে আটক করেছে পুলিশ। হাফিজুর মহানগরীর  ১৯ নম্বর ওয়ার্ড শাখা শিবিরের সেক্রেটারি। বিষয়টি নিশ্চিত করে ডিবি ওসি খন্দকার জাহিদুল ইসলাম বলেন, হাফিজুরকে ডিবি কার্যালয়ে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

অধ্যাপক এ এফ এম রেজাউল করিম সিদ্দিকী হত্যা মামলা তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশকে। রাজশাহী মহানগর পুলিশ কমিশনার মো. শামসুদ্দিন গতকাল এ তথ্য জানান। মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খন্দকার জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘মামলার দায়িত্ব আমাদের দেওয়া হয়েছে। আমরা মামলাটি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করছি।’ তবে তদন্তে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা মিলেছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ওসি বলেন, ‘এ বিষয়ে এ মুহূর্তে কিছু বলা যাবে না।’

পুলিশের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বৈঠক : গতকাল সকালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে মহানগর পুলিশ কমিশনার মো. শামসুদ্দিনসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বৈঠক হয়েছে। সকাল ১০টায় উপাচার্যের বাসভবনস্থ কার্যালয়ে এ বৈঠক হয়। বৈঠকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মুহম্মদ মিজানউদ্দিন, উপ-উপাচার্য অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান, ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক মিজানুর রহমান, প্রক্টর মজিবুল হক আজাদ খান উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠক শেষে ছাত্র উপদেষ্টা মিজানুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, বৈঠকে অধ্যাপক সিদ্দিকী হত্যাকাণ্ডের তদন্তের অগ্রগতি জানতে চাওয়া হয়। পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তাঁরা চেষ্টা করছেন। বৈঠকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

সুরেলা বাড়িটি সুনসান : সকাল-সন্ধ্যা যে বাড়িটি থেকে সেতারের সুর ভেসে আসত সেই বাড়িতে আজ ভর করেছে সুনসান নীরবতা। গতকাল দুপুরে নগরীর সপুরা এলাকায় অধ্যাপক সিদ্দিকীর বাসায় গিয়ে দেখা যায়, বাইরে থেকে তালা দেওয়া। শনিবার বিকেলেই লাশ নিয়ে দাফনের জন্য গ্রামের বাড়ি বাগমারায় গেছে পরিবারের সদস্যরা।

প্রসঙ্গত, শনিবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে সপুরা এলাকায় নিজের বাড়ি থেকে অল্প দূরত্বে খুন হন অধ্যাপক সিদ্দিকী। মোটরসাইকেলে আসা দুই যুবক তাঁকে কুপিয়ে পালিয়ে যায় বলে জানিয়েছে প্রত্যক্ষদর্শীরা।


মন্তব্য