kalerkantho


আইএলওতে ‘জনগণের অংশগ্রহণ’ অন্তর্ভুক্ত করেছি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, ‘অংশগ্রহণমূলক উন্নয়ন’-এর অন্যতম প্রবক্তা। ২৩ বছর আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) হয়ে নানা দেশে এই ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। রবীন্দ্রসংগীতেও তিনি অবদান রেখেছেন। ড. মোহাম্মদ আনিসুর রহমানের মুখোমুখি হয়েছেন তাঁরই ছাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক এম এম আকাশ। ছবি তুলেছেন হাবিবুর রহমান

৬ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



আইএলওতে ‘জনগণের অংশগ্রহণ’ অন্তর্ভুক্ত করেছি

২৫ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোয়ার্টারেই ছিলেন?
সেই ভয়াল রাতের কথা বলতে গেলেই হূদ্যন্ত্র বন্ধ হয়ে যায়। আমরা জগন্নাথ হলের উল্টো দিকের কোয়ার্টারে থাকতাম। ২৫ মার্চ রাত ১১টার আগে মিলিটারির পায়ের আওয়াজ পেয়ে জানালার পর্দা সরিয়ে দেখি, আমাদের ভবনে সামনে দাঁড়িয়ে কামান, বন্দুক তাক করে ওরা জগন্নাথ হলের দিকে পজিশন নিচ্ছে। বাঁচার তাগিদে বারান্দা দিয়ে বেরিয়ে মূল দরজায় একটি বড় তালা ঝুলিয়ে ড্রয়িংরুমে ঢুকে ভেতর থেকে দরজা আটকে ভেতরের ঘরের বাথরুমে স্ত্রী, দুই মেয়ে, কাজের লোককে নিয়ে বসে পড়লাম। রাত ১১টায় আর্মিরা লাফিয়ে জগন্নাথ হলে ঢুকে ছাত্রদের টেনে বের করে অকথ্য অত্যাচার চালাল। তাদের দিয়ে গর্ত খুঁড়িয়ে সে গর্তে নামিয়ে গুলি করে মারল। অবস্থা দেখে ড. গোবিন্দচন্দ্র দেব বাসা থেকে দৌড়ে বেরোলেন। তারা সে অবস্থায়ই তাঁকে মেরে ফেলল। আমাদের কোয়ার্টারের নিচতলায় ড. জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা থাকতেন। তাঁকেও বাসা থেকে টেনে বের করে গুলি করে মারল।

আপনারা কিভাবে বাঁচলেন?
আমার বাসায় এসে ওরা একবার খুব জোরে বেল বাজাল। শুনেই স্ত্রীর হাত ধরে বললাম, ‘ইট ইজ অল ওভার।’ ডোরা একটি কথাই বলল, ‘বাচ্চাদের কথা ভাবছি।’ তালা পরীক্ষার পর ওদের বলতে শুনলাম, ‘এ শালা আগেই ভাগ গিয়া।’ ওরা ওপরে চলে গেল। পরদিনও বন্দি হয়ে রইলাম। সারাক্ষণ কানে ট্রানজিস্টার-রেডিও ধরে আছি। সকালে ঘোষণা হলো—‘কারফিউ তুলে নেওয়া হয়েছে, কাজে যোগদানের আদেশ দেওয়া হয়েছে।’ সাবধানে বাইরে গিয়ে তালা খুলে দেখি, সিঁড়িতে অনেক রক্ত। সহকর্মী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের রক্তের ওপর দিয়ে বড় মেয়েকে হাতে ধরে, ছোট মেয়েকে কাঁধে তুলে বেরোলাম। নিচতলায় আবদুর রাজ্জাক বাসা থেকে বেরিয়ে বললেন, ‘বাইরে চলে আসুন।’ আগে তিনি খুব ডাঁট মারতেন, আমাকে দেখিয়ে তাচ্ছিল্য করতেন, ‘ছেলে ঘাবড়াইয়া গেছে, তয় কিচ্ছু হইব না। মুজিব সব সামলাইয়া নিব।’ বাড়ির সামনে শ্যালককে দেখে সেগুনবাগিচায় শ্বশুরবাড়িতে চলে গেলাম।

দেশ ছাড়লেন কিভাবে?
মোখলেসুর রহমান সিধু ভাই খুঁজতে খুঁজতে আব্বার কাছে গিয়ে বললেন, ‘আনিসকে নিরাপদে নিয়ে যেতে এসেছি।’ তার আগে ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। প্রথমে সে বোধ হয় পালাচ্ছিল; কিন্তু পরে কী মনে করে স্বেচ্ছায় ধরা দিল। তার স্ত্রী হামিদা পশ্চিম পাকিস্তানি হলেও অনর্গল বাংলা বলতে পারে। যাওয়ার আগে সে ‘আমি মুজিবের সঙ্গে যাচ্ছি’ বলে ১০ হাজার টাকা দিল। লোক পারাপারে কাজে লাগতে পারে ভেবে টাকাগুলো সিধু ভাইকে দিলাম। আমাকে তিনি তাঁর গ্রামের বাড়ি মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ার বরাইদে নিয়ে গেলেন। আমি ‘দাগি’ বলে দ্রুত পার করতে পেশাদার মাছ চোরাচালানি ভাড়া করলেন। তারা বলল, ‘আপনাকে নিয়ে কোনো সমস্যা নেই।’ দেখতে পশ্চিমাদের মতো বলে রেহমান সোবহানকে বলল, ‘আপনাকে নিয়ে কী হবে জানি না। চলেন।’ নৌকায় যেতে যেতে দেখলাম লঞ্চ, বাস, নৌকায় স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়ছে। রেডিওতে শুনলাম, স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র চালু হয়েছে। লঞ্চে ওঠার পর রেহমানকে অনেকের সন্দেহ হলো বলে ওরা তার সঙ্গে কথা বলতে চাইল। বোধ হয় কিছুটা বোকার মতো আমি তার সঙ্গে জায়গা বদল করে কথা বলতে লাগলাম। তারা আমাকেও তার লোক বলে সন্দেহ করল। এক জায়গায় লঞ্চ থামার পর পরনের লুঙ্গি ধরে টানতে টানতে ‘পশ্চিমাদের দালাল’ বলে আমাকে কিল-চড়-ঘুষি মারতে লাগল। মুখ ফুলে গেল। বারবার বললাম, ‘ভুল করছেন।’ মুস্তাফা মনোয়ার আমাদের সঙ্গে থাকলেও এতক্ষণ একটি কথাও বলেনি, চুপচাপ ছিল। এবার সে ছোটাছুটি করতে করতে বারবার বলল, ‘এখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আছে?’ দুই-তিনটি তরুণ এগিয়ে আসার পর সে বলল, ‘এরা তোমাদের শিক্ষক। ভুল করে মারছে। বাঁচাও।’ ছাত্ররা আমাদের আগলে ধরল, কিল-ঘুষি খেল। স্থানীয়রা বলল, ‘আপনাদের শনাক্ত করা হবে। এখানে নামতে হবে।’ তারা সংগ্রাম পরিষদের অফিসে নিয়ে গেল। বল্লম হাতে গ্রামের লোকেরা তখন দাঁড়িয়ে আছে। আগের দিন ‘পাকিস্তানিদের সাহায্যকারী’ সন্দেহে দুজনকে জ্যান্ত পুঁতেছে। আমাদেরও তেমন সন্দেহ করছে। তবে ছাত্রদের বাধায় কিছু করতে পারছে না। পরিচয় দিলাম, ‘আমরা তোমাদের শিক্ষক।’ রেহমান তখন একটি ফোরামের মাধ্যমে ‘মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকারনামা’ প্রকাশ করত। সে কথা বললাম। এভাবে তাকে বাঁচালাম। তবে সে এখন বলছে, তাকে নাকি গান শুনিয়ে বাঁচিয়েছি। তখন গান গাওয়ার মতো অবস্থাই ছিল না। এই অংশ বাদে আমার সম্পর্কে তার বইতে লেখা কোনো কিছু নিয়ে বিতর্ক নেই।

খালেদ মোশাররফের সঙ্গে কিভাবে দেখা হলো?
সিধু ভাইয়ের লোক আমাদের মেজর খালেদ মোশাররফের হাতে তুলে দিল। এই প্রথম কোনো সেনানায়ক দেখলাম যে শেকসপিয়ার, রবীন্দ্রনাথের অনর্গল উদ্ধৃতি দিচ্ছে, তরুণদের যুদ্ধে যোগদানের জন্য তেজোদীপ্ত বক্তব্য রাখছে। সে ক্যাম্পে নিয়ে খাওয়াল। তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে দেখা হলে কী কী অস্ত্র, গোলাবারুদ প্রয়োজন তালিকা দিল। আমাদের তার জিপে তুলল। মাঝে ভুল করে পথ নেই এমন এক জায়গায় চলে এলো। তবে গ্রামবাসীদের ঘুম থেকে জাগিয়ে সে নতুন পথ তৈরি করে ত্রিপুরা সীমান্তে পৌঁছে দিল।

ভারতে গিয়ে তো অমর্ত্য সেনের সঙ্গে দেখা হলো?
সীমান্তের ওপারে আমাদের স্বাগত জানানোর জন্য তারা প্রস্তুত ছিল। কয়েক মিনিট সার্কিট হাউসে রেখে তারা প্লেনে তুলে দিল্লি পাঠিয়ে দিল। পরনের কাপড় পরেই দিল্লি পৌঁছলাম। আমরা প্রথমে অমর্ত্যর বাসায় উঠলাম। সুকুমার সেনের সঙ্গে দেখা হলো। পরিচয় গোপন রেখে অমর্ত্য আমাদের সম্মানে ডিনার পার্টি দিল। দিল্লিতে অশোক মিত্র আমাদের গ্রহণ করলেন। তাজউদ্দীন আগেই রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে পৌঁছে ছিলেন। এ কথাটিও রেহমানের বইতে নেই। সে বলে, সে সব জানে, লিখেছেও, ‘তাজউদ্দীন পরে গিয়েছেন!’ কয়েক মুহূর্তের জন্য ভারতীয় সেনা সদস্যরা আমাদের রুম থেকে সরে গিয়েছিল। তখন তাজউদ্দীন বলেছিলেন, ‘ফ্রম ফ্রাইং প্যান টু ফায়ার’।

যুদ্ধের সময় হার্ভার্ডে ছিলেন।
অন্যদের চেয়ে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ভালো বলে তাজউদ্দীনের সঙ্গে আলাপ করে আমি, ড. নুরুল ইসলাম ও ওয়াহিদুল হক মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গড়তে বিদেশে চলে গেলাম। রেহমানের বৈদেশিক যোগাযোগ তেমন নেই বলে গেল না। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘অশোক রায়’ নাম নিয়ে শিক্ষকতা করলাম। মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী কুষ্টিয়া স্বাধীন করে ফেললে উত্সাহের বশে স্ত্রী-কন্যাদের আমেরিকায় রেখে দেশে চলে এলাম। নভেম্বরে কুষ্টিয়ার অস্থায়ী সরকারের সঙ্গে কাজ করলাম। পরে বিদেশে গেলাম। স্বাধীনতার পর দেশে ফিরলাম।

পরিকল্পনা কমিশনে যোগ দিলেন কিভাবে?
দেশে ফেরার আগেই নুরুল ইসলাম টেলিফোনে বললেন, ‘পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দ্রুত যোগদান করো।’ উপায় নেই বলে ১৯৭২ সালের মাঝামাঝিতে যোগ দিলাম। অন্যদের বলেছি, ‘কমিশনে আপনারা থাকবেন, আমিও থাকব। তাহলে ছাত্রদের কারা পড়াবে?’ তাঁরা শিক্ষকতা চালিয়ে যাবেন বলে রাজি হলেও আমি বাদে আর কেউ ক্লাস নিতে যাননি। একমাত্র আমি সকাল ৮টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে কোর্স নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনে যেতাম। আমিসহ চারজনকে নিয়ে ‘চাকরি পুনর্গঠন কমিটি’ করা হলো। তখনো দেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আমলাতন্ত্রেরও কোনো লক্ষ্য নেই। শেখ মুজিব ও তাজউদ্দীনের বিরোধ বাড়ছে। কেবল দুই মন্ত্রী সাইকেল চালিয়ে অফিসে যাতায়াত করেন। একজন তাজউদ্দীন, অন্যজন আমি। তিনি অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী, আমি কমিশনের সদস্য হিসেবে এর চার্জে। ফাইল আমার হাত ঘুরে তাঁর কাছে যাওয়ার কথা; কিন্তু কোনো সরকারি ফাইল তাঁর কাছে যেত না। আমার কাছেও তেমন আসত না। তখন আমার ডাকে নানা জায়গায় অনেক ছাত্র-ছাত্রী দেশের কাজ করছে। গ্রামে মাটি ও খাল কাটছে, রাস্তা বানাচ্ছে, হালচাষ করছে। নিজে ১০টি কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের মাঠে নামিয়েছি। ছয়টি কলেজের হোস্টেলের ছেলে-মেয়েরা যোগাযোগ করে কাজে যোগ দিয়েছে। সপ্তাহে তিন দিন ক্লাস নিই, চার দিন ফিল্ডে থাকি, তাদের উদ্দীপ্ত করি।

জাসদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল?
তখন জাসদ হচ্ছে। প্রায়ই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গোলমাল হয়। ছাত্ররা বন্দুক নিয়ে মারামারি করে। শফিউল আলম প্রধান ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে হাজী মুহম্মদ মুহসিন হলে সাত ছাত্রকে খুন করল। এরপর জাসদ হলো। ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নূরে আলম সিদ্দিকীরা, পল্টন ময়দানে আ স ম আবদুর রবরা সম্মেলন করল। দুই দলই শেখ মুজিবকে আমন্ত্রণ জানাল। তিনি কোথাও গেলেন না। রবরা তাদের সম্মেলনে আমাকে আমন্ত্রণ জানাল। একে ‘সুযোগ’ মনে করলাম। তাকে বললাম, ‘আমি তো শেখ মুজিবের সঙ্গে তাঁর বিশ্বাস নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনে কাজ করছি। এখন তোমরা তাঁর রক্ত চাইছ, এ অবস্থায় তাঁকে না বলে তো সম্মেলনে যেতে পারি না।’ প্রধানমন্ত্রীর কাছে গিয়ে বললাম, ‘রবরা তাদের সম্মেলনে আমাকে চাইছে। বলেছি, আপনাকে না জিজ্ঞাসা করে তো কিছু করতে পারি না।’ তিনি খুব খুশি হলেন। এবার অস্ত্র প্রয়োগ করলাম, ‘আমি সেখানে যাব। আশা করি, রাজি হবেন। কারণ আপনি গণতন্ত্রে বিশ্বাসী।’ তিনি বললেন, ‘যেতে পারেন, ওদের দলে কয়েকটি ভালো ছেলে আছে। আপনার কাছে দেশ গড়ার কথা শুনবে। কিন্তু রাজনীতিতে থাকবেন না।’ ‘কেন থাকব? আমি তো রাজনীতি করি না। দেশ গড়ায় ছাত্রদের ভূমিকা নিয়ে বলব।’ জাসদের নেতারা বলেছিল, অনেকে সম্মেলনে আসবেন; কিন্তু আমি ছাড়া কেউ আসেনি। স্টেজে বসা সিরাজুল আলম খানের হাতে প্রধানমন্ত্রীর ‘ওকে’ করা লিখিত বক্তব্য তুলে দিলে খুব ডাঁটের সঙ্গে তিনি বললেন, ‘অনেক ধন্যবাদ, যেসব বুদ্ধিজীবী জনগণের সঙ্গে নেই, জনগণ তাঁদের কোনো দিন ক্ষমা করবে না।’ মাঠের প্রথম কয়েক সারিতে সাংবাদিকরা খুব অবাক হয়ে গেলেন, এ কাকে দেখছি! দেশ গঠনে ছাত্রদের ভূমিকা নিয়ে বক্তব্য দিয়ে সোজা প্রধানমন্ত্রীর কাছে চলে এলাম। সে সম্মেলনেই রবরা ‘মুজিববাদ’ পরিত্যাগের ঘোষণা দিল।

পিটার কাস্টার্সের সঙ্গে দেখা হয়েছিল?
নেদারল্যান্ডসের এই সাংবাদিক খুব মেধাবী ছিল, ট্রটস্কিপন্থী মার্ক্সবাদী। সে আসত, ‘মেধাবী’ বলে আমিও গল্প করতাম। কিন্তু একসময় সে জাসদের সঙ্গে যুক্ত হলো। কর্নেল তাহের, গণবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করল। তাকে বলেছিলাম, ‘জাসদের ছেলেরা তো দেশি, তারা যা করছে, সেসব আমাদের নিজস্ব ব্যাপার, কিন্তু তুমি তো বিদেশি। অনায়াসেই তোমাকে চেনা যাবে। এদের সঙ্গে কাজের অধিকার তোমার নেই। দেশ ছেড়ে চলে যাও।’ তখন সে আমাকে ‘কাওয়ার্ড’ বলে গালি দিয়ে বলল, ‘দেশে এখন বিপ্লবের পরিস্থিতি, বিপ্লব করতে রাজি নও?’ সে রংপুরসহ নানা জায়গায় যেত। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সে-ও ধরা পড়ল। তার ডায়েরিতে নানা লোকের টেলিফোন নম্বরের মধ্যে আমার নম্বরও ছিল। তার কাছ থেকে নম্বর পেয়েই বোধ হয় কর্নেল তাহের যোগাযোগ করেছিলেন। তবে সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্যবশত তখন ফিল্ডে যাচ্ছিলাম। প্রথমবার এমনকি দ্বিতীয়বারও ‘ফিল্ডে যাচ্ছি’ বলার পর তিনি হেসে দিলেন। এসব কিছুই বোধ হয় গোয়েন্দা রেকর্ডে ছিল।

তার আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি কেমন ছিল?
সংবিধানের মূলনীতি হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সমাজতন্ত্র’ পড়াতে চেয়েছিলাম। তবে এম এন হুদাসহ অন্যরা সেটি বাস্তবায়ন করতে দিতে চাননি। অর্থনীতি বিভাগের এক সেমিনারে কার্ল মার্ক্সের থিওরি নিয়ে আলোচনা করছি, তখনই তাঁরা আমাকে চ্যালেঞ্জ করলেন। কে টি (খন্দকার তোফাজ্জল) হোসেন বোধ হয় প্রথম বললেন, ‘কেন মার্ক্সকে আনছেন?’ উত্তর দিলাম, ‘আমরা তো ডিকশনারি দেখে পড়াই না (হাসি)। আমি সিলেকশন কমিটিতে আছি।’ তিনি বললেন, ‘আর নেই।’ যাতে মার্ক্সকে ক্লাসরুমে আনতে না পারি, অথর্ব শিক্ষক নিয়োগে বাধা দিতে না পারি, সে জন্য তাঁরা উপাচার্যের সঙ্গে পরামর্শ করে আমাকে সিলেকশন কমিটি থেকে বাদ দিলেন। এরপর তিনজন অখাদ্যকে প্রফেসর করা হলো। একেবারে অখাদ্য কে টি হোসেন আমাকে সরিয়ে দেওয়ার পর অধ্যাপক হয়ে গেলেন। ফলে উপাচার্যকে চিঠি দিলাম, ‘এতে বিভাগের মান শেষ হয়ে যাবে। এ নিয়োগগুলো পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।’ তিনি খুব চটে উত্তর দিলেন, ‘এতে তোমার কোনো এখতিয়ার নেই।’ চেয়ারম্যান এম এন হুদা ডেকে বললেন, ‘আপনাকে সোশ্যালিজমের কোর্স দেওয়া হবে। তবে আমরা ঠিক করেছি, এটি সুপারভাইজেশনের জন্য কমিটি করে দেব।’ বললাম, ‘একজন সিনিয়র প্রফেসর হিসেবে কোর্স নেব, সেটি সুপারভাইজ করবেন? মানে বুঝলাম না!’ সবাই হৈহৈ করে উঠলেন, ‘কোর্সটি আপনিই নেবেন। আমরা আপনাকে সাহায্য করতে চাই।’ উত্তর দিলাম, ‘আপনারা যদি কোর্সটি দিতে চান দিতে পারেন। কিন্তু আমি দিলে কোনো সাহায্য চাই না (হাসি)।’ এমন সময় দিল্লি থেকে এ কে (অমিয় কুমার) দাশগুপ্ত এসে টানা সাত দিন আর সি মজুমদার মিলনায়তনে সাতটি লেকচার দিলেন। ছাত্রদের প্রশ্নের পর নতুন অধ্যাপকরা তাঁকে প্রশ্ন করলেন। একজনের নামটি মনে করতে পারছি না, তিনি বললেন, ‘বুঝতে পেরেছি, তিনি ভাষণগুলো বই আকারে প্রকাশ করবেন। আমি সেটি পড়ে মন্তব্য দেওয়ার অধিকার রাখি।’ এই তাঁর অধ্যাপনার দৌড়। তবে কে টি হোসেন যা করলেন, অদ্ভুত! মনে আছে, তিনি বলেছিলেন, ‘আমাদের দাদু এসেছেন। আমরা ভয় পাচ্ছি, তিনি না একেবারে এসে পড়েন। আমরা ভাতে মারা যাই!’ তিনি ডিউক ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি। তারা পয়সা দিলে পিএইচডি দেয়। দেশে ফেরার জন্য যে প্লেনে টিকিট কেটেছিলেন, টিকিটে নামের আগে ড. কথাটি লেখা নেই দেখে তিনি প্লেন বদলেছিলেন! এরপর উপাচার্যকে বললাম, ‘আপনি বলতেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন ও অর্থনীতি বিভাগ আমাকে গর্বিত করে। সেই অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দিয়েছেন। এত নিম্নমানের অধ্যাপক নিয়োগ করায় আমি আপত্তি জানিয়েছি এবং আপনি তাতে উষ্মা প্রকাশ করেছেন। আমি বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে যাচ্ছি। তবে যাওয়ার আগে জনসাধারণের সামনে বিবৃতি দিয়ে আপনি কিভাবে বিশ্ববিদ্যালয়কে ধ্বংস করে দিচ্ছেন তা প্রকাশ করে দেব।’ তিনি ঘাবড়ে গেলেন, ‘না না, আনিস, আমি হয়তো ভুল করে ফেলেছি। এমন কিছু করো না। বলো কী চাও?’ বললাম, ‘আরেকটি নতুন বিভাগ খোলা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।’ তিনি সঙ্গে সঙ্গে রাজি, ‘খুলে দেব।’ ‘ইকোনমিকস’ নামে কোনো বিভাগ এম এন হুদারা খুলতে দেবেন না বলে বললাম। সেটির নাম হবে ‘ডিপার্টমেন্ট অব থিওরিটিক্যাল ইকোনমিকস’। অমর্ত্যর সঙ্গে আলাপ করে সিদ্ধান্ত হলো, যৌথভাবে বিভাগটি চালাব। বছরে কয়েক মাস ছুটি নিয়ে এসে সে পড়াবে।

বিদেশে গেলেন কিভাবে?
বিভাগ চালু করার আগে আগে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ব্যাংকক দপ্তরে কাজের আমন্ত্রণ এলো, গেলাম। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হলো ১৫ আগস্ট, আমার ফেরার কথা ১৯ আগস্ট। হত্যাকাণ্ডের পর স্ত্রীর টেলিগ্রাম পেলাম, ‘ডু নট কাম।’ ফলে নতুন বিভাগে যোগ দেওয়া হলো না। এ এম আজিজুর রহমান কিছুদিন চালালেন। চার ব্যাচ বেরোনোর পর সেটি বন্ধ হয়ে গেল। বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন উপাচার্য ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মিঞা বিএনপি করলেও একসঙ্গে শিক্ষক রাজনীতি, নির্বাচন করেছি বলে বন্ধুত্ব হয়েছিল। তিনি বললেন, ‘আমাকে যদি বন্ধু মনে করেন, তাহলে যা বলছি সেটিই আপনার জন্য সবচেয়ে ভালো মনে করবেন। এখন দেশে ফিরবেন না।’

এডিবি থেকে তো আংকটাডে গেলেন?
তাঁরা যখন জানলেন, আমাকে পাওয়া যাবে, প্রধান পরিচালক ফোন করে বললেন, ‘ডেপুটি চিফ অব রিসার্চ’ পদ খালি আছে। আপনাকে নিতে চাই, টিকিট পাঠাচ্ছি। মানে তাঁরা আমাকে নির্বাচিত করেছেন। গেলাম। তাঁরা বললেন, আপনাকে এই পদে নেওয়ার ক্ষেত্রে একমাত্র অসুবিধা, ন্যূনতম বয়স ৪৫ বছর হতে হবে। আপনার ৪০। তাই জাতিসংঘের সদর দপ্তরের অনুমতি নিতে হবে। বললাম, ‘অনুমতি নিন। আপনাদের কর্মকাণ্ডের ফাইল দিন। পড়ে ভেবে দেখি, এই পদে কাজ করব কি না।’ পড়ে পরদিন গিয়ে বললাম, ‘আর পড়ার দরকার নেই। বরং আমার কাজের অভিজ্ঞতা শোনাই।’ রংপুরে যেসব কাজ করেছি, বললাম। দেশে বন্যা হলে গ্রামের সাধারণ মানুষ নিজেরা উদ্যোগী হয়ে কিভাবে মোকাবেলা করে জানালাম। গ্রামের মানুষের নিজেদের ওপর নির্ভর করার সত্যি কাহিনিতে সবাই অবাক হয়ে গেলেন। তাঁদের উপদেষ্টা আলফ্রেড মেইজেস প্রথমে আমাকে নিতে রাজি হচ্ছিলেন না। তবে কথা শুনে ওপরতলা থেকে নিচে নেমে এলেন। পরে বললেন, ‘আপনার কথাগুলো খুব উদ্দীপনাময়। আপনি যে বলেছেন, এই পদে কাজ করতে পারবেন না, ঠিকই বলেছেন। কাজ করতে পারবেন এমন একটি পদে যোগদানের ব্যবস্থা করছি। আপনার তুলনায় ছোট চাকরি। কিন্তু যেভাবে মানুষকে সাহায্য করতে চান, পারবেন।’ এ বিষয়ে আমার প্রস্তাব ও ধারণাগুলো নিয়ে একটি প্রস্তাবনা তৈরির পরামর্শ দিলেন। তৈরি করে দিলাম। তিনিও আমার সম্মান বাঁচিয়ে গবেষণার চাকরিটি দিলেন। এ পদে এক বছর কাজ করেছি। অমর্ত্য ব্রিটেনের ব্রিস্টল ইউনিভার্সিটিতে অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবে দুই বছরের চুক্তিভিত্তিক চাকরির ব্যবস্থা করেছিল। তবে থিওরিটিক্যাল ইকোনমিকসের ভুবনে ফিরতে চাইনি, আগ্রহ মাঠপর্যায়ে চলে গেছে। মাঠে কাজের অনেক অভিজ্ঞতা হলো। ভারতের মহারাষ্ট্র ঘুরে ভূমিসেনাদের নিয়ে গবেষণা করে ‘অংশগ্রহণমূলক উন্নয়ন’ ধারণাটিকে প্রতিষ্ঠিত করেছি। জেনেভাকে মূল ভিত্তি রেখে ভূমিসেনাদের সঙ্গে কাজ করেছি।

আইএলওতে কিভাবে যোগ দিলেন?
আজিজুর রহমান, ধরম গাইরা তখন ওখানে। ভূমিসেনাদের ওপর আমার সেমিনার দেখার পর ধরম গাই তাঁর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ করে বললেন, ‘আমার সঙ্গে পরামর্শ না করে চাকরি নেবেন না।’ আইএলওতে আমার জন্য তিনি ‘পার্টিসিপেটরি অ্যাকশন রিসার্চ’র ওপর একটি পদ সৃষ্টি করলেন। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করতে হবে। প্রকল্পটি আইএলও অনেক বছর পরিচালনা করেছে। সেখানে ২৩ বছর ছিলাম। যোগ দিয়েছিলাম মিয়ানমারের রেঙ্গুনে। পরে ভারতের কেরালায়। মহাত্মা গান্ধীর সূত্রে ভারতের নানা অঞ্চলে গান্ধীবাদী আন্দোলনের ধারা ছড়িয়েছিল। সেগুলোতে কাজের সূত্রে বুদ্ধিজীবীরা তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের সঙ্গে কাজ করতেন। আন্দোলনকারীরা চরকায় সুতো বোনা থেকে শুরু করে অনেক কিছু করেছেন। কেরালায় দেখলাম, ‘কেরালা শাস্ত্র সাহিত্য পরিষদ’-এর বুদ্ধিজীবীরা প্রতি গ্রীষ্মে তৃণমূলে আন্দোলন করেন। এ আন্দোলনে জনগণের অংশগ্রহণের মূল্য আছে—এ ধারণাকে  পোক্ত ও বিস্তৃত করতে তাঁদের সাহায্য করেছি। তাঁরা আন্দোলন নিয়ে বড় সম্মেলনের আয়োজন করে প্রধান অতিথি হিসেবে আমাকে আমন্ত্রণ জানালেন। তবে সম্মেলনের দিন যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে মিসর এয়ারপোর্ট থেকে বিমান উড়তে পারল না। করাচি হয়ে যেতে চেষ্টা করলাম, পারিনি। তাঁরা মেইলে কাগজ পাঠিয়ে দিলেন। সেগুলো পড়ে দিকনির্দেশনা দিলাম। আইএলওতে বিভাগীয় প্রধানকে আমরা ‘মিস্টার জেইন’ নামে ডাকতাম। ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের খুব নিষ্ঠাবান উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন। ডেনিস হাডসন তখন ওয়ার্কার্স এডুকেশন ডিপার্টমেন্টের প্রধান ও আইএলওতে ট্রেড ইউনিয়নিস্টদের প্রতিনিধি। শ্রমিকদের সংগঠন বলে আইএলওতে তাঁরা খুব শক্তিশালী। হাডসনকে এড়িয়ে কিছুই করা যেত না। কোনো প্রস্তাব দিলে সেটি অনুমোদনের পর জেইন লিখতেন—‘আই হোপ ডেনিস হাডসন ইজ ইন পিকচার।’ ভেবে দেখলাম, হাডসনের সঙ্গে দেখা করব। তাঁকে রাজি করাতে না পারলে আবার পথে বেরোতে হবে। দেখা করলাম। তিনি আমার কথায় বারবার ‘ইয়েস, ইয়েস’ করছেন। বললাম, ‘আপনি নিশ্চয়ই জানেন, অনেক জায়গায়ই নন-ট্রেড ইউনিয়নিস্টরা কয়েক বছর কাজ করে মাঠ তৈরি করেছে। এরপর ট্রেড ইউনিয়ন হয়েছে। আমার দেশের উদাহরণ টানব না, কারণ সেখানে সব শ্রমিক সংগঠনই কোনো না কোনো দলের।’ এ সত্যি কথাটি তাঁকে স্পর্শ করল। তিনি বললেন, ‘আপনার দেশই একমাত্র দেশ নয়।’ এর পর আইএলও থেকে মিশন নিয়ে ভূমিসেনায় চলে গেলাম। তারা ১০-১২ বছর সংগ্রাম করে নিজস্ব কৃষিভূমি তৈরি করেছে। তাদের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে ‘ভূমিসেনার শ্রমিক সংগঠন আছে’ রিপোর্ট লিখলাম। হাডসনকে দিয়ে বললাম, ‘আপনার জন্য এটি আমার উপহার।’ পড়ে তিনি খুব খুশি হলেন। তাঁর মধ্যে সততা ছিল। বলেছিলেন, ‘ওয়েল ডান।’ সঙ্গে সঙ্গে উপলব্ধি হলো, আজ থেকে তাঁকে নিয়ে আর ভয় নেই। তিনি বাংলাদেশেও এসেছেন। ভূমিসেনার কালুরামও ঢাকায় এসেছিলেন। সেখানে থাকতেই আরলান্দো ফালর্স বোরদার সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। ভূমিসেনায় আমার কার্যক্রম নিয়ে লেখা পড়ে তিনি নিজেই চিঠি লিখেছিলেন, ‘ভূমিসেনার এই কাজের মধ্যেই পিপলস পার্টিসিপেশন অ্যাকশন রিসার্চের বেসিক স্টেটমেন্ট রয়েছে। এটাই আমার স্টেটমেন্ট যে এটিই সত্যিকারের পিপলস পার্টিসিপেশন।’

আর কোনো অভিজ্ঞতা?
আইএলওতে যাঁরা কাজ করতেন, তাঁরা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যেসব কাজের দায়িত্ব নিতেন, সেগুলোকে ‘মিশন’ বলতাম। কাজ সেরে এসে মিশন রিপোর্ট দিতে হতো। সে কাজগুলো তো করতামই, ‘নন-মিশন’ রিপোর্টও দিতাম। সেগুলো ডিরেক্টর জেনারেল পর্যন্ত যেত। আমার প্রস্তাবের পাশে ডিরেক্টর জেনারেল বরাবর লিখতেন, ‘আইএলওকে সমৃদ্ধ করতে তিনি এসব কাজ করেছেন। ফলে তাঁকে পূর্ণকালীন ভাতা দেওয়া হোক।’ কর্মীদের জন্য প্রযোজ্য নিয়ম ভেঙে গভর্নিং বডির অনুমতি নিয়ে তাঁরা আমাকে পূর্ণ ভাতা দিতেন। আমার কাজের ভিত্তিতে ফিলিপাইনে ‘সারিলাকাস (আত্মশক্তি)’ নামে সংগঠন হয়েছিল। আইএলওতে আমি ‘জনগণের অংশগ্রহণ’ অন্তর্ভুক্ত করেছি। আগে তারা মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক উন্নয়নে কাজ করত। আমি বললাম, ‘মালিক-কর্মচারীর সম্পর্ক উন্নয়ন নিয়ে যদি কাজ করেন, তা হলে বেশির ভাগ শ্রমিকই তো বাদ পড়ে যাবে। কারণ গ্রামীণ মজুরদের বেশির ভাগেরই তো নির্দিষ্ট মালিক নেই। কিন্তু তারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। তাদের কথাও ভাবতে হবে।’ ‘সারিলাকাস’ প্রকল্পে আইএলওর উন্নয়নের অভিজ্ঞতা থেকে আমি তাদের জন্য সহায়ক ভূমিকা নিতে অনুরোধ করলাম। তারা এ প্রস্তাবকে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে করল।

আইএলও থেকে দেশে ফিরে এসে?
১৯৯০ সালে আইএলও থেকে ফিরে এলাম। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী গণস্বাস্থ্যকেন্দ্র তৈরির সময় আমার মাধ্যমে গণবিশ্ববিদ্যালয় চালুর চেষ্টা করলেন। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য ছিলাম। তবে আইনগত অধিকার নিয়ে সমস্যা হলো বলে চলে এলাম। আইএলওর অভিজ্ঞতাকে দেশে প্রয়োগের ক্ষেত্র খুঁজছিলাম বলে গণগবেষণা করতে ‘রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ, বাংলাদেশ (রিব)’-এ কাজ করেছি। আমাদের গবেষণা ছিল, বাইরের শক্তি, দল বা নির্দেশে নয়—মানুষই তার সমস্যা খুঁজে বের করে আত্মশক্তিতে সমাধান করবে। বাইরের শক্তি কাজ করলেও সেটি সহায়ক শক্তি হবে। দেশের কোথায় এ ধরনের কাজ হচ্ছে খুঁজতে ৭০ জন সাংবাদিকের প্যানেল ছিল। এই মানুষদের নিয়ে বইও হয়েছে। ‘নিজেরা করি’, ‘হাঙ্গার প্রজেক্ট’, ‘ব্র্যাক’ আমাদের কাজ দেখে প্রকল্পটি চালুর জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। আমাদের ধারণায় নীলফামারীর সদর উপজেলার বাবরীঝাড় গ্রামে ‘কাজলী মডেল স্কুল’ হয়েছে। আমরা মানুষের সম্ভাবনা উসকে দিতাম, কর্তৃত্ব করতাম না। জেড বুকসে ‘পিপলস সেলফ ডেভেলপমেন্ট’ নামে আমার লেখাটি এ দর্শনের দালিলিক প্রমাণ। ধারণাটি আফ্রিকার এক উপজাতি গোষ্ঠীর কাছে পেয়েছি। জিম্বাবুয়েতে এক প্রশিক্ষণ কর্মশালায় বলেছিলাম, ‘স্থানীয় ভাষার মধ্যে এমন কোনো শব্দ খুঁজে বের করুন, সেটি এ প্রশিক্ষণের আসল কথাটি সুন্দর করে বলছে।’ তাঁরা ‘উগলুলানা’ ও ‘ওয়াকানা’ পেলেন। ‘উগলুলানা’ মানে ‘একে অন্যকে তৈরি করা’, ওয়াকানা অর্থ ‘একে অন্যের উন্নয়ন’। বাংলা করলাম, ‘আসুন আমরা পরস্পরকে নির্মাণ করি।’

গানের ভুবনে কিভাবে এলেন?
গান আমার নেশা ছিল; কিন্তু প্রথম দিকে একেবারেই গাইতে পারতাম না। লোকে মুখ টিপে হাসত, তবু গাইতাম। কলিম শরাফীও অনুত্সাহিত করতেন, ‘তালজ্ঞান ভালো; কিন্তু কণ্ঠ তো নেই। বাজনা শেখো না কেন?’ সৌভাগ্যবশত ভক্তিময় দাশগুপ্ত তখন কলকাতা থেকে এসে বুলবুল ললিতকলা একাডেমির রবীন্দ্রসংগীত বিভাগের প্রধান হলেন। তাঁর ক্লাসে যোগ দিলাম। তাঁর কারণেই সংগীতের মূল ক্ষেত্রে আসার সুযোগ হলো। তিনি শেখাতে শুরু করলেন। তিনি বলতেন, ‘হেমন্ত (মুখোপাধ্যায়) আর তুমি—এ দুজনকেই জীবনে কিছু দিয়েছি।’ বিদেশে গেলে বইয়ের দোকানে সংগীতে কণ্ঠ সাধনার বই খুঁজে খুঁজে কিনেছি। দিনের পর দিন কণ্ঠচর্চা করেছি। গাইতে গাইতে কলকাতায়ও নাম ছড়িয়ে গেল। কলিম ভাইও এই কণ্ঠকে স্বীকৃতি দিলেন। তিনি আমাকে খুব বিশ্বাস করতেন। সুচিত্রা মিত্র ঢাকায় এলে তাঁর বাসায় উঠতেন। দুজনে একসঙ্গে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গাইতেন। মুন্সীগঞ্জের কাছে এক অনুষ্ঠানে অনেক গান গাইলাম। শুনে সুচিত্রা বেশ খুশি হলেন। বারবার বললেন, ‘কী অসাধারণ গায়!’ প্রবর্তনায় কলিম ভাই ও আমাকে নিয়ে অনেক গানের অনুষ্ঠান হলো। তবলা ছাড়া গাইতাম। তিনিও তবলা ছাড়া প্রচুর গান গেয়েছেন। বাংলাদেশে ভারতের রাষ্ট্রদূত পররাষ্ট্র দপ্তরের এক অফিসারের বাসায় গান শুনে কলকাতায় জানিয়ে দিলেন, ‘এক অসাধারণ গায়কের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে, নিয়ে আসছি। দুই দিনের অনুষ্ঠান হবে।’ কলকাতার রবীন্দ্র সদনে গানের ব্যবস্থা হলো। রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, সাদী মহম্মদও আমন্ত্রিত হলো। আগের রাতে অমিয় বাগচীর বাসায় তাঁর স্ত্রী রত্না গান বেছে দিল। অনুষ্ঠানে যন্ত্রীদের সবাইকে নামিয়ে দিয়ে খালি গলায় প্রথম গাইলাম ‘বধূ মিছে রাগ করো না।’ এরপর দর্শকের অনুরোধে চারটি গান গাইলাম। মাঝে বলেছিলাম, ‘স্বাধীনতার একটিমাত্র ফসল, আমরা রবীন্দ্রসংগীত গাইতে পারি। এর বাইরে আর কোনো ফসল হয়নি।’ গাওয়া শেষ হলে মায়েরা সন্তানদের নিয়ে এসে বললেন, ‘আপনি মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ না করলে ওর গান হবে না।’

আপনার অসীমের স্পন্দন খুব আলোচিত বই।
এখানে আলোচিত হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গেও কিছুটা হয়েছে। অশোকদা, নীলিমা সেন খুব প্রশংসা করেছেন। অদিতি মহসিন আমার বইটি বিশ্বভারতীতে নিয়ে গিয়েছিল। সেখানেও আলোচিত হয়েছে। বন্যাও খুব পছন্দ করেছে।

শ্রুতলিখন : মাসুদ রানা আশিক
(৯ জুন ২০১৭, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক কোয়ার্টার)


মন্তব্য