kalerkantho


লম্বা রেসের ঘোড়া

মঞ্চের ভুবন কোনো দিনও টানেনি। বন্ধুরা সব থিয়েটার করেন, তাঁদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ান। জোর করে তাঁকে অভিনয়ে নিয়ে এলেন তাঁরা। বিটিভি, সিনেমাতেও সেই কাহিনি। কুবেরও হয়েছেন আচানক। রাইসুল ইসলাম আসাদের জীবন গল্পের চেয়েও অবিশ্বাস্য। সেটির সঙ্গে ছিলেন ওমর শাহেদ। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

২৬ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



লম্বা রেসের ঘোড়া

মঞ্চে এলেন কিভাবে?

১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে মুক্তিযুদ্ধ করে ফিরে এলাম। সে বছরের ২৪ কী ২৫ ডিসেম্বর আমাদের সাথী আপা (সাকিনা সারোয়ার, বাংলাদেশ টেলিভিশনের প্রযোজক) সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করলেন। বড় মগবাজার মাঠে সেই অনুষ্ঠান হবে। আমাদের গেরিলা দলটি মুক্তিযুদ্ধের সময় সেখানে ছিল। ঢাকার পল্টন, মগবাজারে একাত্তরে আমরা অপারেশন চালিয়ে ছিলাম বলে এসব এলাকায় পরিচিতি, দাপটও ছিল বেশি। আমাদের দলের ফেরদৌস নাজমী, সোহেল সামাদ, ফিরোজ, আরিফসহ আরো কয়েকজন সে পরিকল্পনায় যুক্ত হলো। সোহেল (পরে বিটিভি, বেতার ও ভয়েস অব আমেরিকার সংবাদ পাঠক) এসে ধরল, ‘এই অনুষ্ঠানে গীতিনকশা হবে। তাতে নাচ, গান আবৃত্তির অংশবিশেষ থাকবে। আপনাকে সেটির ধারা বর্ণনা দিতে হবে।’ কোনো দিনও এমন কিছু করিনি! এক কথায় নাকচ করে দিলাম, ‘প্রশ্নই আসে না। হাজারো মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে এমন কিছু করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’ নাছোড়বান্দা সোহেলের জোরাজুরিতে রাজি হতে হলো। কিন্তু শর্ত দিলাম, ‘কোনোভাবেই আমাকে যেন দর্শকরা দেখতে না পায়, কাউকেই কিছু বলা যাবে না।’ তখন সে বুদ্ধি করল, ‘মাইক্রোফোনের সামনে আমি দাঁড়াব। আলো আমার ওপর পড়বে। আর আপনি আড়ালে থেকে পড়বেন। আপনার জন্য মাইকটি মঞ্চের পেছনে ফিট করে দেওয়া হবে।’ তবে অনুষ্ঠান শুরুর পর মঞ্চের পেছনে ঘুটঘুটে আঁধার। সোহেলের ওপর আলো পড়ছে! দর্শকরা আমার ধারা বর্ণনার অপেক্ষা করছেন! বারবার সে পেছনে তাকাচ্ছে; কিন্তু আমি তো অসহায়। পরে কেউ একজন হঠাৎ একটি টর্চ এগিয়ে দিলেন। সেই আলোয় গীতিনকশা পাঠ করলাম। সৈয়দ সালাউদ্দিন জাকী, বাচ্চুসহ আরো অনেক গণমান্য ব্যক্তি সেদিন উপস্থিত ছিলেন। পরে তাঁদের অনেকের প্রশ্ন ছিল, ‘দরাজ কণ্ঠটি কার?’ সোহেল যতবারই বলে, ‘আমার’, কেউ বিশ্বাস করেন না। নাম বলে দিলে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়ায় সে নামটিও বলতে পারছিল না। এই অনুষ্ঠানটিই ছিল সেই এলাকায় তো বটেই, সম্ভবত স্বাধীনতার পর ঢাকারও প্রথম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

তারপর কী করলেন?

পরের বছরের একুশে ফেব্রুয়ারিতে ‘কৌণিক শিল্পগোষ্ঠী’র প্রধান জাকী ভাই বড় করে অনুষ্ঠান করার পরিকল্পনা করলেন। সোহেল, আমিসহ আরো অনেকে তাঁর সঙ্গে কাজ শুরু করলাম। তাঁর ধানমণ্ডির বাসায় আমাদের রিহার্সাল হয়। তিনি সোহেলকে বারবার প্রশ্ন করেন, ‘সেই কণ্ঠস্বরটি কার? তাঁকে আমার প্রয়োজন।’ আমার দিকে তাকিয়ে ভয়ে ভয়ে সে একই উত্তর দেয়। একুশের প্রহর যত এগিয়ে আসে, জাকী ভাই তাকে তত চাপ দিতে থাকেন, ‘কোথায় সে কণ্ঠ? নিয়ে এসো।’ ত্যক্তবিরক্ত সোহেল একদিন বলেই বসলো,  ‘সব সময় আপনাদের সঙ্গে সে থাকে, কেন সেই কণ্ঠ চিনতে পারেন না? না চিনলে আমি কী করব?’ অনুষ্ঠানের দুই কি তিন দিন আগে জাকী ভাইয়ের প্রবল চাপে থাকতে না পেরে ‘ওটা আসাদ ভাইয়ের গলা’—বলেই সে পালিয়ে গেল! তাঁরাও অবাক—আসাদের গলা? জাকী ভাই আমাকে শুধু বললেন, ‘কাল একটু সকাল সকাল এসো, কাজ আছে।’ তিনি নানা বিষয়ে, কখনো উচ্চ স্বরে, কখনো নিম্ন কণ্ঠে আলাপ করলেন। পরে জেনেছি, টেপ রেকর্ডারে আমার গলাটি রেকর্ড করেছিলেন। কণ্ঠস্বর নিশ্চিত হওয়ার পর তিনি বললেন, ‘একুশের অনুষ্ঠানমালায় তোকে ধারা বর্ণনা দিতেই হবে।’ তাঁর কথা তো ফেলতে পারি না। কিন্তু শর্ত দিলাম, ‘দর্শকরা যাতে দেখতে না পারে সেজন্য উইংসের আড়ালে থাকব, শিল্পীদের সঙ্গেও থাকতে পারি; তাহলে করব, নইলে নয়।’ উপায়ন্তর না পেয়ে তিনিও রাজি।

অভিনয়েও কি হঠাৎ?

তখন কোনো এক দল নাটক নামালে অন্য দলগুলোও সাহায্য করতে এগিয়ে আসত। ‘বহুবচন’-এ জাকী ভাই, বাচ্চুসহ আরো অনেকে ছিলেন। এসব না করলেও তো মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে তাঁদের সঙ্গেই তো আমার ওঠা-বসা। একদিন বন্ধুরাই বলল, ‘চল, রিহার্সালে যাই।’ ১৯৭২ সালে শিল্পকলা একাডেমি এমন ছিল না। ঢেউ খেলানো টিনের ছাদের নিচে অফিস রুমের চেয়ার-টেবিল সরিয়ে রিহার্সাল হত। ওদের সঙ্গে আমিও রিহার্সালের আগে ঘর ঝাড়ু দিই, মেঝে পরিষ্কার করি; চা, এটা-ওটা এনে দিই। কিন্তু অভিনয়ের ইচ্ছা কখনো হয়নি, বন্ধু-বড় ভাইদের সাহায্য করেই আমি খুশি। রিহার্সাল শেষে আমরা রমনা রেস্টুরেন্টে আড্ডা দিই। শিল্পকলায় আলাদা দুটি রুমে সেলিম আল দীনের ‘সর্পবিষয়ক গল্প’ ও ফজলুর রহমানের ‘আমি রাজা হবো না’র রিহার্সাল হয়। সেলিমের নাটকের পরিচালক আমিরুল হক চৌধুরী, ফজলুর রহমানের মুজিব-বিন-হক। মুজিব এখন আমেরিকায়। হঠাৎ একদিন রেস্তোরাঁর বেয়ারার চরিত্রাভিনেতা আসতে পারলেন না। সেই একটিমাত্র দৃশ্য করার জন্য আমাকে অফার করা হলো। আমি বেঁকে বসলাম, ‘অসম্ভব, মঞ্চের পেছনের যত কাজ আছে করে দেব; কিন্তু অভিনয় করতে পারব না। দর্শকের সামনে দাঁড়ানোর সাহস নেই।’ আমিরুল ভাইয়েরা বোঝালেন, ‘তোমাকে অভিনয় করতে হবে না। ও তো এসে পড়বেই, আজকের রিহার্সালটি করে দাও। নাটক তো আটকে যাচ্ছে। এগিয়ে গিয়ে টেবিলের ওপর থেকে চায়ের কাপটি এভাবে তুলে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসবে।’ ‘কিন্তু সামনে দিয়ে যেতে পারব না।’ তাঁরা তাতেই রাজি, যেদিক দিয়ে ইচ্ছা—চাইলে পেছন দিয়েও যেতে পার। কাজটি করে দাও। সেভাবেই দৃশ্যটি করলাম। পর দিনও ছেলেটি এলো না। তখন তাঁরা আমাকে দিয়ে দৃশ্যটি আবার করালেন। এরপর বললেন, “এরপর রেস্তোরাঁর ম্যানেজার তোমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করবে, ‘কত হইছে?’ তুমি শুধু বলবে, ‘এত হইছে’।” এবার তো ভয় পেয়ে গেলাম, ‘কোনো কথাই বলতে পারব না।’ তখন তাঁরা রিহার্সালের দোহাই দিয়ে বললেন, ‘তোমার জন্য তো রিহার্সালের দেরি হয়ে যাচ্ছে।’ উপায়ন্তর না দেখে রাজি হতে হলো। ফের শর্ত দিলাম, ‘স্টেজের বাইরে বেরিয়ে গিয়ে বলতে হলে পারব।’ ‘তাই বলো।’ এভাবে একটু একটু করে আমার পার্ট বাড়ে, কোনো দিন কেউ না আসতে পারলে সেই চরিত্রটি আমাকে দিয়ে করিয়ে রিহার্সাল এগিয়ে চলে। শেষ পর্যন্ত মঞ্চায়নের দিন এই নাটকের প্রধান চরিত্রটি আমার হয়ে গেল। বাচ্চু ‘আমি রাজা হবো না’র প্রধান অভিনেতা ছিল। সে আমার কয়েক বছরের বড় হলেও আজীবন আমরা পাশাপাশি থাকি, একসঙ্গে স্কুল-কলেজে গেছি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়েছি বলে বন্ধু। ওর নাটকটি মঞ্চায়নের দুই দিন আগে হঠাৎ বিকেলে মহড়ায় যাবার জন্য ডাকছি—দোতলা থেকে গলা বাড়িয়ে উত্তর দিল, ‘ওপরে আয়।’ গেলাম। ‘শোন, গত রাত থেকে পেট খুব খারাপ। অনেকবার টয়লেটে গেছি। তুই গিয়ে বল, বিছানা থেকেই উঠতে পারছি না।’ খবরটি জানানোর পর মুজিব বিন হক জিজ্ঞেস করলেন, ‘খবরটি কে নিয়ে এসেছে?’ ‘আসাদ।’ ‘তাঁকে বলো, বাচ্চুর চরিত্র ওকেই করতে হবে।’ আমি তো ভীষণ অবাক! যাওয়ার পর তিনি বললেন, ‘হয় তাঁকে সুস্থ করে আনো, তা না হলে তুমি সে চরিত্র করো। নাটক তো মঞ্চস্থ হতে হবে।’ কিন্তু কোনো দিন তো তাঁদের নাটকের রিহার্সালও দেখিনি। বাসায় ফেরার পর দেখি বাচ্চুর শরীর আরো খারাপ হয়ে গেছে। সে তার চিত্রনাট্য দিয়ে দিল। কোনো রকমে মুখস্থ করে দুটি নাটকেরই প্রধান চরিত্রে অভিনয় করতে হলো।

এরপর কীভাবে নাটকে জড়িয়ে গেলেন?

মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় থাকতে মামুন (মামুনুর রশীদ) ভাই ‘পশ্চিমের সিঁড়ি’ লিখেছিলেন। স্বাধীনতার পর তাঁর দল ‘আরণ্যক’ এখানেই নাটকটি মঞ্চায়নের সিদ্ধান্ত নিল। তখন তো আমরা অল্প কয়জন নাট্যকর্মী ছিলাম, ভালোবাসার সম্পর্কও গভীর ছিল; ফলে প্রশ্ন তোলারই সুযোগ হলো না, তিনি বললেন, ‘তোকে অভিনয় করতেই হবে।’ সে নাটকের সব চরিত্রই ছিল প্রতীকি—বঙ্গবন্ধু, আইয়ুব, ইয়াহিয়া খান। অনেক বড় আয়তনের সেই নাটকে দারাশিকো, কেরামত মওলাসহ অনেকে অভিনয় করেছেন। সেট, লাইট ডিজাইন করেছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। সেখানেও অভিনয় করেছি।

অভিনয়বিদ্যার গুরু?

স্বাধীনতার পর বজলুল করীম লন্ডন থেকে ফিরে ড্রামা সার্কেলকে নতুন করে গোছাতে লাগলেন। এটিই সম্ভবত পূর্ব বাংলার প্রথম নাটকের দল, পঞ্চাশের দশকে শুরু। তিনি আমাদের আমাদের পুরানা পল্টন লেনেই কয়েক বাড়ি পরেই থাকতেন। তাঁর কাঠের ঘরটিতে রিহার্সাল হতো। লুকিয়ে লুকিয়ে ছোটবেলায় তাঁদের ‘রক্তকরবী’, ‘ইডিপাস’সহ আরো অনেক নাটকের রিহার্সাল দেখেছি। ফিরে এনে তিনি জর্জ বার্নার্ড শ’র ‘আর্মস অ্যান্ড দ্য ম্যান’-এর মহড়া শুরু করলেন। আমারও ডাক পড়ল। তাঁর অফিস ছিল পল্টনে। সাইকেল চালিয়ে তিনবেলা বাসায় খেতে আসতেন, রাতে অফিসে থাকতেন। অফিসেই রিহার্সাল হতো। তিনি বলে দিয়েছিলেন, ‘মহড়া বিকেল ৫টা থেকে আরম্ভ হলেও কোনো কিছু আলোচনা বা জানার ইচ্ছা হলে আমার দরজা সব সময় খোলা। সকাল-রাত নেই, যখন ইচ্ছা চলে আসবে।’ ফলে সকাল ১০টা বাজার আগেই চলে যেতাম। তাঁকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে জেনে নিতাম, তিনিও আগ্রহী ছাত্র পেয়ে উজাড় করে দিতেন। মানুষটি থিয়েটারের ভাণ্ডার ছিলেন। অকল্পনীয় অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের ভাণ্ডার, পরিচালক হিসেবেও অসাধারণ। ‘আর্মস অ্যান্ড দ্য ম্যান’-এর প্রতিটি চরিত্র—কী নারী, কী পুরুষ—সবগুলোই আমার সঙ্গে আলোচনা করতেন। মঞ্চের দেহভঙ্গিমা, ডায়ালগ ডেলিভারি, দর্শকের সামনে অভিনয়, শারীরিক সক্ষমতা এমনকি ভুঁড়ি কমানোর উপায়—সবই আমাকে ধরে ধরে শিখিয়েছেন। টানা ছয়টি মাস সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত শিখেছি। বিকেল থেকে মহড়ায় গেছি। পাগলের মতো তিনি আমাকে অভিনয় শেখাতেন। কোনো দিনও তাঁকে ব্যবসার প্রতি সামান্য মনোযোগ দিতে দেখিনি। কাঠের ব্যবসা ছিল; কিন্তু খদ্দের এলেই বলতেন, ‘এখন নয়, পরে আসুন।’ যেটুকু আমি শিখতে পেরেছি সেটি সেই ছয় মাসেই। সেই বিদ্যা ভেঙেই বোধ হয় এত বছর চলছি। ‘আমর্স অ্যান্ড দ্য ম্যান’-এ আমার চরিত্র ‘সার্জিয়াস সারানফ।’

বিটিভিতে শুরু?

‘পশ্চিমের সিঁড়ি’র মহড়ার সময় বিটিভির মুস্তাফা মনোয়ার, কেরামত মওলা এবং শফিকুর রহমান টিভি নাটক করার জন্য জোর করে ধরে নিয়ে গেলেন। ফলে ১৯৭২ সালেই মঞ্চ, টেলিভিশনে শুরু হয়ে গেল। তখন নাটক আগে রেকর্ড করে পরে সম্প্রচার করা হতো। প্রতি রবিবার ‘সাপ্তাহিক নাটক’ হতো। তাতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় যেকোনো অভিনেতা-অভিনেত্রীর জন্যই খুব সৌভাগ্যের ছিল। প্রধান চরিত্র নয়, মাঝারি চরিত্রে আমার শুরু। আবদুল্লাহ আল মামুনের একটি নাটকে প্রধান চরিত্র বুলবুল আহমেদ, আমি দ্বিতীয় প্রধান; কাজী তামান্না, বজলুল করীমসহ আরো অনেকেও আছেন। বিটিভি তখন ডিআইটিতে, সপ্তাহে চার দিন মহড়া হয়। নিচতলায় ছোট্ট হার্ডবোর্ড ঘেরা ঘরে মামুন ভাই বসেন। তাঁর ঘরেই মহড়া দেই। চার দিনের দিন বিকেলে মহড়ায় গেছি। কিন্তু মহড়া হচ্ছে না। কারণ হলো বুলবুল ভাই আসছেন না। পরদিন সকাল ১০টা থেকে রেকর্ডিং!  মামুন ভাই অস্থির হয়ে একবার ঘরে আসেন, আরেকবার চলে যান। ছোটাছুটি করতে করতে একসময় চিত্রনাট্য হাতে ঘরে ফিরে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে বললেন, ‘আপনারা সবাই চলে যান। এই কদিন তো মহড়া হলো। আজ আর করব না। পার্টগুলো মুখস্থ করে, প্রস্তুতি নিয়ে আসবেন। কাল সকাল থেকে শুটিং শুরু করব।’ আমিও চলে যাব বলে উঠছি, তিনি মানা করলেন, ‘আপনি বসুন।’ তিনি তখন আমায় ‘আপনি’ বলতেন। বসলাম। তিনি চুপ করে বসেই আছেন। এরপর আমায় বসে থাকতে ইশারা করে উঠে চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে ফের চলে গেলেন। এতই অস্থির! ফিরে এসে হাতে চিত্রনাট্যটি দিয়ে বললেন, ‘বুলবুল সাহেবের একটু সমস্যা হয়েছে। তিনি অভিনয় করতে পারবেন না। আপনি তাঁর পার্ট করবেন। কাল সকালে তাঁর ডায়লগগুলো মুখস্থ করে চলে আসুন।’ ততক্ষণে সন্ধ্যা ৭টা-সাড়ে ৭টা বেজে গেছে। এক দিনের ভেতরে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করতে হবে, তাও আবার রবিবারের নাটকে? এবার আমার অস্থিরতা শুরু হলো। খুব করে বলার চেষ্টা করলাম, ‘মামুন ভাই, এ আমার পক্ষে সম্ভব নয়। যদি চার দিন মহড়া দিতে পারতাম, তাও কথা ছিল, প্রস্তুতি বলে কিছু থাকত, এক রাতে কিভাবে করব?’ তিনি ভরসা দিলেন, ‘তাঁর সমস্যা হয়ে গেছে, দুর্ঘটনা তো ঘটতেই পারে। ধরেই নিলাম নাটকটি হবে না, তাও চেষ্টা করে দেখি না। চিত্রনাট্য নিয়ে যান, চেষ্টা করুন। নাটক না হলে না হবে।’ আসলে তাঁরও কিছু করার ছিল না। অনেকবার অবস্থা বোঝানোর চেষ্টা করলাম, তিনি শুধু বলেন, ‘আপনি এখন চলে যান, কাল সকালে চলে আসুন।’ হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম। আমি তখন টিনের ছোট্ট এক ঘরে থাকি। ছোট্ট খাটে ঘুমাই। সরু টেবিল ছাড়া আর কিছু নেই। শুয়ে পড়লাম। কিন্তু অস্থিরতা কমে না। বিরক্ত হয়ে বাইরে বেরিয়ে গেলাম। অনেকক্ষণ ঘুরে রাত ১০টা কী সাড়ে ১০টায় ফিরে চিত্রনাট্য হাতে নিয়ে দেখি, এত বড় সংলাপ! এক রাতে কিভাবে মুখস্থ করব! কারো পক্ষে সম্ভব? তাও চেষ্টা করে দেখলাম। অবশেষে বিরক্ত হয়ে খেয়েদেয়ে দুইটার দিকে শুয়ে পড়লাম। সকাল ৯টায় চিত্রনাট্য বগলে নিয়ে এক কাপড়ে বেরিয়ে গেলাম। ডিআইটিতে গিয়ে প্রথম প্রশ্ন, ‘মামুন ভাই কই?’ ‘ভেতরে।’ আমাকে দেখেই কোনো কথা বলার পর্যন্ত সুযোগ না দিয়ে তিনি বললেন, ‘সবকিছু ঠিক আছে, কোনো সমস্যা নেই।’ যতবারই বলি, ‘মামুন ভাই শোনেন’; তিনি, ‘আরে, ঠিক আছে’ বলে থামিয়ে দেন। একসময় বেরিয়ে গেলেন। ফিরে এসে বললেন, ‘মেকআপ রুমে গিয়ে বসুন।’ ভয় পেয়ে গেলাম। যাওয়ার সময় চোখে পড়ল সেটসহ সব তৈরি। মেকআপ রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে প্রয়াত সালাম ভাইকে তিনি বললেন, ‘সালাম, ওনাকে একটু গোঁফ লাগিয়ে দাও তো।’ আমি হতবাক! মরিয়া হয়ে গেলাম, ‘মামুন ভাই, আমি চিত্রনাট্য ফেরত দিতে এসেছি। পোশাকও আনিনি।’ এবার তিনি আমার আর নিজের গায়ের শার্টের দিকে তাকিয়ে, আশপাশের লোকদের শার্ট, টি-শার্ট দেখে বললেন, ‘এত ভাবছেন কেন? প্রস্তুত হোন।’ এই বলে কোনো কথা না শুনে অর্ধেক দৃশ্যের শুটিং শুরু করলেন। সেটি শেষ হওয়ার পর বললেন, ‘তোমার শার্ট খোলো।’ নিজের শার্ট খুলে আমার হাতে দিয়ে বললেন, ‘এটা পরো।’ কোনোমতে চিত্রনাট্য মুখস্থ করে আরেকটি দৃশ্য করলাম। তখন তো স্মৃতিশক্তি খুব ভালো ছিল। আশপাশের লোকের গায়ের শার্ট, পাঞ্জাবি খুলিয়ে আমাকে পরিয়ে, চিত্রনাট্য মুখস্থ করিয়ে বিকেলের আগে তিনি নাটকের রেকর্ডিং শেষ করলেন। এই শুটিং মুস্তাফা মনোয়ারসহ আরো অনেকেই দেখেছেন। তাঁরাও অবাক। সেট থেকে বেরিয়ে, মেকআপ পরিষ্কার করেই মামুন ভাইকে খুঁজলাম। কিন্তু শফিক ভাইকে নিয়ে তিনি আগেই বেরিয়ে গেছেন। গুলিস্তানের ইসলামিয়া রেস্তোরাঁয় সারা দিনের ক্ষুধার্ত মামুন ভাইকে বসিয়ে তিনি খাওয়ালেন। অনেক বছর পরে শুনেছি, আবদুল্লাহ আল মামুন সেদিন বলেছেন, ‘এত দিন পর একটি ছেলে এসেছে, যে অনেক লম্বা রেসের ঘোড়া, অনেক দৌড় দৌড়াবে।’ তখন এত কাজ করেছি যে নাটকটির নাম মনে নেই।

সিনেমায় শুরু?

১৯৭৩ সালের দিকে শুধু কাজ নয়, ডিআইটিতে দুপুর, বিকেলে আড্ডা মারতেও যেতাম। তেমনই একদিন ডাক পেয়ে শুনলাম, আতা (খান আতাউর রহমান) ভাই এসেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবি তৈরি করবেন। নাম ‘আবার তোরা মানুষ হ।’ তিনি অনেক শিল্পী খুঁজছেন। বিটিভির পরিচিতরা আমার ও আল মনসুরের নাম প্রস্তাব করেছেন। ১৯৭৩ সালের শুরুর দিকে তাঁর বিজয়নগরের অফিসে গেলাম। তখনো অভিনয় কী, কেন, কোথায় করছি—এত বোধ মাথায় ঢোকেনি। পাগলের মতো কাজ করছি। কথা বলার পর ছবির সাত মুক্তিযোদ্ধার একজন হয়ে অভিনয় শুরু করলাম। আসলে তখন সময়টি অস্থির ছিল, আর আমার মধ্যেও ছবিতে অভিনয় কিভাবে হয়—জানার আগ্রহ ছিল। অভিনয়ের সময় আতা ভাইয়ের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অনেক আপত্তিকর বিষয় অনেক ঝামেলা, তর্কাতর্কি হয়েছে। তারপর ছবির স্বার্থে অভিনয় করেছি। ১৯৭৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর ছবিটি মুক্তি পেল এবং ফ্লপ হলো। 

 ‘ঘুড্ডি’র পেছনের গল্প মনে আছে?

বাহাত্তর থেকে জাকী ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয়। তারপর থেকে গাঢ় সখ্যতা। তিনি পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউট থেকে পরিচালনার ওপর পড়ালেখা করে ফিরে এসে একসঙ্গে দুটি ছবিতে হাত দিলেন। বিরতির আগে তাঁর ‘ঘুড্ডি’, বিরতির পরে ‘ঘূর্ণি’ দেখানো হবে। দুটোই সোয়া ঘণ্টা কী দেড় ঘণ্টার ছবি। ‘ঘূড্ডি’তে প্রধান চরিত্র আফজাল-সুবর্ণা, ঘূর্ণিতে আমি ও সুবর্ণা। ১৯৭৬ সালে ঢাকা থিয়েটার থেকে সেলিম আল দীনের ‘চর কাঁকড়ার ডকুমেন্টারি’ নামের একটি পথনাটক হয়েছিল। তিনি সেটির কাহিনি মানে ঢাকা শহরের একটি গল্প নিয়ে ‘ঘুড্ডি’ করবেন। আর কক্সবাজারের সমুদ্রপারের গল্প নিয়ে ‘ঘূর্ণি’ হবে। ‘ঘুড্ডি’তে আমি জাকী ভাইয়ের চার কী পাঁচ নম্বর সহকারী পরিচালক। প্রধান পরিচালক সুভাষ দত্তের ছোট ভাই বিকাশ দত্ত। তখন তাঁর অফিস ঢাকার ১ মালিবাগ, আলতাফ মাহমুদের গানের স্কুলের নিচে গ্যারেজে। ওপরতলায় তাঁর পরিবার থাকেন। সেখানেই ঢাকা থিয়েটারের রিহার্সাল হয়। ঘুড্ডির শুটিংয়ের সবকিছু প্রস্তুত। শুটিংয়ের আগের দিন ধানমণ্ডিতে এক বন্ধুর বাড়িতে আফজালের সঙ্গে তাঁর মিটিংও হলো। এরপর সন্ধ্যায় আফজাল চলে গেল। তিনি মালিবাগে ফিরে এলেন। দরজায় তালা দিয়ে আমাকে বললেন, ‘আসাদ, আমার সঙ্গে চলো।’ আমাকে রিকশায় তুললেন। বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউর পোস্ট অফিসের উল্টো দিকে গ্যানিস নামের একটি দোকানে কাপড় থেকে শুরু করে সব পাওয়া যেত। তিনি সেই বিরাট দোকানে ঢুকলেন। তখন বোধহয় রাতে কারফিউ শুরু হয়ে যেত। ফলে দোকান তাড়াতাড়ি বন্ধ হয়ে যেত। তখন ঢাকা থিয়েটারের ‘শকুন্তলা’ নাটকে বিশ্বমিত্রের চরিত্র করি বলে আমার মুখভর্তি দাড়ি। তিনি নিজে পছন্দ করে বেশ কিছু  শার্ট-জামা বের করে আমার মাপ দিয়ে তিন-চারটি সিনথেটিকের বর্ণিল শার্ট কিনে নিলেন। জিজ্ঞেস করার পর দায়সারা উত্তর দিয়ে আবার রিকশায় তুলে পল্টনে আমার নিয়মিত চুল কাটানোর সেলুনে নিয়ে গিয়ে বললেন, ‘তোমাকে দাড়িতে কেমন যেন জংলি লাগে।’ বললাম, ‘আরে ভাই, আমি তো সহকারী পরিচালক।’ তিনি উত্তর দিলেন, ‘তাও এত বড় দাড়িতে কেমন যেন লাগে।’ বললাম, ‘আমি কিন্তু শেভ করব না।’ নাপিতকে বললেন, ‘তাহলে সুন্দর করে ছেঁটে দাও।’ তিনি বসে থেকে দাড়ি কাটালেন। এরপর বললেন, ‘কাল সকাল-সকাল চলে আসবে। আমরা শুটিংয়ে যাব।’ তখন তো বেল-বটম প্যান্টের যুগ, কলকাতায় গেলে বুকে কাজ করা ফুল হাতার শর্ট পাঞ্জাবি কিনে আনতাম, মাঝেমধ্যে লকেটও পরতাম। সেসব পরে সকালে হাজির হলাম। আনোয়ার হোসেন এই ছবির প্রধান কামেরাম্যান ছিলেন। তাঁর সঙ্গে সমস্যা হওয়ায় তিনি শফিকুল ইসলাম স্বপনকে নির্বাচন করলেন। তখন সে পুনেতে দ্বিতীয় বর্ষে পড়ে, তাঁর বন্ধু পরিচালক গিরিশ কারনার্ডকে লিখলেন, ‘ওকে ছেড়ে দিন, আমার ছবিতে সে কাজ করবে।’ এটিই তাঁর প্রথম কাজ। সে আমার বাসার চার-পাঁচ বাড়ি পরে থাকত। সেও চলে এলো। সুবর্ণাও এলো। আমি বিকাশদার সঙ্গে বাসে উঠব, তিনি বাধা দিলেন, ‘কোথায় যাচ্ছ আসাদ? আমার সঙ্গে গাড়িতে এসো। দরকার আছে।’ পেছনে বসালেন। স্বপন গাড়ি চালাচ্ছে। জাকী ভাই সামনে বসা। সুবর্ণাও আছে। এরপর তিনি বলতে শুরু করলেন, ‘মনে করো, একটি ছেলে আর একটি মেয়ে।’ তাঁর গল্পে ঢুকে পড়া শুনেই হঠাৎ খেয়াল হলো, আফজাল কোথায়? আবার মনে হলো, সে হয়তো সরাসরি লোকেশনে চলে আসবে। এরপর তাঁর সঙ্গে আলাপ জমল। তিনি একটি কথা বলেন, আমি আরেকটা। নারায়ণগঞ্জে শীতলক্ষ্যার পারে চলে এলাম আমরা। নদীর ঘাটে তিনি গাড়ি থামালেন। বাস থেকে বিরাট লটবহর নামিয়ে নৌকায় তুললেন। নদী পেরিয়ে তিনি রিকশায় করে নিয়ে এলেন সোনাকান্দা দুর্গে। আমাকে ডেকে বললেন, ‘আসতে আসতে আমরা যে গল্প বলেছি, সেটিই এখানে দৃশ্যায়ন হবে। এই সিঁড়ি দিয়ে ছেলে-মেয়ে দুটি উঠে যাবে। মানে তুমি আর সুবর্ণা উঠে যাবে।’ তিনি দৃশ্যগুলো করে দেখালেনও। আমি তো অবাক! আমি তো এই ছবির শিল্পী নই। এ বলার পর তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে গেলেন, ‘এটি আমার জীবনের প্রথম ছবি, প্রথম দিনের শুটিং আমাকে করতেই হবে।’ আমি যতই বলি, ‘আমার তো কোনো প্রস্তুতি নেই, চিত্রনাট্যও পাইনি।’ তিনি ধমক দিয়ে বলেন, ‘কোনো কথা বলবে না। আমি যা বলছি করো। এসব নিয়ে পরে আলাপ করব। এই দৃশ্য দিয়ে আমি ক্যামেরা ওপেন করব। মনে করো চরিত্র দুটিই এমন।’ ফলে আমরা দুজনে হাঁটতে হাঁটতে ওপরে উঠে গেলাম। ক্যামেরা রেডি ছিল। প্রথম শট ওকে। এরপর তিনি নিজে একের পর এক দৃশ্য বুঝিয়ে দেন আর আমরা সেটি করি। দুপুরে ব্যাটারি ডাউন হয়ে গেল, ক্যামেরা চলে না। লোক পাঠিয়ে নারায়ণগঞ্জ থেকে গাড়ির ব্যাটারি ভাড়া করে নিয়ে আসা হলো। কোনো কিছু কেউ বুঝতে না পারলে তিনি সাদা কাগজে লিখে দেন। স্বপনকে ডেকে বলেন, ‘শটটি এভাবে নেবে।’ ৩৭ কী ৩৮টি শট নিয়ে নিয়ে বললেন, ‘আমার দৃশ্য নেওয়া শেষ হয়েছে।’ সন্ধ্যায় আমরা ফিরে এলাম। সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত এমন কোনো বিষয় আমার নেই, যেটি নিয়ে তাঁর সঙ্গে আলাপ হয়নি, বছরের পর বছরের এই সম্পর্কের পরেও আজও বের করতে পারিনি কেন আফজাল ছিল না? তিনি চিত্রনাট্য ছাড়া উপস্থিত গল্প তৈরি করে ‘ঘুড্ডি’ করেছিলেন। ‘ঘূর্ণি’ কখনো হয়নি।  

 ‘পদ্মা নদীর মাঝি’তে জড়ালেন কিভাবে?

জাকী ভাই হঠাৎ একদিন ফোন দিলেন, ‘কী হলো মিয়া, তুমি তো অক্ষম’। তিনি আমাকে ‘আসাদ আলী অক্ষম’ ডাকেন, ‘তুমি অক্ষম মিয়া, সবাই এসে ফাটিয়ে ফেলছে, লোকজন অভিনয়ের জন্য পাগল হয়ে ঘুরছে, তোমাকে দেখি না কেন?’ আমি অবাক, ‘কী হয়েছে?’ “গৌতম ঘোষ ঢাকায় এসেছে। তাঁর প্রডাকশন থেকে ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ করবে, তোমাকে দেখি না কেন?” বললাম, ‘কেন দেখেন না, তার উত্তর তো আমার চেয়ে আপনি ভালো দিতে পারবেন। আমি নিজেকে যতটা না চিনি, তার চেয়ে আপনি ভালো চেনেন। কোনো দিন কারো কাছে গিয়ে কিছু চাইতে দেখেছেন?’ ‘এসব বললে হবে না।’ “গৌতম আপনার বন্ধু, একসঙ্গে দেশ-বিদেশে অনেক ঘুরেছেন, তাঁর ‘পাড়’ ছবিটি কলকাতার মেট্রোতে দেখেছি, আরো কিছু কাজ দেখেছি। আমার এতটুকু উপকার করেন—তাঁকে বলেন আমাকে সুযোগ দিতে। আমি তাঁর অ্যাসিস্ট্যান্ট হতে চাই, ১০ নম্বর হলেও আপত্তি নেই। তিনি যে ধরনের কাজ করেন, সেগুলো কিভাবে করেন দেখতে চাই। আর যদি তাও না পারেন, আপনি তো তাঁর বন্ধু, দর্শক হিসেবে যত দিন কাজ হবে আমি থাকতে চাই। থাকা-খাওয়ার কোনো ব্যবস্থা প্রযোজক না করলেও আমি করে নেব। কিন্তু অনুমতির ব্যবস্থা করে দিন।” তখন তিনি খেপে গেলেন, ‘কী বলছিস তুই?’ একটু পর সামলে নিলেন, ‘তোমাকে যা বলছি করো।’ বাধ্য হয়ে বলতে হলো, ‘ভাই, আমি একজন অভিনেতা, এখানে যদি কোনো অভিনয়ের সুযোগ থাকে—এটি আমি জীবনেও বলিনি, বলতে পারব না। আমি সেই মানুষ নই। তাঁর মতো নির্মাতা কিভাবে ছবি তৈরি করেন সেটি আমি দেখতে চাই—এই ব্যবস্থা করতে পারেন কি না দেখেন।’ তিনি খেপে টেলিফোন রেখে দিলেন। আরেক দিন ফোন করে বললেন, ‘তোমার অভিনয়ের কিছু কি তোমার কাছে আছে?’ এক ভক্তের কাছ থেকে ভিডিও ক্যাসেট জোগাড় করে তাঁর কাছে পাঠালাম। তখন তিনি এফডিসির ডিরেক্টর প্রডাকশন। পরদিন দুপুরে তিনি ডাকলেন। গিয়ে দেখি, জেনারেল ল্যাবের নিচে প্রজেকশনে তাঁরা তাঁর স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘বরফ’ দেখছেন। গৌতম, প্রযোজক হাবিবুর রহমান খান, আফজাল হোসেন, চম্পাসহ আরো অনেকে আছেন। পেছনে বসে পড়লাম। তাঁরা অন্যদিকে বসে আছেন। জাকী ভাই আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আসাদ, দেখেছ?’ শটগুলো নিয়ে আলাপ শুরু করলাম। জাকী ভাই কথা বলতে গেলে বললাম, ‘আহা জাকী ভাই, ঘরভর্তি লোক ছবি দেখছে। দেখতে দিন, কথা বলেন কেন?’ সিনেমা দেখা শেষে আমি সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে আছি। তাঁরা দুজনে পেছনে দূরে চলে গেলেন। হাত নেড়ে কথা বলছেন। দূর থেকে শুনছি—গৌতম বলছেন, ‘কই, মোটা না তো?’ ‘সময়-অসময়’-এর মধু পাগলা করতে গিয়ে মোটা হতে হয়েছিল। কারণ সেই পাগল অনেক খায়। তাঁরা ফিরে আসার পর জাকী ভাই বললেন, ‘কাল সারা দিন ফ্রি থাকবে।’ গৌতমও বললেন, ‘হ্যাঁ, আপনি কাল একটু সময় দেবেন।’ সেদিন রাত ৭টা-সাড়ে ৭টার দিকে জাকী ভাই ফোন দিলেন, ‘গৌতম ঢাকা ক্লাব থেকে এসে গুলশানের রেস্টহাউসে আছে। অনেকে দেখা করতে এসেছে।’ কিন্তু সে কিছুক্ষণ পর বলেছে, ‘আমাকে একটু একলা থাকতে দিন।’ কারো সঙ্গে দেখা করছে না। বাইরে বসে আছি। মাঝেমধ্যে গিয়ে দেখি সে শুধু পায়চারি করছে। পরে তোমাকে ফোন দেব।’ এই বলে তিনি লাইন কেটে দিলেন। রাত ১০টা কি ১১টার দিকে ফোন করে বললেন, ‘সে কারো সঙ্গে কথা বলছে না। হাবিবের বাসা তো এখানেই, সে তোমাকে শেষ ফোন করে খবর জানাবে, কাল কখন কোথায় আসতে হবে।’ রাত ১টার দিকে হাবিব খান ফোন দিয়ে বললেন, ‘কাল ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে পল্টনের নাইট অ্যাঙ্গেলের পরে নর্থ সাউথ রোডের সামনে থাকবেন।’ ভোরে গোসল সেরে তৈরি হয়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। তাঁদের গাড়ি আসে না তো আসে না। অসম্ভব রাগ ছিল সেই বয়সে, বিরক্ত হয়ে গেলাম। ফিরে যাচ্ছি, আকাশ ফরসা হতে শুরু করেছে। হঠাৎ সজোরে তাঁদের গাড়ি ব্রেক কষল। আমি তো রেগে চিৎকার শুরু করে দিলাম, ‘সোয়া ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে আছি।’ তাঁরা আমাকে প্রায় জোর করে গাড়িতে তুললেন। দুই গাড়িভর্তি লোক লোকেশন দেখতে যাবে। ধলেশ্বরী নদীর সামনে গাড়ি থামল। আমি এগিয়ে গেলাম। তখন গৌতম বললেন, ‘কাল রাতে আমার ঘুমাতে অনেক দেরি হয়ে গেছে। সরি।’ পরে ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ নিয়ে আলাপ শুরু হলো। ‘হোসেন মিয়া চরিত্রটিকে কিভাবে দেখেন?’ “হোসেন মিয়া ছাড়া ‘পদ্মা নদীর মাঝি’র কোনো মূল্য নেই, তিনিই কেন্দ্রীয় চরিত্র। তাঁকে বাদ দিয়ে এটি সাদামাটা উপন্যাস। তাঁর কারণেই এটি এই অবস্থায় পৌঁছেছে।” তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমিও এই অ্যাঙ্গেল থেকেই দেখছি।’ আলাপ করতে করতে আমরা মাওয়া ঘাটে চলে গেলাম। পুল থেকে নামার পর বিরাট ট্রলারে মালপত্র তোলা হলো। সবাই সামনের দিকে গিয়ে বসেছেন। হাবিব খান মাঝে বসা। তাঁর প্রযোজনায় জহিরুল হকের ‘প্রাণ সজনী’তে অভিনয় করেছি। আগেই পরিচয় ছিল। একবার-দুবার সামান্য আলাপ হয়েছে। তিনি ইশারা করলেন, গেলাম। ‘আপনাকে এই ছবিতে অভিনয় করতে হবে।’ বললাম, ‘এখানে তো অনেক চরিত্র, কোনো এক চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পেলে, তাঁর সঙ্গে কাজ করতে পারলে ভালো লাগবে। চরিত্র নিয়ে তো আমার কোনো ঝামেলা নেই, যেকোনো চরিত্রই করব।’ তিনি বললেন, ‘আপনি বুঝতে পারছেন না, এই ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র আপনাকে করতে হবে।’ ‘কেন্দ্রীয় চরিত্র মানে?’ ‘আপনাকে কুবের করতে হবে।’ আমি তাকিয়ে আছি, স্বপ্নেও ভাবিনি আমাকে এই চরিত্রটি অফার করবেন। মনে হচ্ছিল, পানিতে পড়ে যাব। বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো কথাই বলিনি। রাত ১টার দিকে গৌতম হাবিব খানকে বলেছিলেন, ‘কলকাতায় লাইন দিন।’ সেখানে তাঁর সহকারীদের বললেন, ‘শোনো, কাল যে নামটি আনন্দবাজারে যাওয়ার কথা, সেটি বন্ধ করো। আমি কুবের পেয়ে গেছি। সেই নামের বদলে এই নামটি দেবে।’ ঘটনাটি আমি অনেক পরে শুনেছি।  

 

শ্রুতলিখন : নূর মোহাম্মদ হৃদয়
(১৫ ডিসেম্বর ২০১৭, পুরানা পল্টন লেন, ঢাকা)



মন্তব্য