kalerkantho


বিশ্বব্যাংক যমুনা সেতুও তৈরি হতে দিতে চায়নি

সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়লেও সত্তরের ঘূর্ণিঝড় বদলে দিল তাঁকে। এরপর নদীবিজ্ঞানে পিএইচডি। বুয়েটে দীর্ঘকাল অধ্যাপনা শেষে আইইউসিএনে কান্ট্রি ডিরেক্টর। এ দেশের জলবায়ু, নদী ও প্রকৃতি সংরক্ষণে অনবদ্য অবদান রাখা, গঙ্গা চুক্তির অন্যতম নেপথ্য কুশীলব ড. আইনুন নিশাতের মুখোমুখি হয়েছেন ওমর শাহেদ। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

১৯ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



বিশ্বব্যাংক যমুনা সেতুও তৈরি হতে দিতে চায়নি

পরিবেশ নিয়ে কাজের প্রেরণা এলো কোত্থেকে?

১৯৬৯ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে (পুরকৌশল) পাস করে বেসরকারি ফার্মে চাকরি নিয়েছিলাম। পেশাগত জীবন অবকাঠামোগত প্রকৌশলী বা স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে শুরু হয়েছিল। তখন ভবন নির্মাণে মূল আগ্রহ ছিল। মাস ছয়েক পর প্রকৌশলী হিসেবে পানি উন্নয়ন বোর্ডে যোগ দিলাম। সত্তরের সাইক্লোনের পর অফিস থেকে নোয়াখালীর ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের দায়িত্ব দেওয়া হলো। ঘূর্ণিঝড়ের সাত দিন পর রামগতিতে গিয়ে দেখি, পানিতে মানুষের মরদেহ ভেসে বেড়াচ্ছে। দুর্যোগের এই ভয়ংকর রূপই পরবর্তী জীবনে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়ে কাজ করতে অনুপ্রাণিত করেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডে ডিজাইনার হিসেবে কাজ করে শিখেছি—এ দেশের কৃষি খাত রক্ষা করতে, মানুষের খাদ্যের নিরাপত্তা দিতে পানির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই। দুই বছর কাজের অভিজ্ঞতার সঞ্চয় নিয়ে ১৯৭২ সালে বুয়েটে শিক্ষকতায় যোগ দিয়ে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী হলাম। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ভূমি ব্যবস্থাপনা—মানে যে জমিতে ধান চাষ হয়, সেখানেই তো মাছের আবাদ হয়, মাছের সঙ্গে ধানের সম্পর্ক; নদী, নৌচলাচল ইত্যাদিতে আগ্রহ জাগল। মাঝে সরকারি বৃত্তি নিয়ে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোর ইউনিভার্সিটি অব স্টার্থক্লাইডে পিএইচডি করলাম।

কোন বিষয়ে?

অফিশিয়ালি পুরকৌশলের হাইড্রোলিকস, তবে ফোকাস ছিল নদীবিজ্ঞান। আমার আগে নদীবিজ্ঞানে অনেকে পড়ালেখা করলেও তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলি, তাঁরা তাঁদের জ্ঞানকে বাংলাদেশের বাস্তবতায় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেননি। তাঁরা যে বিদেশি তত্ত্ব শিখে এসেছেন, সেগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছেন; কিন্তু আমি সেটি করিনি। সারা জীবন এ দেশের নদী, সেগুলোর কাঠামো, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও নদীসংশ্লিষ্ট জীবনকে ভালোবেসে কাজ করেছি। যদি কেউ প্রশ্ন করেন, এ দেশে কতগুলো নদী আছে? পাল্টা জিজ্ঞেস করব, ভাই, আপনার কাছে নদীর সংজ্ঞা কী? কারণ আমি তো মনে করি, পার্বত্য চট্টগ্রামেই কয়েক হাজার নদী আছে। সুন্দরবনের বুকে আছে হাজারখানেক। আমাদের পদ্মা, মেঘনা, যমুনার মতো অতি বৃহত্ নদী আছে, এগুলো তো নদীর কোনো নিয়মে পড়ে না। এরা একক ও অনন্য। বড় নদী আছে তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার, করতোয়া। সুরমা, কুশিয়ারাও যথেষ্ট বড়। ব্রিটেনের টেমসের চেয়েও তো সুরমা বড়। আমাদের ভৌগোলিক অবস্থা, নদীগুলোর চরিত্রও এমন যে টেমসের বিদ্যা দিয়ে পদ্মা, সুরমা বা অন্যান্য নদীকে বোঝা সম্ভব নয়। ছোট্ট উদাহরণ দিই, বাহাদুরাবাদ ঘাটে যমুনা ১২ থেকে ১৪ কিলোমিটার চওড়া। গঙ্গা বা পদ্মার প্রশস্ততা রাজশাহী শহরের কাছে পাঁচ-ছয় কিলোমিটার। এ দুটি নদী আরিচার কাছে মিলেছে। তখন তার পানিপ্রবাহ ছয় কিলোমিটার। দুই নদীর ১৮ কিলোমিটার চওড়া পানির প্রবাহ মাওয়ায় যখন এলো, সেখানেই আমরা পদ্মা সেতু তৈরি করছি। সেখানে পানি মাত্র তিন কিলোমিটার জায়গাজুড়ে প্রবাহিত হয়। ফলে একে তো অঙ্কে হিসাব করলে হবে না। বাংলাদেশের নদীগুলোর বিজ্ঞান আলাদা, এটি বুঝতে হবে। এ কারণেই সারা জীবন এই দেশের প্রতিটি নদীকে আমি যথাযোগ্য সম্মানের সঙ্গে বোঝার চেষ্টা করেছি। বেশির ভাগ সময়ই বাইরের আলোচনায় বলি না যে বাংলা সাহিত্য নিয়েও ব্যক্তিগতভাবে লেখাপড়া করি। এটিও এই নদীগুলোর বিজ্ঞান বোঝার জন্য আমার কাছে খুব সহায়ক। উদাহরণ দিই, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬ পৃষ্ঠা দীর্ঘ ‘নদী’ কবিতা পড়লেই এ দেশের নদীগুলোর পাহাড় থেকে উত্পত্তি, সাগরে বিলীন হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি স্তরের চমত্কার বর্ণনা পাওয়া যায়। রবিঠাকুরের কবিতা ‘আমাদের ছোটো নদী’ একেবারে ছোট কবিতা। তবে দুঃখের বিষয়, এ কবিতাটিও আমরা পুরোপুরি পড়ি না। এখানে শীতের নদী আর বর্ষার পানির পার্থক্য বোঝানো হয়েছে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, অদ্বৈত মল্লবর্মণ তো নদীগাথা নিয়ে অমর উপন্যাস লিখেছেন। এমনকি আমাদের হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসে হাওরের চমত্কার বিবরণ পাওয়া যায়।

বুয়েটে শিক্ষকতাজীবন?

১৯৭২ থেকে টানা ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত পুরকৌশল অনুষদে শিক্ষকতা করেছি। এটি রাজনীতিবিবর্জিত, সিরিয়াস পড়ালেখার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশের সবচেয়ে মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের একটি বড় অংশ এখানে পড়ার সুযোগ পায়। অধ্যাপনা করতে গিয়ে লক্ষ করেছি, বহু ছাত্র-ছাত্রীই মানসিক চাপে ভোগে। স্কুলে প্রথম, কলেজেও খুব ভালো ফল; কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে তার পাশে যে ছাত্র বা ছাত্রীটি বসে আছে, তারাও তো সমান মেধাবী। কাজেই মেধার লড়াইয়ে টিকতে গিয়ে বা প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে বহু মেধাবীরই সৃজনশীলতা নষ্ট হয়। এ কারণেই বহু প্রকৌশলী খুব মেধাবী হলেও সৃজনশীল হন না। তাঁরা বাঁধা নিয়মের মধ্যেই জীবন পরিচালিত করছেন। তাঁদের এই সীমিত, গণ্ডিবদ্ধ জীবনের জন্য বুয়েটকেই দায়ী করব। কারণ বাংলাদেশের অন্যতম সেরা এই প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলামের মধ্যে সুকুমার বৃত্তি চিন্তার তেমন সুযোগ নেই। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র হিসেবে সমাজবিজ্ঞান, নৃবিজ্ঞান, অর্থনীতি আমাকে পড়তে হয়েছে সত্য; কিন্তু বুয়েটে দীর্ঘদিনের অধ্যাপনার অভিজ্ঞতা থেকে মনে করি, এখানে আরো সৃজনশীল বিষয় পড়ানো প্রয়োজন। ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষা দিতে গিয়ে এই অভিজ্ঞতা হয়েছে। বহু অধ্যাপককে মোটামুটিভাবে পাঠ্যপুস্তকনির্ভর পাঠদান করতে দেখেছি। আমাদের প্রকৌশলীদের পাঠ্যপুস্তকগুলো মূলত আমেরিকায় প্রণীত। ফলে অধ্যাপকরা যখন শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করছেন, তাঁরা আমেরিকার নদীর কথাই পড়াচ্ছেন। কিন্তু আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, বিদেশের পাঠ্যপুস্তকনির্ভর হব না। আমার যেকোনো প্রাক্তন ছাত্রকে জিজ্ঞেস করলেই তারা বলবে, স্যার কখনো বাংলাদেশের বাইরে উদাহরণ দেননি। কষ্ট করে বাংলাদেশের নদীগুলোর তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছি, এ দেশের ভূতাত্ত্বিক তথ্য-উপাত্ত জোগাড় করেছি। বাংলাদেশের কৃষিব্যবস্থার সম্যক ধারণা অর্জন করে যে থিওরিগুলো পড়িয়েছি, সেগুলোর বাংলাদেশে প্রয়োগ কেমন হবে, সেসবই ছেলে-মেয়েদের শিখিয়েছি। তাতে তারাও বাংলাদেশের কর্মপরিবেশের উপযোগী হওয়ার শিক্ষা লাভ করেছে, আমি নিজেও লাভবান হয়েছি। বাংলাদেশের যেকোনো অঞ্চলের যেকোনো প্রাকৃতিক সমস্যা সম্পর্কে আমি পুরোপুরি ওয়াকিফহাল—আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলতে পারি।

বুয়েটে অবদান?

১৯৭৫ সালে পানিসম্পদ কৌশল বিভাগ পুরকৌশল বিভাগ থেকে আলাদা হয়। পুরকৌশল থেকে পানিসম্পদ কৌশলে আমাকে ঠেলে দেওয়া হলো। আজও মনে করি, বিভাজনটি সঠিক হয়নি। পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থীদের জন্য পানিসম্পদ কৌশল ঠিক আছে। কিন্তু আন্ডারগ্র্যাজুয়েট পর্যায়ে বিভাগটিতে আলাদা ডিগ্রি দেওয়া ঠিক হয়নি। তখন প্রভাষক ছিলাম। তখনকার কয়েকজন অধ্যাপকের অন্তর্দ্বন্দ্বে এটি ঘটেছে। এখনো পানিসম্পদ কৌশল আছে। স্নাতকোত্তর পর্যায়ে প্রকৌশল বিভাগের নানা বিষয় যেমন—অবকাঠামোগত, জিওটেনিক্যাল, পরিবহন, পরিবেশগত, ওয়াটার রিসোর্সেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগগুলোতে আলাদাভাবে প্রগ্রাম পৃথিবীর সব দেশের মতো আমাদেরও আছে। কিন্তু পুরকৌশলের এ ভাগগুলোতে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ডিগ্রি থাকা উচিত নয়, পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশন থাকুক। আন্ডারগ্র্যাজুয়েট লেভেলে মূল পঠন-পাঠন একসঙ্গে হওয়া উচিত। পুরকৌশলের ছাত্র-ছাত্রীদের দীর্ঘদিন ‘হাইড্রোলজি’ পড়িয়েছি। পরবর্তী সময়ে সেচবিজ্ঞান, নদী ব্যবস্থাপনাও পড়ানো শুরু করেছিলাম। নিজেই ‘ওয়াটার রিসোর্সেস প্ল্যানিং’ কোর্স তৈরি করে পড়িয়েছি। অর্থাত্ পানিসম্পদ পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে অর্থনৈতিক, সামাজিক, পরিবেশগত, প্রাতিষ্ঠানিক, নৃ-বৈজ্ঞানিক ইত্যাদি যে বিষয় বিবেচনা করতে হয়, সেগুলো একত্র করার দিকনির্দেশনা দিয়েছি। বুয়েটের আইডাব্লিউএফএম (ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার অ্যান্ড ফ্লাড ম্যানেজমেন্ট) নামের গবেষণাপ্রতিষ্ঠানটি এ বিষয়গুলো খুব জোর দিয়ে পড়াচ্ছে। আমি এর প্রথম পরিচালক। তিন বছর পরিচালক হিসেবে এখানে নানা ধরনের নীতিমালা তৈরি করেছি। পরে আবার বিভাগে ফেরত গেলাম। পড়ানোর বাইরে তখন সরকারকে যেসব বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছি, সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—বাংলাদেশের সাইক্লোন শেল্টারের মাস্টারপ্ল্যান তৈরি। উপকূলজুড়ে সাইক্লোন শেল্টার বা ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রগুলো কিভাবে তৈরি হবে, সে সমীক্ষা ও গবেষকদলের দলনেতা ছিলেন অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী, আমি ছিলাম পরিকল্পনাকারী দলের প্রধান।

ঘূর্ণিঝড়ের আগে-পরে মানুষকে আশ্রয় দিতে পরিকল্পনা কী ছিল?

তখনকার সময়ে আলাদা ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করা হতো। সেটি ঠিক নয় জানিয়ে আমরা পরামর্শ দিলাম, উপকূলজুড়ে প্রতিটি অবকাঠামোই হবে দুর্যোগকালীন আশ্রয়কেন্দ্র। অন্য সময় সেগুলোর স্বাভাবিক ব্যবহার হবে। দুর্যোগের সময় সেগুলো আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হবে। মূল পরামর্শটি দিয়েছিলাম—প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোই মূল আশ্রয়কেন্দ্র হবে। নিজে পুরো উপকূল ঘুরেছি। ভোলা, চরফ্যাশনও গিয়েছি। সেভাবেই এখন স্কুলগুলো বন্যা, ঝড়, জলোচ্ছ্বাসের সময় মূল আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আরো বলেছিলাম, প্রতিটি আশ্রয়কেন্দ্রে চলাফেরার জন্য রাস্তা থাকতে হবে। তখন সরকার আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের জন্য এলাকাবাসীর কাছ থেকে জমি অনুদান নিত। স্বাভাবিকভাবেই মানুষ সবচেয়ে খারাপ ও দূরের জমিটি দান করত। কিন্তু আমরা বললাম, যেখানেই জমি দেওয়া হোক, দুর্যোগের সময় মানুষ যেন আসতে পারে, সে জন্য রাস্তা লাগবে। দুর্যোগকালীন ব্যবস্থাপনার জন্য শেল্টার ম্যানেজমেন্ট কমিটি করে দিলাম। একটি গ্রামের জনসংখ্যা বিচার করে, সেই গ্রামের কোন স্থানে আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি হলে সবচেয়ে ভালো হয়, বিপদের সময় মানুষ সবচেয়ে তাড়াতাড়ি আসতে পারে, সেখানে আশ্রয়কেন্দ্র তৈরির প্রস্তাব করলাম। নৌবন্দরগুলোর জন্য বিশেষ আশ্রয়কেন্দ্র করার পরামর্শ দিয়েছি, যাতে সতর্কতা সংকেত দেওয়া মাত্র সব নৌযান নির্দিষ্ট স্থানে আসতে পারে, এতে মানুষ আশ্রয় নিতে পারে। পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রবণতা বিচার করে আমরা বন্যা প্রতিরোধক বাঁধগুলোর বাইরের দিকে চিরহরিত্ বৃক্ষ রোপণের প্রস্তাব করেছি। তাতে মাটির বাঁধগুলো টিকে থাকবে। তবে উপকূলীয় বাঁধগুলো উপচে পানি প্রবেশ করলে আশ্রয়কেন্দ্রের বিকল্প নেই।

বন্যা ব্যবস্থাপনায় পরামর্শ?

১৯৮৭-৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যার পর করণীয় হিসেবে এ মহাপরিকল্পনা শুরু হয়েছিল। পরিকল্পনাকারীদলের পাঁচজনের আন্তর্জাতিক প্যানেলে তিন বিদেশি ও দুই বাংলাদেশির আমি একজন। এখনো এ দেশের পানি পরিকল্পনায় সে মহাপরিকল্পনার রিপোর্টগুলো খুব কাজে আসছে। যেমন টঙ্গী ব্রিজ থেকে আশুলিয়া হয়ে মিরপুরের কল্যাণপুরে যে বাঁধ আছে, সেটি আমাদের আট নম্বর প্রস্তাবনা। আমাদের মহাপরিকল্পনার ভিত্তিতেই ঢাকা শহর রক্ষা বাঁধ তৈরি হয়েছে। পুরো ঢাকার পরিকল্পনার সঙ্গে শহরের ছয়টি নদী ঘিরে বন্যা ব্যবস্থাপনা যুক্ত করেছি। তখন জোরের সঙ্গে বলেছিলাম, সব পরিকল্পনায় স্থানীয় জনসাধারণকে সম্পৃক্ত করে করতে হবে। সরকার ধীরে ধীরে প্রস্তাবগুলো গ্রহণ করছে। বলেছিলাম, পূর্বাভাসব্যবস্থা উন্নত করতে হবে। আমাদের বন্যা পূর্বাভাসব্যবস্থা এখন খুব উন্নত। উপকূলীয় বেড়িবাঁধগুলো উন্নত করার কথা বলেছিলাম। নব্বইয়ের দশকে কিছু উন্নতি হয়েছে, এখনো হচ্ছে। ১৯৮৮-৮৯ সালের আগে নদীভাঙন ঠেকাতে কাজ করতে সরকার আগ্রহী ছিল না। এই কার্যক্রমকে সরকারি কর্মকাণ্ড হিসেবে নেওয়ার কথা বলেছিলাম। কারণ নদীভাঙন ঠেকাতে না পারলে তো নদী ব্যবস্থাপনা করা যাবে না। এখন সরকারই নদীভাঙন প্রতিরোধ কার্যক্রম পরিচালনা করে।

যৌথ নদী কমিশনে কিভাবে যোগ দিলেন?

১৯৮২ সালে সরকারি কর্মকর্তাদের বাইরে থেকে একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশনের সদস্য হিসেবে যোগ দিলাম। টানা ১৮ বছর বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেছি। তবে সরকার থেকে কোনো সম্মানী গ্রহণ করিনি। কারণ তাতে দায়বদ্ধতা তৈরি হবে, আমলাদের সুরে সুর মিলিয়ে কথা বলতে হবে। তাতে আমি মোটেও রাজি নই। যা সঠিক মনে করি, সেটিই সচিব, মন্ত্রীদের বলব। আমার যুক্তি-বিশ্লেষণের পর তাঁরা যে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেবেন, সেটি মেনে নেব। কারিগরি বিষয়ে তো কারিগরির বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেবেন। তবে সিদ্ধান্ত হবে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে। অনেকেই এ কথাটি বুঝতে চান না। কারিগরি বিশ্লেষণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হয় না। ভারত-বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ৫৪টি নদী বয়ে গেছে। এই নদীগুলোর পানিপ্রবাহের ন্যায্য হিসসা নিয়ে আলোচনার জন্যই যৌথ নদী কমিশন আছে। যখন প্রথম যুক্ত হই, পরিবেশগত কোনো ধারণাই আমাদের ছিল না। পদ্মার পানির দাবির মূল ভিত্তি ছিল সেচের জন্য চাহিদা। তখন আমরা বলতাম, জি কে ব্যারাজের জন্য পানি পাচ্ছি না। কিন্তু আমি বলা শুরু করলাম, পরিবেশের জন্যই মূলত পানি চাই। গঙ্গার পানি প্রত্যাহার ১৯৭৫ সাল থেকে শুরু হয়। ১৯৭৬ সালে পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হয়েছে। প্রত্যাহারের ফলে পানির লবণাক্ততা বাড়ায় সুন্দরবনের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়েছে। আমার এই বক্তব্য প্রথম দিকে কেউ গ্রহণ করেননি। কৃষিবিদরাই সবচেয়ে আপত্তি করতেন। কারণ তখন তাঁদের ও প্রকৌশলীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল। কৃষিবিদরা মনে করতেন, জি কে ব্যারাজের মতো এত বড় সেচ প্রকল্পের প্রয়োজন নেই। প্রকৃতিনির্ভর সেচব্যবস্থাই আমরা গড়ে তুলতে পারি। পরে আমার কথাই ঠিক হলো। বাংলাদেশ এখন যৌথ নদী কমিশনে যে মূল দলিলগুলো নিয়ে গিয়ে ভারতের সঙ্গে আলোচনা করে, সেগুলো ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৮ সালের মধ্যে আমার তত্ত্বাবধানে সবাই মিলে তৈরি করেছি। ১৯৮২ সালের দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা চুক্তিতে তেমন ভূমিকা ছিল না; কিন্তু ১৯৮৫ সালের দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা চুক্তিতে আমার ভূমিকা ছিল। কারিগরি দিকগুলো নিয়েই মূলত কথা বলার সুযোগ হতো। সে সময়ের পানিমন্ত্রীরা, বিশেষত এ জেড এম ওবায়দুল্লাহ খান ও আনিসুল ইসলাম মাহমুদের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করব। তাঁরা অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। দুজনকেই কারিগরি যুক্তি, কারিগরি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কিভাবে কথা বলবে, সেসব সহায়তা করতে পেরেছি।

গঙ্গা চুক্তিতে আপনার অসাধারণ ভূমিকা আছে।

এই ধারাবাহিকতায়ই ১৯৯৬ সালের গঙ্গা চুক্তির ক্ষেত্রে মূল কারিগরি বিষয়টি দেখেছি। মনে রাখা প্রয়োজন, চুক্তি শুধু কারিগরি যুক্তিতর্কে হয় না, তাতে রাজনৈতিক যুক্তিতর্কও থাকে। যৌথ নদী কমিশনে পানি নিয়ে আলোচনা হয়, কিন্তু সেটি যখন প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ে উন্নীত হয়, তখন দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট অনেক কিছু থাকে। কারিগরি বিশেষজ্ঞ হিসেবে যতটুকু ভূমিকা রাখা সম্ভব ছিল, পুরোটাই আমি দিতে পেরেছি। আমার বক্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর পদক্ষেপ নিলেন, ভারতের সঙ্গে যেসব বিরোধ আছে, সেগুলোর সমাধান করবেন। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গঙ্গা চুক্তি হাতে নেওয়া হলো। কারণ নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের যেকোনো দুর্যোগ হলে ফারাক্কা বাঁধকে দোষারোপ করা হতো। সিলেটে বন্যা হচ্ছে, ফারাক্কার দোষ! তিনি রোমে ভারতের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী এইচ ডি দেব গৌড়ার সঙ্গে মিটিং করলেন। তাঁরা আউটলাইন করলেন। দুই প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক আউটলাইনটি নিয়ে আমরা কাজ শুরু করলাম। ১৯৯৬ সালের আগস্ট থেকে ডিসেম্বরে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে ছয়-সাতবার দিল্লি গেছি। কারিগরি নীতিমালায় ৫০-৫০ ভাগ হিসাবে গঙ্গার পানির ভাগ করা হবে, সেটির ভিত্তি স্থাপিত হলো। বাংলাদেশ যাতে ন্যূনতম হিসসায় পানি পায়, সে ছক তৈরি করলাম। সবচেয়ে আত্মতৃপ্তির ব্যাপার, আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি কথা বলে আমি তাঁকে বোঝাতে পেরেছি—কী কী পদক্ষেপ নিলে বাংলাদেশের স্বার্থ সবচেয়ে বেশি অর্জিত হবে। তিনি খুব মনোযোগ দিয়ে আমার বক্তব্য শুনেছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যখন কথা বলেছেন, সেখানেও উপস্থিত ছিলাম। যেভাবে আমি তাঁকে যুক্তিতর্কগুলো উপস্থাপন করে দিয়েছিলাম, তিনি সেটিই অনুসরণ করেছেন। তবে দুঃখের সঙ্গে এই কথাটিই বলি, যৌথ নদী কমিশনের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, আমাদের আলোচনা কমিটিতে যে সরকারি আমলারা থাকেন, তাঁদের বেশির ভাগই সমস্যার গভীরে যান না, সাধারণ, দায়সারা কথা বলেন, কারিগরি বিষয়গুলো বিস্তারিত বলার জন্য যে ধরনের যোগ্যতাসম্পন্ন বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন, যৌথ নদী কমিশনে তাঁদের নেওয়া হয় না। কমিশনে কাজের সময় লক্ষ করেছি, যাঁদের দায়িত্ব কারিগরি ধারা নিয়ন্ত্রণ করা, তাঁরা বহুলাংশে রাজনৈতিক ধারায় কথা বলেন, রাজনৈতিক ধারার লোকেরা কারিগরি বিষয়গুলো না বুঝে সেসব বিষয়ে বলতে চেষ্টা করেন। আমাদের দেশের কিছু দুর্বলতা আছে। ভারত সেই দুর্বলতার সুযোগ নেয়। সেসব হিসাব থেকে বলতে পারি, বাংলাদেশের দিক থেকে গঙ্গা চুক্তিটি আরো ভালো হতে পারত।

যমুনা সেতু কিভাবে তৈরি হলো?

বিশ্বব্যাংক পদ্মার মতো যমুনা সেতুও তৈরি হতে দিতে চায়নি। প্রচণ্ড বাধা দিয়েছে, বিদেশি বিশেষজ্ঞ এনে নানা গবেষণা চালিয়েছে। তখনকার সচিব মনিরুজ্জামান বুয়েটে এসে উপাচার্য স্যারকে বলেছিলেন, কেন আমরা বিদেশি বিশেষজ্ঞের ওপর নির্ভরশীল থাকব? দেশি প্যানেল তৈরি করতে পারি না? তারা বিদেশিদের মোকাবেলা করবে, সেতু তৈরির যৌক্তিকতা তুলে ধরবে। এরপর দেশীয় প্যানেল হলো। অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী দলনেতা নির্বাচিত হলেন। বুয়েটের সাত অধ্যাপকের মধ্যে নদীশাসনের জন্য আমি নির্বাচিত হলাম। পরে বিশ্বব্যাংকও সাতজনের আন্তর্জাতিক প্যানেল করল। আমাদের ও তাদের দুই প্যানেলের সমন্বয়ে পাঁচজনের মূল প্যানেলে তিনজন বিদেশি, দুই বাংলাদেশি—আমি ও জামিলুর রেজা চৌধুরী। আমরা সার্বিক নির্দেশনার দায়িত্ব পেলাম। পুরো কর্মপ্রক্রিয়ায় যখনই সিদ্ধান্ত গ্রহণে জটিলতা হয়েছে, আমরা সেটির কারিগরি বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত দিয়েছি। এভাবে যমুনা সেতু তৈরি হয়েছে। এটি আমার জীবনের অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতা। পদ্মা সেতুতেও সেভাবেই কাজ করছি। বিশেষজ্ঞ প্যানেলে দলনেতা জামিলুর রেজা চৌধুরী, আমি প্রধানত নদীশাসনের দিকে নজর দিই।

আইইউসিএনের সঙ্গে যোগাযোগ কিভাবে?

ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) জলাভূমি সংরক্ষণ নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গবেষণা শুরুর পর আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে দলনেতা হিসেবে কাজের আমন্ত্রণ জানাল। ১৯৯২-৯৩ সালে সেই নীতিনির্ধারণী পরিকল্পনাপত্রটি তৈরিতে সাহায্য করলাম। সম্পাদকমণ্ডলীর চার সদস্যের একজন হিসেবে যেকোনো জলাভূমিতে কৃষি, বিশেষত শীতে বোরো ধান, মাছ, মাছের বিচরণক্ষেত্র, জলাভূমির মাটি ও পানির গুণাবলি, অবকাঠামো, হিজল-করচের বন, আইন, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনাসহ ১৩-১৪টি বিষয় নির্ধারণ করেছি। বিশ্লেষকরা সেগুলো বিশ্লেষণ করে পরামর্শ দিলেন। জাতীয় সম্মেলনের মাধ্যমে আমরা প্রস্তাবনাগুলো সরকারের কাছে উপস্থাপন করলাম। সুইজারল্যান্ড থেকে সেগুলো বই আকারে প্রকাশিত হলো। কিছুদিন আগে কলকাতায় দেখেছি, আমাদের বইটির তথ্য-উপাত্ত তারা জলাভূমি ব্যবস্থাপনায় ব্যবহার করছে। এ অভিজ্ঞতার আলোকে আইইউসিএনে যোগ দিয়ে হাওর নিয়ে প্রচুর কাজ করতে পেয়েছি। ১৯৯৮ সালে তারা কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ (এ দেশীয় প্রতিনিধি) হিসেবে প্রস্তাবের পর তাদের নির্বাচনপ্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে নির্বাচিত হলাম। এ অভিজ্ঞতার আলোকে আইইউসিএনে যোগ দিয়ে হাওর নিয়ে প্রচুর কাজ করতে পেরেছি। ১৯৯৮ সালে তাদের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ নির্বাচিত হলাম। বাংলাদেশে আইইউসিএনের আমি প্রথম কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ। আমি যোগদানের আগে এটি নিভু নিভু প্রতিষ্ঠান ছিল। ১৪০টি দেশে কাজ করা এই প্রতিষ্ঠান সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে প্রকৃতি সংরক্ষণে উদ্বুদ্ধ করে। যেকোনো দেশের প্রথম ও প্রধান সদস্য সরকার। ফলে আইইউসিএনে থাকতে সরকারের বহু নীতিমালা তৈরিতে সাহায্য করেছি। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কৌশল, মরুকরণরোধ পরিকল্পনা প্রস্তুতে অবদান রেখেছি। ২০০৮ সালে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য থাকার সময়ও সরকারকে বর্তমান জলবায়ু ব্যবস্থাপনার মূল পরিকল্পনা তৈরিতে সাহায্য করেছি। আইইউসিএনের মতো ব্র্যাকেও গবেষণায় উত্সাহ দিয়েছি। এখানে কিছু গবেষণাকেন্দ্রও তৈরি করেছি।

টাঙ্গুয়ার হাওর উন্নয়নে কী করেছেন?

টাঙ্গুয়ার হাওরকে সরকার ‘রামসার সাইট’ ঘোষণা করল, যার মানে প্রকৃতি সংরক্ষণই এখানে মূল উদ্দেশ্য। তখন সরকার এই জলাভূমি লিজ দিয়ে বছরে ২৫ লাখ টাকা আয় করত। ভূমি মন্ত্রণালয় বলল, এই টাকা তাদের কে দেবে? ফলে হাওরের আশপাশের ৯২টি গ্রামের মানুষকে সংগঠিত করে আমরা এমন ব্যবস্থাপনায় গেলাম, যাতে স্থানীয়রাই হাওরে মাছ ধরবেন। জেলেরা বিক্রি করা মাছের ৪০ শতাংশ দাম পাবেন, সরকার ৩৬ শতাংশ ও স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদগুলো বাকি ২৪ শতাংশের টাকা পাবে। আমাদের অনুরোধে সরকার আইন জারি করে নিয়মটি বলবত্ করল। আমরা জেলেদের পরিচয়পত্র দিলাম। তাঁরা সেখানকার মোট ৫১টি বিলে প্রতিদিন মাছ ধরতেন। সাত-আটটি বিল মাছ ধরার আওতামুক্ত রেখে মাছের প্রজননের ব্যবস্থা করলাম। বাকি বিলের মাছ টিএনও বা স্থানীয় ম্যাজিস্ট্রেটের তত্ত্বাবধানে প্রতি সন্ধ্যায় বিক্রি করা হতো। সরকারের কোষাগারেও টাকা জমা দেওয়া হতো। তবে স্থানীয় সংসদ সদস্যরা এ কাজে প্রবল বাধা দিতেন। সুনামগঞ্জের তত্কালীন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আলী খান ও আবু জাফর সিদ্দিকীর অক্লান্ত পরিশ্রম ও সমর্থনে স্থানীয় জনগণকে এই পুরো ব্যবস্থাপনার মালিকানা দিতে পেরেছিলাম। আমিসহ আইইউসিএনের কর্মকর্তারা গ্রামগুলোতে গিয়ে তাঁদের সঙ্গে আলাপ করে অভাব-অভিযোগ শুনে সমাধান, পরামর্শ দিতাম। হাওরটিতে সারা বছর পাখি থাকেই, শীতে দুই থেকে পাঁচ লাখ পরিযায়ী পাখি আসে। আমরা তাঁদের বলতাম, পাখিগুলো আপনাদের হাওরের জন্যই ভালো, ওদের ক্ষতি করবেন না। হাওর থেকে স্থানীয়দের আয়ের জন্য তাঁদের পানসির ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম। কিস্তিতে টাকা পরিশোধ করে তাঁরা নৌকাগুলোর মালিক হতেন। সিলেট, সুনামগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকার দর্শনার্থীরা ফোন করে নৌকাগুলো বুকিং করে এই অপরূপ হাওরে বেড়াতেন। এখনো মনে করি, টাঙ্গুয়ার হাওর সরকারের একক মালিকানায় রাখা প্রয়োজন, কোনোভাবেই এটি লিজ দেওয়া উচিত নয়, স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা করা দরকার। ক্রমান্বয়ে সারা দেশের সব বিলকে আশপাশের মানুষের সামাজিক মালিকানায় পরিচালনা করা প্রয়োজন। মালিক না হলে তাঁরা তো বিলগুলো দেখে-শুনে রাখবেন না।

আর কোনো উদ্যোগ?

আইইউসিএনে থাকতে আরো অনেক প্রকল্পে যুক্ত ছিলাম। এখন যে ভাসমান বাগানের কথা বলা হয়, সেটি সাসটেইনেবল এনভায়রমেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রজেক্ট (সেম্প) বা টেকসই পরিবেশ ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের মাধ্যমে উত্পত্তিস্থল পটুয়াখালী থেকে নিয়ে গিয়ে ফরিদপুর, সিলেটসহ নানা স্থানে ছড়িয়ে দিয়েছি। এর মূল কথা, বিলে নলখাগড়া, কচুরিপানা দিয়ে নানা জাতের গাছের সমন্বয়ে ভাসমান বাগান তৈরি করা। আমরা প্রচুর ঔষধি বৃক্ষও রোপণ করেছি। বান্দরবানের কেয়াংগুলোতে (বৌদ্ধ মন্দির) গিয়ে ভান্তের (ধর্মগুরু) সঙ্গে আলাপের পর তাঁদের তত্ত্বাবধানে মন্দিরের জায়গায় ঔষধি বৃক্ষ রোপণ করেছি। মানিকগঞ্জে বাড়ির মালিকদের উদ্বুদ্ধ করে অনেক বাড়ির ছাদ, পতিত জমি, উঠানের কিনারে সহকর্মীদের মাধ্যমে গাছ জোগাড় করে রোপণের ব্যবস্থা করেছি। হাটবারের আগের দিন কবিরাজরা এসে গাছগুলোর ফল, ডালপালা কিনে নিয়ে যেতেন। আইইউসিএনের রেড লিস্টগুলোও আমার সময়ে করা। সেই তালিকায় এ দেশের বিপন্ন, অতি বিপন্ন প্রাণীর তালিকা আছে।

কিন্তু বাঘের গলায় বেল্ট তো আপনার সময়েই পরানো হয়েছে?

কান্ট্রি ডিরেক্টর থাকলেও আমি এর সঙ্গে জড়িত ছিলাম না, আমি বিরোধিতা করেছি। বন বিভাগের এক বড় কর্তা তাঁর পিএইচডির জন্য বাঘ মনিটরিংয়ের জন্য বাঘটিকে ট্যাগিং করেছিলেন। বাঘটিকে ছাগল খেতে দিয়ে বিশেষ ধরনের যন্ত্র নিক্ষেপ করে অজ্ঞান করে সেটির গলায় বেল্ট পরানো হলো। মরদেহটি পরীক্ষার পর প্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বাঘটির ওপর ওষুধের মাত্রা অনেক বেশি দেওয়া হয়েছিল বলে সেটি মারা গেছে, এ কাজ মোটেও বিজ্ঞানসম্মতভাবে করা হয়নি। পরে পরিবেশবিদদের প্রবল আপত্তিতে আর কোনো বাঘের গলায় বেল্ট পরানো হয়নি।

এ দেশের নদীগুলো কেন মারা যাচ্ছে?

একটি নদী তিনটি কারণে মারা যায়। দখল করে গলা টিপে মেরে ফেললে, আমরা বিশেষজ্ঞরা একে ‘ভৌত কারণ’ বলি। দ্বিতীয়ত, নোংরা পানি বা দূষণের কারণেও নদী মারা যায়। একে ‘রাসায়নিক’ কারণ বলি। তৃতীয়ত, জৈবিক বা প্রাণ না থাকলে সেটি মারা যায়। ১০০ বছর আগেও এ দেশের নদীর পানিই ছিল মানুষের পানীয়। এতই টলটলে ছিল! নদী শুধু পানিই বহন করে না, সেডিমেন্ট (পলি) বহন করে। পানি ও সেডিমেন্টের মধ্যে সমতা রাখতে হবে। এ দেশের নদীগুলোকে মেরে ফেলা হচ্ছে বলে সেগুলো মারা যাচ্ছে। বাঁচানোর জন্য এগুলোর আকারও বুঝতে হবে। শীত আর বর্ষার নদী এক নয়। যতই ছোট হোক, প্রতিটি নদীরই আলাদা ধর্ম আছে। একেক সময় তার পানি বাড়ে-কমে। জোয়ার-ভাটাময় নদী এলাকাগুলোতে নভেম্বর-ডিসেম্বরে সেচ দেওয়া হয়। ডিসেম্বরে খাল-বিল শুকিয়ে হয়ে যায় বলে যেটুকুও বা পানি থাকে, তুলে ফেলা হয়। শীতে উজান থেকে পানি আসে না বলে সামান্য পানিটুকু তুলে ফেলায় নদীগুলো মরে যায়।

নদীগুলো বাঁচানোর দায়িত্ব কার?

বাংলাদেশের নদীগুলোর মা-বাপ নেই। মত্স্য বিভাগের এর অধিকার নেই। তারা বলে, পানি উন্নয়ন বোর্ড মালিক। ওরা বলে, ভূমি মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণ করে। তারা আবার বলে, আমরা কিছু জানি না। এ দেশের নদী ধ্বংসের আরেকটি প্রধান কারণ, সচেতনভাবে কেউ-ই মালিকানা নেয় না, নদীর উন্নয়ন করে না। এর আসল মালিক ভূমি মন্ত্রণালয়। তারা তো এ ব্যাপারে কিছুই করে না।

রামপালে পরিবেশের ক্ষতি হবে?

রামপালে বিদুেকন্দ্র নির্মাণে পরিবেশ অধিদপ্তর অনুমতি দেয়নি; বরং ৪৯টি শর্ত যোগ করে বলেছে, এগুলো প্রতিপালন করতে হবে। সরকার সেখানে যা যা করবে বলে অঙ্গীকার করেছে, সেগুলো করলে ভয়ের কারণ নেই। যেমন তারা বলছে, ভারত থেকে কয়লা আমদানি করা হবে না। ভারতের যে খনিগুলো থেকে সরকার কয়লা আনবে, সেগুলোর মান খুব খারাপ, ছাই অনেক। এ বিষয়ে আপত্তির পর বিদ্যুত্ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছেন, দক্ষিণ আফ্রিকা, পোল্যান্ড বা ইন্দোনেশিয়া থেকে কয়লা আমদানি করা হবে। কিন্তু পত্রিকার খবরে দেখেছি, ভারত থেকে সহজে কয়লা আমদানির জন্য পশুর নদী ড্রেজিং করা হবে। যেকোনো কাজ করতে গেলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয় সত্য, তবে অতিরিক্ত খরচ করে মোকাবেলাও করা যায়। এই বিদ্যুেকন্দ্র নিয়ে বড় কর্তারা মুখে যেসব কথা বলছেন, বাস্তবায়ন করলে ক্ষতি তত হবে না। কিন্তু সরকারের অঙ্গীকারগুলোর ওপরই তো বিশ্বাস রাখা যাচ্ছে না। রামপাল ও পায়রা তাপ-বিদ্যুেকন্দ্র নির্মিত হলে উপকূলজুড়ে ২০০-এর মতো বড় শিল্প-কারখানা গড়ে উঠবে, সাইনবোর্ডও টাঙানো হয়েছে। ফলে রামপাল দূষণকারী অনেক প্রতিষ্ঠানকে ডেকে আনবে। গত বছরের জুলাইয়ে পোল্যান্ডে ইউনেসকোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কাউন্সিলের সঙ্গে আলোচনায় সরকার রাজি হয়ে এসেছে, রামপালে বিদ্যুেকন্দ্র তো বটেই, এই বিশ্ব ঐতিহ্যে অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত দূষণও সরকার পর্যালোচনা করবে; কিন্তু রামপাল নিয়ে আমরা সুধীসমাজ এ কারণেই ভীত যে পরিবেশসম্মত উপায়ে এই বিদ্যুেকন্দ্র করবে কি না সে বিষয়ে এখনো সরকার আশ্বস্ত করতে পারেনি। আমরা এর অনেক ক্ষতিকর দিক দেখছি। এখানে প্রচুর ছাই উত্পাদিত হবে। ২৫০ মেগাওয়াটের বড়পুকুরিয়া কয়লাখনিতে কয়লা পুড়িয়ে যে বিদ্যুত্ তৈরি হয়, সে ছাইগুলোর ব্যবস্থাপনাই তো এখনো তৈরি হয়নি। এক হাজার ৩০০ মেগাওয়াট রামপালের ছাইয়ের ব্যবস্থাপনা কিভাবে হবে? তেমনি সেখান থেকে উত্পাদিত সালফার ডাই-অক্সাইডের কী করা হবে বুঝতে পারছি না। সরকার এসব বিষয়ে মুখে মুখে যা অঙ্গীকার করছে, সেগুলো বাস্তবায়ন করবে কি না তার ওপর আমরা বিশ্বাস রাখতে পারছি না। বিদ্যুেকন্দ্রটি তৈরির পর যেসব শিল্প-কারখানা তৈরি হবে, সেগুলোর ব্যাপারেও আমরা পরিবেশগত কারণে উদ্বিগ্ন। সরকার প্রতিশ্রুতি পালন করলে সুন্দরবনের পরিবেশগত ক্ষতি হবে না, কিন্তু এসব পালন করা হবে, এমন কোনো প্রমাণ এখনো নেই।            

শ্রুতলিখন : ইয়াকুব ভুঁইয়া
(১৫ নভেম্বর ২০১৭, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।)



মন্তব্য