kalerkantho


সব সময় খবরের সঙ্গে থাকি

সমকাল ও যুগান্তরের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক তিনি। ইত্তেফাকের স্বর্ণযুগে ২৭ বছর ছিলেন বার্তা সম্পাদক। দুঁদে সাংবাদিক গোলাম সারওয়ার অনেক প্রখ্যাত সাংবাদিকের জন্ম দিয়েছেন। তাঁর সাংবাদিকতা জীবনের গল্প শুনেছেন ওমর শাহেদ। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

৩ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



সব সময় খবরের সঙ্গে থাকি

সাংবাদিকতা পেশায় কিভাবে এলেন?
জন্ম বরিশালে হলেও সিক্স থেকে এইট পর্যন্ত ঢাকার আজিমপুরে ওয়েস্ট এন্ড হাই স্কুলে পড়েছি। ১৯ আজিমপুর রোড থেকে ‘সৈনিক’ পত্রিকাটি বেরোত। অফিসটি আমাদের বাসার খুব কাছে ছিল। বন্ধু সৈয়দ মোস্তফা জামালের সঙ্গে সৈনিকে যেতাম। অফিসে বসতাম, কপি দেখতাম। তখন পত্রিকা ডাকে পাঠানো হতো, কোথায় যাবে সেই লেবেলও আঠা দিয়ে লাগাতাম। এভাবে কাজ করে সাংবাদিকতার প্রতি অনুরাগ জন্মেছে। পরে ঢাকায় এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা অনার্সে ভর্তি হলাম। ১৯৬০ সালে ‘আজাদী’র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা ছিলাম। কিছুদিন পর আব্বা টাকা পাঠাতে পারছিলেন না, বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতার টাকায় চলে না। চাকরি না হলে পড়ালেখাই বন্ধ হয়ে যাবে—এ অবস্থায় আমি, বন্ধু সৈয়দ আশরাফ সহসম্পাদক পদে পয়গামে সাক্ষাত্কার দিলাম। আমি প্রথম, আশরাফ দ্বিতীয় হলো। পয়গাম মোনেম খাঁর পত্রিকা। চিন্তার দিক থেকে আমি সম্পূর্ণ অন্য ধারার। সবাই অবাক হয়ে গেলেন। খেলাঘর করি, লেখালেখি করি, ছড়াকার বলে শহীদুল্লা কায়সারের সঙ্গে হূদ্যতা ছিল। তিনি বললেন, ‘মোনেম খাঁর পত্রিকায় চাকরি নিলি?’ ‘ভাই, চাকরি খুব দরকার। না হলে পড়ালেখাই বন্ধ হয়ে যাবে।’ ‘কত বেতন পাস?’ ‘১২৫।’ ‘কালই সংবাদে জয়েন করবি। তোকে আরো ২৫ টাকা বেশি দেব।’ ১৫০ টাকা বেতনে সংবাদে যোগ দিলাম। তখন বাঘা বাঘা সাংবাদিক সংবাদে কাজ করেন—সম্পাদক জহুর হোসেন চৌধুরী, যুগ্ম সম্পাদক শহীদুল্লা কায়সার। সহকারী সম্পাদক—রণেশ দাশগুপ্ত, সত্যেন সেন, বজলুর রহমান, আলী আকসাদ। সাংবাদিকতার এসব দিকপালের সঙ্গে কাজ করার বিরল সৌভাগ্য হয়েছে।

তখনকার সম্পাদকদের কাজ কী ছিল?
তাঁরা অফিসে খুব কম আসতেন, প্রায়ই আসতেন না। পত্রিকার নীতিগত ব্যাপার জড়িত বলে সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয় পাতা তাঁদের বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হতো। তাঁরা পাতা দেখে শুদ্ধ করে পাঠিয়ে দিতেন। এ ছাড়া তেমন কোনো কাজ ছিল না। জহুর হোসেন চৌধুরীও অফিসে তেমন আসতেন না। তাঁর কোনো ভূমিকাও তেমন ছিল না। একটি ঘটনা বলি—১৯৭১ সালের সাতই মার্চে বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ভাষণ দিলেন। তখন বয়স কম, আমরা সবাই উত্তেজিত হয়ে রেসকোর্স মাঠে আছি। ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বলে সেদিন বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করে দিলেন। অফিসে এলাম। জহুর ভাই ডাকলেন, ‘সারওয়ার সাহেব, আজ কী করছেন? ‘বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বড় করে করছি।’ ‘হেডিং কী?’ ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ ‘আপনার কী মাথা খারাপ হয়েছে? এই হেডিং যাবে না। ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম হেডিং হবে, স্বাধীনতার সংগ্রাম যাবে না।’ ‘কেন, তিনি তো এ কথা বলেছেন।’ ‘তিনি বললেই দায়িত্ব আপনি নেবেন? পরে আমাকে ধরে নিয়ে যাবে। এটি যাবে না।’ এ আমি কিছুতেই মানতে পারছিলাম না। সঙ্গে সঙ্গে ডেস্ক, রিপোর্টিংয়ের সহকর্মীদের নিয়ে বসলাম। বললাম, ‘সম্পাদক সাহেব তো এই নির্দেশনা দিয়েছেন। এখন আমরা কী করব?’ সিদ্ধান্ত নিতে আমাদের কিন্তু খুব সময় লাগেনি, বেশি আলোচনাও করতে হয়নি। সিদ্ধান্ত নিলাম—‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ শিরোনাম যদি না যায়, তাহলে কাল সংবাদ বেরোবে না। জহুর ভাইকে বললাম, “আমরা তো বসেছিলাম, সিদ্ধান্ত নিয়েছি—‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ যদি হেডিং না যায়, তাহলে কাল সংবাদ প্রকাশিত হবে না।” তিনি রেগে টেলিফোন রেখে দিলেন। আমরা ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ ব্যানার হেডিংয়ে ছাপলাম। তখন জুনিয়রই ছিলাম, কিন্তু এভাবেই আমরা প্রথাসিদ্ধ সম্পাদক যাঁরা একটি নির্দিষ্ট টিউনে সারা জীবন টিউনিং হয়ে এসেছেন, সেটি ভেঙে আমাদের মতো করে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম। পরদিন সেই শিরোনামে পত্রিকা বেরোল।

২৫ মার্চ কালরাতের কথা মনে আছে?
সে আমাদের জন্য খুব ভয়ংকর দিন ছিল। সেদিনও সংবাদে ছিলাম। তখন ঢাকার নবাবপুরে নিশাত সিনেমা হলের পাশে অফিস ছিল। সামনেই ছিল নবাবপুর পুলিশ ফাঁড়ি। সেদিনও অনেক পুলিশ ছিল। ২৫ মার্চ হঠাত্ জহুর ভাই টেলিফোন দিলেন, ‘উত্তরপাড়ার খবর রাখেন?’ ‘কী হয়েছে?’ ‘অবস্থা তো খুব খারাপ। বুঝেসুঝে চলেন।’ তখন রাত ৯টা। দ্রুম দ্রুম মেশিনগানের শব্দ আসছে। বুলেট, মেশিনগান, স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের শব্দ বাদে আর কিচ্ছু শোনা যাচ্ছে না। আলো নিভিয়ে আমরা মেঝেয় শুয়ে থাকলাম। আর্মির গাড়ি নবাবপুর রোড থেকে আসছে, যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর পর আর্মি দৌড়াচ্ছে, প্রচণ্ড বুটের শব্দ শুনছি। হঠাত্ ওরা ফাঁড়িতে অতর্কিত হামলা করল। সকালে বেরিয়ে দেখি, ১৯ সদস্যের সবাইকে বর্বর বাহিনী গুলি করে হত্যা করেছে। ভাগ্য ভালো, তারা সংবাদ অফিস চিনত না। তারা কিন্তু এর আগে ১ রামকৃষ্ণ মিশন রোডের ইত্তেফাক ভবনে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল। দাউ দাউ করে জ্বলছে। সংবাদ তো অত বড় মাপের পত্রিকা ছিল না। ফলে চিনত না। না হলে সংবাদেও একই ঘটনা ঘটত। পরদিন সকাল ৮টা থেকে ৯টা এক ঘণ্টার জন্য কারফিউ তুলে দিল। আমি ও বেশ কিছু সহকর্মী হেঁটে হেঁটে শহীদুল্লা কায়সারের কায়েতটুলীর বাসায় গেলাম। সেখানেই সন্ধ্যাবেলা শহীদ মিনার গুঁড়িয়ে দেওয়ার শব্দ শুনেছি। শমী কায়সার তখন একেবারে বাচ্চা, জহির রায়হান কোলে নিয়ে হাঁটছিলেন। শহীদুল্লা কায়সার বললেন, ‘সারওয়ার, আমরা তো এখানে থাকতে পারছি না, ভারতে চলে যাব। তোমরা তো আর যাবে না। কী করবে? বাড়ি যাবে?’ ‘কিভাবে যাব?’ ‘এক কাজ করি, তোমাকে আমরা সোয়ারিঘাট পৌঁছে দিই। তাঁর সঙ্গে সেই বিখ্যাত ভক্স ওয়াগন গাড়িতে আমি ও আরো দু-একজন সহকর্মী রওনা হলাম। নৌকায় বুড়িগঙ্গা পেরিয়ে টানা পদব্রজে চলেছি। উত্তাল পদ্মা নৌকায় পাড়ি দিয়েছি। চার-পাঁচ দিনে বরিশাল পৌঁছার পর বিধ্বস্ত চেহারা দেখে চেনা যাচ্ছিল না।

মুক্তিযোদ্ধার জীবন?
ছোট ভাই গোলাম সালেহ সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ওপারে চলে গেলেও আমি দেশের অভ্যন্তরে থেকেই মুক্তিযুদ্ধ করেছি। এটি আরো কঠিন ছিল। মেজর এম এ জলিল ভাইয়ের ৯ নম্বর সেক্টরের অধীনে আমাদের সাব-সেক্টর কমান্ডার ছিলেন বেনীলাল দাশগুপ্ত। গভীর অরণ্যে আমাদের ক্যাম্প ছিল। বাংলাদেশের চালের প্রধান জোগানদার বানারীপাড়া বাজারের ঘাটে হাজারো নৌকা থাকত। তারিখ মনে নেই, হুলারহাট থেকে গুলি করতে করতে সাত-আটটি গানবোট এলো। পাক সেনারা নেমেই সব মোকামে আগুন ধরিয়ে দিয়ে পুরো বাজার পুড়িয়ে দিল। অনেক লোক মারা গেল। জীবন রক্ষার দায়ে বাড়িঘর ছেড়ে দৌড়ে চাখার পেরিয়ে সামনে চলে গেলাম। পেছনে আর্মি গুলি করতে করতে এসেছিল। তবে মারতে পারেনি। এর পর থেকে অপারেশনে নামলাম। বাংলাদেশের খুব বড় একটি থানা বানারীপাড়া থানা আক্রমণ করলাম। ওসি নজরুল ইসলাম অস্ত্র, গোলাবারুদ, অফিসার ও কনস্টেবলদের নিয়ে আত্মসমর্পণ করলেন। এলাকায় প্রথম মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে থানার পতন ঘটল।

শিক্ষকতায় এলেন কেন?
যে স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেছি, সেই বানারীপাড়া ইউনিয়ন ইনস্টিটিউশনের হেডমাস্টার আবদুল গনি রাজাকার ছিলেন। স্বাধীনতার পর তিনি ভয়ে পালিয়ে গেলেন। বাধ্য হয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দিলাম। তাঁরাও বললেন, হেডমাস্টার না দিয়ে যেতে পারবেন না। ছয়-সাত মাস দায়িত্ব পালনের পর মনে হলো, শিক্ষকতা আমার পেশা নয়।

ইত্তেফাকে যোগ দিলেন কিভাবে?
ইয়াহিয়া খান ইত্তেফাকের ছাপা বন্ধ করে দিলে বার্তা সম্পাদক আসাফউদ্দৌলা রেজা আবার সংবাদে যোগ দিলেন। তাঁকে একসঙ্গে বার্তা ও নির্বাহী সম্পাদক পদ দেওয়া হলো। আমি ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু আবদুল্লাহ আল মামুন সংবাদে একসঙ্গে আট বছর কাজ করেছি। এখন তো সাংবাদিকতা নানাভাবে বদলে গেছে, তখন ডেস্কের মূল কাজ ছিল অনুবাদ। খুব দ্রুত অনুবাদ করতাম। তাই তিনি আমাদের খুব পছন্দ করতেন। তিনি সংবাদ থেকে ইত্তেফাকে যাওয়ার পর আমাকেও নেওয়ার চেষ্টা করলেন। কিন্তু প্রধান শিক্ষক ছিলাম বলে যেতে পারিনি। তার পরও রেজা ভাই বারবার টেলিগ্রাম করছিলেন—‘ইত্তেফাকে চলে আয়।’ তাঁর তাগাদায় হেডমাস্টার ঠিক করে দিয়ে ঢাকায় এলাম। কিন্তু সংবাদে যোগ দিলাম। রেজা ভাই বাসার নিচে দেখা করতে চলে এলেন। বললেন, ‘তোকে বারবার টেলিগ্রাম করেছি, বলেছিস, মুক্তিযুদ্ধের সময় চাকরি করবি না, যুদ্ধ করবি। এখন ইত্তেফাকে যোগ দে।’ আমিও দেখলাম, সংবাদের পরিবেশ অনেক বদলেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে গ্রুপিং চলছে। আমাদের ঘনিষ্ঠ এক আপার স্বামী ছিলেন এর পুরোভাগে। তাঁর নাম বললে অনেকে চিনবেন বলে বলব না। ইত্তেফাকে যোগ দিলাম। এরপর জীবনের ২৭টি বছর, জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সময় ইত্তেফাককে দিয়েছি। এখনো অনেকে বলেন, যেখানেই যান, ইত্তেফাকের প্রশংসাই কেন করেন? উত্তরে বলি, ‘আমার মনের মধ্যেই ইত্তেফাক যেন জড়িয়ে আছে।’ এমনই ছিল ইত্তেফাকের সঙ্গে আমার সম্পর্ক। প্রতিদিন সকালে যেমন সমকাল দেখি—পত্রিকার কোথায় কী ভুল হয়েছে, কোন নিউজ, ফিচার বা এডিটরিয়ালের ট্রিটমেন্ট ঠিক হয়নি, কোন ছবি বা ক্যাপশন ঠিক হয়নি; তেমনিভাবে খুব মনোযোগ দিয়ে ইত্তেফাকও স্ক্যান করি। টেলিফোন করে বলি, ‘তোমরা আজ কী করলে? এ কোনো হেডিং হলো? এটি ট্রিটমেন্ট? তোমাদের পত্রিকা কিন্তু কিচ্ছু হচ্ছে না।’ অন্য পত্রিকা নিয়ে তো এসব আমার বলার কথা নয়। কিন্তু অবচেতন মনেই কাজ করে, এখনো ইত্তেফাকেই আছি। আমার সময়ে ইত্তেফাক ছিল সেই পত্রিকা—সংবাদ সম্মেলন হচ্ছে, সবাই বসে আছেন। সব রিপোর্টার, ফটোগ্রাফারও হাজির। সবাই বলছেন, সম্মেলন শুরু করুন। কিন্তু শুরু হচ্ছে না। কারণ ইত্তেফাকের প্রতিনিধি না আসা পর্যন্ত সংবাদ সম্মেলন শুরু করা যাবে না। ইত্তেফাকের এমন অনন্য অবস্থান ছিল।

যোগদানের পর? 
কিছুদিন পর বার্তা সম্পাদক রেজা ভাই অসুস্থ হয়ে পড়লেন। স্বীকৃত না হলেও কার্যত তখন বার্তা সম্পাদকের কাজটি করতে হয়েছে। ইত্তেফাক তখন এত জনপ্রিয় ছিল যে পাঠকরা, বিভিন্ন সংস্থা তাদের খবরগুলো এক লাইন, দুই লাইন ছাপা হলেই খুশি হতো। সবাই বলতেন, সারওয়ার ভাই, আপনার মতো বার্তা সম্পাদক হয় না। ইত্তেফাক কত চমত্কার, এডিটিং কী দারুণ। কথাটি আসলে ঠিক নয়। ইত্তেফাক এত বিজ্ঞাপনসর্বস্ব ছিল যে নিউজ দেওয়ার জায়গাই ছিল না। দু-তিন লাইনের মধ্যে মূল খবর দিয়ে শেষ করতে হতো। সম্পাদক হওয়ার পরও এমনকি মূসাভাইও (এবিএম মূসা) বলতেন, ‘সারওয়ার, তুই কত বড় সম্পাদক জানি না, কিন্তু তুই বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ বার্তা সম্পাদক।’ বার্তা সম্পাদক হিসেবে ইত্তেফাকে আমি পত্রিকার নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা করতাম। এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনা বলি, তখন এইচ এম এরশাদের শাসনামল। আনোয়ার হোসেন মঞ্জু সাহেব তাঁর সরকারের মন্ত্রী। তিনি সাধারণত জিজ্ঞাসা করতেন, ‘সারওয়ার সাহেব কিছু আছে নাকি?’ এ ভাষায় আমাদের আলোচনা হতো। ১৯৮৭ সালে সরকারের বিপক্ষে ৩২ জন বিশিষ্ট নাগরিক বিবৃতি দিলেন। সেটি ছাপানোর আগে তাঁকে কিন্তু জানাইনি। কারণ তাঁকে বললে সরকারের মন্ত্রী হিসেবে তিনি সেটি ছাপতে দেবেন না। বিবৃতিটি ছাপা হয়ে গেল। এরশাদ সাহেব তোলপাড় শুরু করলেন। মঞ্জু সাহেবকে ডেকে বললেন, ‘এটি কিভাবে ইত্তেফাকে ছাপা সম্ভব হলো?’ মন্ত্রিসভার জরুরি মিটিং শেষ করেই তিনি সরাসরি অফিসে এলেন। জিজ্ঞাসার পর বললাম, “আপনাকে এ জন্য জানাইনি যে জানালে আপনি এটি ছাপতে মানা করতেন। আর আপনি ‘না’ করলে তো পত্রিকায় দিতে পারতাম না। কিন্তু আমি মনে করি, এটি ছাপা হওয়া উচিত ছিল।” তিনি বললেন, ‘না, এটি ছাপানো উচিত হয়নি।’ এরপর তিনি আমাকে সাসপেন্ড করে দিলেন। সেদিন ছিল ১ এপ্রিল, আমার জন্মদিন। বাসায় চলে এলাম। রাতে পারিবারিকভাবে জন্মদিন পালন করছি। তখন তাঁর টেলিফোন এলো, ‘সারওয়ার সাহেব, কী করছেন?’ বললাম। ‘আরে কিসের জন্মদিন! কাল অফিসে চলে আসবেন।’ বললাম, ‘কেন আসব?’ (হাসি)। তার পরও তাঁর অনুরোধে পরদিন গেলাম। বললেন, ‘আমাকে বলা হয়েছিল, তাঁকে ডিসমিস করে সেটির কপি আমাকে (এরশাদ) দেবেন। ফলে বাধ্য হয়েছিলাম। কপি না দিলে কী হতো সে তো বোঝেন! তিন দিন পর আবার কাজে যোগ দিন।’ আবার এলাম।

বিনোদন সাংবাদিকতা করেছেন?
বাকশাল প্রতিষ্ঠার পর মাত্র চারটি পত্রিকা—দৈনিক বাংলা, বাংলাদেশ টাইমস, ইত্তেফাক ও অন্য একটি পত্রিকা সরকার জাতীয়করণ করে বাকিগুলোর সাংবাদিকদের যে যেখানে চান চাকরি দিলেন। তখন আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বললেন, “সারওয়ার সাহেব, আমাদের তো ‘পূর্বাণী’ নামে একটি পত্রিকা ছিল। চলেন, সেটির প্রকাশনা শুরু করি।” তাঁদের মামা খন্দকার শাহাদাত হোসেনের নামে ডিক্লারেশন ছিল। ডিক্লারেশন বদলানোর ঝামেলায় না গিয়ে তিনিই সম্পাদক থাকলেন, আমি নির্বাহী সম্পাদক। প্রিন্টার্স লাইনে আমাদের নাম ছাপা হতো। শুধু সিনেমা নয়, মোটামুটিভাবে এটি সাহিত্যমনস্ক পত্রিকা ছিল। ১৬ পাতার পত্রিকাটিতে ফজলে লোহানীর সুবিখ্যাত গল্প ‘মা’ ছয় পৃষ্ঠাজুড়ে ছাপা হয়েছিল। পূর্বাণী বাংলাদেশে প্রথম ম্যাগাজিন আকারে ‘ঈদ সংখ্যা’ প্রকাশ শুরু করেছে। আমার মনে হলো, ভারতে যদি পূজা সংখ্যা হতে পারে, এখানে ঈদ সংখ্যা কেন হবে না? তাদের পূজা সংখ্যার হাজার হাজার কপি এখানে চলছে, আমাদের ঈদ সংখ্যা কেন চলবে না? এই চিন্তা থেকেই ঈদ সংখ্যার ধারণাটি করেছিলাম। ধীরে ধীরে পরে দৈনিকগুলোও আমাদের অনুসরণে ঈদ সংখ্যা প্রকাশ শুরু করেছে। আমার কাজের চরিত্রে একটু পাগলামো আছে। এখনো দিন নেই, রাত নেই, কাজ করি। পাগলামোটা মনে হয় কাজ করেছে। ফলে যখন পূর্বাণী ছেড়ে দিই, সার্কুলেশন ৭০ হাজারের ওপরে ছিল। ছেড়ে দিলাম, খন্দকার সাহেব হাল ধরলেন। তিন মাসের মধ্যে সার্কুলেশন সাত হাজারে নামল। পূর্বাণী বন্ধ হয়ে গেল।

বাচসাসে ছিলেন?
একাধিকবার ভোটে বাচসাসের (বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি) নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। খোকা (আহমেদ জামান চৌধুরী) ভাইয়ের সঙ্গে নায়ক রাজ্জাকের খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। দুজনেরই একটি বিষয়ে খুব মিল ছিল। সেটি বললাম না। একবার ঢাকা ক্লাবে দুজনেই একটু অস্বাভাবিক অবস্থায় ছিলেন। অসুস্থ অবস্থায় রাজ্জাক চিত্রালীতে একটু উল্টাপাল্টা লেখায় খোকা ভাইকে বেদম মার মেরে রক্ত বের করে দিলেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত রাজ্জাকের সঙ্গে আমার পারিবারিক সম্পর্ক, বন্ধুত্ব ছিল। কিন্তু তখন এটি আমরা মেনে নিতে পারলাম না। বাচসাসের জরুরি সভা আহ্বান করে সিদ্ধান্ত নিলাম, যদি ক্ষমা না চান, তাহলে রাজ্জাকের কোনো ছবি ছাপা হবে না। তিনি যে ছবিতে অভিনয় করেছেন, সেটির বিজ্ঞাপনও ছাপা হবে না। এ ছিল ভয়ংকর সিদ্ধান্ত। সিনেমা পাড়ায় হুলুস্থুল পড়ে গেল। আমরাও অনড়, তাঁকে মাফ চাইতেই হবে। পরিচালক-প্রযোজক-অভিনেতা-অভিনেত্রীরা সবাই রাজ্জাককে ধরলেন, আপনি ক্ষমা না চাইলে তো আমাদের সব ছবি বন্ধ হয়ে যাবে। মনে আছে, চিত্রালীর মেকআপের দিন তিনি অফিসে এসে সবার কাছে হাত জোড় করে ক্ষমা চাইলেন, ‘আমি ভুল করে ফেলেছি, আর করব না।’

পূর্বাণী ছেড়ে দিলেন কেন?
যখন তাঁরা আবার ইত্তেফাক ফিরে পেলেন, ডাক পড়ল। সরকার পত্রিকাটি নেওয়ার আগে ‘চিফ সাব-এডিটর’ ছিলাম। তখন গ্রেড ছিল ‘বি’। তবে পূর্বাণীর নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে ‘এ’ গ্রেডে ছিলাম। ফলে একটু গোঁ ধরে বললাম, ইত্তেফাকে যাব না, পূর্বাণীতেই থাকব। তাঁদের কাছে আমি অপরিহার্য ছিলাম। কিন্তু তাঁরা আমাকে কিছুতেই রাজি করাতে পারছিলেন না। শেষে বললেন, ‘অফিস অর্ডার দিয়ে নিয়ে আসব।’ ‘তাহলে চাকরি ছেড়ে দেব।’ ফলে গ্রেড ঠিক রাখার জন্য নতুন ‘যুগ্ম সম্পাদক’ পদ তৈরি করে আমাকে নেওয়া হলো। এটি বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় অভিনব ঘটনা। তার পরও কিছুদিন দুই চাকরি অব্যাহত রেখেছি। দুটি একসঙ্গে চালাতে গিয়ে প্রচণ্ড চাপ পড়ছিল বলে পরে পূর্বাণী ছেড়ে দিলাম।

ইত্তেফাকে আপনার অবদান?
ইত্তেফাকের অনেক কিছু বদলেছি। একসময় পত্রিকাটিতে খেলার খবর প্রায় ছাপাই হতো না। রেজা ভাই জিজ্ঞাসা করতেন, ‘অ্যাই, খেলার পাতায় কেমন বিজ্ঞাপন?’ বিজ্ঞাপনের কর্মীরা উত্তর দিতেন, স্যার, সাত কলাম বিজ্ঞাপন আছে। ‘তাহলে এক কলাম খেলা দে।’ মানে বিজ্ঞাপন দেওয়ার পর যেটুকু অবশিষ্ট থাকত, সেখানে খেলার সংবাদ ছাপা হতো। খেলা নিয়ে তাঁদের চিন্তা এমনই ছিল। কিন্তু আমি বললাম, ‘বিজ্ঞাপন দেওয়ার পর অবশিষ্টাংশে খেলার খবর ছাপা হবে—এ কোনো কথা হলো? তিনি বললেন, ‘খেলা কে দেখে? ‘আপনি দেখেন না, আমরা দেখি। খেলার সংবাদ খুব কম দেওয়ায় পত্রিকা কিন্তু তরুণদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে।’ পরে বললাম, ‘যদি অন্তত আধা পৃষ্ঠা খেলার খবর না দেন, তাহলে কাল থেকে রাতে আসা বন্ধ করে দেব। আসবই না।’ পরে ইত্তেফাকে খেলার খবরে গুরুত্ব দেওয়া শুরু হলো। ইত্তেফাকের হেডিংয়ে সব সময় ‘যাইতেছি’, ‘করিতেছি’, ‘খাইতেছি’ থাকত। বললাম, ‘রেজা ভাই, এভাবে স্মার্ট হেডিং হয়? জায়গাও তো বেশি লাগে।’ তিনি উত্তর দিলেন, ‘এটি মানিক মিয়ার ঐতিহ্য, এই ভাষা বদলানো যাবে না।’ ভাষা নিয়ে বহুদিন যুদ্ধ করেছি। পরে দ্বিতীয়বার গিয়ে বললাম, ‘এই ভাষারীতি বদলাতে হবে।’ এরপর ইত্তেফাক চলিত রীতিতে এলো। পুরো পত্রিকা চলিত ভাষায় ছাপা হয়, কিন্তু সম্পাদকীয় সাধু ভাষায়। সম্পাদকীয় সাধু ভাষায় কেন? ‘যুগান্তর’ প্রকাশের প্রথম দিন নিজে একটি সম্পাদকীয় লিখেছিলাম। হেডিং ছিল ‘সাধু’ সম্পাদকীয়। তাতে কেন আমরা সম্পাদকীয় সাধু রাখলাম, সেটি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছি। বলার চেষ্টা করেছি, সম্পাদকীয় একটি ভারী বিষয়। এটির সাধু ভাষারীতিতেই ভালো। কারণ যেকোনো বিষয় বলতে গেলে তত্সম শব্দের সীমিত ব্যবহারের মধ্যে ভালোভাবে লেখা যায়; এটি একমাত্র সাধু ভাষায়ই সম্ভব, চলিততে নয়। সুতরাং সম্পাদকীয় সাধু ভাষায়ই হওয়া উচিত। আনন্দবাজারও তা-ই, পুরো পত্রিকা চলিত ভাষায়, কিন্তু সম্পাদকীয় সাধু ভাষায়। সাধু ভাষায় শব্দের জোর আছে, বাক্য গঠনের শক্ত গাঁথুনি আছে। 

ইত্তেফাকের ভেতরের অনেক ঘটনারও তো সাক্ষী?
ইত্তেফাকে শুধু বার্তা সম্পাদকই ছিলাম না, দুই ভাইয়ের সঙ্গে নীতিনির্ধারণীতে আমিও এমনভাবে যুক্ত ছিলাম যে লিখিতই ছিল—তাঁদের অবর্তমানে বার্তা সম্পাদকের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। এ অবস্থানে ছিলাম। দুই ভাইয়ের (ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন ও আনোয়ার হোসেন মঞ্জু) মধ্যে নানা দ্বন্দ্ব ছিল। অনেক সময় রুদ্ররূপও ধারণ করত। সাংবাদিক, প্রেসের লোকজনসহ সবাইকে নিয়ে ইউনিয়নেরও শক্তিশালী স্টিয়ারিং কমিটি ছিল। ইত্তেফাকের প্রেসের কর্মীরা তো খুবই মারদাঙ্গা ছিলেন। একবার স্টিয়ারিং কমিটির মিটিংয়ের পর কিছু সিদ্ধান্ত হলো। সেগুলো হয়তো এক ভাইয়ের বিপক্ষেই গেল। ফলে একপক্ষের ইন্ধনে কামাল নামের এক লোক ইত্তেফাকে মারা গেলেন। এ নিয়ে সারা অফিসে তুমুল উত্তেজনা। কাল পত্রিকা প্রকাশিত হবে কি হবে না সে আলোচনা চলছে। যদিও ইউনিয়নের সদস্য ছিলাম না, তার পরও সবাই আমাকে সম্মান করতেন। জিজ্ঞাসা করলেন, সারওয়ার ভাই কী বলেন? এটি আমার জীবনের অন্যতম কঠিন সমস্যা ছিল। কাল ইত্তেফাক বেরোবে কি বেরোবে না? এক ভাই বললেন, আমার এই লেখাটি না ছাপা হলে কাল পত্রিকা বেরোবে না। অন্যজন বললেন—না, এটি ছাপা হবে না। একটি লেখা নিয়ে দুই ভাই মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেলেন। লেখাটি ছাপা হবে কি না মধ্যস্থতা করার দায়িত্ব ছিল আমার। দুজনের বিরোধ চরমে উঠল। দুজনই শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত দিলেন, কাল ইত্তেফাক প্রকাশিত হবে না। ইউনিয়নের সবাইকে নিয়ে বসলাম। আলাপ করে বললাম, দুই ভাইয়ের এখন যে অবস্থা, তাতে পত্রিকা যদি একবার বন্ধ হয়ে যায়, আবার বের করা কঠিন হবে। ফলে পত্রিকা বন্ধ করা যাবে না। কিন্তু এক ভাই বললেন, ‘সারওয়ার সাহেব যেকোনো কিছুর বিনিময়ে আপনি একটি দিনের জন্য পত্রিকা বন্ধ রাখেন।’ কিন্তু আমি অনড়, সেটি করা যাবে না। আমাদের মিটিং হচ্ছে। ইত্তেফাকে আমার রুমের দক্ষিণ দিকের জানালাটি সব সময় খোলা থাকত। পাশে ভবন ছিল। সেখান থেকে রাতের ১১টা কি ১২টায় শুধু আমাকে টার্গেট করে একটি গুলি করা হলো। জীবন-মৃত্যু তো আল্লাহর হাতে, সে কারণেই বোধ হয় বসে ছিলাম, হঠাত্ দাঁড়িয়ে গেলাম। মান্নান নামের একটি ছেলেও ছিল মিটিংয়ে। সে বসে ছিল, হঠাত্ দাঁড়িয়ে গেল। ফলে আড়াল হয়ে গেলাম। গুলিটি আমার মাথায় না লেগে তার মাথায় লাগল। সঙ্গে সঙ্গে সে মারা গেল।  

যুগান্তরে কিভাবে সাফল্য পেয়েছেন?
এক বছরের মধ্যে ঢাকা ও সারা দেশে একটি শীর্ষ পত্রিকা, যেটির নাম আমরা সবাই জানি, সেটিকে ‘যুগান্তর’ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এর অনেক রহস্যের একটি—প্রত্যন্ত অঞ্চলের খবর তো আমরা রাখি না, তেমন ছাপিও না। যুগান্তর প্রকাশের তিন মাস আগে থেকে আক্ষরিক অর্থেই টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া ছুটেছি। দিন ছিল না, রাত ছিল না, সারা বাংলাদেশ সফর করেছি, মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। যেখানে কোনো দিন পত্রিকা যেত না, যেখানে এক দিন পর পৌঁছাত, উত্তরবঙ্গের এমন সব জায়গায় পত্রিকাটি দিনে দিনে পৌঁছে দিয়েছি। এতে আমাদের অনেক টাকা লস হয়েছে, লাখ লাখ টাকা অপচয় করেছি। সেসব এলাকায় পত্রিকা পৌঁছাতে ২০ টাকা খরচ পড়ত। কিন্তু আমি বলেছি, কোনো কথা নেই, পত্রিকা যেতে হবে। এই যে নতুন বাজার খুঁজে সেটি সৃষ্টি করা, প্রত্যন্ত অঞ্চলে খবর পৌঁছে দেওয়া—সুস্পষ্ট ভাষায় দাবি করব, যুগান্তরই সেটি করেছে, নতুন পাঠক সৃষ্টি করেছে।

ব্রেক থ্রু?
ডা. এইচ বি এম ইকবালের সেই ছবিটি। মিছিলে তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে সন্ত্রাসীরা গুলি ছুড়ছে। ছবিটিতে তাঁর হাত এমনভাবে আছে যে মনে হয় তিনিই গুলি ছুড়ছেন, আসলে তিনি করেননি। তত্কালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে খুব হূদ্যতা ছিল। ছবিটি না ছাপার জন্য তিনি বহু অনুরোধ করেছেন, ‘সারওয়ার ভাই, ছবিটি ছাপবেন না।’ বলেছি, ‘তাহলে আমার একটিমাত্র বিকল্প আছে, সম্পাদকের পদ ছেড়ে দিতে হবে। কারণ সবাই জানেন, ছবিটি আমার কাছে আছে।’ আরো অনেকে টেলিফোন করে অনুরোধ করেছেন—‘ছবিটি আজ ছাপবেন না।’ তাঁদেরও বলেছি, ‘তাহলে আমাকে পত্রিকা ছেড়ে দিতে হবে।’ ছবিটি পাওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে যদি অন্য কাউকে ধার দিয়ে দেয়, সে আশঙ্কায় আলোকচিত্র সাংবাদিক কাজল হাজরাকে ডেকে তার নেগেটিভও সিজ করেছিলাম। বিভিন্ন পত্রিকা থেকেও ছবিটি দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছেন। ছাপানোর পর পত্রিকার কাটতি হু হু করে বেড়ে গেল। ইরাক যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর কেন জানি মনে হলো—এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হবে। যুদ্ধ শুরুর অল্প দিনের মধ্যে প্রতিদিন যুদ্ধের খবর নিয়ে মূল পত্রিকায় আলাদা চার পৃষ্ঠা প্রকাশ করা শুরু করলাম। আলাদা ডেস্ক করলাম, লোক দিলাম। তাঁরা যুদ্ধের খবরাখবর লিখতেন। যুদ্ধটি এ দেশের মুসলমানদের সেন্টিমেন্ট জড়িয়ে আছে তো, সেটিও আমাদের এসংক্রান্ত খরবগুলো ক্লিক করার কারণ। তখন আমাদের প্রেসে মাত্র একটি মেশিন ছিল। হকাররা লাইন দিয়ে পত্রিকা নিয়েছেন। পাঠকরা তাঁদের বলে রেখেছিলেন, যখনই যুগান্তর পাবেন, নিয়ে আসবেন। দুপুর ১২টা, ১টা পর্যন্ত পত্রিকা ছেপেছি। সেটিও যুগান্তরের বিশাল ব্রেক থ্রু। ইস্যুটি আসলেই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু, পিকআপ করা প্রয়োজন, সাংবাদিকদের এটি বুঝতে হবে।

শিরোনামে আপনাকে অনেকে অপ্রতিদ্বন্দ্বী মানেন।
ইত্তেফাক ট্র্যাডিশনাল ও কনজারভেটিভ পত্রিকা ছিল বলে আমার হাত-পা বাঁধা ছিল। হেডিং, খবর নিয়ে নানা ট্রিটমেন্ট দেওয়ার সুযোগ কম ছিল। সম্পাদক হিসেবে যুগান্তর ও সমকালে এগুলো করার সুযোগ পেয়েছি। আমি কিন্তু খুব খুঁতখুঁতে। যদিও জানি এটি খারাপ অভ্যাস। ইদানীং একটু বদমেজাজিও বটে। জানি না, এ হয়তো বয়সের জন্য হতে পারে। খুব খুঁতখুঁতে বলে বারবার একটি লেখার শিরোনাম দিই। মনে করি, স্মার্ট শিরোনাম ছাড়া একটি পত্রিকা পাঠকপ্রিয় হতে পারে না। পত্রিকায় সহসম্পাদকদের সৃজনশীলতা প্রদর্শনের সুযোগ সীমিত। একমাত্র স্মার্ট শিরোনাম দেওয়ার সময় তাঁদের কথা চিন্তাভাবনা করে নিজের সৃজনশীলতা প্রকাশের একটু হলেও সুযোগ থাকে। একেক খবরের শিরোনামের চরিত্রও একেক রকম। যেমন আজ সমকালে হেডিং আছে—‘মেঘ ভাঙা রোদ।’ তিন দিন পর রোদ উঠেছে, তাই মনে করেছি, হেডিংটি একটু অন্য রকম হোক। ভালো হেডিংয়ের জন্য ‘অনুপ্রাস’ খুব গুরুত্বপূর্ণ। একই শব্দের একাধিক ব্যবহারই অনুপ্রাস। শিরোনামে অনুপ্রাস যত বেশি, শিরোনাম তত শ্রুতিমধুর ও স্মার্ট। আমাদের কাগজ খুললেই অনুপ্রাসের অসংখ্য উদাহরণ পাওয়া যাবে। ‘বাংলাদেশের পাশে থাকুন’তেও অনুপ্রাসের ব্যবহার করেছি। ‘সংসদ ভেঙে দিয়ে সহায়ক সরকার’-এ ‘স’র তিনটি অনুপ্রাস আছে। এর মধ্যে কিন্তু কাব্যিক দ্যোতনাও আছে। ইংরেজি পত্রিকায় এ কাজ খুব সহজ, তাঁদের সুযোগও বেশি। দেশি-বিদেশি ইংরেজি পত্রিকা স্মার্ট হেডিংয়ের জন্য সব সময় শব্দের মিল রাখার চেষ্টা করে। যেমন—ডেইলি স্টার শিরোনাম করেছে, ‘ডাউন উইথ ডাউনপুর’। ডাউনের একাধিক ব্যবহার করেছে। তবে বাংলা পত্রিকায় এ ক্ষেত্রে একটু সময় দেওয়ার সুযোগ আছে। শিরোনামে একটু আলাদা থাকার চেষ্টা করি, প্রথাসিদ্ধ শিরোনামের বাইরে যাওয়া যায় কি না এ নিয়ে আমাদের সব সময় ভাবনা থাকে। অন্যরা এই হেডিং করবে জানি, কিন্তু আমরা করব না। ফলে সারা দিন বৃষ্টি হয়েছে, অন্য সব পত্রিকা হেডিং করেছে ‘ঢাকা থই থই’ ইত্যাদি, কিন্তু সমকালে হেডিং করেছি ‘হেমন্তে শ্রাবণধারা’। ‘শ্রাবণধারা’ রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে নেওয়া। ‘মাঠজুড়ে সোনারঙ ধান’, ‘আইসিইউ যেন সোনার হরিণ’, ‘শূন্য রেখাতেও বসবাস’—এমন অনেক শিরোনাম আছে। ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কেড়ে নিতে চায়’  থেকে শিরোনাম করেছি—‘ওরা আমার বুকের সন্তান কেড়ে নিয়ে যায়।’ গানটি যাঁর জানা নেই, তিনি শিরোনামটি লিখতে পারবেন না। খেলার হেডিংয়ে আজ সবাই লিখেছেন ‘হোয়াইটওয়াশ’। আমরা একটি শব্দ জুড়ে দিয়েছি—‘যাচ্ছেতাই হোয়াইটওয়াশ’। হোয়াইটওয়াশের তো একটি সীমা আছে। ছবিতেও এ কাজটি করি। ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি গণজাগরণ মঞ্চের সময় পুরো পাতা ছবি দিয়ে প্রথম পাতা করেছিলাম। শিরোনাম ‘আলোর পথযাত্রী’। সহকর্মীদের সঙ্গে আলাপ করলাম, এত বড় ঘটনা ঘটল—পাঁচ কলাম ছবি দিলাম, লেখা লিখলাম? একটু অন্য রকম করি না কেন? আমাদের ছবিটিও খুব ভালো ছিল। অন্য রকম শিরোনাম দেওয়ায় আমি আনন্দ বোধ করি।

এই বয়সেও এত পরিশ্রম করেন?
আমি সব সময় খবরের সঙ্গে থাকি। সন্ধ্যার পর থেকে বার্তা বিভাগে, রাত ২টা পর্যন্ত সজাগ থেকে সারা দুনিয়া তন্ন তন্ন করে খবর খুঁজি। আমার স্মার্টফোনে বিশ্বের ১০টি দেশের ৫০টি পত্রিকা আছে, সঙ্গে সঙ্গে আমি চেক করতে পারি। এ এক ধরনের রোগও। যখনই অফিসে ঢুকি রিপোর্টার, যাঁরা ডেস্কের দায়িত্বে আছেন, সবাই জানেন আই নো এভরিথিং। আমিই বরং জানাই টিভিতে, অনলাইনে স্ক্রল দেখাচ্ছে, খবরটি দেখেন। তাঁরাও জানেন, যেকোনো মুহূর্তে আমার টেলিফোন যাবে। আমি সব লক্ষ করি। খুঁতখুঁতে স্বভাবের কারণে শেষ মুহূর্তেও ক্যাপশন বদলে দিই। চরিত্র বদলেছে, অনেক কিছু ফিচারাইজড হয়েছে; কিন্তু আমি মনে করি, এর নাম তো সংবাদপত্র; ফলে প্রথম ও শেষ কথা ‘সংবাদ’। 

(২৩ অক্টোবর, দৈনিক সমকাল, ঢাকা)


মন্তব্য