kalerkantho


স্বাধীন থাকতে পছন্দ করি

বোর্ডে সেরা ছাত্রী ছিলেন। প্রথম বাংলাদেশি মেয়ে হিসেবে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করেছেন। হার্ভার্ড ও কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ছিলেন ড. রওনক জাহান। তাঁর জীবনের গল্প শুনেছেন ওমর শাহেদ। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

১০ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



স্বাধীন থাকতে পছন্দ করি

আজকের এই অবস্থানে আসার পেছনে আপনার অনুপ্রেরণা কে?

আমার বাবা এবং মা দুজনেই আমাকে অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। তবে বাবার সমর্থনটি ছিল খুবই বেশি।

তাঁর নাম আহমদ উল্লাহ। তিনি ইস্ট পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে (ইপিসিএস) চাকরি করতেন। তাঁর বদলির চাকরি ছিল। প্রথম জীবনে পশ্চিম বাংলায় চাকরি করতেন। সেখানে দেখেছিলেন, বাঙালি হিন্দু পরিবার তাদের মেয়েদের লেখাপড়া শেখাচ্ছে। তিনিও মেয়েদের লেখাপড়ায় খুব উৎসাহী হয়ে ওঠেন। বাবা খুব প্রগতিশীল ছিলেন। মেয়ে ও ছেলের মধ্যে তফাত করতেন না। আমাদের ভাই-বোনদের এক রকমের খেলনা কিনতেন, মেয়েদের জন্য কোনোদিনও পুতুল কিনতেন না। পঞ্চাশের দশকে আমরাই প্রথম প্রজন্মের মুসলমান নারী যারা-স্কুল কলেজে পড়তে গিয়েছিলাম। ভাই-বোন ছিলাম ছয়জন, তার মধ্যে তিন বোন। ছোটবেলা থেকে বাবার মুখে শুনতাম, আমাদেরও ছেলেদের মতো প্রথম হতে হবে। আমিও স্বপ্ন দেখতাম—লেখাপড়া করব, চাকরি করব, প্রতিষ্ঠিত হব। বাবার ও মায়ের সমর্থন আমার জন্য খুব বড় আশীর্বাদ ছিল। কারণ তখনকার দিনে তো মেয়েদের খুব অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হতো। যেসব মফস্বল স্কুলে পড়েছি, সেগুলোতে তো অত প্রশিক্ষিত শিক্ষক ছিলেন না। তবে কেবল স্কুলের ওপর নির্ভর করে ছিলাম না। প্রতিদিন সকালে বাবা স্কুলে যাওয়ার আগে ইংরেজি দেখিয়ে দিতেন, স্কুলের কাজ দেখে দিতেন। তিনি ইংরেজিতে ভালো ছিলেন, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস। প্রথম থেকেই লেখাপড়ায় ভালো ছিলাম। মনে পড়ে—কোনোদিন প্রথম দ্বিতীয় হইনি। ষষ্ঠ ও অষ্টম শ্রেণিতে ফলাফলের ভিত্তিতে সরকারিভাবে বৃত্তি দেওয়া হতো, দুটিই পেয়েছি।

 

কেন ছেলেদের স্কুলে ভর্তি হতে হলো?

সরকারি চাকরিজীবী হয়েও বাবা খুব স্বাধীনচেতা ছিলেন। সরকার বললেও রাজনৈতিক কারণে তিনি কাউকে শাস্তি দিতেন না। একটি ঘটনার কথা বলি, বাবা তখন বাগেরহাটে, খুলনার আওয়ামী লীগ নেতা এম এ আজিজকে সরকার রাষ্ট্রদ্রোহী মামলার আসামি করেছিল। বাবা দেখলেন, তিনি তেমন কোনো অপরাধই করেননি। সকালে কোর্ট খুলে সব ফাইলপত্র দেখে তাঁকে খালাস করে দিলেন। এ ধরনের স্বাধীন আচরণের কারণে সরকার বাবাকে পছন্দ করত না। ফলে তারা তাঁকে শাস্তি দিতে চাইল। তাঁকে শাস্তি দেওয়ার সবচেয়ে ভালো উপায়—বদলি করে দেওয়া, যাতে তিনি মেয়েদের লেখাপড়া করাতে না পারেন। তাঁকে ভোলায় বদলি করে দেওয়া হলো। সেখানে মেয়েদের স্কুল নেই, একটিমাত্র সরকারি বালক বিদ্যালয়। বাবা আইন ঘেঁটে দেখলেন, সরকারি কর্মকর্তা বদলি হলে সেখানকার সরকারি স্কুলে তাঁর সন্তানকে ভর্তি করতে হবে। প্রধান শিক্ষককে গিয়ে তিনি বললেন, আমার মেয়েকে এখানে ভর্তি করাতে হবে। প্রধান শিক্ষক বললেন, এটি তো ছেলেদের স্কুল। বাবা আইন দেখালেন, এতে তো ছেলে কি মেয়ের কথা লেখা নেই, লেখা আছে ‘সন্তান’। যেহেতু স্কুল, আপনাকে ভর্তি করাতে হবে। বাধ্য হয়ে ভর্তি করাতে রাজি হলেও তিনি বললেন, সে ক্লাস করতে পারবে না, বাসায় বসে পড়বে। ভর্তি হলাম। তখন বছরে দুটি পরীক্ষা হতো। বাবার পিয়নরা আমাকে গার্ড দিয়ে প্রধান শিক্ষকের রুমে নিয়ে যেত। সেখানে বসে পরীক্ষা দিতাম। ছেলেরা সব হাঁ করে তাকিয়ে থাকত। ফলে পুরো নাইন বাসায় পড়তে হলো। বাবার কাছে সব শেখা গেল, শুধু অঙ্কটা পারা গেল না। এ তো শিক্ষকের কাছে শিখতে হয়। ভেবেছিলাম সায়েন্সে পড়ব, বাদ দিতে হয়েছিল।

 

মেট্রিকে মেয়েদের মধ্যে প্রথম হয়েছিলেন, সম্মিলিত মেধাতালিকায় সপ্তম।  

নাইনের শেষ দিকে বাবা মুন্সীগঞ্জে বদলি হলেন। এভিজেএম গার্লস হাই স্কুলে ভর্তি হলাম। বাগেরহাটের মনমোহিনী বালিকা বিদ্যালয়ে যেমন সত্যেন স্যারকে পেয়েছি, এখানে চিন্তাহরণবাবুকে পেলাম। তিনি এই স্কুলের প্রাণ ছিলেন। সকাল থেকে রাত অবধি মেয়েদের শরীর ভালো আছে কি না, কিভাবে তারা লেখাপড়া করবে—এসবই দেখতেন। তিনি কিন্তু বিএ পাসও ছিলেন না, গুরু ট্রেনিং নিয়েছিলেন। ময়লা জামাকাপড়ে ধূলি-ধূসরিত হয়ে, স্যান্ডেল পরে স্কুলে চলে আসতেন। তবে আমাদের খুব যত্ন নিতেন। প্রথমেই তিনি বুঝেছিলেন, আমি ভালো করব; তাই খুব উৎসাহিত করতেন, মেয়েদের মধ্যে তুমি বোর্ডে স্ট্যান্ড করতে পারবে। তখন নিয়ম ছিল, কোনো শিক্ষার্থী বোর্ডে এক থেকে দশের মধ্যে থাকলে সেই স্কুল সরকারি অনুদান পাবে। তবে টেনে ওঠার পর বাবা নারায়ণগঞ্জে বদলি হলেন, চাইলে মর্গান গার্লস হাই স্কুলে ভর্তি হতে পারতাম। কিন্তু চিন্তাহরণবাবুসহ অন্যরা ভাবলেন, মর্গান থেকে ম্যাট্রিক দিলে তো সেই স্কুলেরই সুনাম হবে। ফলে তাঁরা বাবাকে খুব অনুরোধ করলেন, আমি যেন তাঁদের স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিই। আমিও দেখলাম, যেভাবে তিনি আমাকে উৎসাহিত করেছেন, তাঁর স্কুল থেকেই ম্যাট্রিক দেওয়া উচিত। ফলে এভিজেএম থেকেই ম্যাট্রিক দিলাম। তখন পূর্ব পাকিস্তানে একটিই বোর্ড ছিল। আমার আগে একমাত্র ফেরদৌসী রহমানই সম্মিলিত মেধাতালিকায় ছিলেন। ১৯৫৭ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে সম্মিলিত মেধাতালিকায় সপ্তম হয়েছি, মেয়েদের মধ্যে প্রথম।

 

এরপর তো ইডেন কলেজ।

বাবা ইতিহাসের ছাত্র ছিলেন, ফলে ইতিহাস খুব ভালো লাগত। কলেজে ইসহাক স্যার ইতিহাস খুব ভালো পড়াতেন। ইতিহাসে নম্বরও বেশি পেতাম। ইতিহাসবিদ সালাউদ্দিন সাহেবের স্ত্রী, হামিদা (খানম) আপা যুক্তিবিদ্যা পড়াতেন। ফলে ভেবেছিলাম, ইতিহাসে বিএ পড়ব। চাইলে ইংরেজি সাহিত্যেও পড়তে পারতাম। কিন্তু বড় বোন ইংরেজিতে পড়েছেন বলে সেদিকে গেলাম না।

 

রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ভর্তি হলেন কেন?

ইতিহাসের ফরম নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিলামও। তখন এটি ঢাকা মেডিক্যালের গেটের কাছে সেই ছোট্ট জায়গায় ছিল। ইতিহাস বিভাগের ভবনে দেখি, দেয়ালে ফাটল ধরেছে। মনটাই খারাপ হয়ে গেল, নিজেকেই প্রশ্ন করলাম, এই ফাটল ধরা ভবনে তিন বছর কাটাতে হবে? এখানে পড়ব না। সেখান থেকে ফরম নিয়ে নিলাম। আসলে তখন বিষয় নিয়ে অত চিন্তা করিনি। আমার মূল উদ্দেশ্য ছিল—প্রথম শ্রেণী পাওয়া। তাহলে বৃত্তি নিয়ে বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিতে পারব। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে ওই একটি পথই তো খোলা আছে। ১৯৫৯ সালে ভর্তি হলাম। নিজ ইচ্ছায় ভর্তি হওয়ায় বাবাও কিছু বললেন না।

 

ছাত্র-ছাত্রী-শিক্ষক, সেই সময়ের পরিবেশ কেমন ছিল?

বিএ অনার্সে বাংলা ও ইংরেজিতে পাঁচজন করে, বাকি সব বিভাগে দুই কি একজন করে মেয়ে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে জনাচল্লিশেক ছাত্র, আমরা দুটি মাত্র মেয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেই কলা ভবনের দোতলায় মেয়েদের কমনরুমে বসে থাকতাম বা লাইব্রেরিতে মেয়েদের ঘরে বসতাম। ক্লাসের ঘণ্টা পড়লে ক্লাসের সামনে দাঁড়াতাম। শিক্ষক এসে বলতেন, ঢোকো, ক্লাসে যেতাম। ক্লাস শেষে স্যারের সঙ্গে বেরিয়ে কমনরুমে। ছেলেরা পেছনে বসত, কোনো কথাই হতো না। কেউ কথা বলতে চাইলে বেয়ারাকে দিয়ে চিরকুট পাঠাত, কমনরুম থেকে এসে একটুখানি কথা বলে মেয়েরা আবার কমনরুমে চলে যেত। আমরা মেয়েরা খুব সকালে বেয়ারাকে দিয়ে লাইব্রেরি থেকে বই ওঠাতাম। আবার সন্ধ্যার আগে আগে ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যেতাম। খুব খারাপ লাগত—ছেলেরা দেরি করে ঘুম থেকে ওঠে, আমরা ভোরে উঠে ক্লাসে যাই; বেয়ারাকে দিয়ে বই আনাই, সে বই খুঁজে আনতে দেরি করে। কিন্তু ছেলেদের তো সেসব সমস্যা হয় না। বিকেলে বই ফেরত দিয়ে আমরা চলে যাই, ছেলেরা তখন এসে সহজে বই পেয়ে অনেক রাত পর্যন্ত পড়ে।

 

শিক্ষকদের কথা মনে পড়ে?

আমার ভর্তির সময় আবদুর রাজ্জাক স্যার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে, তিনি ১৯৬০ সালে ফিরলেন। মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী তখন লন্ডনে পিএইচডি করছেন। জিডব্লিউ চৌধুরীও ছিলেন। সব শিক্ষকরাই আমাকে খুব পছন্দ করতেন। মোজাফফর স্যার অনর্গল এক ঘণ্টা বক্তৃতা করতেন। রাজ্জাক স্যার খুব লম্বা লেকচার দিতে পছন্দ করতেন না। লেকচারের বদলে তিনি বারবার প্রশ্ন করতেন। তাঁর মুখে তীর্যক মৃদু হাসি লেগেই থাকত। ক্লাস, টিউটরিয়ালে মনে হতো, তিনি হয়তো আমাদের অজ্ঞতা দেখে একটু বিদ্রূপই বুঝি করছেন (হাসি)। কিন্তু আমি তো তাঁর অনেক প্রশ্নেরই উত্তর জানতাম। তবে একটি-দুটির উত্তর দিয়ে বাকিগুলোর উত্তর দিতাম না। কেননা আর কেউ তো উত্তর দিচ্ছে না, বারবার তো আর দাঁড়ানো যায় না। স্যারদের অনেক প্রশ্নেরই জবাব জানা থাকলেও একটি-দুটির বেশি উত্তর দিতাম না। কারণ ছেলেরা পছন্দ করত না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মেয়েদের আলাদা টিউটরিয়াল হতো। আমাদের চেয়ারম্যান নিউম্যান স্যার মনে করতেন, জুনিয়র শিক্ষকদের সঙ্গে মেয়েদের টিউটরিয়াল দেওয়া সুবিধার হবে না, ফলে মুজাফফর স্যার, রাজ্জাক স্যারের সঙ্গে আমার টিউটরিয়াল হয়েছিল। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বই পড়তে খুব আগ্রহ থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি, দেশের রাজনীতির কোনো খোঁজই রাখতাম না। শুধু লেখাপড়া নিয়ে থেকেছি। তখন খুব কম মেয়েই দেশের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিল।

 

বিএ পরীক্ষার রেজাল্ট?

বিএ অনার্সে ভর্তি হওয়ার দুই বছর পর আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয় উত্তাল হয়ে উঠল। ক্লাস হতো না, বাসায় বসে পড়তে হতো। পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল ১৯৬২ সালে। তবে আন্দোলনের কারণে একটু পেছাল। ১৯৬৩ সালে এমএ, রেজাল্ট বেরোলো ১৯৬৪ সালের শেষে। বিএ অনার্স ও এমএ দুটোতেই ফার্স্ট ক্লাস পেলাম।

 

হার্ভার্ডে কিভাবে গেলেন?     

ছোটবেলা থেকেই আমার কষ্ট হত—মেয়েদের সব সময় শুধু ‘না’ শুনতে হয়, এটা করতে পারবে না, সেটা করতে পারবে না। তাই প্রতি মুহূর্তে ভেবেছি, এ পরিস্থিতি থেকে বেরোব কিভাবে? এ থেকে বেরোতে হলে তো এই দেশ থেকেই বেরোতে হবে। তাই উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাবার সুযোগ খুঁজতে থাকলাম। ১৯৬৩ সালে একবারই পাকিস্তান সরকার ‘স্টেট স্কলারশিপ’ বৃত্তি দিয়েছিল। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের যেকোনো বিষয়ে সেরা পাঁচ ছাত্র-ছাত্রী সেগুলো পাবে ও পশ্চিমের যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন বছর পড়তে পারবে। তখন এমএ পরীক্ষা দিচ্ছি। ১৯৬৪ সালে ইন্টারভিউ হলো। যেহেতু বিএ ও এমএতে প্রথম শ্রেণি ছিল, ইন্টারভিউও ভালো হলো, বৃত্তি পেয়ে গেলাম। প্রথমে তো অক্সফোর্ডে পড়ার ইচ্ছা ছিল, তবে দেখলাম, অক্সফোর্ডের নামকরা কলেজগুলো সবই ছেলেদের। ফলে ভাবলাম, আমেরিকায় যাব। প্রথমে স্ট্যানফোর্ডে চেষ্টা করলাম, এরপর শিকাগো, কলম্বিয়া—সব জায়গায়ই অ্যাডমিশন হলো। হার্ভার্ড তো সবচেয়ে নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়, ফলে ভর্তি হতে পারি কি না পারি—এই ভেবে আবেদনই করিনি। বিদেশে পড়তে তখন তিনটি রেফারেন্স লেটার লাগত। সে জন্য রাজ্জাক স্যারের কাছে যাওয়ার পর তিনি বললেন, ‘হার্ভার্ডে পড়ছেন না কেন?’ মনের কথা বলার পর তিনি বললেন, ‘নুরুল ইসলাম, আনিসুর রহমান সেখান থেকে পিএইচডি করেছেন। তাঁরা পারলে আপনি পারবেন না কেন? আবেদন করুন। ’ তিনি আত্মবিশ্বাস দিলেন। তখন বেশ দেরি হয়ে গিয়েছিল। তাও হার্ভার্ডে লিখলাম। হার্ভার্ড থেকে চিঠিও এলো। তাঁরা জানালেন, জানুয়ারি থেকে আমাকে নেওয়া যেতে পারে। এমএ নয়, সরাসরি পিএইচডি করতে পারব। প্রফিশিয়েন্সি ও শিক্ষকদের কাছ থেকে রেফারেন্স লেটার নিয়ে ১৯৬৫ সালের জানুয়ারিতে হার্ভার্ডে চলে গেলাম। চার বছর থেকেছি।

 

সেই জীবন?

আমেরিকান ও ইউরোপীয় ছাত্র-ছাত্রীই বেশি ছিল। আমি তো শাড়ি পরে গিয়েছি। এ ধরনের মানুষ তাঁরা আগে তেমন দেখেননি। হঠাৎ করে আমাকে ইংরেজিতে কথা বলতে আরম্ভ করতে হলো। পিএইচডি প্রগ্রামে সেমিনার থাকত। তাতে শিক্ষকদের প্রশ্ন করতে হত এবং আলোচনা করতে হত। এটিই আমার জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল। সবই তো জানি, লিখতেও পারি ভালো। কিন্তু সবার সামনে কথা বলতে হবে, বিশেষ করে যারা ইংরেজিতে দক্ষ, তাদের সামনে। তার পরও মনের জোর ছিল, তাই সব ভয়, সংকোচ কাটিয়ে উঠলাম। হার্ভাডের চার বছর আমার জীবনের সেরা বছর। সেখানে পড়তে যাওয়ায় আমার জীবনে আমূল পরিবর্তন হলো। সেখানে গিয়ে প্রথমে আকাশচুম্বী স্বপ্ন দেখা ও জীবনযুদ্ধে সাঁতার কাটতে শেখা—এই দুটি জিনিশ শিখলাম। সেখানে প্রচলিত ছিল—হয় সাঁতার দাও, নয় ডুবতে হবে। যেহেতু ডুববার কোনো ইচ্ছাই আমার ছিল না, তাই খুব দ্রুতই সব প্রতিকূলতা জয় করে সবার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে লাগলাম। প্রত্যেক পরীক্ষাই ফলাফল ভালো হতে লাগল, মনোবল বাড়ল। ক্লাসে বন্ধুবান্ধব হলো, যাদের সঙ্গে তর্কবিতর্ক করতে আরম্ভ করলাম। জীবনে এই প্রথম একটি নামকরা প্রতিষ্ঠানে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে লেখাপড়া করার সুযোগ হলো। অধ্যাপকরা সব বিশ্ববিখ্যাত, সব সহপাঠীই অত্যন্ত মেধাবী। অনেক মেধাবী ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে প্রতিযোগিতা ও বন্ধুত্ব করার সুযোগ হলো। এখনো তাদের অনেকের সঙ্গে বন্ধুত্ব আছে। হার্ভার্ডের পরিবেশ ছিল গণতান্ত্রিক। অধ্যাপকরা ভালো বক্ততা দিলে আমরা তালি দিতাম। পছন্দ না হলে দুয়ো দিতাম। তাতে তাঁরা কিছু মনে করতেন না। তাঁদের মতামত গ্রহণ করার কোনো বাধ্যবাধকতাও আমাদের ছিল না। তাঁদের স্যার বলতে হত না, নাম ধরে ডাকতাম। আমার প্রিয় অধ্যাপক স্যামুয়েল হাটিংটনকে ‘স্যাম’ বলতাম। দুই বছর ক্লাসের পর থিসিস লেখার জন্য একটি কমপ্রিহেনসিভ পরীক্ষা হলো। ফল খুব ভালো হওয়ায় হার্ভার্ডের টিচিং ফেলো হলাম ও থিসিস লেখা আরম্ভ করলাম।  

 

আপনিই তো প্রথম বাংলাদেশি মেয়ে, যিনি হার্ভার্ডে পিএইচডি করেছেন?

হ্যাঁ। প্রথমে ভেবেছিলাম, পলিটিক্যাল থিওরি কিংবা রাশিয়ার রাজনীতির ওপর থিসিস লিখব। তবে সে জন্য বিভিন্ন ভাষা শিখতে হবে। কিন্তু আমার তো তিন বছরের বৃত্তি, এর মধ্যে দুই বছর প্রায় শেষ। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হলো—পাকিস্তানের রাজনীতি বিশেষ করে জাতীয় সংহতির সমস্যা নিয়ে কাজ করব। আমার সময়কাল ছিল ১৯৫৮-১৯৬৮ সাল। সাম্প্রতিক সময়ের তথ্যের জন্য ১৯৬৮ সালের গ্রীষ্মে দেশে এলাম। অনেক সরকারি কর্মকর্তা ও রাজনীতিবিদের সাক্ষাৎকার নিয়েছি। তখন আইয়ুবের যুগ, ছয় দফা আন্দোলনের পর রাজনীতিবিদরা অনেকে জেলে বন্দী। বাঙালি ও পাকিস্তানী রাজনীতিবিদদের মধ্যে একটি পার্থক্য লক্ষ্য করলাম। দেখলাম, পূর্ব পাকিস্তানে নুরুল আমিন কিংবা হামিদুল হক চৌধুরী একটু ধনী হলেও বাকি রাজনীতিবিদদের অত সম্পদ নেই। বেশির ভাগ রাজনীতিবিদেরই বাসায় কাঠের চেয়ার দেখেছি। অথচ পশ্চিম পাকিস্তানে গিয়ে দেখেছি, রাজনীতিবিদদের অনেক পয়সা, ড্রয়িংরুমে কার্পেট, সোফা। এক বছরের মাথায় থিসিস লিখে জমা দিলাম। থিসিসের মূল বিষয় ছিল, পাকিস্তানে বিশেষত আইয়ুব খানের আমলে জাতীয় সংহতির নামে যেসব রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক নীতি গ্রহণ করা হচ্ছিল, সেগুলো আদৌ কাজ করে নাকি করে না? তথ্য-উপাত্ত নিয়ে দেখলাম, এগুলো কাজ করছে না। বরং পাকিস্তান ভেঙে যাবার পথে। ১৯৬৯ সালে পিএইচডি হলো। এর পরই কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে এক বছরের পোস্ট ডক্টরেট করার প্রস্তাব এলো। যার প্রধান কাজ হবে—এই থিসিসকে বই আকারে সাজিয়ে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশ করা। ১৯৭২ সালে আমার বই কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘পাকিস্তান : ফেইলিওর ইন ন্যাশনাল ইন্টিগ্রেশন’ নামে প্রকাশিত হলো। এখনো দেশে ও বিদেশের বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে বইটি পড়ানো হয়। এর পর ১৯৭১ ও ১৯৭২ সালে হার্ভার্ডে অধ্যাপনা করেছি। আমাদের স্বাধীনতার পর সেখানে ‘বাংলাদেশ’ নামে একটি সেমিনারের আয়োজন করেছিলাম, যেখানে প্রতি সপ্তাহে একটি লেকচার হত। সম্ভবত কোনো বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ে সেটিই বাংলাদেশের ওপর প্রথম সেমিনার।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিলেন কবে?

১৯৭০ সালে রিডার পদে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিলাম। এই পদকে এখন সহযোগী অধ্যাপক বলা হয়। ১৯৭৩ সালে আমাকে বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব দেওয়া হলো। বিভাগের উন্নয়নে কিছু কাজ করেছি, বহু বছরের পুরনো সিলেবাসকে নতুন করে তৈরি করেছি। কমপারেটিভ পলিটিকস, সাউথ-সাউথইস্ট পলিটিকস, রিসার্চ মেথডের মতো নতুন বিষয় যোগ করেছি। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডার খ্যাতনামা বহু শিক্ষকের সঙ্গে পরিচয় ছিল, তাঁদের ব্যক্তিগতভাবে চিঠি লিখে বিভাগের অনেক শিক্ষককে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ভারতে পিএইচডির সুযোগ করে দিয়েছি।   তা না হলে এখন যারা এদেশে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, তাঁদের অনেকে হয়ত বাইরে গিয়ে উচ্চশিক্ষাই নিতে পারতেন না। ‘পলিটিক্যাল সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন’—এর জেনারেল সেক্রেটারি ছিলাম। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের একটি কনফারেন্স করে ভারত থেকে অতিথি এনেছি।

 

একাত্তরে ধর্ষণের শিকার নারীদের নিয়ে তো আপনার লেকচার আছে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি হার্ভার্ডে। দেশের অসংখ্য মেয়ে তখন ধর্ষিতা হয়েছেন এবং যুদ্ধের পর তাঁদের পরিবারেও তাঁরা গ্রহণযোগ্য হচ্ছিলেন না। এই খবরগুলো ১৯৭২ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পত্রপত্রিকায় ব্যাপকভাবে প্রকাশিত হচ্ছিল। তখন বাংলাদেশের নারীদের ওপর একটি বক্তৃতা দেওয়ার জন্য নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমন্ত্রণ জানানো হলো। আগে তো কখনো নারীদের ওপর গবেষণা করিনি। ফলে বেশ কিছুদিন চিন্তা করে ‘উইমেন ইন এশিয়া’ লেকচারটি দিতে হলো। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমাদের মেয়েদের দুর্দশা ও অপমান আমায় আন্দোলিত করেছে। আমেরিকায় তখন মেয়েদের নিয়ে নানা গবেষণা আরম্ভ হয়েছে। মনে হলো, আমার দেশের মেয়েদের নিয়ে তো কোনো গবেষণা হয় না, তাদের নিয়েও তো গবেষণা প্রয়োজন। ফলে ১৯৭৩ সালে দেশে ফিরে নিজ বাড়িতে বন্ধুবান্ধব, শিক্ষকদের নিয়ে ‘উইমেন ফর উইমেন’ শুরু করলাম। সেটি ১৯৭৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করলো।

 

উইমেন ফর উইমেনে শুরুতে কারা ছিলেন?

এলেন সাত্তার নামে এক বিদেশিনী, পারভীন আহমেদ, আমার বন্ধু ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক মাহমুদা ইসলাম, বড় বোন রওশন জাহান, লোকপ্রশাসনের অধ্যাপক বিলকিস আরা আমিন, রওশন কাদের—এমন হাতেগোনা কয়েকজন সঙ্গে ছিলেন। শুরুতে খুব কম নারীকেই গবেষণায় আগ্রহী দেখেছি। সেই যুগে এই রেওয়াজও কম ছিল। অবশ্য আমি প্রথম থেকেই গবেষণায় আগ্রহী। ১৯৭২-১৯৭৩ সালে ছাত্রদের নিয়ে রাজনীতির ওপর সার্ভে রিসার্চ করেছি। ১৯৭০ ও ১৯৭৩ সালে যাঁরা সংসদ সদস্য হয়েছেন, তাঁদের ওপর একটি গবেষণা প্রবন্ধ তৈরি করেছি। এছাড়াও স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে প্রথম সংসদ নির্বাচনের ভোটারদের ওপর জরিপ করেছি। এগুলোই তখন এ দেশের রাজনীতি নিয়ে প্রথম বড় ধরনের গবেষণা। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনের ওপর বইটি লেখার জন্য তো ১৯৭৫ সালে শিকাগোতে চলে গেলাম। গবেষণা শেষ করে ১৯৭৭ সালে দেশে এলাম। তবে বইটি এখনো প্রকাশ করিনি। তবে দুটি অধ্যায় নিয়ে ১৯৮০ সালে ‘বাংলাদেশ পলিটিকস প্রবলেমস অ্যান্ড ইস্যুজ’ প্রকাশ করেছি, ইউপিএল থেকে বেরিয়েছে।

 

কেন ১৯৮৩ সালে বিদেশে চলে গেলেন?

১৯৭৪ সাল থেকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যে নারী আন্দোলন শুরু হলো, সেগুলোয় খুব জড়িয়ে গিয়েছিলাম। সেসব নিয়ে গবেষণার আগ্রহও বেড়ে গিয়েছিল। এছাড়া আমি তো রাজনীতি নিয়েও গবেষণা করতাম, সামরিক আইন জারি হওয়ার পর থেকে রাজনীতি নিয়ে গবেষণা করা বা স্বাধীনভাবে লেখা কষ্টকর হয়ে পড়ল। আমার গবেষণার ওপর পুলিশি হয়রানি অনেক বেড়ে গিয়েছিল। বিদেশে কনফারেন্সে যেতেও আমাকে অনুমতি নিতে হতো। এক-দুবার অনুমতিও দেওয়া হয়নি। তাদের ভেতর আমাকে মন্ত্রী বানানোর আগ্রহও দেখেছি। কিন্তু আমি তো মন্ত্রী হতে চাই না, স্বাধীনভাবে লেখাপড়া ও গবেষণা করতে চাই। সেটিই যখন হচ্ছিল না, সিদ্ধান্ত নিলাম, ছোটখাটো কনফারেন্সের জন্য আর বিদেশে যাব না, দেশ থেকে একেবারেই বেরিয়ে যাব। ফলে জাতিসংঘের চাকরির অফারটা নিয়ে নিলাম। ১৯৮২-৮৪ সাল পর্যন্ত এশিয়া প্যাসিফিক ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের উইমেন ইন ডেভেলপমেন্ট প্রগ্রামের এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান ছিলাম। মালয়েশিয়ায় অফিস ছিল। দক্ষিণ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, চীন, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের মেয়েদের অবস্থা নিয়ে কাজ করতে হয়েছে। অনেক বেশি প্রশাসনিক হলেও এ কাজের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কাজের অভিজ্ঞতা বেড়েছে।

 

এরপর তো আইএলওতে কাজ করেছেন।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থায় কাজের অভিজ্ঞতা ছিল আরো একটু বড়। এটি বৈশ্বিক কর্মসূচি ছিল। এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার মেয়েদের অবস্থা ও তাদের কর্মক্ষেত্র নিয়ে কাজ করতে হয়েছে। আমার অধীনে বিভিন্ন দেশের মানুষ কাজ করেছেন, বিভিন্ন দেশে প্রজেক্টের কাজে যেতে হয়েছে। এটি আমার সারা জীবনের একাডেমিক কাজের চেয়ে একেবারেই অন্য রকম ছিল, অনেকটাই প্রশাসনিক। পাঁচ বছর পর ১৯৯০ সালে আইএলও ছেড়ে আবার কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনে ফিরে গেলাম। মেয়েদের ওপর কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি বই লেখার ইচ্ছা হলো। সেটি জেড বুকস থেকে ১৯৯৫ সালে বেরিয়েছে—‘দি এলুসিভ এজেন্ডা : মেইনস্ট্রিমিং উইমেন ইন ডেভেলপমেন্ট’। পরে এখানে ইউপিএল প্রকাশ করেছে। এটিও খুবই প্রশংসিত হয়েছে। এতে বাংলাদেশ ও তানজানিয়া এবং চারটি আন্তর্জাতিক সংস্থায় মেয়েদের অবস্থা নিয়ে তুলনামূলক আলোচনা করেছি। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ২৫তম বার্ষিকী উপলক্ষে কলম্বিয়ায় একটি আন্তর্জাতিক কনফারেন্সের আয়োজন করলাম। কনফারেন্সের ভলিউমও ২০০০ সালে জেড বুকস থেকে বেরিয়েছে—‘বাংলাদেশ প্রমিস অ্যান্ড পারফরম্যান্স’। এই কনফারেন্সের মাধ্যমে আমি আবার বাংলাদেশ গবেষণায় ফিরেছি। তবে ২০১০ সাল থেকে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে আর পড়াচ্ছি না, পুরোপুরিভাবে গবেষণা করছি।

 

কী নিয়ে গবেষণা করছেন?

এখন সিপিডিতে সম্মানীয় ফেলো হিসেবে আছি। গত ৪-৫ বছর দুটি বড় গবেষণা করেছি। একটি রাজনৈতিক দলের ওপর, অন্যটি জাতীয় সংসদ নিয়ে। রাজনৈতিক দলের ওপর গবেষণাটি ২০১৫ সালে প্রথমা থেকে বই হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। নাম—‘পলিটিক্যাল পার্টিস ইন বাংলাদেশ। ’ তবে সংসদ নিয়ে গবেষণাটি এখনো বই হিসেবে প্রকাশ করিনি। অনেক দিন ধরেই অনেক প্রকাশক পাকিস্তান ভেঙে যাওয়া নিয়ে আমার প্রথম বইটির মত আরো একটি বই লেখার জন্য অনুরোধ করছেন, যেটি সর্বজন গৃহিত হবে। বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে সে ধরনের আরো একটি কাজের ইচ্ছা আছে, যেটি বহু বছর ধরে অনেকে পড়তে পারবেন।

 

অধ্যাপক রেহমান সোবহানের সঙ্গে বিয়ের গল্প শুনব।

বহু বছর ধরে তো বিয়ে করার কোনো ইচ্ছাই ছিল না। কারণ আমি খুব স্বাধীনচেতা। মনে হয়েছিল, বিয়ে করলে যেভাবে ইচ্ছা কাজ করতে পারব না। যেকোনো বিষয় নিয়ে তাঁর সঙ্গে যেকোনো সময় আলোচনা করতে হবে। এ তো কখনো চাইনি। প্রফেসর সোবহানকে বিয়ে করার কারণ—প্রথমত, বহু বছর ধরে একসঙ্গে কাজ করছি, সব সময় তিনি আমার লেখা পড়েছেন, উৎসাহিত করেছেন। আমিও তাঁর লেখা পড়ে আলোচনা-সমালোচনা করেছি। তিনি যখন আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন, ভেবে দেখলাম, তাঁকে বিয়ে করলে যেমন স্বাধীন থাকতে পছন্দ করি, তাতে কোনো অসুবিধা হবে না। বাস্তবেও গত ১১ বছরে কোনো অসুবিধা হয়নি। কিছুদিন নিউ ইয়র্কে থাকি, কিছুদিন বাংলাদেশে। অনেক বিষয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি এক, সব সময়ই আমরা একে অন্যের লেখা পড়ি ও পড়ে মন্তব্য করি। আমাদের কাজের ক্ষেত্রও এক। একই বিষয়ে আগ্রহী আমরা—এটিই সবচেয়ে বড় বাঁধন। অর্থনীতিবিদ হলেও রেহমান রাজনীতি নিয়ে লেখেন। রাজনীতি নিয়ে কাজ করলেও আমি রাজনীতির ওপর অর্থনীতির কী প্রভাব তা দেখাতে চেষ্টা করি।

 

হার্ভার্ডের র‌্যাডক্লিফ অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হয়েছেন।

সম্মাননাটি পেয়ে খুবই বিস্মিত হয়েছিলাম। কারণ হার্ভার্ড ছেড়ে দেওয়ার পর সেখানে আরো কয়েকবার যেতে অনুরোধ করা হয়েছিল, যাইনি। হঠাৎ তারা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরনো, গ্র্যাজুয়েশন করা ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে খ্যাতিমান, প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন ও সমাজ-রাষ্ট্রে অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছেন—এমন কৃতীদের সম্মাননাটি আমাকে দিল। খুঁজে বের করে আমাকে এই সম্মাননাটি দেওয়ায় আমি খুব খুশি। আরো খুশি এই কারণে—আমার পুরোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্তত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে আমার কর্মের স্বীকৃতি দিয়েছে। এটি দুর্লভ সম্মান। আমি ছাড়া তৃতীয় বিশ্বের দুই-একজন নারীই সম্মাননাটি পেয়েছেন। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন আমাকে সম্মাননা দিয়েছেন। দেশে এটিই আমার প্রথম সম্মাননা। আমার পুরোনো ছাত্র-ছাত্রীরা এবং যারা আমাকে শুধু বই পড়ে চেনে, তারা যে আমাকে মনে রেখেছে—এটি জেনে আমি খুব আনন্দিত।  

 

শ্রুতলিখন : রেনেসাঁ রহমান

(১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ, লালমাটিয়া, ঢাকা)


মন্তব্য