kalerkantho


আর্সেনিকে সিরিজ মৃত্যু

ভিটায় বাতি জ্বালানোর কেউ নেই

ফখরে আলম, যশোর   

২৫ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



ভিটায় বাতি জ্বালানোর কেউ নেই

আর্সেনিক বিষে সর্বশেষ মারা যান রেঞ্জুয়ারা

ধানের গোলা, গরুর গোয়াল, পুকুর, ফসলের ক্ষেত, আধাপাকা বাড়ি—সব পড়ে আছে। অথচ ভিটায় বাতি জ্বালানোর কেউ নেই। পরিবারের তিন প্রজন্মের ১৭ সদস্যকে কেড়ে নিয়েছে ভয়ংকর বিষ আর্সেনিক। মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক মিশ্রিত নলকূপের পানি পান করে আর্সেনিকোসিসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে তারা সবাই।

দেশের সবচেয়ে ভয়াবহ আর্সেনিক কবলিত যশোরের শার্শা উপজেলার সামটা গ্রামে পাতালের বিষ ওলট-পালট করে দিয়েছে এক বংশের তিন পরিবারকে। আর্সেনিকোসিসে এভাবে কয়েকটি পরিবার ধ্বংস হয়ে যাওয়ার নজির পৃথিবীতে নেই। যশোর শহর থেকে ৩২ কিলোমিটার দূরের গ্রামটি ঘুরে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এমন ভয়ংকর তথ্য জানা গেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৯৮ সালের দিকে আর্সেনিকোসিসে আক্রান্ত হয়ে গ্রামের বয়োবৃদ্ধ জোহরা খাতুন মারা যান। ২০০০ সালের দিকে মারা যান তাঁর বড় ছেলে দাউদ আলী। এরপর শুরু হয় সিরিজ মৃত্যু। আর্সেনিকোসিসে আক্রান্ত হয়ে পর্যায়ক্রমে মারা যান দাউদের স্ত্রী নেহার বানু, ছেলে আইয়ুব ও ইউনূচ, মেয়ে রওশন আরা ও রেঞ্জুয়ারা, পুত্রবধূ কুলসুম, দুই ভাই ওহেদ আলী ও দরুদ আলী, ওহেদ আলীর ছেলে আনসার আলী, দরুদ আলীর স্ত্রী জবেদা খাতুন, দুই ছেলে কেতাব আলী ও শামসুর রহমান, মেয়ে ফাতেমা এবং দরুদ আলীর বাড়িতে বসবাস করা জামাই আব্দুল গফুর। সর্বশেষ ২০১৪ সালে মারা যান দাউদের ছোট মেয়ে রেঞ্জুয়ারা।

আর্সেনিকে আক্রান্ত হয়ে এভাবে সিরিজ মৃত্যুর ঘটনায় রেঞ্জুয়ারার স্বামী রেজাউল তিন বছরের ছেলে রেজওয়ানকে সঙ্গে নিয়ে সামটা গ্রামে দাউদের ভিটা ছেড়ে অন্য গ্রামে চলে যান। বর্তমানে ওই ভিটা শূন্য পড়ে আছে। ভিটায় সন্ধ্যাবাতি জ্বালানোরও কেউ নেই।

সামটা গ্রামে আর্সেনিকের দূষণ নিয়ে কাজ করছে এশিয়া আর্সেনিক নেটওয়ার্ক। প্রতিষ্ঠানটির টেকনিক্যাল সুপারভাইজার রুহুল কুদ্দুস কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সামটা গ্রামের ৭৩৮টি নলকূপের পানি পরীক্ষা করে ৬৬৬টিতেই মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক পাওয়া গেছে। দাউদ আলীর পরিবারের সব সদস্যসহ গ্রামের ৩০ জন আর্সেনিকোসিসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। বর্তমানে গ্রামে আমাদের তালিকাভুক্ত আর্সেনিকোসিসে আক্রান্ত ১৭৫ জন রোগী রয়েছে।’

স্থানীয় বাগআঁচড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইলিয়াস কবির বকুল বলেন, ‘দাউদের পরিবারের সব সদস্যের মৃত্যুর ঘটনা খুবই দুঃখজনক। আর্সেনিকের এ দূষণ এলাকাবাসীকে আতঙ্কিত করে তুলেছে। সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানিয়েছি।’

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে যশোরের ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. এ বি এম আলী আহসান বলেন, ‘আর্সেনিকোসিসে আক্রান্ত হয়ে যারা মারা গেছে তাদের তালিকা আমাদের কাছে নেই। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে খবর নিয়ে এ বিষয়ে বলতে পারব।’

শার্শা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মঞ্জুরুল মোর্শিদ বলেন, ‘সামটায় আর্সেনিকে সর্বশেষ মৃত্যুর খবর আমার জানা নেই। আগে কয়েকজন মারা গেছে বলে শুনেছি।’


মন্তব্য