kalerkantho


বইটি আমাকে হিরোর মর্যাদা দিয়েছে

সিনেমা দেখতে দেখতে ভালোবাসা জন্মাল। আর সিনেমা সাংবাদিকতা তাঁকে টেনে নিয়ে গেল গবেষণায়। আকরগ্রন্থ ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস’সহ বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বই লিখেছেন অনুপম হায়াত্। সেগুলোর পেছনের কাহিনি জেনেছেন ওমর শাহেদ। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

১৭ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



বইটি আমাকে হিরোর মর্যাদা দিয়েছে

সিনেমার প্রতি আগ্রহ কিভাবে হলো?

গ্রামে থাকতেই প্রথম সিনেমা দেখেছিলাম—একটি প্রচারচিত্র। মনে আছে, নাইনে পড়ার সময় ১৯৬৪ সালে গ্রামের বন্ধুরা মিলে দল বেঁধে ‘সুতরাং’ দেখে আবেগে ভেসেছি।

১৯৫৮ সালে ঢাকায় এসে রূপমহলে উত্তম-সুচিত্রার ‘অগ্নিপরীক্ষা’, ১৯৬১ সালে দিলীপ কুমারের ‘আন’ দেখার স্মৃতি কোনো দিন ভুলব না। ১৯৬৬ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে তো ঢাকায় চলে এলাম। এর পর থেকে সময় পেলেই হলে চলে যেতাম। রাজ্জাক-কবরীর ‘নীল আকাশের নীচে’, ‘এতটুকু আশা’, উর্দু ছবি ‘মুজাহিদ’-এর কথা এখনো মনে পড়ে। তবে আমার প্রধান আকর্ষণ বইয়ের প্রতিই ছিল। ১৯৭০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগে ভর্তি হয়ে সিনেমার প্রতি মূল আগ্রহটা তৈরি হয়।

 

সেটি কিভাবে?

ম্যাস কমিউনিকেশন ক্লাসে শিখলাম, চলচ্চিত্রেরও আলাদা মূল্য আছে। কারণ সিনেমা ইতিহাস-ঐতিহ্যের অংশ, এর নান্দনিক মূল্যও অনেক, এটি সমাজে খুব প্রভাব বিস্তার করে। মনে প্রশ্ন জাগল, কেন সিনেমা দেখে মানুষ আন্দোলিত হয়? এর কাজ কি শুধু নাচ-গান-অভিনয় প্রদর্শন? সিনেমা দেখার আগ্রহ আরো বেড়ে গেল।

ফাইভে পড়ার সময় থেকেই তো চিত্রালীর খুব ভক্ত ছিলাম। এই সিনেমা পত্রিকাটি আমাকে খুব টানত। তখন থেকেই জহির রায়হান, কাজী খালেক, সুমিতা দেবী, কবরী, সুলতানা জামানের নাম জানি। ঢাকায় এসে অন্তরঙ্গ, জোনাকি, ঝিনুক, মালঞ্চ পড়া শুরু করলাম।

 

চলচ্চিত্র নিয়ে লেখালেখিতে কিভাবে উৎসাহী হলেন?

আলমগীর কবিরের লেখার স্টাইল খুব ভালো লাগত। ১৯৬৮ সালের জানুয়ারিতে ‘অন্তরঙ্গ’তে তাঁর সাক্ষাৎকার পড়ে চমকে গেলাম, গণিত ও পদার্থবিদ্যায় খুব ভালো হলেও তিনি আর্ট-কালচার-সিনেমায় খুব আকৃষ্ট ছিলেন। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে ব্রিটেনে গিয়ে লন্ডনের টেমস নদীতে সব সার্টিফিকেট ছিঁড়ে ফেলে মনের খেদে বলেছিলেন, মা-বাপ আমাকে ভুল শিক্ষা দিয়েছেন। এই ঘটনা খুব আন্দোলিত করল। মানুষ মেয়েদের প্রেমে পড়ে, সেদিন থেকে আমি আলমগীর কবিরের লেখার প্রেমে পড়ে গেলাম। এর পর থেকে তিনি যা করেন তা-ই ধ্রুব সত্য মনে হয়। ১৯৭৩ সাল থেকে তাঁর ছবি দেখা শুরু করে দিলাম। হলিডে পত্রিকায় তাঁর লেখাগুলো খুব ভালো লাগত। তিনি ব্রিটেন-প্যারিসের সিনেমার খবর লিখতেন। বুঝলাম, সিনেমা শুধু দেখার নয়, পাঠেরও বিষয়। ১৯৭৩ সালে তো তাঁর ঢাকা ফিল্ম ইনিস্টিটিউটে ভর্তি হয়ে গেলাম।

 

কোথায় ক্লাস হতো?

প্রথমে ক্লাস হতো তোপখানা রোডের পাকিস্তান কাউন্সিলে, সেগুনবাগিচার বাড়িতে, পরে তিনি আমাদের আজিমপুরের বাড়িতে নিয়ে গেলেন। মাঝেমধ্যে সেন্সর বোর্ডসহ নানা জায়গায় ক্লাস করেছি। তিনি খুব ডায়নামিক লোক ছিলেন। এক বছরের কোর্সে শনি-রবিবার ক্লাস হতো। তাঁর বাড়িতে সিনেমার ওপর অনেক বই-ম্যাগাজিনের বিরাট ভাণ্ডার পেলাম। ‘বিহাইন্ড দ্য স্ক্রিন’, ‘ফিল্ম ইজ আর্ট’—এসব বই পড়া হলো। চিত্রনাট্য রচনা, নির্মাণ, আলোকচিত্র, সম্পাদনা, বিপণনের মতো বিষয়গুলো তাঁর সংগ্রহের বই পড়েই জেনেছি। এগুলো আমার মনোজগত্ গড়ে দিতে খুব সাহায্য করেছে। তাঁর লেখা ‘দ্য সিনেমা ইন পাকিস্তান’ বইটি পড়ে জানলাম, সিনেমারও ইতিহাস আছে। তার পর থেকেই মার্কিন ও ভারতীয় দূতাবাসে গিয়ে এই ইতিহাস খুঁজি। সেভাবেই জানলাম, যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সিনেমা’ পড়ানো হয়। তাঁর বইতে পাকিস্তানের পাশাপাশি আমাদের সিনেমার ইতিহাসও কিছুটা ছিল। এই ইতিহাস জানার খুব আগ্রহ হলো।

 

এভাবেই কি সিনেমা নিয়ে লেখালেখির শুরু?

১৯৭২ সাল থেকে পূর্ব ও পশ্চিম ইউরোপের ছবিগুলো আসছিল, ভারতীয় ছবিগুলো দেখানো হচ্ছিল। ফিল্ম উইকগুলোতে যেতাম, ছবি দেখতাম। তাঁর ইনস্টিটিউটে পড়ার সূত্র ধরে ১৯৭২ সাল থেকে নানা জায়গায় চলচ্চিত্রের বাস্তবতা ইত্যাদি বিষয়ে লেখালেখি শুরু করলাম। পোল্যান্ডের ছবি দেখে চিত্রালীতে চিঠি লিখলাম—আমাদের চলচ্চিত্রকার, দর্শকরা এই ছবিগুলো কেন দেখলেন না? তাহলে তো তাঁরা বুঝতে পারতেন, যুদ্ধের পর দেশটি কিভাবে উন্নতি করেছে, সেভাবে আমাদের এই যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশেরও উন্নতি সম্ভব হতো। এটিই আমার সিনেমা বিষয়ে প্রথম লেখা। ১৯৭৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর চিত্রালীতে লিখলাম, ‘আর্ট ফিল্ম বুঝতে হলে মাথা চাই। ’ এটিই আমার প্রথম প্রকাশিত প্রবন্ধ। এর পর থেকে নিয়মিত সিনেমা দেখে চিত্রালী, জনপদ, পূর্বাণী, আজাদ, সচিত্র বাংলাদেশ, বাংলাদেশ সংবাদে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে লিখেছি। ১৯৭৭ সালে সচিত্র বাংলাদেশে ‘সীমানা পেরিয়ে’র রিভিউ লিখলাম, এম এ সামাদের ‘সূর্য সংগ্রাম’-এর রিভিউ লিখলাম। ১৯৭৬ সালে চিত্রালীতে নজরুলের ওপর ‘চলচ্চিত্রের যুবরাজ : কাজী নজরুল ইসলাম’ লিখলাম।

 

তখন তো সাংবাদিকতাও করেছেন?

১৯৬৬ সালে ভূমি রাজস্ব বোর্ডে চাকরিতে যোগ দিই। তবে লেখালেখির শখ থেকে প্রথমে দেশবাংলায় পার্টটাইম কাজ করতাম। ‘ডুমুরের ফুল’ সিনেমার শুটিং শুরু হওয়ার কিছুদিন আগে সুভাষ দত্তর সাক্ষাৎকার নিয়ে ছাপালাম। পরে চাবুক ও মুক্তিবাণী পত্রিকায় কাজ করেছি। মুক্তবাণীতে সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে বিনোদন ও সাহিত্য বিভাগ দেখতাম। সিনেমার পাশাপাশি সমকালীন প্রসঙ্গ—দুর্নীতি, সামাজিক অবক্ষয় নিয়েও গঠনমূলক লিখেছি। ১৯৭৭ সাল এখানে পর্যন্ত কাজ করেছি। ১৯৭৩ সালে টিসিবিতে (ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ) যোগ দিলাম। এখানে প্রতি একুশে ফেব্রুয়ারির সংকলন, সম্ভার ও স্ট্রেট ট্রেড নামের দুটি হাউস ম্যাগাজিনের সম্পাদক ছিলাম।

 

বিচিত্রায় যোগ দেওয়ার মাধ্যমেই তো সিনেমা সাংবাদিকতার শুরু?

১৯৭৭ সালের ডিসেম্বরে বিচিত্রায় প্রদায়ক হিসেবে কাজ শুরু করলাম। ফলে রিপোর্টিংয়ে সুযোগ পেলাম। তখন বিচিত্রা খুবই প্রভাবশালী পত্রিকা। ফলে চলচ্চিত্র নিয়ে লেখালেখি ও গবেষণার দিগন্ত খুলে গেল। সিনেমা স্টুডিওতে যেতাম, শুটিংয়ে যেতাম। সিনেমা নিয়ে গবেষণার শুরু হলো। বিচিত্রায় ১৯৭৭ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে বিশেষ সংখ্যায় পূর্ব-পাকিস্তানের প্রথম সবাক ছবি ‘মুখ ও মুখোশ’-এর পরিচালক আবদুল জব্বার খানের সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হলো। তাঁর অফিস তখন বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে। এখনো মনে পড়ে, তিনি শিশুর মতো সরল, আমাকে এত ভালোভাবে নিয়েছিলেন (দীর্ঘশ্বাস)। তাঁর বাসায় যে কতবার গেছি! সেই ছবির নায়িকা পিয়ারী বেগমের সঙ্গেও দেখা করেছি। জব্বার সাহেব আমাকে সেই ছবির প্রথম বুকলেট দিয়েছিলেন। তাঁদের ফিল্ম ট্রাস্ট কম্পানির মাধ্যমে আমদানি করা অনেক পুরনো সিনেমার স্টিল, পোস্টারও দিয়েছিলেন। আমার ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস’ বইয়ে কিন্তু ‘মুখ ও মুখোশ’ নির্মাণের ইতিহাস আছে। তাঁর অফিসের কাছেই ‘রূপবান’ সিনেমার পরিচালক সালাউদ্দিনের অফিসে গেছি। তিনিও বেশ সহযোগিতা করেছেন। সেখানে ‘মেঘের অনেক রঙ’ ছবির নির্মাতা হারুন-অর-রশীদকে পেয়েছিলাম, এখনো তাঁর সঙ্গে ভালো সম্পর্ক। বিচিত্রায় আমার অনেক যুগান্তকারী লেখা ছাপা হয়েছে। চলচ্চিত্রের ইতিহাস নিয়ে ১৯৭৮ সালের ২৩ জুন ছাপা হয়েছে ‘স্মৃতির মুখ : হারানো ছবি’। তখনই ফিল্ম আর্কাইভ চালু হয়েছে। এসব দেখে শাহরিয়ার কবির খুব খুশি হলেন। তিনি পরামর্শ দিলেন, ‘অনুপম, এর আগেও তো ঢাকায় ছবি তৈরি হয়েছে। আপনি আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের কাছে যান। তাঁর সঙ্গে নবাব পরিবারের যোগাযোগ আছে। তিনি এ ব্যাপারে ভালো বলতে পারবেন। ’

 

নবাব পরিবার নিয়ে আপনার কাজ শুরু হলো?

তাঁর সঙ্গে তো গল্প লেখার সূত্রে আগেই পরিচয় ছিল। একদিন তিনি আমাকে নবাব পরিবারে নিয়ে গেলেন। এই পরিবারের সূত্রেই ঢাকাই ছবির অলিগলিতে হাঁটা শুরু করলাম। নবাব পরিবারের খাজা হালিম খুব সাহায্য করেছেন। তাঁর সাহায্যে কিভাবে ঢাকার প্রথম ছবিটি তৈরি হয়েছিল, নায়িকা কিভাবে পাওয়া গিয়েছিল, নায়ক কারা ছিলেন—সব খুঁজে বের করলাম। জানলাম, ১৯২৭ থেকে ১৯৩১ সালের মধ্যে তাঁরা ঢাকায় সিনেমা বানিয়েছিলেন। অল্প দিনের মধ্যে চলচ্চিত্রের অনেক অজানা তথ্য জানা হলো। প্রথমে তো ঢাকার নবাব পরিবারের সদস্যরা সাহায্য করতে ইতস্তত করছিলেন। পরে দু-একজন বাদে এই পরিবারের সবাই সাহায্য করেছেন। একটি অভিজ্ঞতার কথা বলি, নবাব পরিবারের লোকেরা কিন্তু সাধারণ বাঙালিদের বিশ্বাস করেন না। আমি আর ইলিয়াস ভাই ঢাকার প্রথম দুটি ছবি ‘সুকুমারী’ ও ‘লাস্ট কিস’-এর স্টিল উদ্ধার করতে নায়কের (খাজা আজমল) এক ছেলের কাছে গিয়েছিলাম। তাঁরা তো আমাদের দেখেই গালাগাল শুরু করে দিলেন। কারণ তাঁর বাবাকে মুক্তিযোদ্ধারা মাটিতে পুঁতে পাথর মেরে হত্যা করেছি। খাজা আজমলের এক ছেলে পাকিস্তান আর্মির সাহায্যে অনেক বাঙালিকে মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা করেছিল। ফলে ১৭ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা তাঁর বাবাকে হত্যা করেন। পরে ইলিয়াস ভাই কৌশলে তাঁর হাত থেকে স্টিলগুলো নিয়ে নিলেন। আমরা বৃষ্টির মধ্যে দৌড় দিয়ে চলে এলাম। এগুলো রেয়ার ডকুমেন্ট। এই কাজে ফিল্ম আর্কাইভের সংগ্রাহক সৈয়দ আবদুল আহাদও সহায়তা করেছিলেন। ‘লাস্ট কিস’-এর নায়িকাকে পতিতালয়ে ‘বুড়ি’ বলে ডাকা হতো, সিনেমায় তিনি নাম নিয়েছিলেন ‘ললিতা’। পরে এগুলোর কপি রেখে মূল কপিগুলো ফিল্ম আর্কাইভে জমা দিয়েছি।

 

নবাব পরিবারের ডায়েরিও তো পেয়ে গেলেন।

বলে না—কান টানলে মাথা আসে, সেভাবেই অনেক ডায়েরি পেয়েছিলাম। খাজা হালিমের কাছে এই পরিবারের অনেক ডায়েরি ছিল। তিনি তাঁদের পরিবারের ফটো অ্যালবামও সংগ্রহ করে রেখেছিলেন। প্রতিদিন দুপুর ২টার পর অফিস শেষ করেই চলে যেতাম। তিনি ১৯০৪ সালের পর থেকে ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত তাঁদের পরিবারের সদস্যদের লেখা এই ডায়েরিগুলো উর্দু থেকে আমাকে বাংলায় অনুবাদ করে শোনাতেন। নোট করে নিতাম। পরে এগুলো নিয়ে একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়—‘নওয়াব পরিবারের ডায়েরিতে ঢাকার সমাজ ও সংস্কৃতি’। ডায়েরিগুলোতে সিনেমার অনেক অজানা তথ্যও আছে। এর পরই সিনেমা নিয়ে আমার পুরোদমে গবেষণা শুরু হলো। গবেষণার ফলাফল নিয়ে বিচিত্রা, বাংলার বাণী ছাড়াও বিভিন্ন সিনেমা কাগজে একের পর এক প্রবন্ধ লেখা শুরু হলো। নামগুলোও অন্য রকম দিয়েছি—‘নাটকের সুপ্রভাত’, ‘চলচ্চিত্রের ট্র্যাজেডি’। আমার লেখাগুলো ইতিহাসবিদ ও গবেষক মুনতাসীর মামুনের চোখে পড়ল। তিনি বললেন, ‘বাংলা একাডেমি লাইব্রেরির ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ স্মৃতি পাঠাগার থেকে আপনি পুরনো দিনের ছবির কিছু খবরাখবর পেতে পারেন। ’ সেখানে গিয়ে শত শত পত্রিকা ওল্টাতে শুরু করলাম। হঠাত্ ১৯৩১ সালের ২৫ জুনের বাংলার বাণীতে ‘লাস্ট কিস’ ছবির বিজ্ঞাপন পেয়ে গেলাম। আমার আগে আর কেউ এটি উদ্ধার করতে পারেনি। ঢাকা ইস্ট বেঙ্গল সিনেমা সোসাইটির এটি প্রথম ছবি ছিল। ১৯৭৯ সালে বাংলার বাণী ও সাপ্তাহিক সিনেমায় এই খবর এবং আমাকে নিয়ে সংবাদও প্রকাশ করেছিল। কিভাবে ঢাকার প্রথম ছবির দুষ্পাপ্য ইতিহাস উদ্ধার করেছিলাম, সেই খবর ছাপা হয়েছিল। এর পর থেকে আমার নামের শেষে ‘চলচ্চিত্র গবেষক’ অভিধাটির ব্যবহার শুরু হলো।

 

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস কিভাবে লেখা শুরু করলেন?

কখন থেকে ঢাকার হলগুলোতে সিনেমা দেখানো শুরু হলো, সেই আমল থেকে পরিকল্পনা করে কাজ শুরু করলাম। পরে ক্রমানুক্রমিকভাবে অধ্যায়গুলো সাজিয়েছি। প্রথম অধ্যায় হলো ‘পুরান ঢাকার চলচ্চিত্র’। এই বইয়ের সব অধ্যায়ই গুরুত্বপূর্ণ। তবে ‘চলচ্চিত্রে বাঙালি মুসলমান’ অধ্যায়ের মতো তথ্যবহুল লেখা আর কোনো বইয়ে নেই, ছবিগুলোও খুব রেয়ার। এখানে যে ছবি আছে (ছবি দেখিয়ে)—নজরুল, ফিরোজা বেগমের হাসোজ্জ্বল ছবি—এটি বিচিত্রা থেকে নিয়েছি। ছবিগুলো বিচিত্রা, চিত্রালী, সিনেমা পত্রিকা থেকে নেওয়া। বাঙালি মুসলমানদের ছবির ইতিহাসের মূল সূত্রটি পরিচালক উদয়ন চৌধুরী দিয়েছিলেন। পুরান ঢাকার বাসিন্দা ইসমাঈল মোহাম্মদ খুব সহযোগিতা করেছেন। অবজারভার সম্পাদক ওবায়েদ উল হকও পুরনো অভিনেতা-অভিনেত্রীদের ছবি দিয়ে সাহায্য করেছেন। তিনি তো ১৯৪৬ সালেই ‘দুঃখে যাদের জীবন গড়া’ নির্মাণ করেছিলেন। এই জীবন্ত ইতিহাসের সাক্ষাৎকারও নিয়েছিলাম। আব্বাসউদ্দীনকে তাঁর জীবনী থেকে জেনেছি। ফতেহ লোহানীকে পেয়েছি তাঁর স্ত্রী, কন্যা এবং কামাল লোহানীর কাছ থেকে। এই পরিবারটির সহযোগিতার কথা না বললে অন্যায় হবে। শাহরিয়ার কবির বনানী চৌধুরীর খবর দিয়েছিলেন। তিনি কলকাতা থেকে ঢাকায় এলে তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। তিনি প্রথম বিএ পাস করা বাঙালি মুসলমান অভিনেত্রী। পৈতৃক বাড়ি মাগুরায় হলেও তিনি কলকাতায় থাকতেন। লোহানী পরিবারের কাছ থেকে কাজী খালেক সম্পর্কে তথ্য পেয়েছি। সওগাতের নাসিরউদ্দীন সাহেবের সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় তাঁর মেয়ে নূরজাহান (বেগম) আপা খুব সাহায্য করেছেন। সারোয়ার হোসেনও সহযোগিতা করেছেন। আবদুল জব্বার খান ‘মুখ ও মুখোশ’-এর মহরতের ছবিটি দিয়েছিলেন।

 

চলচ্চিত্রশিল্পের উন্মেষদেশ বিভাগের পরে অধ্যায়ের গল্প?

এই কাজে এফডিসির প্রথম নির্বাহী পরিচালক নাজির আহমদ খুব সাহায্য করেছেন। আবদুস সাদেক প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণের চেষ্টা করেছিলেন। তিনি ইস্ট পাকিস্তান কো-অপারেটিভ ফিল্ম মেকার্স থেকে ছবি বানানোর চেষ্টা করেছিলেন। এই সংগঠনটি ১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তাঁর পরিবারও অনেক সহযোগিতা করেছে। তাঁর স্ত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদের প্রথম প্রেসিডেন্ট ছিলেন। সাদেক সাহেব স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের গভর্নিং বডির সদস্য ছিলেন। ১৯৪৭-৪৮ সালে তিনিই প্রথম পাকিস্তানের দুই অংশের অর্থনৈতিক বৈষম্যটি তুলে ধরেন। তাঁদের কম্পানির বুকলেটটিও পেয়েছিলাম। এখানে কবি জসীমউদ্দীনও জড়িত ছিলেন। এগুলো সবই বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভে দিয়েছি। আমার কাছে রেখে তো লাভ নেই, থাকত না। নাট্যকার সাঈদ আহমদও অনেক সহযোগিতা করেছেন। ভাষা আন্দোলনের কর্মী মোশাররফ হোসেন চৌধুরীও অনেক সাহায্য করেছেন। পত্রপত্রিকার কাটিং ও ছবি জোগাড় করতে ফরিদুর রেজা সাগর এবং তাঁর মা সাহিত্যিক রাবেয়া খাতুন অনেক সাহায্য করেছেন। রওশন আরা, সৈয়দ আবদুল আহাদসহ আরো অনেকে সহযোগিতা করেছেন।

 

কত ছবি, কত নাম! এই অধ্যায়ে কী আছে?

১৮৯৬ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত হাজার তিনেক ছবি হয়েছে, এর মধ্যে কয়টি ছবি গুরুত্বপূর্ণ? উল্লেখযোগ্য ছবিগুলোর স্টিল, সেগুলোর আলোচনা-সমালোচনা, প্রসঙ্গক্রমে সমকালীন পত্রপত্রিকায় সেগুলো নিয়ে কী বলা হয়েছে, সেসব তথ্যও তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। এ জন্য অনেক খাটতে হয়েছে। যেমন—চিত্রালীর রিভিউ সংগ্রহের জন্য লাইব্রেরি থেকে লাইব্রেরিতে ঘুরেছি। অবজারভার, বাংলা একাডেমি ও ফিল্ম আর্কাইভ লাইব্রেরি থেকে অনেক তথ্য পেয়েছি। ছবিগুলোও গ্ল্যামারাস করার চেষ্টা করেছি। (ছবি দেখিয়ে) ‘নয়নমণি’ ছবির ববিতা-ফারুকের এই ছবিটি তো খুব গ্ল্যামারাস (হাসি)। ছবিটি দেখুন—‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ ছবিতে রাহেলা ও আনোয়ার হোসেন। (ছবি দেখিয়ে) এই রাহেলা হলেন খান আতার মেয়ে। এরপর ‘সুতরাং’, ‘রূপবান’, ‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘ওরা ১১ জন’, ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’, ‘তিতাস একটি নদীর নাম’, ‘সূর্য কন্যা’ ইত্যাদি ছবির স্টিল দিয়েছি। ‘আসিয়া’র পোস্টার পুরনো পত্রিকা থেকে নিয়েছি। আমি চেয়েছি, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সাংবাদিকতার ওপর একটি ডকুমেন্টেশন থাকুক।

 

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা এ অধ্যায়টি কিভাবে তৈরি করেছে?

এটি এফডিসিতে গিয়ে তৈরি করেছি। ওখানে যত শুটিং হতো দেখতে যেতাম। যেহেতু বিচিত্রায় কাজ করি, তখন এই পত্রিকাকে মানুষ আলাদা গুরুত্ব দিত। তারপর তো তারকালোকে কাজ করেছি। ফলে সাংবাদিক হিসেবে কোনো বাধা ছাড়াই চলে যেতে পারতাম। এ ছাড়া কত কত লোকের কাছে গেছি—খান আতার (খান আতাউর রহমান) কাছে গেছি। তাঁর সাক্ষাৎকারও নিয়েছি। বইয়ের কাভারে তাঁর ছবি আছে দেখে তিনি খুব খুশি হয়েছিলেন। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু যখন ন্যাশনাল আর্কাইভ থেকে এফডিসি বিল উত্থাপন করেন, সেখানে তাঁর বক্তব্য ন্যাশনাল আর্কাইভ থেকে খুঁজে বের করেছি। ১৯৭৫ সালের পরে তাঁর ছবিও ব্যবহার নিষিদ্ধ ছিল। বাংলার বাণী থেকে তাঁর ছবি নিয়ে এরশাদের আমলের তথ্যমন্ত্রী আনোয়ার জাহিদের অনুমতি নিয়ে ছবিটি ছাপিয়েছি। কারণ ইতিহাস ইতিহাসই। সুমিতার (দেবী) সাক্ষাৎকার নিয়েছি। এ ছাড়া আরো অনেকের সঙ্গে কথা বলেছি। এই কাজে সৈয়দ সালাউদ্দিন জাকী খুব সহযোগিতা করেছেন। এভাবে ১৯৭৭ সালে বিচিত্রায় কাজ করা অবস্থায় বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস নিয়ে যে পাণ্ডুলিপি তৈরি করতে শুরু করলাম, প্রায় দশ বছর পর সেটি প্রস্তুত হয়ে গেল। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত হলো। নানা জায়গা থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছি। এমনকি পতিতালয়েও যেতে হয়েছে। এ জন্য কোথায় না গেছি! কত জায়গায় যে যেতে হয়েছে! দিন-রাত ঘুরে বেড়িয়েছি। যেহেতু সাংবাদিকতা করতাম, ফলে তথ্য সংগ্রহ করা সহজ হয়েছিল। আর সত্ থাকার চেষ্টা করেছি। যাঁর কাছ থেকে যে ডকুমেন্টস এনেছি, ব্যবহার করে সেগুলো ঠিকঠাক ফেরত দিয়েছি। এগুলো কেউই তো দেয় না। অনেকে আবার সন্দেহও করতেন।

 

কিভাবে বইটি প্রকাশিত হলো?

১৯৭৮ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন তথ্য, সাক্ষাৎকার ও ছবি জোগাড় করে পাণ্ডুলিপি তৈরি হলো। এর মধ্যে ১৯৮৬ সালে সৈয়দ সালাউদ্দিন জাকী এফডিসির পরিচালক হিসেবে যোগ দিলেন। তাঁকে গিয়ে বললাম, আমার কাছে চলচ্চিত্রের ইতিহাসের ওপর একটি পাণ্ডুলিপি আছে। তিনি আমাকে এফডিসির এমডি গ্রুপ ক্যাপ্টেন (অব.) সাইফুল আজমের কাছে নিয়ে গেলেন। তিনি কথা শুনে বললেন, ‘আমার কাছে তো অনেকে আসেন, পাণ্ডুলিপিটি আমাকে দেন। ’ দিলাম। তিনি পাণ্ডুলিপি পড়ে খুব খুশি হলেন এবং বিভিন্ন অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যদের মিটিং ডাকলেন। এরপর আমাকে বললেন, ‘এখানে তো সিনেমার পাণ্ডুলিপির খুব অভাব, এটি খুব ভালো হয়েছে। তাতে সবার কথা যেন থাকে। ’ এর পরই ‘হু ইজ হু’ নামে সর্বশেষ অধ্যায়টি যোগ করা হলো। বিচিত্রা থেকে খুব কষ্ট নিয়ে চলে এসেছিলাম। কারণ প্রতি সপ্তাহে তাদের সিনেমার কলামটি লিখতাম। প্রতিটি রিপোর্টিংয়ে ২০ টাকা দেওয়া হতো। ১৯৭৭ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত টানা কাজ করেছি। টিসিবিতে কাজ শেষে পার্টটাইম কাজ করেছি। টিসিবিতে নানা সুবিধা ছিল। কিন্তু কোনোটিই নিইনি। আমি তো সত্ভাবে বেঁচে থাকার চেষ্টা করেছি। ১৯৮৮ সালের আগস্টে বইটি প্রকাশের পর আনন্দে কেঁদে ফেলেছিলাম। বিচিত্রার সম্পাদক শাহাদত চৌধুরী বইটি হাতে নিয়ে বলেছিলেন, ‘ও তো আমাদেরও ছাড়িয়ে গেল। ’ প্রকাশের পর আল মাহমুদকে কপি দিয়েছিলাম। কবি বলেছিলেন, ‘এটি তোমাকে অমর করে রাখবে। ’ সত্যিই বইটি আমাকে হিরোর মর্যাদা দিয়েছে। নাট্যকার সাঈদ আহমেদ বইটি নিয়ে বিটিভিতে আমার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। শামসুর রাহমানও বইটি দেখে খুব খুশি হয়েছিলেন। গিয়াস কামাল চৌধুরী তখন ভয়েস অব আমেরিকায়। তিনি বলেছিলেন, ‘অনুপম, তুমি কী করেছ, সেটি তুমি নিজেও হয়তো জানো না, বুঝতেও পারছ না। ’ তাঁরা ১০ কপি কিনে নিয়ে গিয়েছিলেন। ১৯৮৮ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় কলকাতার দেশ পত্রিকায় প্রায় এক পাতা জুড়ে আলোচনা ছাপা হয়েছিল। তারা একে বাংলাদেশের মিনি ফিল্ম আর্কাইভ বলেছিল। তবে ওই একবারই বইটি তিন হাজার কপি ছাপানো হয়েছিল। আমার এই ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস’ বইয়ে ১৮৯৮ থেকে ১৯৮৭ সালের জুন পর্যন্ত  এ দেশের চলচ্চিত্রগুলোর অনেক দুষ্প্রাপ্য, অজানা ও বিস্মৃতপ্রায় তথ্য ও প্রামাণ্য নিদর্শন আছে।

 

সিনেমা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তো নায়ক-নায়িকাদের সঙ্গেও বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে।

হ্যাঁ, অনেকের সঙ্গেই বন্ধুত্ব হয়েছে। ফারুক আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। কবরী, চাষী, ওয়াসিমের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠতা আছে। উজ্জলের অফিসে আড্ডা দিতাম। বয়স্কদের মধ্যে ক্যামেরাম্যান সাধনদা, সংগীত পরিচালক সুবল দাস, সত্য সাহা, শাহজাহান চৌধুরী, চলচ্চিত্র পরিচালক আজিজুর রহমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল। সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু ছিল রফিকুজ্জামান ও মতিন রহমান। শেখ নিয়ামত আলী তো আমাদের অফিসে প্রায়ই যেতেন। তাঁকে তো ভুলতেই পারি না। তাঁর বাসায়ও যেতাম। ক্যামেরাম্যান আনোয়ার হোসেন, ডলি আনোয়ার, মোরশেদুল ইসলামের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক হয়েছে। মোরশেদুল ইসলামের প্রথম ছবি ‘আগামী’র প্রথম রিপোর্টিং তো তারকালোকে আমিই করিয়েছি। সুমিতার জীবন নিয়ে আমার ছেলে অব্যয় বই লিখেছে। চলচ্চিত্রে যেসব শিক্ষিত মানুষ কাজ করতেন বা চলচ্চিত্র আন্দোলন করতেন তাঁদের সেই সময়ে লেখালেখির মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।

 

চলচ্চিত্র নিয়ে আরেকটি বই লিখেছেন চলচ্চিত্রবিদ্যা

আলমগীর কবিরের সরাসরি ছাত্র হিসেবে আমি, রফিকুজ্জামান, মতিন রহমান, কাজী হায়াত্, আলম কোরায়শী, চাষী নজরুল ১৯৯৩ সালে আলমগীর কবির ফিল্ম ইনস্টিটিউট নামে একটি ইনস্টিটিউট করার চেষ্টা করেছিলাম। পরে নানা কারণে সেটির নাম বদলে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র অধ্যয়ন কেন্দ্র হলো। ১৯৯৪ সালে সেটি চালু হলো। ডাকযোগে ২১টি কোর্স হলো। তখন মনে হলো, একসময় তো বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে চলচ্চিত্র বিষয় হিসেবে চালু হবে। কিন্তু কোনো পাঠ্য বই তো নেই। পুনে ফিল্ম ইনিস্টিটিউট, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে সিলেবাস জোগাড় করলাম। আলমগীর কবিরের ১৯৭৩ সালের কোর্সের কারিকুলাম তো ছিলই, সব মিলিয়ে নিজের পড়ালেখার মাধ্যমে একটি কোর্স তৈরি করলাম। সেই আলোকেই এ বইটি লিখেছি, যাতে পঞ্চম শ্রেণি থেকে শুরু করে বিএ পাস মানুষও চলচ্চিত্র সম্পর্কে ধারণা পেতে পারেন। ২০০৪ সালে প্রকাশিত এ বইটিই চলচ্চিত্র নিয়ে প্রথম পাঠ্য বই।

 

আলমগীর কবিরকে নিয়েও তো আপনার বই আছে।

এটির নাম ‘আলমগীর কবিরের চলচ্চিত্র, পটভূমি, বিষয় ও বৈশিষ্ট্য’। এখানে তাঁর জীবনকথা, সৃষ্টিকর্ম, চলচ্চিত্রগুলো নিয়ে আলাদা অধ্যায় আছে, মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান, তাঁর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র—সবই আছে। ২০১৬ সালে প্রকাশিত হয়েছে। এতে আমি আমার শিক্ষকের জীবন ও কর্মের একটি প্রামাণ্য দলিল হাজির করার চেষ্টা করেছি, যাতে ভবিষ্যতে তাঁকে নিয়ে কেউ গবেষণা করতে গেলে প্রাথমিক তথ্যগুলো হাতের কাছেই পান। একইভাবে জহির রায়হানের চলচ্চিত্র, পটভূমি ও বৈশিষ্ট্য নিয়েও লিখেছি। আধুনিক চলচ্চিত্রের ইতিহাসের ছাত্র-ছাত্রীদের তো তাঁদের জীবন ও কর্ম অবশ্যই পড়তে হবে। বই দুটিতে সমকালীন পত্রপত্রিকা ও বাস্তব কর্মের আলোকে তাঁদের কাজগুলো প্রামাণ্যভাবে তুলে ধরতে চেয়েছি। আর কিছুই নয়, যেটুকু প্রয়োজন ততটুকুই আছে। এতে পাঠকরা বিভ্রান্ত হবেন না। ভুল তথ্য পাবেন না।

 

নজরুল-রবীন্দ্রনাথের চলচ্চিত্র নিয়ে লিখেছেন।

কবি কাজী নজরুল ইসলাম সেই যুগে চলচ্চিত্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমে জড়িত ছিলেন, এটি গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছিল। কারণ যখন মুসলমানদের ছবি দেখাই হারাম ছিল, তিনি তখন সিনেমা পরিচালনা, সংগীত রচনা-পরিচালনা ও অভিনয় করেছেন। ‘চলচ্চিত্র জগতে নজরুল’ লেখার জন্য রফিকুল ইসলাম, মজফফর আহমেদের বই থেকে সামান্য তথ্য পেয়েছি, উদয়ন চৌধুরীও কিছু সহযোগিতা করেছেন। পত্রপত্রিকা ঘেঁটে লেখা এ বইটি ১৯৯৭ সালে নজরুল ইনস্টিটিউট প্রকাশ করেছে। ভালোই চলেছে। এখন তো বাজারে পাওয়া যায় না। রবীন্দ্রনাথের কাহিনি নিয়ে তো ১৯২৩ সালে সিনেমা হয়েছে। ফলে তাঁর ব্যাপারেও আগ্রহ ছিল। কলকাতা থেকে বইপত্র জোগাড় করেছি, আনন্দবাজারের ‘রবীন্দ্র প্রসঙ্গ’তে তাঁর লেখা থেকে সিনেমা হওয়া সব বিজ্ঞাপন পেয়েছি। অনেক তথ্য ঘেঁটে লেখা ‘চলচ্চিত্রে রবীন্দ্রনাথ’ ২০০৮ সালে প্রকাশিত হয়েছে।

      

হীরালাল সেন ও অন্যান্য?

তিনি তো প্রথম বাঙালি চলচ্চিত্রকার ছিলেন। সরকারি ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটের শিক্ষক হিসেবে আমি আমার ছাত্রদের সঙ্গে চারবার তাঁর মানিকগঞ্জের বাড়িতে গেছি। তারা তাঁর ওপর প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করেছে। পাগলের মতো তাঁর ওপর তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করেছি। নাটকের বই থেকে তথ্য নিয়েছি। ১৯০৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত তাঁর সিনেমার বিজ্ঞাপন পত্রিকা থেকে জোগাড় করেছি। তিনি প্রথম বাঙালি আলোকচিত্রী। ফটোগ্রাফির ইতিহাস থেকে তাঁর আলোকচিত্রজীবন নিয়েছি। আমি পদ্ধতিগতভাবে কাজ করেছি—তাঁর সিনেমা কম্পানির (রয়াল বায়োস্কোপ কম্পানি) রেজিস্টার নম্বর পর্যন্ত খুঁজে বের করেছি। নবাব পরিবারের ডায়েরিতে পেয়েছি—তিনি ১৯১১ সালের ২২ মার্চ ঢাকায় বায়োস্কোপ দেখিয়েছেন। ১৮৯৮ সালে ভোলায় তাঁর ছবি দেখানো হয়েছিল। এই তথ্যটি এখনো ক্রস চেক করতে পারিনি। এ ছাড়া আমার লেখা মেহেরবানু খানম, ফতেহ লোহানী, খান মোহাম্মদ তৈফুরের জীবনীগ্রন্থ বাংলা  একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়েছে।

 

গবেষকের এই জীবনে কোনো কষ্ট আছে?

‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস’ প্রকাশের সময় অনাহূতভাবে আমাকে তখনকার দুর্নীতি দমন বিভাগের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। তারা নানাভাবে আমাকে হেনস্তা করার চেষ্টা করেছে। এর পেছনে এফডিসির দুর্নীতিপরায়ণ কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও জামায়াতে ইসলামীর একটি প্রিন্টিং প্রতিষ্ঠান জড়িত ছিল। অথচ এ বইটির মুদ্রণের দরপত্রের সঙ্গে আমার কোনোই সংস্রব ছিল না।

 

চলচ্চিত্র শিক্ষকতা ও গবেষণা তত্ত্বাবধানও করেছেন জেনেছি।

হ্যাঁ, চলচ্চিত্রের শিক্ষক হিসেবে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র অধ্যয়ন কেন্দ্র, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ ফেডারেশন, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি, গ্রিন ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউট, ঢাকা ফিল্ম ইনস্টিটিউটে শিক্ষকতা করেছি। বাংলাদেশ ফিল্ম সেন্সর বোর্ড, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জুরি কমিটিতে সদস্য হিসেবে কাজ করেছি। বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের অধীনে বিভিন্ন গবেষণাও তত্ত্বাবধান করেছি।

 

শ্রুতলিখন : রেনেসাঁ রহমান

(২ ডিসেম্বর ২০১৬, শনির আখড়া, ঢাকা)


মন্তব্য