kalerkantho


প্রত্যেকে আমাকে সম্মান করেছেন



প্রত্যেকে আমাকে সম্মান করেছেন

এ দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে অসামান্য অবদান তাঁর। প্রতিষ্ঠা করেছেন নারায়ণগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজ। খ্যাতির শিখরে তুলেছেন ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজকে। প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্বভার নিয়েছেন সাউথ পয়েন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের। অধ্যক্ষ হামিদা আলীর সেই জীবনের গল্প শুনেছেন ওমর শাহেদ। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

 

শিক্ষকতার শুরু কিভাবে হলো?

১৯৬৪ সালের কথা। কিছুদিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এমএ পাশ করেছি। নারায়ণগঞ্জে ইংলিশ প্রিপারেটরি স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা মিসেস স্টুয়ার্ট তিন মাসের ছুটিতে দেশে যাবেন। আমার মামাশ্বশুরের কানে গেল, সেখানে এই পদটি খালি হবে। তিনি তাঁর বোনের জামাই, আমার স্বামীর পরিবারের প্রধান মুনশি সাহেবকে বললেন, ‘আমি তো হামিদার জন্য খুব ভালো একটি চাকরি জোগাড় করেছি।’ তিনি শুয়ে ছিলেন। কথাটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসলেন—‘তোমার সাহস কত? আমার বাড়ির বউ চাকরি করবে, কী করে ভাবলে?’ তখন তিনি বললেন, ‘ভাবতে হবে। আপনার ছেলে-মেয়েরা লেখাপড়া করছে, তারা যদি দেখে, সে সংসারসহ সব কিছু ঠিক রেখে চাকরি করছে, তা আপনার পরিবারের জন্য শিক্ষা নয়? আমি কোনো কথা শুনব না। ইংলিশ প্রিপারেটরি স্কুলের হেড মিস্ট্রেস ছুটিতে। ছুটিকালীন সময়ে এত ভালো পজিশনে তাঁকে যোগদান করতে হবে। সুতরাং এই সুযোগ ফেলতে পারব না।’ তিনি আমাকে বললেন, ‘শ্বশুর যখনই আসবেন, মাথায় ভালো করে তেল মালিশ করবে। সব ঠিক হয়ে যাবে।’ সত্যি সত্যিই তা-ই হলো (হাসি)। তিনি আমাকে বললেন, ‘মা, তুমি কি সত্যিই চাকরি করতে চাও?’ বললাম, চাচাজান, পড়ালেখা যখন করেছি, ইচ্ছা তো করেই। পড়েছি, শিখেছি, সেগুলো শেখাব না? আস্তে আস্তে তাঁর মন নরম হলো। বললেন, ‘ঠিক আছে, চাকরি করতে চাও করো, কিন্তু বোরকা পরে চলতে হবে।’ (উচ্চ স্বরে হাসি) বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় বোরকা পরতাম, রাস্তায় গিয়ে খুলে ফেলতাম। তখন তো নারায়ণগঞ্জের মানুষ খুবই রক্ষণশীল ছিল।

 

কেমন লাগত?

শিক্ষকতা নেশার মতো লাগতে শুরু করল। এত ভালোভাবে চালিয়েছি যে প্রতিটি ক্লাসের শিক্ষক, অভিভাবক, বাচ্চারা খুব খুশি হলো। যথেষ্ট কড়াকড়িও করেছি। আমাকে ওরা ভয় পেত। পড়া শিখে না এলে অনেক রকম শাস্তি ছিল। আগের প্রিন্সিপাল একটু দেরি করেই এলেন। ফলে মাস ছয়েক ছিলাম।

 

নারায়ণগঞ্জ মহিলা কলেজে কিভাবে যোগ দিলেন?

ওখানে থাকার সময়ই আমার এক ভাশুর, শিক্ষিত মানুষ, চাকরি করতেন। তিনি বললেন, ‘তোলারাম কলেজের ভেতরে এসডিও সাহেব একটি মহিলা কলেজ করেছিলেন। তিনি বদলি হয়ে যাওয়ার পর সেটি বন্ধ হয়ে গেছে। কলেজের ১০-১২টি মেয়ে সকাল সাড়ে ৭টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত তোলারাম কলেজে ক্লাস করে। ছেলেরা সকাল ১১টা থেকে ক্লাস করে। সেটি দেখতে হবে।’ আমাকে হাতে পেয়ে তো কলেজের প্রিন্সিপাল খগেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী খুব খুশি। তিনি বললেন, ‘আমি তো অত সকালে যাই না। হামিদা, তুমি যদি দায়িত্ব নাও তাহলে বেঁচে যাই।’ আমি সানন্দে রাজি। ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে এলাম। আমার স্বামী তো মহা খুশি। এভাবে চাকরি করতে পারব তিনি তা ধারণায়ই আনেননি। যে চাচাজান রাজি হননি, যখন শুনলেন কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল হয়েছি, তিনি বললেন, ‘মা, কলেজ মনে রেখে সেখানে ভালো করে কাজ করবে, যাতে আমাদের বাড়ির কোনো বদনাম না হয়।’ তখন তাঁর মেয়েরা কেউ টেনে, কেউ ইন্টারমিডিয়েটে পড়ে। নারায়ণগঞ্জের মানুষ তখন এত রক্ষণশীল ছিল যে মেয়ের জন্য আমাকে বাড়ি বাড়ি যেতে হয়েছে। কতজন কত যে খারাপ কথা বলেছে—লেখাপড়া শিখিয়ে কী হবে? মেয়ে বড় হয়েছে, ম্যাট্রিক পাস করেছে, বিয়ে দিয়ে দেব। যথেষ্ট হয়েছে আর পড়াশোনার দরকার নেই। অনেকে অবশ্য উদারতাও দেখিয়েছেন, যত দিন বিয়ে না হয় পড়ুক না, ক্ষতি কী? এভাবে মেয়ে জোগাড় করেছি। ১৯৬৫ সালে আস্তে আস্তে মেয়েরা তোলারাম থেকে নারায়ণগঞ্জ মহিলা কলেজে চলে এলো। তখন ৩০-৩২ জন ছাত্রী ছিল। ডিগ্রির ক্লাসে বাংলা সাহিত্য পড়ানোর জন্যও ডাক এলো। বাংলা একাডেমিতে গিয়ে বিএ ক্লাসের মেয়েদের পড়ানোর জন্য নোট করতাম। আমাদের বাংলা বিভাগের বিরাট সেমিনার কক্ষের অর্ধেক বইয়ে ঠাসা ছিল। ওদের জন্য নোট করে নিয়ে যেতাম। ওরা তো মহাখুশি—এত ভালো পড়াচ্ছি। সুনাম সব সময়ই পেয়েছি। তবে তখনই আমার মাথায় ছিল—এটি তো কোনো কলেজ হলো না। একে আলাদা করতে হবে। তোলারাম কলেজের ঠিক উল্টো দিকেও কলেজের জমি ছিল। খানাখন্দে ভরা। স্যারকে বললাম, এখানে তো তোলারাম কলেজ আছেই, আমরা ওই জমির মধ্যে আপাতত মহিলা কলেজ শুরু করতে পারি। তিনি বললেন, ‘আমার ক্ষমতায় নেই, তুমি যদি পারো, করো।’

 

কিভাবে কলেজ তৈরি হলো?

সেটি নিয়ে কত যে ঝগড়া, কত মারামারি, কাটাকাটি! রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে তোলারাম কলেজের গভর্নিং বডির মেম্বাররা আমাকে গাল দিতেন, ‘মহিলা কলেজ তোলারাম কলেজের জমি নিয়ে যাচ্ছে। খগেন্দ্রনাথ ময়মনসিংহের (নেত্রকোনা), তিনিও ময়মনসিংহের—সব একজোট হয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি। একটি কথাও কানে নিইনি। বহু কষ্টে জমি উদ্ধার করলাম। তোলারাম কলেজ সেটি আমাদের নামে লিখে দিল। যখন জায়গাটি পেলাম, তখন থেকে চিন্তা হলো, কিভাবে ঘর বানাব। টাকা তো নেই। মনটা খারাপ। এর মধ্যে আব্বা একদিন এলেন। বললেন, ‘কী রে মা, তোর মনটা এত খারাপ কেন?’ বললাম, বাবা, এভাবে আমি জায়গা পেয়েছি। কিন্তু কেমন করে কলেজ বানাব? কোনো দিশা পাচ্ছি না। আমাদের টাকা-পয়সা নেই। ফখরুজ্জামান তখন কেন্দ্রীয় বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলেন, বাড়ি সিলেটে। তিনি আনন্দমোহন কলেজে বাবার রুমমেট ছিলেন, খুব বন্ধু। বাবা বললেন, ‘আমি যদি ফখরুজ্জামানের কাছে যাই, তাহলে হয়তো তোর জন্য কিছু একটা করতে পারব।’ আমি ও খগেন স্যার বাবার সঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রীর সচিবালয়ের অফিসে গেলাম। আমার বাবার স্লিপটি যখন ভেতরে নিয়ে গেল, সঙ্গে সঙ্গে তিনি কল করলেন। বাবাকে দেখে চেয়ার ছেড়ে দিয়ে ‘মিজান, তুই’ বলে তিনি বুকে জড়িয়ে ধরলেন। ‘কী ব্যাপার, তুই হঠাৎ এত দিন পরে আমার কাছে?’ বাবা বললেন, দায়ে না পড়লে কেউ আসে? এসে দেখি মেয়েটা কাঁদছে! মন খারাপ।’ তিনি বললেন, ‘কী হয়েছে তোর?’ বললাম, তোলারাম কলেজ থেকে বহু কষ্টে কলেজের জমি পেয়েছি। কিন্তু আমার টাকা-পয়সা কিছু নেই। আপনি জানেন, নারায়ণগঞ্জের মানুষ রক্ষণশীল মনোভাবের। তারা মেয়েদের পড়ালেখায় বিশ্বাস করে না। কিন্তু আমি মেয়েদের কলেজ করবই (দীর্ঘশ্বাস)। তিনি বললেন, ‘আচ্ছা, দেখি তোর জন্য কী করতে পারি।’ সঙ্গে সঙ্গে তখনকার ডিপিআই ড. ফেরদৌস খানকে ফোন করলেন, ‘আপনি কী আমার একটি উপকার করবেন?’ তিনি আমাকে ‘মেয়ে’ সম্বোধন করে তাঁকে সমস্যার কথা বললেন। ফেরদৌস সাহেব বললেন, ‘খুব ভালো সময়ে ফোন করেছেন। আমরা যেসব জায়গায় কলেজ নেই, সেগুলোতে কলেজ করে দেওয়ার জন্য প্রকল্প হাতে নিয়েছি। একসঙ্গে চার লাখ টাকা দেব। তাঁরা ভবন করে ক্লাস শুরু করতে পারবেন।’ তাঁর কথায় মন্ত্রী মহোদয়ের টেবিলে বসেই দরখাস্ত লিখলাম। পিএকে দিয়ে তিনি টাইপ করালেন। সই করলাম। খগেনবাবুকে নিয়ে ফেরদৌস খানের রুমে গেলাম। সব চূড়ান্ত হলো। কিছুদিনের মধ্যে ভবনের কাজ শুরু করলাম। মানুষ খুব সাহায্য করেছে। ইটভাটায় পর্যন্ত গিয়ে ইট চেয়েছি। তারা ইট দিয়েছে। ইটের গাড়ি আসার পর ছাতা নিয়ে গাড়ির কাছে গিয়ে এক নম্বর ইট নামিয়ে দুই নম্বরগুলো ট্রাকে তুলে দিয়েছি। রডের দোকানে গিয়ে দোকানদারকে বলেছি, নারায়ণগঞ্জের জন্য একটি মহিলা কলেজ করছি, ভবনের টাকা পেয়েছি। আপনারা কম দরে রড দিন। তাঁরা কম দরে রড, সিমেন্ট ও বালু দিয়েছেন। কলেজের জন্য অনেক কষ্ট করেছি।

 

প্রিন্সিপালের জীবন?

১৯৭১ সালে সেখানে প্রিন্সিপালের দায়িত্ব নিলাম। তার আগের ছয় বছর খগেনবাবু প্রিন্সিপাল ছিলেন। আমাকে ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। শুরুতে তোলারাম কলেজের শিক্ষকদের ২৫ টাকা করে মাইনে দিতাম। তাঁরা সকালে এসে ক্লাস নিয়ে যেতেন। চারতলা ভবন তৈরি করে ফেলার পর মানুষের আকর্ষণ বেড়ে গেল। ছাত্রীরা আসতে থাকল। ডিগ্রি চালু করার পর কলেজ ভালো অবস্থানে গেল। আমার ১৬ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে কলেজকে ভালো অবস্থানে নিয়ে গেলাম। সাবজেক্ট বাড়ালাম। জীবন নিয়ে আমি পুরোপুরি সন্তুষ্ট। যেখানে গিয়েছি, কেউ আমাকে দেখে মুখ ফেরাতে পারেননি। তখন মহকুমা ছিল, এসডিও সাহেবরা পদাধিকার বলে মহিলা কলেজের প্রেসিডেন্ট থাকতেন, প্রিন্সিপাল হিসেবে আমি সেক্রেটারি। তাঁরা প্রত্যেকে আমাকে সম্মান করেছেন। মিটিংয়ে যে রেজল্যুশন পাঠিয়েছি, পাস করে দিয়েছেন। খুব কড়া এক ডিসিকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, যা-ই পাঠাই, না পড়ে সই করে দেন কেন? তিনি বললেন, ‘মিসেস হামিদা আলী, কলেজটি আপনার। আপনি তৈরি করেছেন। সেখানে আপনি ভুল করবেন? আমি শুদ্ধ করব? এটি আপনার দায়, আপনার দায়িত্ব। আমি কদিন আছি?’ এ কথা শোনার পর মনটি ভরে গেল। আমার ওপর তাদের এত বিশ্বাস ছিল যে তাঁরা মনে করতেন, আমি খারাপ কিছু করতে পারি না। সরকারের সঙ্গেও আমার খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। খুব ভালোভাবে কলেজ চালাতাম। অফিসারদের মেয়েরাও তো পড়ত। অন্য রকম আনন্দে কাটিয়েছি। এটিই আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায়। যখন চলে আসি, নারায়ণগঞ্জ মহিলা কলেজ একেবারে জমজমাট। যে কাজটি করতাম, খুব মন দিয়ে করতাম। এখনো সেটি চেষ্টা করি। এটিই আমার স্বভাব।

 

সরকারি হয়ে যাওয়ার পর দায়িত্ব ছেড়ে দিলেন কেন?

১৯৮১ সালে নারায়ণগঞ্জ মহিলা কলেজ যখন সরকারি হয়ে গেল, তাঁরা কেউ ভাবেননি, সরকারি চাকরি আমি গ্রহণ করব না। তখন ড. করিম ডিপিআই ছিলেন। তিনি অনেক অনুরোধ করেছেন। তাঁর সঙ্গে আমার মেয়ের মতো সম্পর্ক হয়েছিল। তিনি তাঁর রুমে নিয়ে গিয়ে কত বুঝিয়েছেন, ‘সরকারি চাকরি পাওয়া সোজা কথা? এটি কেউ হেলায় হারায়? আপনি বুঝতে পারছেন না, সরকারি চাকরি মানে অনেক সুযোগ-সুবধাি।’ আমি বললাম, আপনার কথা ঠিক। তবে এই যে আজ আমাকে দেখামাত্র ‘আসেন, বসেন’ বলে বসালেন, যখন সরকারি চাকরি করব, আপনার সামনে এসে আমাকে দাঁড়াতে হবে। অনুমতি দেবেন, তারপর বসতে হবে। এটি নিয়ম। নিয়মের বাইরে তো যেতে পারবেন না। তিনি বললেন, ‘তা ঠিক।’ বললাম, সরকারি চাকরি মানেই পরাধীনতা। জীবনে কোনো দিন আমি পরাধীন ছিলাম না। আমার পক্ষে এটা সহ্য করা হয়ে উঠবে না। সবাইকে বদলি করেন। আমাকেও তো বদলি করবেন। তিনি বললেন, ‘না, এতটুকু কথা দিতে পারি, বদলি হলেও আপনি মন্ত্রণালয়ে থাকবেন। আমাদের মতো লেখাপড়ার কাজ করবেন।’ বললাম, তখন আপনি থাকবেন না। হয়তো আমি থাকব। কিন্তু এসব কী কেউ মনে রাখবে? না, এটি হয় না। যেটি হয় না, সেটি করব না। মন্ত্রণালয়ে নিয়েও অনেকে আমাকে অনেকভাবে বোঝালেন, এই ভুল করবেন না। আমার কোনো সন্তান হয়নি। দেবরের প্রথম সন্তান জা-দেবর মিলে জন্মের সঙ্গে সঙ্গে আমার কোলে তুলে দিয়ে বলেছিলেন, ‘আজ থেকে এই আপনার মেয়ে।’ তখন ওকে নিয়েও খুব ব্যস্ত ছিলাম। তখন ও বড়, ক্লাস টুতে পড়ে, নারায়ণগঞ্জে। ওকে ভিকারুননিসায় ভর্তি করানোর স্বার্থও আমার ছিল। আরেকটি আকর্ষণ ছিল—সেখানে কোয়ার্টার আছে। আমার বাসা তখন সেগুনবাগিচা। সেখান থেকে নারায়ণগঞ্জ আসা-যাওয়া করতে কষ্ট হতো। যখন ছেড়ে আসি, তখন সেখানে ২২ শ ছাত্রী। আমার ফেয়ারওয়েলের সময় সেখানকার এমপি, সম্পর্কে আমার তাওই, জায়ের বাবা, তিনি বলেছিলেন, ‘হামিদাকে আমরা ছাড়তে চাই না। কিন্তু তাকে তো কিছুতেই রাখতে পারলাম না। আপনাদের কাছে আমার একটি আরজ রইল—ও মারা গেলে ওর লাশটি যেন এখানে দাফন করা হয়।’ আমি যখন ওখানে ছিলাম, তারা পড়াশোনা, গানে-গজলে, খেলাধুলায়— সব কিছুতে অংশ নিত। আমারও উৎসাহ, শক্তি ছিল।

 

এর মধ্যে তো রাজনীতিতেও জড়িয়েছিলেন?

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যখন নারায়ণগঞ্জ গিয়েছিলেন, মহিলা কলেজের প্রিন্সিপাল হিসেবে আমাকে বক্তৃতা দিতে হয়েছে। তিনি বলেছিলেন, ‘রাজনৈতিক বক্তৃতা নয়, আপনি শুধু দেশের মেয়েদের জন্য কী করা উচিত সেসব বলবেন।’ আমি প্ল্যাটফর্ম পেয়ে গেলাম। মেয়েদের অবস্থা, তাদের প্রতি অবহেলার কথা জোরেশোরে বললাম। তাতে তিনি এত খুশি হলেন, এক মাস পরেই ডেকে পাঠিয়ে বললেন, ‘আপানাকে জাতীয়তাবাদী দলে যোগ দিতে হবে।’ বললাম, জীবনে কখনো রাজনীতি করিনি, কখনো করবও না। তিনি বললেন, ‘রাজনীতি করার কথা একবারও আপনাকে বলেছি? বলেছি, দলে যোগ দিয়ে মহিলাদের উন্নয়নের জন্য কাজ করবেন।’ বললাম, পরে এসব কথা থাকে না। প্রায় দুই ঘণ্টা তিনি, ড. আমিনা রহমান, ড. আজিজুর রহমান ও বিচারপতি আবদুস সাত্তার মিলে এতভাবে বোঝালেন যে আমার স্বামী বলেছিলেন, কখনো এমন অফার করলে তুমি নেবে না, আমি কখনোই তোমাকে রাজনীতি করতে দেব না; কিন্তু তাঁর কথায় বাধ্য হয়ে রাজি হলাম। তখনই তাড়াতাড়ি তিনি কলেজকে জাতীয়করণ করালেন (হাসি), যাতে নারায়ণগঞ্জ থেকে এসে ঢাকায় থাকতে পারি। দলে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার ও আমি ছাত্রদের নিয়ে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ‘ছাত্রদল’ নামে কেন্দ্রীয় কমিটি করেছিলাম। সেখান থেকেই আজকের ছাত্রদলের জন্ম। এই কমিটি গড়ায় রাষ্ট্রপতি খুব খুশি হয়েছিলেন। ছাত্ররা আমার কথা খুব মানত। জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সম্পাদিকা থেকে দলের অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল সেক্রেটারি হয়েছিলাম। বি (বদরুদ্দোজা) চৌধুরীর সঙ্গে আমরা তিনজন যুগ্ম মহাসচিব ছিলাম। আমি ছিলাম মহিলাদের দায়িত্বে। জিয়াউর রহমানের সঙ্গে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ট্যুরে যেতাম। নানা জেলায় বিষেশত, নারী ও শিশুদের ওপর বক্তৃতা দিতাম। ফলে মহিলারা এমনভাবে ঘর থেকে বের হয়ে এলেন যে এখনো সেই ধারাটিই আছে। তিনি মহিলা দল বানালেন। যেহেতু মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ ছিলাম, ফলে তাঁরা আমাকে খুব গুরুত্ব দিতেন, আমার কথায় উৎসাহ পেতেন। দলের চেহারাই বদলে গেল। প্রতিটি জেলায় অফিস হলো। থানা, উপজেলা এমনকি গ্রামপর্যায়েও বড় বড় অফিস হলো। সেগুলোয় এসে তাঁরা জাল বুনতেন, বাঁশ-বেত-সেলাইয়ের কাজ করতেন, সঙ্গে বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্রও ছিল। এভাবে মেয়েদের অনেক উদ্বুদ্ধ করা হয়েছিল। মহিলা ক্রীড়া সংস্থায় কাজ করতে হয়েছে। ১৯৮১ সালের ৩০ মে তিনি মারা গেলেন। পরদিন ১ জুন নারায়ণগঞ্জ মহিলা কলেজের চার্জ বুঝিয়ে দিয়ে ভিকারুননিসায় যোগ দিলাম। ভিকারুননিসায় যোগদানের পর বলেছিলাম, যিনি আমাকে রাজনীতিতে এনেছিলেন, যাঁর ছায়াতলে কাজ করেছি, সেই ছায়া তো আর পাব না। সুতরাং আর কাজ করব না। এখানে থেকে রাজনীতি করাও যাবে না।

 

কিভাবে ভিকারুননিসায় যোগ দিলেন?

তখন ড. আমিনা রহমান মহিলাবিষয়ক মন্ত্রী ছিলেন। তাঁর মন্ত্রণালয়ে আসতাম। একদিন তিনি ডেকে বললেন, ‘ভিকারুননিসায় গভর্নিং বডিতে খুব সংকট চলছে। তুমি যদি হাল ধরো, তাহলে সংকট কেটে যাবে। এখানে এসো, আমাদের সঙ্গে কাজ করো।’ ভিকারুননিসা স্কুলে তাঁরা প্রিন্সিপাল পাচ্ছিলেন না। আমি আগেই ভিকারুননিসার মেম্বার হয়েছিলাম। এরপর পত্রিকায় তিনবার প্রধান শিক্ষিকা চেয়ে বিজ্ঞপ্তি দিলাম। কিন্তু তাঁরা এসে যোগদানের কথা বলেও যোগ দিলেন না। আমাদের বিপক্ষে একটি বড় অশুভ চক্র কাজ করছিল। যাঁকেই প্রিন্সিপাল হিসেবে ঠিক করা হতো, শুনেছি, তাঁর বাসায় গিয়ে ছুরি দেখিয়ে বলা হতো, ভিকারুননিসায় যোগ দিলে তোমার জীবন শেষ হয়ে যাবে। অনন্যোপায় হয়ে মন্ত্রণালয় আমাকে বলল, আপনি যোগদান করুন। আপনাকে পেলে আমাদের আর কিছু লাগবে না। যোগ দিলাম। বাসায় কেউ আসেনি। দু-একটি ফোন এসেছে, নেমপ্লেট, কলিংবেল উঠিয়ে নিয়ে গেছে। অনেক উড়ো চিঠি এসেছে। আমি কেয়ার করিনি। অনেক অত্যাচার করেছে, আমি দমিনি। আমার তো অনেক সাহস। তারাও দেখল, আমার সঙ্গে পারা যাবে না।

 

ভিকারুননিসার জীবন?

যখন কাজ শুরু করলাম, মনে হলো, জীবনের অন্য রকম সূচনা হয়েছে। তখন মাত্র এক হাজার ৩০৫ জন ছাত্রী ছিল। গভর্নিং বডির মিটিংয়ে কিভাবে কাজ করব, জানালাম। তাঁরা খুশি হয়ে অনুমতি দিয়ে দিলেন। শিক্ষাসচিব আমাদের সভাপতি ছিলেন। তাঁরা বলতেন, হামিদা আলী যেখানে আছেন, সেখানে আমাদের দেখার কিছু নেই। সব দায়-দায়িত্ব তাঁর। তাঁরা আমাকে বিশ্বাস করতেন। আমি এসে ভবনের কাজ শুরু করলাম। ভবন বর্ধিত না করলে ছাত্রী এনে কোথায় ভর্তি করব? স্কুলের নামে ব্যাংকে মাত্র পাঁচ লাখ টাকা ছিল। আমি মন্ত্রণালয় থেকে ১৮ লাখ টাকার একটি প্রকল্প আনলাম। তাঁরা বললেন, ক্রমান্বয়ে আপনি ভবন করতে থাকবেন। আমরা টাকা দিয়ে যাব। জুনিয়র সেকশনে ভবন করলাম। কলেজের ভবন তিনতলা করলাম। নতুন ভবনও করলাম। সেখানে ২০ তলা ভবনে বিশ্ববিদ্যালয় চালু করে এসেছি। এটি নিয়েই তাদের সঙ্গে আমার কিছু দ্বন্দ্ব হয়েছিল। কিন্তু সেটি তারা প্রকাশ করেনি। যখন অবসর নেব, তখন প্রকাশ করেছে। কিন্তু আমি তো তখন চলেই এসেছি। ফলে আমার ক্ষতি করতে পারেনি। তারা বলেছে, স্কুলের জায়গার ওপর বিশ্ববিদ্যালয় কেন হবে? অথচ এটি খুব সুন্দরভাবে চলছিল। ১৩২ জন মেয়ে ভর্তি হয়েছিল। তারা প্রথম বর্ষ শেষ করে দ্বিতীয় বর্ষে যাচ্ছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অধ্যাপক এনেছিলাম, উপ-উপাচার্য নিয়োগ দিয়েছিলাম। কোথাও কোনো গণ্ডগোল নেই। কিন্তু তাদের মনে হিংসা তৈরি হলো, ভিকারুননিসার জমির ওপর আমি বিশ্ববিদ্যালয় কেন করলাম? অথচ এ তো এক মায়েরই সন্তান। তার ওপর আমাদের অধিকার নেই? ওখানে ১৮ বিঘা জমি আছে। খালি জায়গায় আমি বিশ্ববিদ্যালয় করেছি। তখন ডা. এইচ বি এম ইকবাল গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান। তিনি কিছু ভুল পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ভবনের কাজ শুরুর পর প্রত্যেক শিক্ষককে দিয়ে এক কোদাল মাটি উঠিয়েছেন, যাতে প্রত্যেকের সমর্থন পাওয়া যায়। তাঁরা প্রত্যেকে খুশি ছিলেন। কিন্তু একটি কুচক্রী মহল জমির প্রশ্নে আপত্তি করল। পরে তারা এটি নিয়ে আন্দোলন করে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দিল। আমি তখনকার শিক্ষামন্ত্রী ড. ওসমান ফারুকের কাছে গিয়ে বলেছি, আপনার যদি মনে হয় আমি কোনো অন্যায় করেছি, আমাকে আপনি মাটি চাপা দিন। কিন্তু আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ক্ষতি করবেন না, এটি বন্ধ করবেন না। তিনি আমাকে কথা দিলেন, ‘ঠিক আছে, আপনি থাকবেন না, আমি তো আছি, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করব না।’ একজন বাবা এসে আমার চোখে চোখ রেখে কেঁদে ফেলেছিলেন—‘আপা, ছয় বছর বয়সে আমার মেয়েটিকে হাত ধরে নিয়ে এসেছিলাম, এখন আপনার ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি করেছি। এখান থেকে ওকে লেখাপড়া শিখিয়ে বের করে নিয়ে যেতে পারছি, এটি আমার জীবনের মস্তবড় সফলতা। আপনি একটি বড় কাজ করেছেন।’ কিন্তু কোনো মহলের নির্দেশনায় সেই কুচক্রী দল বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দিল। তাতে আমি এত কষ্ট পেয়েছি যে মানুষ সন্তানহারা হলে যা হয় আমার সেই অবস্থা হয়েছে। তাতে কী লাভ হয়েছে? তারা যে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দিয়েছে, তাতে তো আমার ক্ষতি হয়নি। আমার মনে কষ্ট হয়েছে, কিন্তু ক্ষতি তো মেয়েদের হয়েছে। সেই ভবন সেখানে পড়ে আছে। ওরা একটি তলায় ইংরেজি মাধ্যমের ক্লাস করায়। এটি আমার খুব কষ্টের ফসল। যেসব মহিলা আমার বিপক্ষে ছিল, তারা কেউ সুখে নেই। এছাড়াও ইকবাল সাহেব অনেকগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান ছিলেন। তাঁর প্রিমিয়ার ব্যাংক খোলার পর সবার টাকা সেখানে নিয়ে গেলেন। ভিকারুননিসায় আমি পাঁচ কোটি টাকা রেখে এসেছিলাম। ২০০২ সালের ১৬ জুলাই চলে এলাম। তিনি সে বছরের অক্টোবরে সেই টাকা তাঁর ব্যাংকে নিয়ে গেলেন। এরপর তহবিল তছরুপ, ভিকারুননিসার জমি দখল করেছি—এভাবে তারা আমার বিরুদ্ধে চারটি কেস দিয়েছিল। সেগুলো কোনোটিই ধোপে টেকেনি। দুদকের প্রতিটি মামলা থেকেই সসম্মানে আমি মুক্তি পেয়েছি। প্রতিটি মামলাই ভুল ছিল। আমি মানহানি মামলা করতে পারতাম। কিন্তু করিনি। ওরা নিচে নেমেছে, আমি কেন নামব?

 

কিভাবে একে দেশের সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করেছেন?

আমার মেয়েরা আমাকে এত ভালোবাসত যে যতক্ষণ অ্যাসেমব্লিতে না যেতাম, ততক্ষণ ওরা উল্টো দিকে মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। ওরা বলত, আপা না আসা পর্যন্ত আমরা অ্যাসেমব্লি করব না। আমি এসে মানুষের ভালো-মন্দ নিয়ে নৈতিক বক্তৃতা দিতাম। সেটি ওরা খুব পছন্দ করত। ওরা এত নিয়মানুবর্তী ছিল যে আমার ছায়াটি দেখলেই হলো, সবাই চুপ হয়ে যেত, উঠে দাঁড়িয়ে থাকত। ৩৫০ জন শিক্ষকও আমাকে খুব ভালোবাসতেন। তাঁদের প্রত্যেককে আমি নাম ধরে ডাকতাম। সেটি তাঁদের বিরাট প্রশান্তি ছিল—আপা আমাদের সবাইকে নাম ধরে ডাকেন। কতখানি ভালোবাসলে এতগুলো নাম মনে রাখতে পারেন! কখনো বকতাম, কখনো শাসন করতাম, কখনো আদর করতাম। সব কিছু মিলে একটি পরিবারের মধ্যে এত সুন্দর জীবন আমার কেটেছে। সব জায়গা থেকে কেবল প্রশংসাই পেয়েছি। ভর্তির আবদারে জীবন শেষ হয়ে যেত। তখন তো এখনকার মতো উেকাচ দিয়ে ভর্তির কোনো সুযোগ ছিল না। আমি ধানমণ্ডিতে শাখা করেছি। এত চাহিদা তৈরি হয়েছে যে সেখানেও একটি বড় স্কুল হয়ে গেছে। আমি ইংরেজি মাধ্যম চালু করেছি। ছাত্রীদের পড়ানোর জন্য টেক্সট বুক বোর্ডে গিয়ে বসে থেকে ইংরেজিতে পাঠ্যবই লিখিয়েছি। সেখানে শিক্ষক নিয়েছি। এখন তো সেটিই চলছে। কলেজ বর্ধিত করার পরও ছাত্রী এত বেড়ে গিয়েছিল যে সংকুলান হচ্ছিল না। আমি বসুন্ধরায় সোয়া দুই বিঘা জায়গা কিনেছি। ওরা অনেক কম দামে আমাকে জমি দিয়েছে। বেইলি রোডে ডে শিফট করেছি। ধানমণ্ডিতেও মর্নিং ও ডে শিফট করে সাড়ে ১০ হাজার ছাত্রীকে জায়গা দেওয়া হলো। এমনভাবে আমার স্কুল-কলেজের প্রসার ও সুনাম বাড়তে লাগল যে ২১ বছর পর যখন ৬৫ বছর হওয়ায় আমি অবসর নিয়ে আসি, আমাকে রাখার কোনো উপায় নেই, আমার মেয়েরা রাস্তায় পর্যন্ত বসে কেঁদেছে, এখানে জয়েন করার কারণও সেটি, এ রকম ছোট বাচ্চারা যখন রাজপথে অবস্থান নিয়েছে, আমাদের চেয়ারম্যান চট্টগ্রামের কর্ণফুলী ডকইয়ার্ডের মালিক ইঞ্জিনিয়ার এম এ রশীদ ও চট্টগ্রামের ডিসি—দুজন সেদিক দিয়ে সচিবালয়ে যাবেন, তাঁরা দেখলেন রাস্তা বন্ধ, মেয়েরা সব বসে আছে। তাঁরা গাড়ি থেকে নেমে শিশুদের বললেন, ‘মা, তোমরা কাঁদছ কেন? তোমাদের কী হয়েছে? কেন রাস্তা বন্ধ করে রেখেছ? আমরা তো যেতে পারছি না।’ তখন ওরা বলল, ‘আমরা রাস্তা বন্ধ করব না? মাকে ছাড়া কি বাচ্চারা বাঁচে? (গলা ভারী হয়ে এলো) আমাদের মাকে ওরা এখান থেকে ছেড়ে দিচ্ছে, আমরা সেটি মানব না।’

 

সাউথ পয়েন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজ কিভাবে শুরু হলো?

রশীদ সাহেব এই কথা শুনে এত মুগ্ধ হয়ে গেলেন যে কলেজে এসে আমার সঙ্গে দেখা করতে চাইলেন। তখন কলেজের মেয়েরা আমাকে পাহারা দিচ্ছিল। তারা ঠিক করেছিল, সরকার থেকে অবসরের যে চিঠি আসবে, সেটি তারা আমাকে সই করতে দেবে না। তারা ভিকারুননিসায় আমাকে রাখতে চায়। তিনি একদিন গেলেন, পরদিনও গেলেন, ওরা দেখা করতে দিল না। পরে তারা বলল, চট্টগ্রামের এক ভদ্রলোক ইঞ্জিনিয়ার এম এ রশীদ ও চট্টগ্রামের ডিসি আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান। আমরা দুই দিন ফিরিয়ে দিয়েছি। বললাম, কেন? ওরা যদি ছল করে এসে আপনার সই নিয়ে যায়? আমরা সই করতে দেব না। ওরা আমাকে যত্ন করেছে, পাহারা দিয়েছে। (কান্নাজড়িত কণ্ঠে) ভিকারুননিসার কাছে আমার অনেক ঋণ। আমি সেখানে জয়েন করলাম তো চারদিক ফুলে-ফলে ভরে গেল। অভিভাবকরা মেয়ে ভর্তি করে কেঁদে ফেলতেন—আপনার হাতে দিলাম, আপনার মতো করে মানুষ করবেন। (দীর্ঘশ্বাস) দেখা হওয়ার পর রশীদ সাহেব প্রথমেই বললেন, ‘বহুদিন ধরে ভাবছি—ঢাকায় একটি স্কুল করব। আপনি আমাদের সঙ্গে এসে যোগ দেবেন।’ বললাম, কাল মাত্র রিটায়ার করেছি, আমাকে কয়েকটি দিন সময় দিন। তিনি বললেন, ‘সময় দেওয়া যাবে না। সেশন জানুয়ারিতে শুরু হবে, এই কয়েকটি মাস তো আমাদের কাজ করতে হবে।’ পরে আমার স্বামী বললেন, ‘দেখো, তুমি তো বসে থাকতে পারবে না। সারা জীবন কাজ করেছ। এখনো কর্মঠ আছ। দেখো না, তাঁরা কী করেন?’ তারপর বাড়ি খোঁজা শুরু হলো। কেউ বাড়ি ভাড়া দিতে রাজি নন। স্কুল শুরু করতেও দেরি হয়ে যাচ্ছে। তখন আমাকে বললেন—আপা, আপনি সঙ্গে গেলে বাড়ি পেয়ে যেতাম। তাঁরা আমাকে গুলশানের এক বাসায় নিয়ে গেলেন। যে মহিলা দরজা খুললেন, আমাকে দেখেই ‘ভাবি’ বলে জড়িয়ে ধরলেন। আমি বললাম—ভাবি, আমি স্কুল করব। তিনি বললেন, ‘আপনি স্কুল করবেন আর আমি বাড়ি দেব না? নিন দিয়ে দিলাম।’ (হাসি) তাঁরা এতদিন ঘুরেও বাড়ি পেলেন না আর আমি একদিনেই ভবন ভাড়া নিয়ে ফেললাম দেখে তাঁরা তো অবাক! সেই বাড়ি নিয়ে গুলশান-১ নম্বরে ২০০৩ সালের জানুয়ারিতে স্কুল শুরু করলাম। রশীদ সাহেব দুই হাতে খরচ করেছেন। আমি যা বলেছি, তিনি সঙ্গে সঙ্গে মেনে নিয়েছেন, কোনো হস্তক্ষেপ করেননি। অভিভাবকরা হামিদা আলীকে খুঁজে খুঁজে ছেলে-মেয়ে ভর্তি করেছেন। এখানে আমাদের আট হাজারের বেশি ছাত্র-ছাত্রী আছে। এটিও খুব সুশৃঙ্খল স্কুল। শিক্ষক নেওয়ার ক্ষেত্রে কাউকে কমপ্রোমাইজ করিনি। আমাদের দুটি জমি আছে। বারিধারায় সাত বিঘা জমিতে ভবন হচ্ছে। মালিবাগে ২৭ জন বাড়িওয়ালাকে বুঝিয়ে ছয় বিঘা জমি কেনা হয়েছে। মিরপুর, বনানীতে শাখা করেছি। মোট চারটি শাখার একটিতে ইংরেজি মাধ্যমে পড়ানো হয়। সারা জীবন আমি ছাত্র-ছাত্রীদের সন্তানের মতো ভালোবেসেছি।

 

ব্যক্তিগত জীবন?

আমার জন্ম ১৯৩৭ সালের জুলাই মাসে ময়মনসিংহের ফুলবাড়ি থানার মঠবাড়ী গ্রামে। বাবা মিজানুর রহমান ব্রিটিশ আমল থেকে টানা ৪০ বছর আমাদের ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ব্রিটিশদের কাছ থেকে তিনি তিনবার ‘বেস্ট প্রেসিডেন্ট’ পুরস্কার পেয়েছেন। আমার স্বামী মোহাম্মদ আলী এ বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি ৮৯ বছর বয়সে মারা গেছেন। আমার মেয়ে আশফিয়া নিগার দেখতে, কথাবার্তায় অপূর্ব ছিল। ভিকারুননিসা থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করার পর আমাকে এক বন্ধু এসে ধরল, ‘আমার ছেলে ভারত থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে এসেছে। এখন ওকে পিএইচডি করতে বিদেশে পাঠাব। তোমার মেয়েটি আমায় দাও।’ মেয়েও গোঁ ধরেছে—বিদেশে পড়বে। সব মিলিয়ে স্বামী রাজি হয়ে গেলেন। বিয়ের প্রথম বছরই তার সন্তান এলো। তারা বিদেশে পড়তে গেল। দ্বিতীয় সন্তান পেটে আসার ছয় মাসের মধ্যে আমেরিকার মতো দেশে হাসপাতালে আমার মেয়ে মারা গেল, বাচ্চাটি বেঁচে রইল।

[১৫ মার্চ, ২০১৭, সাউথ পয়েন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজ,

মালিবাগ, ঢাকা]



মন্তব্য