kalerkantho


সব ফ্যাশন হাউসই আমার অভিজ্ঞতাকে গ্রহণ করেছে

আড়ংয়ের আজকের যে অবস্থান, তার অন্যতম নেপথ্য নায়ক তিনি। বাংলাদেশের প্রধান প্রায় সব ফ্যাশন হাউসের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন। এ দেশের ফ্যাশনশিল্প ও তাঁতিদের উন্নয়নে অনন্য ভূমিকা রেখেছেন চন্দ্রশেখর সাহা। তাঁর জীবনে আলো ফেলেছেন ওমর শাহেদ। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



সব ফ্যাশন হাউসই আমার অভিজ্ঞতাকে গ্রহণ করেছে

আপনার জন্ম? লেখাপড়া?
আমার জন্ম ১৯৫৫ সালে চট্টগ্রাম শহরে। গ্রামের বাড়ি রাঙ্গুনিয়া। বাবা প্রিয়নাথ সাহা, মা রেনুকা সাহা। বাবার চাকরি সূত্রে আমরা ডাবলমুরিং থানার উত্তর নালাপাড়ায় থাকতাম। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে আমি বড়। ছোট ভাই শৈবাল সাহাও ডিজাইনার। বোন ইন্দিরা সাহা চট্টগ্রামে থাকে। প্রাইমারি পড়েছি পিটিআই ট্রেনিং স্কুলে। স্কুলটি খুব ভালো, বাসা থেকে হেঁটেই যেতাম। পরে চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হলাম। ক্লাস এইটে এক বছর কুমিল্লা ঈশ্বর পাঠশালায় পড়েছি। রামলালা ছাত্রাবাসে থাকতাম। ফিরে এসে কলেজিয়েট স্কুল থেকে ম্যাট্রিক, চট্টগ্রাম কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করি।

আর্ট কলেজে পড়ার ইচ্ছা কেন হলো?
শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়েই আগ্রহ ছিল বেশি। অনেক দিন থেকেই আর্ট কলেজে ভর্তি হতে চেয়েছি। ম্যাট্রিক পাসের পর কাউকে না বলে ১৯৭৫ সালের আগে আর্ট কলেজে ভর্তির খবর নিতে মানুষজনকে জিজ্ঞাসা করে, খুব সাহস করে জীবনের প্রথম ঢাকায় এলাম। তবে ভর্তি পরীক্ষা শেষ হয়ে গেছে বলে ফিরে যেতে হলো। যথারীতি সাধারণ লেখাপড়া করতে হলো। তবে ভালো লাগেনি বলে এক বছর বিরতি দিয়ে চট্টগ্রাম আর্ট কলেজে ভর্তি হলাম।

সেই জীবন?
আর্ট কলেজের আমরা তৃতীয় ব্যাচ। তখন কলেজ গড়ে উঠছে। কলেজের অনুষ্ঠানগুলোর কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতাম। অনুষ্ঠান পরিকল্পনা, মঞ্চ সাজানো, আপ্যায়ন, স্মরণিকা প্রকাশ ইত্যাদি কাজ অনেক করেছি। সেই থেকে এখনো প্রেস, মুদ্রণ, গ্রাফিকস, সাজসজ্জা—এসবের সঙ্গে সম্পৃক্ত আছি। চট্টগ্রাম আর্ট কলেজে তিন বছর পড়েছি। কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ সবিহ-উল-আলম স্যার প্রত্যেক ছাত্র-ছাত্রীকে সমান চোখে দেখতেন। আবুল মোমেন নন্দনতত্ত্ব পড়াতেন। নন্দনতত্ত্ব্ব ভেতরে একেবারে গেঁথে দিয়েছেন। অনেক বন্ধু ছিল, খুব আড্ডা দিয়েছি, অনেক ঘুরেছি।

ঢাকা আর্ট কলেজে কবে এলেন?
১৯৭৮-৭৯ সালে ঢাকায় এসে মাস্টার্সে ভর্তি হলাম। আমার লক্ষ্যই ছিল, ঢাকা আর্ট কলেজে পড়ব। ফলে সেখান থেকে ট্রান্সফার হয়ে চলে এলাম। আমি ওরিয়েন্টাল আর্টের ছাত্র। হেড অব দ্য ডিপার্টমেন্ট হাশেম খান স্যার আমাকে আলাদা করে বোঝার চেষ্টা করেছেন। তিনি আমার কাজের মূল্যায়নও করতেন। তবে রেগুলার ক্লাস করা হয়ে উঠেনি। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে কাজ করলে কিছু পয়সা আসে, অন্যদের মতো শৌখিনতা, একটু সচ্ছলতার জন্য আমিও সেসব করেছি। দল বেঁধে সদরঘাটে বিরিয়ানি খেতাম, সিনেমা দেখতাম। সাইদুল হক জুইস, জেবা রশীদ চৌধুরী, ওয়াকিলুর রহমান, নিসার হোসেন, ঢালী আল মামুন তো আমার চট্টগ্রাম আর্ট কলেজের বন্ধু। এখানে এসে তাঁদের সঙ্গে সখ্য আরো বাড়ল।

আলাদা করে কারো কথা মনে পড়ে?
ছোটবেলা থেকে সিনেমা দেখতে পছন্দ করি। মায়ের সঙ্গে হলে গিয়ে ছবি দেখতাম। ঢাকায় মোহাম্মদ খসরুর সঙ্গে পরিচয় হলো। তখন ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলন তুঙ্গে। তিনি বিসিকে আলোকচিত্র বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি আমাকে অন্য ধারার ছবি, ইঙ্গমার বার্গম্যান, সের্গেই আইজেনস্টাইনসহ নামকরা পরিচালকদের ছবি দেখার সুযোগ করে দিয়েছেন।

ছবি আঁকার দিকে ঝুঁকলেন না কেন?
প্রথাগত একাডেমিক শিক্ষায় প্রাচ্যকলা বিভাগে পড়তে গিয়ে এবং ক্লাস ওয়ার্কের প্রয়োজনে যতটুকু আঁকতে হয়, ততটুকুই এঁকেছি। কিন্তু সেটিই যে আগামীর জীবন হতে পারে, সেই ভাবনা আমার ভেতরে ছিল না। লাইব্রেরি ওয়ার্ক করতাম, চিত্র প্রদর্শনী এখনো দেখি, ভালো লাগে। বিদেশে গেলে জাদুঘরের চিত্রশালা ঘুরে দেখি। ছবি দেখে ভেতরে উদ্দীপনা তৈরি হয়, কাজের স্পৃহা জাগে, কিন্তু নিজে কখনো পেশাজীবী হিসেবে ছবি আঁকিনি।

আড়ংয়ে যোগ দিলেন কিভাবে?
আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সিনিয়র ভাই অনীশ বড়ুয়া আড়ংয়ের পাবলিক রিলেশন অফিসার হিসেবে চাকরি করতেন। পাবলিকেশন বিভাগেও সম্পৃক্ত ছিলেন। একদিন তিনি বললেন, ‘আড়ংয়ে ডিজাইনার খুঁজছি, তুমি ইন্টারভিউ দাও।’ স্যার ফজলে হাসান আবেদের প্রথম স্ত্রী আয়েশা আবেদ এবং বিদেশ থেকে ইন্টেরিয়র ডিজাইনে পড়ালেখা করা সুরাইয়া হোসাইন (পুতুল) ইন্টারভিউ নিলেন। আয়েশা আবেদ যত দিন বেঁচে ছিলেন, তিনিই আড়ংয়ের প্রধান ছিলেন। তাঁরা পরদিনই যোগ দিতে বললেন। ১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারিতে যোগ দিলাম।

তখন আড়ংয়ের অবস্থা কেমন ছিল?
তখন সোবহানবাগের এমসিসি গার্ডেনে ছোট্ট এক অফিসে ছিল ‘আড়ং’। তখন এটি সবে শুরু হচ্ছে। ব্র্যাক ও এমসিসি মিলে তৈরি করছে। এমসিসি একে গড়ে তুলছিল। দুই বছর পর তারা সরে গেল। ব্র্যাক আড়ংয়ের পুরো দায়িত্ব নিল। সব কিছু নতুনভাবে গোছানো শুরু হলো। তখনই আমাদের সম্পৃক্ততা শুরু হলো। আমার আগে আড়ংয়ের সব ডিজাইনারই বিদেশি ছিলেন। আমি গিয়ে শুধু একজন দেশি ক্রাফটসম্যান পেয়েছি। আমি আড়ংয়ের একমাত্র ও প্রথম বাংলাদেশি ডিজাইনার ছিলাম। সেই আমলে এই নতুন প্রতিষ্ঠান দিনে ১০ হাজার টাকার পণ্য বিক্রি করত। আস্তে আস্তে কাজের চাপ বাড়ল। আর্ট কলেজ থেকে জুনিয়রদের সহযোগী হিসেবে নিলাম। আড়ংয়ে কারুশিল্প, হস্তশিল্প, রুপার গয়না বিক্রির জন্য আলাদা সেকশন ছিল। তবে জানতাম না, আমার ভাগ্য এখানে নির্ধারিত হয়ে গেছে। ২০টি বছর নিজের জীবন বলতে কিছু ছিল না। প্রতিদিন নতুন অ্যাসাইনমেন্ট, নতুন ভাবনা ভাবতে হতো। তখন, এখনো আমার পুরো জীবনটাজুড়েই আছে আমাদের তাঁতশিল্প, তাঁতি, শহর, গ্রামের মানুষের রুচি-পছন্দ, তাঁদের প্রয়োজন। আড়ংয়ের প্রবৃদ্ধি বাড়াতে প্রতিদিন নতুন বিষয় নিয়ে কাজ করতাম। আড়ংয়ের পণ্যগুলোর মান ও বৈচিত্র্য এক দিনে তৈরি হয়নি। অমরা নানা পণ্যের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের ভাবনা যুক্ত করেছি। সবাই মিলে নতুন পণ্যের আইডিয়া করেছি। ২০ বছর ধরে প্রক্রিয়াটি চলেছে, এখনো চলছে।

নতুন পণ্যের ধারণাগুলো কিভাবে তৈরি করেছেন?
একবার ঢাকায় একটি পাঞ্জাবির সন্ধান পেলাম, বোতামগুলো বাঁশের। রাজশাহীর চরঘাট উপজেলার থানাপাড়ার একদল তাঁতির কাজ এটি। পরে তাদের সঙ্গে আমি কাজও করেছি। নিজেও তাদের পাঞ্জাবি চট্টগ্রামে কিনে নিয়ে গিয়েছি। এ পাঞ্জাবি আমরা আড়ংয়ের মাধ্যমে বিপণন শুরু করলাম। এভাবে সারা দেশে আড়ং পাঞ্জাবির ঈদের ট্রেন্ড নিয়ে এলো। ১৯৮১ সালে সিল্ক সুতার সঙ্গে কটন সুতা মিলিয়ে ‘অ্যান্ডি’ নামে পরিচিত কাপড়টিকে আমি প্রচলন করেছি। তখন মানিকগঞ্জে আমাদের প্রজেক্ট চলছিল। কাপড়টি একটু রাফ। এতে যে সিল্ক আছে, ক্রেতারা বুঝতে চান না। আড়ংয়ের মাধ্যমে একে নিম্ন-মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত, উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণির ফ্যাশনেবলদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছি। আমার আইডিয়া ছিল—কটন ও সিল্ক দিয়ে কাপড় বুনলে সেটিতে আরো উজ্জ্বলতা আসে, আরো সুন্দর, নতুন হয়। ধারণাটি সফল হয়েছে। তখন কারখানায় তৈরি পোশাকের দিকেই মানুষের ঝোঁক ছিল বেশি। সে অবস্থায় তাঁতের কাপড়ের শার্ট, পাঞ্জাবি, সালোয়ার-কামিজ বা টপসের কাপড় হতে পারে—তাঁতশিল্পের এই ইমেজটাও আড়ংয়ের মাধ্যমে ধীরে ধীরে বড় করতে হয়েছে। পাশাপাশি আড়ংয়ের ব্র্যান্ড ইমেজও বাড়াতে হয়েছে। রুপার গয়না নিম্ন শ্রেণির লোকেরা পরে—এমনটিই ধারণা ছিল। সে গয়নাকে আমরা ফ্যাশনের অংশ করতে পেরেছি। ২০ বছর আড়ংয়ের ডিজাইন স্টুডিওর দায়িত্বে ছিলাম। প্রথম দিকে একাই স্টুডিওতে ছিলাম। পরে মাহিন খান যোগ দেন। আমার কাজের ক্ষেত্র ছিল—প্রডাক্ট ডেভেলপমেন্ট। নতুন নতুন পণ্যের আইডিয়া করা। যেমন—ইউরোপীয়রা মোমবাতিকে আলাদাভাবে দেখে। অথচ আমাদের এখানে মোমবাতি মাজার, মন্দিরে থাকে। সাধারণ মোমবাতিই অনেক রঙের হতে পারে—এ ধারণাটি তখন এ দেশে ছিল না। সেটিকে আমরা জন্মদিনের উপহার হিসেবে নিয়ে আসতে পেরেছি। এভাবে একের পর এক পণ্যকে নতুনভাবে ক্রেতার সামনে নিয়ে এলাম। গয়নার বাক্স, ফটোফ্রেম ইত্যাদিকে মানুষের শখের পণ্য করে ফেলতে পেরেছি। তখন সুন্দর বিছানার চাদর বলতেই ভারতীয় চাদর বোঝাত। কলকাতায় কোনো কাজে বা ঘুরতে গেলে মানুষ দুই-চারটি চাদর কিনে আনত। এমন অনেক কিছুই আছে। শতরঞ্জি আগেও ছিল। তবে সেটিকে মানুষ পা মুছতে পাপোশ হিসেবে ব্যবহার করত। একে আমরা ফ্যাশনের জায়গায় নিয়ে এসেছি। আসলে মানুষের গ্রহণযোগ্যতা, আকাঙ্ক্ষা, সুখ ইত্যাদি মিলিয়ে আমরা কাজ করেছি। দীর্ঘদিন ধরে আড়ংকে ক্রেতার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে পণ্যগুলোর নকশা, পরিকল্পনা, রং ইত্যাদি বিষয়ে খুব খেয়াল রাখতে হয়েছে, নিত্যই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয়েছে। রাজশাহীতে সিল্কের শাড়ির পরিবর্তন, টাঙ্গাইলের সুতির শাড়িতে সিল্কের আঁচল দেওয়া আমার আইডিয়া। তখন আড়ংয়ের শক্তিশালী ডিজাইন টিম ছিল। তাঁরা খুব আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করেছেন। আড়ং দেশীয় কারুশিল্পীদের যেটুকু দক্ষতা, নিপুণতা ও বংশপরম্পরায় যেটুকু অভিজ্ঞতা এখনো বেঁচে আছে, সেটির ইতিহাস ঘেঁটে, কল্পনাকে মিশিয়ে পণ্য তৈরি করছে। প্রতিটি পণ্য কিভাবে কাজ করে, সেগুলোর সময়োপযোগী বিশ্লেষণ—এগুলো সবই প্রায়োগিক বিষয়। এই কাজের নেপথ্যের নায়ক ডিজাইন স্টুডিওর ডিজাইনাররা। ইসলামিক স্থাপত্য, টেরাকোটার ডিজাইন থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে আমরা ঈদ পাঞ্জাবির কালেকশন তৈরি করেছি। আমরা প্রতিবছর পাঞ্জাবিতে নতুনত্ব আনতাম। কালার ম্যাচিং পাঞ্জাবি চালু করেছি। এটিই আড়ংয়ের ব্র্যান্ড ইমেজ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। কুশন কাভার কেনার জন্য আগে সবাই নিউ মার্কেটে যেতেন। তবে আমরা বিছানা চাদর থেকে শুরু করে সবই নতুন আঙ্গিকে তৈরি করেছি। হ্যান্ডমেইড, বাঁশের জিনিস বানিয়েছি। নকশি কাঁথা, পাটি থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েও পোশাকের ডিজাইন করেছি। সব কিছু থেকেই অনুপ্রেরণা নিয়ে কাজের ধারা আড়ংয়ে ছিল। আমাদের দেশে যত হস্তশিল্পের উপকরণ আছে, তার সবই আড়ং পরিবর্তনের ধারায়, নতুন আইডিয়ায় ও ফাংশনাল প্রডাক্ট হিসেবে তুলে ধরেছে। নকশা হাতে সুঁই দিয়ে যে সেলাই করা যায়, এটি আড়ং মানিকগঞ্জের মেয়েদের মাধ্যমে চালু করেছে। রঙের বৈচিত্র্য আনার ক্ষেত্রেও আড়ংয়ের অনেক ভূমিকা আছে। তাঁতিদের মাধ্যমে কোটা সিল্ক, অ্যান্ডি সিল্ক, স্ট্রাইপ সিল্ক সবই আমরা চালু করেছি। কটন কাপড়ে বৈচিত্র্য এনেছি। তাঁতের কাপড় দিয়ে, মানুষের জীবনযাপনের জন্য, উত্সবের জন্য যা প্রয়োজন তার সব কিছুরই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয়েছে। আমরা কনসেপচ্যুয়াল ডিজাইন করেছি, কালার কম্বিনেশন, তাঁতিদের সাহায্য করে নতুন কাপড়, পণ্য তৈরি, হস্তশিল্পে আরো নতুন ডায়মেনশন তৈরির চেষ্টা করেছি। আবেদ সাহেবও আমাদের বোর্ড মিটিংয়ে আইডিয়া দিতেন। একটি মোড়া কিভাবে বানালে সেটি সাধারণ মোড়ার চেয়ে আলাদা হবে, সে ধরনের আইডিয়া আমরা কারুশিল্পীদের দিতাম। হ্যান্ডমেইড পেপার, বাঁশের জিনিসপত্র, রিকশা, নৌকাসহ আরো অনেক খুঁটিনাটি পণ্য নিয়ে কাজ করেছি। বিছানার চাদর থেকে সব ধরনের পণ্যই নতুন আঙ্গিকে তৈরি করেছি। আমাকে এসব পরিকল্পনা করতে হয়েছে। ঈদকে সামনে রেখে প্রতিবছর ক্রেতাদের জন্য পণ্যের আইডিয়া করতাম। ডিজাইন স্টুডিও প্রডিউসারদের মাধ্যমে সেগুলোর স্যাম্পল বানাত। এরপর পণ্যগুলো বাজারে আসত। এখন দেশের সব ফ্যাশন হাউস এভাবে কাজ করে। আড়ংয়ের ডিজাইন স্টুডিওর প্রধান হিসেবে এ কৃতিত্বের কিছু প্রশংসার আমিও দাবিদার।

এর মাঝে তো এনআইডিতে পড়তে গেলেন?
তাঁত নিয়ে আমার কোনো প্রশিক্ষণ বা লেখাপড়া ছিল না। এর আগে যেটুকু কাজ করেছি, সবই তাঁতিদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে। ১৯৮৫ সালে ভারতের গুজরাটের আহমেদাবাদের এনআইডিতে (ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডিজাইন) এক বছরের জন্য টেক্সটাইল ডিজাইন (টেক্সটাইল উইভিং ডিজাইন) পড়তে গেলাম। স্যার ফজলে হাসান আবেদের বন্ধু অশোক চ্যাটার্জি তখন এনআইডির এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর। এখনো তিনি আমাকে খুব স্নেহ করেন। তাঁদের দুজনের উদ্যোগে সেখানে পড়ার সুযোগ হলো। বাংলাদেশ থেকে আমি প্রথম ডিজাইনার, যিনি এনআইডিতে টেক্সটাইল ডিজাইন পড়েছেন। এটিও আমার জীবনের অন্যতম টার্নিং পয়েন্ট। এনআইডি এশিয়ার অন্যতম সেরা ডিজাইন ইনস্টিটিউট। ভারতের তাঁতশিল্পে সমৃদ্ধির পেছনে এর অনেক অবদান আছে। শিক্ষকরা উচ্চমানের। কোর্সটিও স্পেশাল। আগে টেক্সটাইল এত বিস্তারিতভাবে জানতাম না। সেখানে গিয়ে তাঁতিদের কাছে এসব শিখেছি। আহমেদাবাদে নিজের হাতে তাঁত, সুতা, রেশম সবই বুনতে হয়েছে। তাঁদের শিক্ষাব্যবস্থা এত ভালো যে কাপড় বুননের কৌশলগত সুবিধা-অসুবিধা, কিভাবে পরিকল্পনা করে কাজ করতে হয়, নকশা করতে হয়, সবই ডিজাইনারদের শিখতে হয়। সেখান থেকেই ভালোভাবে উইভিং ডিজাইন শিখেছি। নিজের হাতে তাঁত বুনতে পারার এ শিক্ষা ১৯৮৬ সালে দেশে ফেরার পর আমার কাজে লেগেছে। এর পর থেকে উইভিং ডিজাইনে আমার পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হলো। আগে তাঁতিরা আমাকে সাহায্য করতেন। ফেরার পর সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইলের জামদানি কারিগরসহ অন্যদের আমি আইডিয়া দিতে শুরু করলাম। তাঁরা সেটি বাস্তবায়ন করে কাপড়ের নমুনা দেখাতে শুরু করলেন। এরপর আমরা প্রডাকশনে যেতাম। আড়ংয়ের কাপড়গুলোর ডিজাইনেও নতুনত্ব আনলাম। আড়ং থেকে আমরা নরসিংদীসহ বিভিন্ন জায়গায় তাঁতিদের দক্ষতার বিকাশ ঘটিয়েছি। তাঁদের বলেছি, ‘আপনারা আপনাদের মতোই কাপড় বুনবেন, তবে জমিন এভাবে দেবেন, এই রং দেবেন।’ তাঁরা সেসব কাজ করেছেন। উইভিং ডিজাইনে এমন কোনো বিষয় নেই, যেখানে আমি কাজ করিনি। সিরাজগঞ্জে লুঙ্গি-গামছার ডিজাইন দিয়েছি, শাহজাদপুরে তাঁতের শাড়িতে অ্যান্ডির সুতা ব্যবহার করে আঁচল তৈরি করেছি, কে-ক্রাফটের মাধ্যমে চাকমা কাপড়ের অনুপ্রেরণায় আদিবাসী শাড়ি তৈরি করেছি। তখন চাকমারা তাঁদের খাদি কাপড়ের আদলে অনেক কাপড় তৈরি করেছেন।

আড়ংয়ে লাইব্রেরিসহ আরো কাজ করেছেন।
মনে আছে—আড়ংয়ে ডিজাইনের ওপর একটিমাত্র বই ছিল। পরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ টাকা বরাদ্দ করল, আমরা বই সংগ্রহ শুরু করলাম। যথেষ্ট বই জোগাড় করেছি। নিজে বিভিন্ন জায়গা থেকে বই সংগ্রহ করে এনে লাইব্রেরিতে দিতাম। কাপড়ের স্যাম্পল জোগাড় করে এনে দিতাম। যতটুকু পেরেছি, সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করেছি। এখনো আড়ং তার প্রয়োজনে বই জোগাড় করে। বাংলাদেশের সব বুটিক শপ বা ফ্যাশন হাউসকে উত্সাহ দেওয়ার মতো লাইব্রেরি আড়ংয়ের আছে। সেখানে আমরা ডকুমেন্টেশন, আর্কাইভ গড়ে তুলেছি। আমরা কালেকশন করা হাজার হাজার কাপড়ের টুকরা স্পেসিফিক্যালি লিখে রেখেছি, ফটোগ্রাফের মাধ্যমে ডিজিটাল আর্কাইভ করেছি। এখন আড়ংয়ের ফটোগ্রাফি সেকশনও আছে, সবই বিদেশের মানদণ্ডে তৈরি। শেষের দিকে আমি ও মাহিন খান প্রডাক্ট ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার ছিলাম। ছেড়ে আমার সময় ডিজাইন স্টুডিওতে ২০-২৫ জন সহকর্মী রেখেছি। এখন সেখানে ৬০ জন ডিজাইনার আছেন।

ছেড়ে দেওয়ার পর?
এখানে জিটিজেডের (জার্মান অর্গানাইজেশন অব টেকনিক্যাল করপোরেশন) অধীনে ডিটিসি (ডিজাইন অ্যান্ড টেকনোলজি সেন্টার) নামের একটি প্রতিষ্ঠান এসেছিল। এটি ডিজাইন সেন্টার ছিল, জার্মানরাই চালাতেন। তাঁদের সঙ্গে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত কাজ করেছি। আমার কাজগুলো ছিল গবেষণামূলক। নানা কারিকুলাম ডেভেলপমেন্ট করতাম। ডিজাইন নিয়ে নতুন ভাবনা ভাবতাম, সেগুলোর উন্নয়ন করতাম। তাঁদের সঙ্গে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত কাজ করেছি। প্রডাক্ট ডিজাইন কী, কিভাবে হয়—এসব নিয়ে তাঁরা অনেক সেমিনার, ওয়ার্কশপ করেছেন, বিদেশ থেকেও ডিজাইনাররা এসেছেন, তাঁদের সঙ্গে কাজ করেছি।

এখান থেকেই তো আপনার প্রথম বই বেরোলো?
বাংলাদেশের কারা কারুশিল্প তৈরি করেছেন, সেগুলোর পরিকল্পনা কারা করেছেন, তাঁদের উদ্দেশ্যই বা কী—এসবের ওপর বিশ্লেষণধর্মী এ বইটি লিখেছি। আমাদের জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক দ্রব্যগুলোর পরিকল্পনা কারা করলেন, কেন করলেন—এসব নিয়েই ‘বিহাইন্ড দ্য প্রডাক্ট’ বা ‘দ্রব্যের অন্তরালে’ নামে ২০০৬ সালে বইটি প্রকাশিত হলো। আমার সহ-লেখক ডিটিসিতে সহকর্মী স্থপতি মাশরুর রহমান মিথুন। এসব ব্যাপারে তাঁরও আগ্রহ আছে। জার্মানির রাষ্ট্রীয় তহবিলে দুই বছর খেটে আমরা এটি তৈরি করেছি। এ ছাড়া সন্দেশের নকশা থেকে মোটিভ তৈরি করে কিভাবে আরো নকশা বানানো যায়, প্রক্রিয়াটি কী, সেগুলোর বিশ্লেষণ নিয়ে একটি বই লিখেছি। এটি দেখে যে কেউ নিজে নকশা বানাতে পারবেন। এখানে আসলে আমি ধারণা দিতে চেয়েছি। ধারণাগুলো থেকে নিজের সৃজনশীলতার মাধ্যমে পাঠকরা আরো অনেক নকশা বানাতে পারবেন। পুরো প্রক্রিয়াটি এতে দেওয়া আছে। বইটির নাম ‘সন্দেশ : ট্র্যাডিশনাল মোটিফস : থাউজেন্ড পসিবিলিটিস’।
বিভিন্ন জায়গায় ঘোরার ফলে আমার কাছে যেটুকু ছিল, আড়ংয়ের আর্কাইভ থেকে সহায়তা নিয়েছি, অ্যান্টিক ডিলারদের দোকান থেকেও অনেক ছাঁচ জোগাড় করেছি, অনেকের ব্যক্তিগত কালেকশন থেকে সাহায্য নিয়ে বইটি এ বছর প্রকাশ করেছি।

জামদানির মোটিভ নিয়ে আরেকটি বই করছেন।
‘বাংলাদেশ কারুশিল্প পরিষদ’ জামদানির মোটিভ বা নকশা সংরক্ষণের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছে। সেটির প্রধান মানে গবেষণার কাজটি কারুশিল্প পরিষদের প্রধান ডিজাইনার হিসেবে আমি করছি। আগে এখানে জামদানির মোটিভগুলো কী ছিল, এখন কী কী আছে, সেগুলোর ধরনই বা কী, দেখতে কেমন, নামগত বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি যতটুকু পাওয়া গেছে—সবই এতে থাকবে। আমরা ব্যক্তিগত সংগ্রহের পুরনো জামদানি, তাঁতিদের কালেকশন, বাজার ঘুরে শাড়ি থেকে মোটিভের ইমেজ জোগাড় করেছি। খুব শিগগিরই এটি প্রকাশিত হবে। এই পরিষদের সঙ্গে ১৯৮৭ সাল থেকে যুক্ত আছি। এখন দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট। আমরা এখানে স্বেচ্ছায় সেবা দিই। কারুশিল্পীদের নিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান করি। তাঁরা যাতে ঐতিহ্য চর্চার মাধ্যমে নিজ পেশায় থাকতে পারেন, সে জন্য পুরস্কার দিয়ে তাঁদের সম্মানিত করা হয়, বিভিন্ন বিপণন ব্যবস্থায় তাঁদের সংযুক্ত করা হয়। সাধ্যের ভেতরে এ দেশের কারুশিল্পীদের অনুপ্রেরণা দেওয়ার জন্য আমাদের যা যা করার প্রয়োজন হয়, আমরা করি। আমরা মেলা করি, বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁদের ক্রেতাদের সঙ্গে পরিচিত করাই।

প্রায় সব হাউসের সঙ্গেই কাজ করেছেন।
২০০১ সালের পর থেকে কোনো প্রতিষ্ঠানে স্থায়ীভাবে চাকরি করিনি। বাংলাদেশের সব ফ্যাশন হাউস তাদের উন্নয়নে আমার অভিজ্ঞতাকে পরামর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছে। নাগরদোলা তৈরির পুরো কনসেপ্টটি আমার। তারা আগে এটি অন্য প্যাটার্নের ছিল। অন্য হাউসগুলোর যখন যা প্রয়োজন হয়েছে—যেমন প্রদর্শনীর পরামর্শ, বুকলেট তৈরি, নতুন আইডিয়া দান, ডিজাইন স্টুডিও কেমন হবে সে আলোচনা, ঈদের কালেকশন কী হবে থেকে শুরু করে হাউসের ডিজাইন স্টুডিওকে সমৃদ্ধ করতে, ডিজাইনারদের ভালো করতে সব ধরনের পরামর্শ দেওয়ার চেষ্টা করি। দ্যাট ইজ মাই নলেজ, দ্যাট ইজ মাই এক্সপারটাইজ। তার বাইরে বাংলাদেশে যত কারুশিল্পী আছেন, তাঁদের সবার সঙ্গেই আমার কমবেশি যোগাযোগ আছে। এ ছাড়া নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি ও শান্ত-মারিয়ামে পড়াই।

নিরীক্ষাধর্মী কাজ ও প্রদর্শনী করেছেন।
আড়ংয়ের সঙ্গে জামদানির প্রদর্শনী করেছি, সেটিরও নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। আড়ংয়ের ৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে নকশি কাঁথা নিয়ে প্রদর্শনী করেছি। বহু আগে কে ক্রাফটের সঙ্গে খাদি সুতা নিয়ে তৈরি নানা রকমের পোশাকের পরিকল্পনা করে প্রদর্শনী করেছি। তাতে টাঙ্গাইলের তাঁতিরা আমাদের সহযোগিতা করেছেন। রঙের ব্যানারে মা দিবসে মাকে নিয়ে শিশুদের আঁকা ছবি, নারী দিবসে মাকে নিয়ে শিশুদের আঁকা ছবি প্রিন্ট করে সেটি কিভাবে টেক্সটাইল ডিজাইনে রূপান্তর করা যায় সেই প্রদর্শনী করেছি। অঞ্জনের সাহায্যে নরসিংদীর তাঁতিদের কাপড় নিয়ে জাতীয় জাদুঘরে প্রদর্শনী করেছি। পাট নিয়েও কাজ করেছি, পাটের সম্ভাবনা নিয়ে নিরীক্ষা হয়েছে, সে প্রদর্শনী প্রশংসিতও হয়েছে। 

মণিপুরিদের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা?
সে এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। কী বিচিত্র অভিজ্ঞতা যে হয়েছে, ভাবতেই পারিনি। সিলেটের মণিপুরিরা বয়নশিল্পে একসময় খুব উন্নত ছিল। তাঁতিরা প্রশংসিত তাঁতশিল্প তৈরি করতেন। রুচিশীল বাঙালির ঘরে ঘরে তাঁদের কালেকশন আছে। অনেকে গর্ব করে বলেন, আমার কালেকশনে তাঁদের তৈরি জামদানি আছে। কেউ কেউ আমাকে আফসোস করে বলেছেন, আমার কাছে একটি মণিপুরি শাড়ি থাকলে খুব খুশি হতাম। নানা কারণে তাঁদের তাঁতশিল্প ধ্বংসের মুখে চলে গিয়েছিল। তাঁরা সুতি সুতা ব্যবহার করতেন না, কোরিয়ান সুতা দিয়ে পোশাক বানাতেন। নকশায় বৈচিত্র্য ধরে রাখতে পারেননি, রঙের বৈচিত্র্যও ছিল না। গুণগতমান নিয়েও তাঁদের চিন্তা ছিল না। বছর দুই-তিন আগে, অক্সফাম আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়ে বলল, তাদের তাঁতশিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করুন। কমলগঞ্জে গেলাম। ৪০ থেকে ৫০ জন তাঁতিকে নিয়ে কর্মশালা করলাম। আসলে আমি তাঁদের কতগুলো ডিকটেশন দিয়েছিলাম। প্রথমেই বলেছি, ‘আপনাদের কার কাছে পূর্বপুরুষের পুরনো কী আছে, নিয়ে আসুন।’ প্রথমে কেউ কিছু আনেননি। পরে একজন পুরনো ছেঁড়া গামছা নিয়ে এলেন। সেটি খুব চমত্কার। বললাম, ‘এই গামছার আদলে আপনাদের গামছা বুনতে হবে। ঠিক যেভাবে আছে, সেভাবেই বানাবেন। তবে রং বদলে দেবেন, জমিনের রং কোরা দেবেন, কালো নকশা করবেন। ফিরে এসে আমি আপনাদের সবার কাজ দেখব।’ মণিপুরিদের টেকনিক অনুসারে কাপড় বুননের আইডিয়া দিয়ে তাঁদের কাজ দিলাম। তারপর স্বর্ণ উঠে এলো। এক বাড়ির উঠানে আমরা কাজ করতাম। তাঁদের কাজগুলো যখন সে উঠানে টাঙানো হলো, চোখের জল আটকে রাখতে পারিনি—এত সুন্দর কাজ এই তাঁতিরা কিভাবে করলেন? আমি তাঁদের সঙ্গে আমার কাজের ক্ষেত্রটি বুঝে গেলাম। এরপর ক্রিয়েটিভ ওয়ার্কশপ করলাম। সেখানে কিভাবে আঁচল বুনতে হয়, কিভাবে মোটিভের মৌলিকত্ব ধরে রেখে, ঐতিহ্য মেনে কাজ করতে হয় দেখালাম। নতুন কাজ মানে কী—এই ভাবনাটি, চলটিই তাঁদের মধ্যে ছিল না। কেনই বা তাঁরা এভাবে কাজ করবেন? মহাজন যেভাবে বলে সেভাবেই তাঁরা কাজ করেন। এখানে তাঁরা কাজের স্বাধীনতা পেলেন, নিজেদের আবিষ্কার করার সুযোগ পেলেন। নিজেদের বিশেষ সৌন্দর্যকে আবিষ্কার করলেন। পরে ঢাকার কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে তাঁদের কাজের প্রদর্শনী হলো। প্রদর্শনীর পর মানুষ সত্যিই অবাক হয়ে গেল, তাঁতিরাও অবাক হলেন! এখন আবার তাঁরা তাঁদের ঐতিহ্যে কাজ করছেন, ভালো কাজ হচ্ছে।

এমন আরো অনেক প্রকল্পে কাজ করেছেন।
আমার প্রতিটি কর্মশালায় নতুন কিছু ঘটেছে। যেমন পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারের আশপাশের দুটি গ্রামের মৃৎশল্পীদের নিয়ে ইউনেসকোর সঙ্গে প্রকল্প করেছি। এই মৃিশল্পীরা খুব গরিব, মাটির হাঁড়ি-পাতিল বানান। নিজেরাও কোনো দিন নিজেদের সমাজের ভালো সম্প্রদায় ভাবেননি, সমাজও  স্বীকৃতি দেয়নি। ফলে তাঁরা নিজেদের খুব ছোট ভাবতেন। তাঁদের ভেতরে যে শিল্পীসত্তা, সৃজনশীলতার ক্ষমতা আছে—আমি শুধু সেটি আবিষ্কার করিয়ে দিয়ে তাঁদের সেটির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছি। কর্মশালায় একটি কথাই বলেছি, ‘আপনারা মহাজনের কাছ থেকে দাদন নেওয়া শ্রমিক নন, মৃত্ কারিগর নন, আপনারা এক একজন শিল্পী। মানুষের সৌন্দর্য চেতনার পরিচয় তৈরি করা আপনাদের কাজ, সেই পরিচয়ের মাধ্যমে যে ক্রেতা আপনার তৈরি শিল্পকর্মটি তাঁর বাসায় বা অফিসে রাখবেন, তিনি যেন এটির গুরুত্ব অনুভব করতে পারেন, নতুন জগতের সন্ধান পান—এটিই আপনার কাজ।’ তাঁরা সেটি খুব ভালোভাবেই করেছেন। সেই সাহস থেকেই তাঁরা কাজ করেছেন। তাঁদের সব কাজই অনন্য হয়েছে। তাঁদের কাজগুলো ঢাকায় এনে জাতীয় জাদুঘরে আট দিনের প্রদর্শনী করা হলো। তাঁদের কাজ দেখে এই শহরের অভিজাত সমাজ, সৃজনশীল মানুষ, চারুকলার শিক্ষকরা আশ্চর্য, মুগ্ধ হয়ে গেলেন। কর্মশালায় এত দর্শনার্থী হলো, এত মানুষ তাঁদের মাটির পণ্যগুলো সংগ্রহে আগ্রহ দেখালেন যে তাঁরা খুব সম্মানিত হলেন। চারুকলা ইনস্টিটিউট তাঁদের আমন্ত্রণ জানালো। তাঁরা সেখানে গিয়ে সকালের নাশতা খেলেন, সব ঘুরে দেখলেন। অথচ অসচ্ছলতায় তাঁরা কেউ জীবনে ঢাকায় আসতে পারেননি। তাঁদের জগিট বদলে গেল। আড়ং খুব আগ্রহ নিয়ে তাঁদের তালিকাভুক্ত করেছে। তাঁদের নিয়ে তারা সারা বছর কাজ করবে। আরো অনেকে আগ্রহ দেখিয়েছে। ফলে আমাদের আসল লক্ষ্য তাঁদের অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য ঘটেছে। এই কাজটি ইউনেসকো বাংলাদেশ ক্রাফটস কাউন্সিলকে দিয়েছিল। কাউন্সিলের সভাপতি হিসেবে আমি এর মূল দায়িত্বে ছিলাম। কিছুদিন পর তাদের আরেকটি প্রদর্শনী হবে।

আপনার নিজেরও তো বিশাল সংগ্রহ আছে?
আসলে ক্রাফট অ্যান্ড টেক্সটাইলে আমার আগ্রহ আছে। যখন যেখানে যাই, চামচ থেকে কুলো—সবই সংগ্রহ করি। যা রাখলে ভালো লাগবে মনে হয়েছে, যার কাছে আছে, তিনি আমাকে সহজে দেবেন বলে মনে হয়েছে, সেসব সংগ্রহ করেছি। শোলা থেকে শুরু করে বাংলাদেশের কারুশিল্পীরা যত উপকরণ দিয়ে কাজ করেন, যত পণ্য তৈরি করেন, সেগুলোর কিছু না কিছু নমুনা আমার কাছে আছে।

এসএমই ফাউন্ডেশনের সঙ্গে কিভাবে যুক্ত হলেন?
এসএমই ফাউন্ডেশন (প্রমোট স্মল অ্যান্ড মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজেস) তাদের পোশাক নিয়ে যেসব ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা কাজ করেন, তাঁদের সাহায্য করার জন্য একটি কারিকুলাম তৈরি করতে আমার সহায়তা চাইলেন। সেভাবেই সম্পৃক্ত হলাম। ছয় বছর ধরে সেখানে কোর্স করাই। ছয় দিনের প্রতিটি কোর্সে মানুষ বদলে যায়। রিসোর্স পারসন হিসেবে আমি ক্লাস নেই, মতামত দিই।

ব্যক্তিগত জীবন?
১৯৮৭ সালে বিয়ে করেছি। স্ত্রী আলপনা চৌধুরী, বিএএফ শাহীন কলেজের শিক্ষক ছিলেন। সম্প্রতি অবসরে গেছেন। আমাদের এক ছেলে, এক মেয়ে। মেয়েটি বড়—অকিলা সাহা, ফ্যাশন ডিজাইনিং পড়ছে। ছেলে অরিন্দ সাহা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে।

শ্রুতলিখন : তারেক মুসা
(৩ মে ২০১৭, উত্তরা, ঢাকা)



মন্তব্য