kalerkantho


নিজের মতো করে পথকে তৈরি করে নিয়েছি

তাঁর জীবন গল্পের চেয়েও সত্যি। অন্যের বাড়িতে থেকে লেখাপড়া করেছেন, সাহিত্যের অনুরাগ থেকে লেখালেখির সূচনা। গল্পকার জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের গল্পের পেছনের জীবন শুনেছেন ওমর শাহেদ। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

৩ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



নিজের মতো করে পথকে তৈরি করে নিয়েছি

আপনার জীবন তো সংগ্রামমুখর।

খুব অল্প বয়সে মা মারা যান, বাবা তখন বিদেশে। আমরা ছিলাম তিন ভাই-বোন। বড় ভাই-বোন, তাঁদের পর আমি। বড় ভাই অনেক আগেই কলকাতায় চলে যান। মায়ের মৃত্যুর পর আমাদের পক্ষে পাবনার গ্রামে আর থাকা সম্ভব হয়নি। এক মামা বগুড়া শহরে হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার, তিনি আমাদের তাঁর কাছে নিয়ে যান। তত দিনে বাবাও ফিরে এলেন। তবে তাঁর পক্ষে সেভাবে কোনো কাজ, অর্থকড়ি জোগাড় করা সম্ভব হয়নি। ফলে বেশ কিছুকালের ভেতরেই তাঁর যা কিছু ছিল, সব বিক্রি করে তিনি প্রায় দীনহীন হয়ে বগুড়া শহরে চলে আসেন। তাতে অবস্থা এমন হলো যে আমাদের স্কুলের মাইনে দেওয়ার মতো ক্ষমতাও থাকল না।

বাধ্য হয়ে কিছুদিন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে শেষে এক মুদির দোকানে চাকরি নিলাম। দোকানদারের সহকারী, তাঁর ছেলের গৃহশিক্ষক, অনেকগুলো গরু ছিল তাঁর, সেগুলোর যত্ন নেওয়ার কাজও করেছি। প্রথমে মাইনে দিতেন না। পরে খুব সম্ভব ১০ টাকা করে দিয়েছেন। বড় ভাই ফিরে এসে যখন দেখলেন মুদি দোকানে কাজ করছি, গৃহকর্তাকে বললেন, ‘ওর পড়ালেখা করার ইচ্ছা আছে, বুদ্ধিও ভালো, ওকে স্কুলে যেতে দিন। ’ তিনি রাজি হলেন, ‘ঠিক আছে, স্কুলে যাও। কিন্তু তাহলে আমি আর মাইনে দেব না। ’ তাঁর বাড়িতে থাকতে থাকতেই স্কুল পাস করলাম। তারপর কিছু কারণে তাঁর কাছে থাকা আর সম্ভব হলো না।

 

কলেজে পড়েছেন কিভাবে?

রঘু দেবনাথ নামে এক ছোট দোকানদারের অতি দরিদ্র পরিবারে জায়গির থেকে তাঁদের ছেলেকে পড়ানোর বিনিময়ে কলেজে (সরকারি আজিজুল হক কলেজ) যেতে শুরু করলাম।   তবে মাইনে কী করে জোগাব, তারও কোনো স্থিরতা ছিল না। কখনো টিউশনি, কখনো খবরের কাগজ বিলি করেছি। কলকাতা থেকে স্টেটসম্যান আসত, আমাদের স্কুলের দপ্তরি কালু সেগুলো বিলি করতেন। তাঁর বয়স হয়ে গিয়েছিল। তাঁর কাছ থেকে সেই কাজ নিয়েছিলাম। তাতে কিছু পয়সা আসত, টিউশনি—এই করে কোনোমতে মাইনে জোগাতাম। তবে কলেজ শেষের পর টাকা-পয়সা ও অন্য কিছু কারণে আর পড়ার কোনো উপায়ও ছিল না।

 

ঢাকায় তো আপনার কেউ নেই?

এখানে এসে কোথায় থাকব, কী খাব তার কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। বড় ভাই ইসলামপুরের ‘ইস্ট বেঙ্গল পাবলিশার্স’ নামের এক প্রকাশনা সংস্থার মালিক সুরেন ঘোষের ভাইয়ের কাছে একটি চিঠি লিখে দিলেন। সেটি নিয়ে সুরেনদার কাছে এলাম। কলেজে থাকার সময় কলেজ ম্যাগাজিনের সম্পাদক হয়েছিলাম। ফলে প্রুফ দেখতে শিখেছি। তিনি আমায় থাকতে দিলেন। বিনিময়ে তাঁর প্রকাশনার প্রুফ দেখতে শুরু করলাম। তিনি কিছু মাইনেও দিতেন। এসব করতে করতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় ভর্তি হয়ে গেলাম। কলেজে পড়ার সময় থেকে মাথায় স্থির করা ছিল—যদি কোনো দিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি, তাহলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় পড়ব। ফলে কোনো দিকে আর তাকাইনি।

   

চলতেন কিভাবে?

প্রায় নিঃসম্বল, কপর্দকহীন অবস্থায় ঢাকায় এলাম। ভার্সিটির ফি দিতে হবে, জগন্নাথ হলের ফি দিতে হবে। ইষ্ট বেঙ্গল থেকে যা টাকা পাই, তাতে তো চলে না। ফলে ‘মজলুম’ নামের এক পত্রিকায় প্রুফ রিডারের কাজ নিলাম। খুব সকালে ঘুম থেকে উঠেই ইস্ট বেঙ্গলে গিয়ে প্রুফ দেখতাম। সেখান থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস করতে যেতাম। বিকেলে ফের প্রকাশনীতে প্রুফ দেখে মজলুম অফিসে কাজ করতাম। প্রুফ দেখতে দেখতে টেবিলেই ঘুম এসে যেত। ঘুম থেকে উঠে খেয়েদেয়ে ক্লাসে যেতাম। তবে একসময় মালিক জেনে গেলেন। তিনি বললেন, ‘এভাবে আমার এখানে থাকতে পারবে না। ’ বাধ্য হয়ে চলে এলাম। সে অনেক গল্প...। নানা কাজ করে এই শহরে নিজেকে ভাসিয়ে রেখছি। এর মধ্যে হলের ফি বাকি পড়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইনেও বাকি পড়েছে। এটা-সেটা করে চলি। কিন্তু কোনো কিছুই দমিয়ে রাখতে পারেনি। কখনোই মনে করিনি—এটি পারব না। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ইউনিয়নের নির্বাচন হলো, সেখানেও দাঁড়ালাম। তবে দেখলাম—বকেয়া ফি না দিলে তো নির্বাচন করতে দেওয়া হবে না (হাসি)। ফলে সহপাঠী কবি সেবাব্রত চৌধুরী তাঁর বড় ভাই দেবব্রত চৌধুরীর কাছে নিয়ে গেলেন। তিনি আমাকে সাঁতারু ব্রজেন দাসের কাছে নিয়ে গেলেন। তিনি হলের বকেয়া টাকা দিয়ে দিলেন। সে টাকা জমা দিয়ে নির্বাচন করলাম এবং ১৯৫৯-৬০ সালে ছাত্র ইউনিয়নের জগন্নাথ হল শাখার সাহিত্য সম্পাদক নির্বাচিত হলাম। তখন দ্বিতীয় বর্ষে পড়ি।

 

ড. গোবিন্দচন্দ্র দেবের সঙ্গে কিভাবে পরিচয়?

গভীর রাতে ইস্টবেঙ্গল পাবলিশার্সে প্রুফ দেখে হলে ফিরে দেখতাম—মূল ফটক বন্ধ হয়ে গেছে। প্রতিদিন তো আর দারোয়ানকে ডেকে তোলা সম্ভব নয়। তার রুমের জানালায় পা দিয়ে গম্বুজের ওপর উঠে দোতলার রুমে ফিরতাম। কিছুকাল এভাবে চলার পরে একদিন দারোয়ান ধরে ফেললো। নিয়ে গেল প্রভোস্ট ড. জিসি (গোবিন্দচন্দ্র) দেবের কাছে। তিনি আমার কাছে সব বৃত্তান্ত শুনে বললেন, ‘কী করতে চাইছো?’ বললাম, লেখাপড়া শিখতে চাই, আমার বড় হওয়ার স্বপ্ন আছে। ‘এভাবে তোমার লেখাপড়া হবে না। ইসলামপুরের এসব কাজ ছেড়ে দাও। আমি পুরনো ঢাকার ফরাশগঞ্জে রামকৃষ্ণ মিশনের একটি ছাত্রাবাস করছি, সেখানে চলে যাও। মিশনের একটা বৃত্তি দিচ্ছি, সেটি নিয়ে লেখাপড়া করো। ’ এর পর থেকে সেখানে থাকতাম আর তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসায় এসে তিনি যা লিখতেন, সেগুলোর ডিকটেশন নিতাম। ক্লাস শেষে প্রতি বিকেলে তাঁর কাজ করতে করতে প্রায়ই রাত হয়ে যেত। তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘এত রাত হয়ে গেছে, আর যাওয়ার দরকার নেই। তুমি এখানেই থেকে যাও। ’ এই করতে করতে দ্বিতীয় বর্ষের সাবসিডিয়ারি পরীক্ষা চলে এলো। তখন তিনি নিজে আমাকে ফরাশগঞ্জে গিয়ে পড়িয়ে আসতেন। যাতে আমি পাস করে যাই। এভাবে কিছুকালের মধ্যে আমাদের সম্পর্ক এমন এক স্তরে চলে এলো যে তিনি বললেন, ‘তোমার আর রাতে ফেরার দরকার নেই। আমার এখানে চলে এসো। ’ আমি মিশনের ছাত্রাবাস ছেড়ে দিয়ে তাঁর বাসায় চলে এলাম। কিছুকাল পরে আমার বাবা ভারতে চলে যাওয়ার জন্য ঢাকায় ইমিগ্রেশন ভিসা করতে এলেন। তাঁর সঙ্গে দেখা করার পর ড. জিসি দেব তাকে বললেন, ‘আপনার তো তিনটি ছেলে, একে আমায় দিয়ে দিন। ’ আনন্দের সঙ্গে বাবা আমায় তাঁকে দিয়ে দিলেন। সেই থেকে আমি ড. জিসি দেবের ছেলে, তিনি আমার পালক পিতা। পালক পুত্র হিসেবে গ্রহণ করে তিনি আমাকে লেখাপড়া শেখালেন। দৈনন্দিন জীবনের চিন্তা আর রইল না। ‘পরিচয়’ নামে একটি কাগজ বের করেছি, সাহিত্য লিখেছি। লেখাপড়াও শেষ হলো।

 

বিদেশে গেলেন কেমন করে?

ড. দেব ফুলব্রাইট স্কলারশিপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে গেলেন। এক বছর পর ফিরে এসে আমার জন্য সেখানে পড়ানোর ব্যবস্থা করলেন। আমিও আগে থেকেই চেষ্টা করছিলাম। এ জন্য ব্রিটিশ কাউন্সিল, ফুলব্রাইট স্কলারশিপসহ কিছু স্কলারশিপের জন্য দরখাস্ত করেছিলাম। ব্রিটিশ কাউন্সিল স্কলারশিপের ইন্টারভিউতে ড. সাজ্জাদ হোসেন বললেন, ‘সাংবাদিকতায় পড়বে, ব্রিটিশ কাউন্সিলে কেন? আমেরিকায় ফুলব্রাইটে পড়তে যাও। ’ তবে দরখাস্ত করার আগেই স্যার আমার লেখাপড়ার সব ব্যবস্থা করে ফিরে এলেন। ১৯৬৭ সালে আমেরিকা চলে গেলাম। কয়েক মাস থেকেই ফিরে এলাম। ১৯৬৯ সালে আবার গেলাম। প্রথমে টেম্পল ইউনিভার্সিটি থেকে সাংবাদিকতায় মাস্টার্স করেছি। পরে শিকাগো ইউনিভার্সিটিতে সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের জন্য এক বছর ছিলাম। এরপর ইউনিভার্সিটি অব মিসৌরিতে পিএইচডি করেছি। আমি সাংবাদিকতায় বাংলাদেশের প্রথম পিএইচডি।

 

মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেছেন জেনেছি।

মুক্তিযুদ্ধে আমি ও পূরবী বসু দুজনে যা পেরেছি, করেছি। মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে কাজ করেছি, সভা-সমিতি করেছি, শহরে শহরে, নানা স্কুলে ও গির্জায় বক্তব্য রেখেছি, বাংলাদেশের জন্য কংগ্রেসে গিয়ে স্বাধীনতার জন্য কথা বলেছি, ওয়াশিংটনে মিছিল করেছি। পাকিস্তান থেকে আমেরিকায় অস্ত্র নিতে জাহাজ এসেছিল, সেটি আটকানোর জন্য আমরা ফিলাডেলফিয়া, বাল্টিমোরে মিছিল করেছি। এ ঘটনা নিয়ে ব্লকেড নামে রিচার্ড টেইলরের একটি বই আছে, সিনেমাও হয়েছে।

 

দেশে আসেন না কেন?

পিএচডি শেষ করার পর থেকেই তো দেশে আসার চেষ্টা শুরু করেছিলাম। তখন ওয়াশিংটনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আবু সাঈদ চৌধুরীর সঙ্গে দেখা হলো। বললাম, পিএইচডি শেষ করেছি, আমি তো দেশে ফিরতে চাই। তিনি বললেন, ‘চলে এসো। আমি তোমাকে এ্যাডহকে একটি নিয়োগপত্র দিয়ে দেব। ’ আমি এলাম। বিভাগের চেয়ারম্যান তখন নুরুদ্দিন। তাঁকে একথা বলার পর তিনি বললেন, ‘অ্যাডহকে তো অ্যাপয়েন্ট হয় না। সেজন্য আমাদের সম্মতি লাগবে। তিনি যদি নিজে থেকে আপনাকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিতে চান, আমরা সবাই পদত্যাগ করবো। ’ তিনি আমার সহপাঠী ছিলেন। তখন আমি কুইন্স কলেজে পড়াতাম। ফিরে গেলাম। ১৯৮৭-৮৮ সালে সেন্ট জোনসের চাকরি ছেড়ে দিয়ে আমি দেশে চলে এলাম। পূরবীও তার চাকরি ছাড়লো। গণস্বাস্থ্য ফার্মাসিটিক্যালসে সে চাকরি নিল। আমি গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে চাকরি নিলাম। তবে থাকতে না পেরে আমরা চলে গেলাম। তবে আমার বন্ধু সংবাদের সম্পাদক বজলুর রহমান কোনোভাবেই আমাকে যেতে দিতে রাজি হচ্ছিল না। সে বললো, যাচ্ছেন যান। আমি দেখি কী করতে পারি। সে এখানে বলে প্রেস ইনিস্টিটিউটে পরিচালক হিসেবে আমার জন্য ব্যবস্থা করলো। তখন আমি জন ওয়েলি অ্যান্ড সন্স নামের খুব বড় একটি প্রকাশনা সংস্থায় চাকরি নিয়েছি। বজলু বললো, ‘এখানে চাকরি হয়েই গেছে, নামমাত্র সাক্ষাতকার দিতে হবে। ’ এক মাসের চাকরি থেকে ছুটি নিয়ে চলে এলাম। যেখানে যাওয়ার দরকার, গেলাম। তখন এরশাদের আমল। তবে ইন্টারভিউর আগে কাগজে খবর বেরুলো—আমাদের দেশে এত বড় বড় বিশেষজ্ঞ থাকতে কেন বিদেশ থেকে বিশেষজ্ঞ নিয়ে আসা হয়? শোনা যায়, পাশ্ববর্তী রাষ্ট্রের চাপে বিদেশ থেকে একে নিয়ে আসা হচ্ছে। চাকরি হলো না, চলে গেলেন। একসময় জীবনযাত্রার জন্য বিদেশে ছিলাম, এখন চাকরি করি না ঠিকই, তবে আমাকে তো সংসার চালাতে হয়। এখনো ছেলে-মেয়ে দুটি ভালোভাবে দাঁড়াতে পারেনি। তাদের দেখতে হয়। তারা দাঁড়িয়ে গেলে আমাদের হয়তো সেই দায়িত্ব থাকবে না। ভাবছি, তখন চলে আসব।

 

লেখার ভাবনা এলো কী করে?

লেখার কথা অনেক আগেই মনে এসেছে। ফাইভ-সিক্সে যখন ছিলাম, ডিটেকটিভ বই পড়তাম। তখনকার দিনে রহস্য, রোমাঞ্চ-অ্যাডভেঞ্চার সিরিজ—কাঞ্চনজঙ্ঘা, প্রহেলিকা সিরিজ বেরোত, সেগুলো পড়তাম। খবরের কাগজে ছোটদের পাতা বেরোত, পড়তাম। এমনকি নিজে একটুখানি লেখারও চেষ্টা করেছি। একবার একটা ছোট্ট রহস্য উপন্যাস কিছু দূর লিখেছিলাম। পরে সেটি আর লেখা হয়নি। কোথায় হারিয়ে গেছে জানিও না। তখন থেকে একটু-আধটু লেখার চিন্তা মাথায় ছিল। স্কুলের শেষ বছরে কয়েকজন বন্ধু মিলে হাতে লেখা পত্রিকা করেছি—‘রামধনু’। মোটা র‌্যাক্সিনে বাঁধাই পত্রিকাটি ছিল এক ভলিউমের। যারা সেটিতে লিখেছে, তাদের মধ্যে আমি আর কমলেশ সেন লেখক হয়েছি। কমলেশ পরে পশ্চিমবঙ্গে চলে গেছেন। সেখানে তিনি বামপন্থী কবি হিসেবে বেশ খ্যাতি লাভ করেছেন। অনেক বই আছে তাঁর। কলেজে (সরকারি আজিজুল হক কলেজ) এসে এডওয়ার্ড লাইব্রেরির বই পড়ে মনের ভেতরে লেখার চিন্তাটি হলো। কলেজ ম্যাগাজিন ছিল। তখনকার দিনে পরীক্ষা নিয়ে ম্যাগাজিনের সম্পাদক নির্বাচিত করা হতো। সাধারণত প্রথম ও তৃতীয় বর্ষের ছাত্ররাই পরীক্ষা দিত। আমিও পরীক্ষা দিলাম। ম্যাগাজিনের দুটি অংশ ছিল—বাংলা ও ইংরেজি। সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে বাংলা বিভাগের সম্পাদক হলাম, তৃতীয় বর্ষের এক বড় ভাই সহকারী সম্পাদক হলেন। ম্যাগাজিনের ভার ছিল অধ্যাপক হাবীবুর রশীদের হাতে। তিনি আমাকে ম্যাগাজিনের সঙ্গে যুক্ত থাকতে বললেন। তাঁর কাছে লেখা এলো। সেগুলো বাছাই করলাম। ভাবলাম, ম্যাগাজিনের জন্য লিখব। একটি গল্প, একটি রম্যরচনা আর দুটি কবিতা—সব মিলিয়ে স্যারকে চারটি লেখা দিলাম। এটি ১৯৫৬ সালের ঘটনা, আমার জীবনের প্রথম গল্প। তিনি তিনটি পছন্দ করলেন। গল্পটি নিজের নামে ছাপা হলো, কবিতাও। রম্যরচনাটি তিনি অন্য নাম দিয়ে ছাপিয়ে দিলেন। মনে আছে—গল্পের নাম ‘সূর্যপ্রণাম’। এক তরুণীর জীবনসংগ্রামের গল্প। এই করতে করতে ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে গেলাম। তাদেরও একনিষ্ঠ কর্মী ছিলাম। শহরে অনেক জলসা হতো, সেগুলোতে যেতাম, আবৃত্তি করতাম। কলেজ নাটকে অভিনয় করি। অল্প কিছুকালের মধ্যে বগুড়ায় অতি পরিচিত হয়ে গেলাম। তখনই স্থির করলাম—কলেজ থেকে বেরোলে বাংলা পড়তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাব, আমি লেখক হব, ঢাকায় যাব। সত্যি সত্যি কলেজ পাস করে ঢাকায় চলে এলাম।

 

লেখা কিভাবে প্রকাশিত হলো?

তখন দৈনিক আজাদের রবিবাসরীয় সাহিত্য পাতার পরিচালক ছিলেন আবদুর রশিদ ওয়াসেকপুরী। ‘বান’ নামে তাঁর একটি উপন্যাস ইস্টবেঙ্গল ছেপেছে। সেটির প্রুফ দেখতাম। তিনি বই ছাপানোর সূত্রে আসতেন। আজাদের নিউজ এডিটর জোনাব আলীর বইও ইস্টবেঙ্গল ছেপেছে। তিনিও আসতেন। তাঁদের সঙ্গে জানাশোনা হলো। তাই একটি গল্প লিখে ওয়াসেকপুরীকে দিলাম। গল্পের নাম ‘চরণপদ্ম’। তিনি গল্পটি নিয়ে পরদিন আজাদে ছেপে দিলেন। ইস্ট বেঙ্গলে আমার সঙ্গে আবদুল কাদের দেওয়ান প্রুফ দেখতেন। তিনি ‘মোস্তফা কামাল’ ছদ্মনামে ছোটদের জন্য ছড়া লিখতেন। কবি ওমর আলী তাঁর বন্ধু ছিলেন। তিনি ছড়া লেখেন, আমি লিখি গল্প। ফলে আমাদের জমে গেল। এই সূত্রে আবারও লেখালেখির কথা মনে এলো। ১৯৫৮ সালে একুশে ফেব্রুয়ারিকে উপলক্ষ করে একটি গল্প লিখলাম—‘হিসাব’। লিখে একুশের কয়েক দিন আগে তাঁতীবাজারের দৈনিক মিল্লাত পত্রিকা অফিসে গিয়ে নোটসুদ্ধ গল্পটি রেখে এলাম। পত্রিকাটির সাহিত্য পাতা দেখতেন কবি মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান। তাঁকে চিনতাম না। তিনিও তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, পরে অধ্যাপক হয়েছেন। মোস্তফা কামাল তাঁর কথা বলেছিলেন। তাঁকে লিখেছিলাম—‘মনির ভাই, গল্পটি রেখে গেলাম, একটু বিবেচনা করবেন। ’ পরের সংখ্যাটিই একুশে সংখ্যা ছিল। পরে মিল্লাতে গিয়ে দেখি—দেয়ালে একুশে সংখ্যাটি আছে। আমার ‘হিসাব’ ছাপা হয়েছে। কলেজের রশীদ স্যার তো বিনা আপত্তিতেই (হাসি) আমার গল্প ছেপে দিতেন, ওয়াসেকপুরীও গল্প ছেপে দিলেন। মনিরুজ্জামানও আপত্তি না করে গল্প ছাপলেন। ফলে ভেতরে লেখার কনফিডেন্স এসে গেল।

 

কিভাবে সাধারণ এক ছেলে থেকে লেখক হয়ে গেলেন?

কোনো নির্দিষ্ট লেখক আমাকে লেখক বানিয়েছেন, তা বলতে পারব না। প্রচুর গল্প পড়েছি। ওই সময় যত লেখকের শ্রেষ্ঠ গল্প বেরিয়েছে, সবই পড়েছি। অন্য লেখকদের গল্পও পড়েছি। একাধারে উপন্যাস পড়েছি। নির্দিষ্টভাবে রুশ সাহিত্যের অনুবাদ পড়েছি। সোজা কথা, উন্মুখ পাঠক ছিলাম। যেহেতু আর কোনো নেশা ছিল না, বই পড়াই নেশা ছিল। বগুড়ায় এডওয়ার্ড পার্কের উডবার্ন লাইব্রেরিতে অসংখ্য বই পড়েছি। বগুড়া থেকে চলে আসার পর এ নেশা না কমে বরং বেড়েছে। বাংলাবাজার আর নর্থব্রুক হল রোডের কোনায় ‘রিডার্স কর্নার’ নামে ইস্টবেঙ্গলের একটি শোরুম ও বই পড়ার দোকান ছিল। মাঝেমধ্যে দোকানে গিয়ে বসতাম। ফলে নতুন সব বই-ই পড়তে পারতাম, খুশিমতো নিতাম আর পড়তাম। বই পড়তে পাওয়ার কোনো অসুবিধাই ছিল না। যখন ইউনিভার্সিটিতে এলাম, এরই মধ্যে দিন পরিবর্তন হয়েছে, প্রুফ দেখার সৌজন্যে কিছু পয়সাকড়িও হয়েছে। নলেজহোমে গিয়ে কলকাতা থেকে আসা পত্রপত্রিকা নিয়ে আসি, পড়ি। পড়ার অভ্যাস থেকেই যায়। এই করতে করতেই দুটি বছর কেটে গেল। মাথা থেকে অর্থচিন্তা সরে গেল। তার পর থেকে লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার স্বপ্ন ঢুকে পড়ল। তত দিনে লেখক হিসেবে কিছুটা প্রতিষ্ঠাও জুটেছে।

 

উত্তরণের সঙ্গে কিভাবে যুক্ত হলেন?

আমার কঠিন জীবনের কথা শুনে মুহম্মদ এনামুল হক (পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক) ‘উত্তরণ’ নামে একটি মাসিক পত্রিকায় সহকারী সম্পাদক হিসেবে নিয়োগ দিলেন। বগুড়া থেকেই তাঁর সঙ্গে আলাপ ছিল, সেখানে তো আমাকে সবাই চিনত। তিনি আমাকে ভালো করেই চিনতেন। এটি দ্বিমাসিক সাহিত্য পত্রিকা ছিল। তিনি ও মুহাম্মদ ইউনূস (পরে নোবেল বিজয়ী) পত্রিকাটি শুরু করেছিলেন। ইউনূস, তিনি তখন দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। দুই সংখ্যা প্রকাশের পর তিনি আর রইলেন না। এনামুল ভাই আমাকে সহকারী সম্পাদক পদে কাজ করতে বললেন। যেহেতু পেটের ভাত জোগাড় করার দরকার। এ জন্য তিনি আমাকে বার্ডস অ্যান্ড বুকসের আহম্মদ মীরের (মহিউদ্দিন) কাছে নিয়ে গেলেন। এই প্রকাশনা সংস্থায় প্রকাশনা সহকারীর কাজটি পেলাম। তাদের প্রথম বইটিই হলো শামসুর রাহমানের ‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’। সেই বইয়ের প্রুফ রিডিংয়ের ফলে কবিতাগুলো তিন-চারবার করে পড়া হয়ে গেল। তাঁর কবিতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবহিত হলাম। আমার লেখায় এভাবে কবিতার ছাপ এসেছে।   উত্তরণের লেখা সংগ্রহ করতাম। নতুন লেখকদের চিঠি দিলাম। আলাউদ্দিন আল আজাদ, জহির রায়হানসহ তখনকার দিনে আরো অনেকে—যাঁরা লিখতেন। এমনকি কামরুল হাসান ভাই, কাইয়ুম চৌধুরী ভাইয়ের কাছেও কয়েকবার উত্তরণের প্রচ্ছদের জন্য গিয়েছি। এভাবে ঢাকায়ও বেশ পরিচিতি জন্মে গেল। আমাকে সবাই চিনতেন। দৈনিক আজাদ, মিল্লাতে লিখেছি। মাসিকে তখনো লেখা হয়নি। ইংরেজি ভাষায় লেখা একটি চীনা গল্প অনুবাদ করে দিলাম। এনামুল ভাই ছেপে দিলেন উত্তরণে। তারপর লিখলাম ‘মৃত্যু অনেক’। এটি আমার গল্পসমগ্রে আছে। ১৯৬০ সালে লিখেছি। আমার প্রথম স্বীকৃত গল্প ‘পরমাত্মীয়’ও উত্তরণেই ছাপা হয়েছিল। আমার গল্পসমগ্রের প্রথম গল্প। ‘পরমাত্মীয়’ তো ভিন্ন রকমের গল্প, অন্য রকম গল্প। তাতে ভাষার কাজ ছিল। তখন অলরেডি ভাষায় আমার দক্ষতা জন্মেছে। কবিতায় আমি আপ্লুত। ‘পরমাত্মীয়’ কবিতা মিশিয়ে লিখলাম। কোনো চরিত্র, কোনো কাহিনি নেই, কিছুই নেই। তার পরও এটি গল্প। নতুন গল্পের চিন্তা এভাবেই মাথার ভেতর আসছে। তখন কিছু গল্প লিখেছি লিটল ম্যাগাজিনে, কিছু গল্প লিখেছি হল বার্ষিকীতে। এর মধ্যেই একটি গল্প ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বার্ষিকীতে লিখলাম—‘কেষ্টযাত্রা’।

 

এটি তো বিখ্যাত গল্প?

কেষ্টযাত্রা সেই অর্থে প্রচলিত ধাঁচের গল্প, কিন্তু প্রচলিত ধাঁচের মধ্যেও ভাষার ব্যবহার, চরিত্র চিত্রণ, বিষয়বস্তুর কারণে একে আজ পর্যন্ত সবাই আমার সেরা গল্পের একটি বলেন। কিন্তু তখনো নতুন গল্প যে লিখব, সেটি মাথায় আসেনি। গল্প হয়েই যাচ্ছে। আমার গল্প আলাদা, অন্য রকমের হচ্ছে। কিন্তু প্রচলিত ধারার বাইরে হচ্ছে না। একদিন সম্পাদক এনামুল হক ভাই বললেন, নতুন, ভিন্ন রকমের, আধুনিক গল্প লিখতে হবে। ফলে আধুনিক গল্প কী ভাবতে ভাবতে একটি গল্প লিখলাম। তখন অলরেডি আমার গল্প এদিক-সেদিক ছাপা হচ্ছে। আধুনিক গল্পটি লিখে সমকালে নিয়ে গেলাম। তখন সমকাল বাংলাদেশের সেরা কাগজ। সিকান্দার আবু জাফর আমাদের চিনতেন—নতুন লেখক, উত্তরণ করি। জাফর ভাইকে গল্প দিয়ে এলাম। কিছুদিন পরে গেলে তিনি বললেন, ‘এই গল্প ছাপা হবে না। ’ মনে খুব কষ্ট হলো। গল্পটি নিয়ে এলাম। মনে পড়ে, বিকেলে বেড়াতে বেড়াতে গোপীবাগ চলে যেতাম। রামকৃষ্ণ মিশনের ভেতরে গিয়ে পুকুরপাড়ে বসতাম। মনে আছে—গল্পটি ছিঁড়ে পুকুরে ভাসিয়ে দিয়েছিলাম। পরে ভাবলাম, নতুন ও আধুনিক গল্প লিখতে হবে। কী হবে সেই গল্প? তত দিনে তো সব আধুনিক গল্পকারদের পড়ে ফেলেছি। পশ্চিমবাংলার ওই সুবোধ ঘোষ, নরেন মিত্র, সন্তোষ ঘোষ, বিমল কর; আমাদের আলাউদ্দিন আল আজাদ, শহীদ সাবের, আবুল কালাম শামসুদ্দীন, জহির রায়হান—প্রত্যেকের গল্প আমার পড়া। এসব গল্পে ভেতরে তো নতুন কিছু নেই। কী হবে নতুন গল্প? ভাবতে ভাবতে এক রাতে লিখতে বসলাম। আসলেই একেবারে নতুন চিন্তা থেকে প্রথম বাক্যটি লিখলাম—‘জনসভার শেষে তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হলো। ’ এই যে বাক্যটি লিখলাম, এই যে ভিন্নধারার একটি গল্প লিখতে শুরু করলাম, এর পর থেকে অতি কষ্টের সঙ্গে বাক্যগঠন, বেছে বেছে শব্দ ব্যবহার, ক্রিয়াপদের ব্যবহার নিয়ে নানা চেষ্টা, যত কম লেখা যায়, যত সংক্ষিপ্ত করে বাক্য লেখা যায়—এভাবে বাহুল্যবর্জিত গল্প লিখতে শুরু করলাম। সারা রাত ধরে লিখলাম, ‘একজন পুরুষ চাই’। পরদিন জাফর ভাইকে দিয়ে এলাম। দুই-তিন দিন পর তাঁর কাছে গেলাম। তিনি বললেন, ‘যা, গল্পের প্রুফ দেখে দিয়ে আয়। ’ ভেতরে গিয়ে দেখি, গল্পটির কম্পোজ হয়ে গেছে। আমার গল্প সমকালে ছাপা হবে। ‘একজন পুরুষ চাই’ (হাসি) হলো এমন এক গল্প, বাংলাদেশে কেন, পশ্চিমবঙ্গেও তখন ওই রকম গল্প লেখা হয়নি। এতই নতুন, এতই ভিন্ন। আমার গল্পসংগ্রহে আছে। সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন টেকনিক, ভিন্ন শব্দগঠন, ভিন্ন শব্দ ব্যবহার, শব্দের প্রয়োগ ভিন্ন, বাক্যগঠনও ভিন্ন। তখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। গল্পটি ১৯৬৩ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। তখনই মনে এলো, এটিই হলো নতুন গল্প। যে গল্প একেবারেই আমার। যে গল্পের মধ্যে আমার লেখার ছাঁচ আছে। এভাবে লিখতে হবে। লোকে দেখলেই বুঝবে, এটি জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের লেখা।

 

ভাষা কিভাবে তৈরি করেছেন?

ভাষাগত জ্ঞান থেকে। আমি বাংলার ছাত্র। আর কাজের সূত্রে সারাজীবন ইংরেজিতে পড়ালেখা করেছি। প্রচুর পড়েছি। ফলে এভাবে শব্দ তৈরি করতে পারি। ‘দুর্বিনীত কাল’ প্রকাশের পর অনেকে প্রশংসা করে বললেন, সম্পূর্ণ নতুন ধারার গল্প, নতুন রকমের শব্দের ব্যবহার। সমালোচনাও হলো। ফলে উৎসাহী হয়ে দুই বছর পর ‘বহে না সুবাতাস’ বের করলাম। সেখানে আমার ভাষার কাজ, শব্দের ব্যবহার সবই আছে। কিন্তু দুর্বিনীত কালের গল্পগুলোর মধ্যে আমি যেভাবে প্রতীক, বাক্যবন্ধ, বিষয়বস্তু ব্যবহার করেছি, তার চেয়ে অনেক সাবলীলভাবে, সহজভাবে এখানে সেগুলো ব্যবহার করেছি। কিন্তু কোনো সময়ই ভাষার ব্যবহারে, বিষয় নির্বাচনে আমি প্রচলিত পথে যাওয়ার চেষ্টা করিনি। এটি চট্টগ্রামের বইঘর প্রকাশ করল। পরের বছর প্রকাশিত হলো—‘সীতাংশু তোর সমস্ত কথা’। এটি নাকি পাঠক মহলে, বিদগ্ধ মহলে খুব সাড়া ফেলেছিল। এটি আমি শুনিনি। তখন বিদেশে ছিলাম। ১৯৭২ সালে প্রথম যখন বাংলাদেশ কনফারেন্স হচ্ছিল, সেখানে আমি গিয়েছি, সেখানে মঞ্চে যখন ঘোষণা করা হলো—এবারের ছোটগল্পে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছেন জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, আমি তাজ্জব বনে গেছি, আমার ধারণাই ছিল না (হাসি)। পরে বুঝলাম, আমার গল্প তো লোকে পছন্দ করে। আমার বয়সী যাঁদের সঙ্গে দেখা হয়, যাঁরা লেখা পড়েন, তাঁরা সবাই বলেন—আপনার সেই তিনটি বই—সেগুলো তো আমরা পড়েছি তখন। আমার গল্প রীতিমতো আলোড়ন তুলেছিল। ‘সীতাংশু তোর সমস্ত কথা’য় আমার ভাষা ও কনটেন্টের মধ্যে মিল খুঁজে সিম্বলিজম, নতুন যত স্রোত এসেছিল—অতীন্দ্রিয়তাবোধ, মনোজগৎ—সব কিছুকে একত্রিত করে, প্রচুর প্রতীকের ব্যবহার করেছি। তবে এমনভাবে সব কিছু সাজানো যে গল্পগুলো প্রথাসিদ্ধই মনে হয়। অথচ পড়তে গেলেই প্রতি পরতে পরতে ভিন্নতা আছে, এগুলো এত অন্য রকম, এত অতীন্দ্রিয়তা বোধসম্পন্ন, এত ইঙ্গিতময়, এত শব্দময়। শব্দের ব্যবহার, ধ্বনির কারুকার্যতা প্রতিটি গল্পের ভেতরেই আছে। এই অর্থে এটি একেবারেই আলাদা বই। তিনটি বইয়ের চরিত্রও আলাদা। তবে এটিই সবচেয়ে বেশি গ্রাহ্য হয়েছে। আমি পর পর তিন বছর তিনটি বই বের করার চেষ্টা করেছি। নিজের জন্য একটি ভাষা তৈরি করার চেষ্টা করেছি, নিজের জন্য শব্দ তৈরি করার চেষ্টা করেছি। নিজের ভাষাটি যেমনই হোক না কেন, সাধারণ লেখকদের চেয়ে ভিন্নভাবে ক্রিয়াপদ ব্যবহার করার চেষ্টা করেছি, আমার গল্পে প্রচুর অসমাপিকা ক্রিয়ার ব্যবহার আছে। সোজা কথা, আমি আমার গল্প লেখার সময় শুধু যে গল্পই লিখেছি, তা-ই নয়, আমি আমার শৈলী নিয়ে অসম্ভব চিন্তা করেছি। ফর্ম কখনো ভুলে যাইনি। স্পষ্টতই আমার বাংলা ভাষা পড়ার জ্ঞান, অধ্যয়ন—এসব গল্পের পেছনে কাজ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে যখন এসব গল্প লেখার চেষ্টা করছি, তখন বিদেশি লেখকদের লেখা পড়ছি। হেমিংওয়ে, কাফকা, এরাস্কিন কল্ডওয়েল—এঁরা তো মামুলি, তত দিনে লরেন্স ডুরেল, কিংসলে অ্যামিস, আলবেলর্তো মোরাভিয়া পড়ছি। ফলে এসব নতুন ইংরেজি ও বাংলা লেখার জগৎ অধ্যয়ন হয়ে গেছে, রপ্ত করে ফেলেছি। এ জন্যই যখন কেউ জিজ্ঞাসা করে, কে আপনার প্রিয় লেখক ছিলেন? বলি, কোনো প্রিয় লেখক ছিলেন না, অনেকের লেখাই পড়েছি। সবাই সামনে ছিলেন। কিন্তু মনে হয়েছে, তাঁরা কেউই অনুসরণযোগ্য নন। ফলে নিজের মতো করে পথ তৈরি করে নিয়েছি। নিজে ভাষা তৈরি করেছি। শব্দ ব্যবহারের পথ তৈরি করেছি। কী করে ইঙ্গিতময় ভাষা ব্যবহার করতে হয়, প্রতীকী শব্দ তৈরি করতে হয়, শিখেছি। এমন নয় যে মাথার ভেতর ম্যাজিক কাজ করেছে। অধ্যয়ন, নানা ধরনের পড়াশোনা আমার ভেতরে কাজ করেছে। এই সব কিছু একত্রিত করে আমার এই রচনাশৈলী তৈরি করেছি।

 

শ্রুতলিখন : মাসুদ রানা আশিক ও আনিকা বুশরা

(১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৬, শান্তিনগর, ঢাকা)


মন্তব্য