kalerkantho


খুলনা

প্রতিষ্ঠার ১৩৪ বছর

গৌরাঙ্গ নন্দী   

২৫ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



প্রতিষ্ঠার ১৩৪ বছর

মহানগরের কেন্দ্রস্থলে সিটি কলেজ মোড়ে চিংড়ি ফোয়ারা। ছবি : কালের কণ্ঠ

স্থানটির নাম ময়লাপোতা। বোঝাই যায়, ময়লা ফেলার স্থান থেকেই এমন নামকরণ। জনবসতি বাড়তে থাকে, ময়লা ফেলার স্থান পরিবর্তিত হয়। এলাকাবাসী উৎসাহের সঙ্গে সেই এলাকায় একটি স্কুল গড়ে তোলে। নাম দেয় সোনাপোতা বিদ্যালয়। তবে সেই নাম জনপ্রিয়তা পায়নি। এলাকাটির জৌলুস ও গুরুত্ব দুই-ই বেড়েছে। সময়ের ব্যবধানে এখানে বিশাল উঁচু ভবনও গড়ে উঠছে। খুলনা শহরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভবন (১৬ তলা) এখন ওই এলাকায়ই। কিন্তু সবাই আজও এলাকাটি ময়লাপোতা হিসেবেই জানে।

আজকের খুলনা শহরে অসংখ্য পরিবর্তন ও নতুনত্বের ছোঁয়া চারদিকে। ময়লাপোতা মোড় থেকে পশ্চিমমুখো সোজা তাকালে দুই পাশে সুউচ্চ বাণিজ্যিক ভবনের সারি, যা দশ বছর আগেও ছিল না। দশককাল আগেও খুলনা ছিল ভৈরব-রূপসা নদীর তীরঘেঁষা লম্বাকৃতির একটি ছোট্ট শহর। সাতচল্লিশ-উত্তরকালে খালিশপুরের ঘনবসতি এলাকা অধিগ্রহণ করা হয়। বলতে গেলে, এলাকাবাসীকে রাষ্ট্রীয়ভাবে উচ্ছেদ করা হয়। ভৈরবের তীরঘেঁষে জুট মিল, কাগজ কল, হার্ডবোর্ড মিল গড়ে ওঠে। অদূরে দৌলতপুরে পাটের মোকাম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে নির্মিত নৌযান ভেড়ার জেটি ঘিরে পণ্য ওঠা-নামার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে তিনটি ঘাট। ভৈরব-রূপসা-কাজীবাছার ভাটিতে চালনার বন্দরটিকে আরো একটু দক্ষিণে নিয়ে পশুর-মংলার সঙ্গমস্থলের মংলা নালার (নদী) দক্ষিণ পারে গড়ে ওঠে মংলা বন্দর। খুলনা পরিচিত হয়ে ওঠে শিল্প ও বন্দর নগর হিসেবে। এক সময় কলকাতার কাছাকাছি থাকায় শিল্প-সাহিত্য ও রাজনীতিতে উৎকর্ষ খুলনার খোল-নলচে বদলে যেতে থাকে।

খুলনা অঞ্চলটি ছিল সুন্দরবনের অংশ। বন কেটে আবাদ করে এখানে বসতি গড়ে ওঠে। আইন-ই-আকবরিতে এই অঞ্চলটি ভাটি এলাকা বলে বর্ণিত হয়েছে। খাজা খানজাহান আলীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এলাকাটিতে বসতির বিস্তার ঘটে। অবশ্য তাঁর সময় বিকশিত এলাকাটি প্রধানত বাগেরহাট এলাকা।

ইংরেজ আমলে ১৮৪২ সালে যশোর জেলার প্রথম বিভাগ সৃষ্টি হয় খুলনা নামে। যেটি বাংলারও প্রথম মহকুমা। ১৮৮২ সালের ২৫ এপ্রিল যশোর জেলার খুলনা ও বাগেরহাট এবং চব্বিশ পরগনা জেলার সাতক্ষীরা মহকুমা নিয়ে খুলনা জেলা সৃষ্টির নোটিশ জারি হয়। এর কাজ শুরু হয় ১ জুন। জেলা সদর হয় খুলনা।

খুলনা পৌরসভা হয় ১৮৮৪ সালে। এক শ বছরের মাথায় ১৯৮৪ সালে খুলনা সিটি করপোরেশনে (কেসিসি) উন্নীত হয়। বর্তমানে এই জেলার জনসংখ্যা ২৪ লাখ। আর কেসিসি এলাকার জনসংখ্যা ১২ লক্ষাধিক, যা শুরুর সময় পুরো জেলার জনসংখ্যার চেয়েও বেশি। এই সময় খুলনা অনেক পরিবর্তিত হয়ে আজকের অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে।

স্বাধীনতা-উত্তরকালে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো খুলনা এগোয়নি। সময়কে ধারণ করে পুুঁজি বিনিয়োগ হয়নি, রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনাও তেমন ছিল না। আইযুবি উন্নয়ন দশকের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বদৌলতে কিছুটা বিনিয়োগ হয়েছিল; পরে প্রকৃতপক্ষে আর কিছুই হয়নি। ওই সময়েই খুলনা-মংলা রেলের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু রেললাইন হয়নি। এখন আবার খুলনা-মংলা রেললাইন নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে; সে কারণে নতুন করে জমি অধিগ্রহণও করা হয়েছে। আগের জমি চলে গেছে দখলদারদের কবলে। একই সময়ে বয়রায় অধিগ্রহণ করা জমিতে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল গড়ে উঠেছে প্রায় তিন দশক পরে। রাষ্ট্রীয় নীতির কারণে কল-কারখানা ব্যক্তিমালিকানায় ছেড়ে দিলেও পুঁজিপ্রবাহ বাড়েনি। আন্তর্জাতিক বাজারে পাটের গ্রহণযোগ্যতা কমে যাওয়া, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের পরামর্শ হুবহু অনুসরণ করা, সর্বোপরি সরকারের কর্মজীবীবান্ধব নীতি না থাকার জের ধরে এই খুলনার শিল্প-কলকারখানাগুলো একের পর এক জৌলুস হারিয়েছে। অবশ্য বর্তমান সরকার আবার তা টেনে তোলার চেষ্টা করছে।

বর্তমানে খুলনায় উঁচু উঁচু ভবন তৈরি হচ্ছে। আবাসন খাতে পুঁজি বিনিয়োগ হচ্ছে। রাষ্ট্র পরিকল্পিতভাবে এখন বেশ কিছু খাতে পুঁজি বিনিয়োগ করছে। পদ্মা নদীর ওপর সেতু হচ্ছে। গ্যাস সংযোগ আসার অপার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। পরিপূরক পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। আন্তদেশীয় ও আন্তমহাদেশীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরির মহাপরিকল্পনা গৃহীত হয়েছে। যোগাযোগ ও জ্বালানি খাতে পিছিয়ে থাকা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কেন্দ্রবিন্দু শহর খুলনার জেগে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে। সবকিছু ঠিকঠাকভাবে রূপায়িত হলে এক সময় এই খুলনা হয়ে উঠবে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সেরা শহর।

আজ ২৫ এপ্রিল খুলনা জেলা তার প্রতিষ্ঠার ১৩৪ বছর পূর্ণ করেছে। ‘খুলনা দিবস-২০১৬’ উদ্যাপন উপলক্ষে আজ সোমবার বিস্তারিত কর্মসূচি নিয়েছে বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটি। কর্মসূচির মধ্য রয়েছে—আজ সকাল ৯টা ১০ মিনিটে খুলনা মহানগরীর শিববাড়ী মোড় থেকে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, মধ্যাহ্ন ভোজ, বিকেল সাড়ে ৪টায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সন্ধ্যা পৌনে ৭টায় আলোচনা সভা ও সন্ধ্যায় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।



মন্তব্য