kalerkantho


আমি কিন্তু আর্কিভিস্ট নই ইতিহাসবিদ

ইতিহাসের জন্য উৎসর্গ করেছেন নিজেকে। শিক্ষকতা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। লিখেছেন ঢাকাবিষয়ক বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বই। ছিলেন বাংলাদেশ ন্যাশনাল আর্কাইভসের পরিচালক। বাংলাদেশ ইতিহাস সমিতির সভাপতিও ছিলেন। বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে প্রকাশিত ঢাকাবিষয়ক ২১টি বইয়ের প্রধান সম্পাদকও তিনি। ইতিহাসবিদ ড. শরীফ উদ্দিন আহমেদের মুখোমুখি হয়েছেন রিদওয়ান আক্রাম। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



আমি কিন্তু আর্কিভিস্ট নই ইতিহাসবিদ

ইতিহাসের প্রতি ভালোবাসা, নাকি নিছক পড়াশোনার জন্য ইতিহাসকে বেছে নিলেন?

১৯৫০-এর দশকের শেষের দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য পাস করা ছয়জন মেধাবী ও চটপটে যুবক অধ্যাপনার জন্য দিনাজপুরের সুরেন্দ্রনাথ কলেজে যোগ দেন। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন অধ্যাপক কাজী আশরাফ হোসেন। ইতিহাস পড়াতেন। বেশ সুদর্শন ও তুখোড় অধ্যাপক। ইতিহাসের ওপর ইংরেজিতে টানা লেকচার দিয়ে যেতেন। অল্প সময়ের মধ্যে তিনিই আমার হিরো হয়ে গেলেন। তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, ইতিহাসই পড়ব। আশরাফ স্যারকে ইতিহাসের শিক্ষক হিসেবে না পেলে বোধ হয় ইংরেজি অথবা অর্থনীতি নিয়েই পড়াশোনা করতাম।

 

ছাত্রাবস্থায়ই তো অধ্যাপক আব্দুল করিমের সঙ্গে পরিচয়?

আমাদের সময়ে (১৯৬১ সালের দিকে) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে বেশ কয়েকজন গুণী অধ্যাপক ছিলেন, যাঁদের মধ্যে অধ্যাপক আব্দুল করিম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। নানা কারণে করিম স্যারের বিশেষ স্নেহভাজন হয়ে উঠি। তিনিই আমাকে বলেন, ‘তুমি খুব নরম মানুষ, ওই ম্যাজিস্ট্রেট হতে পারবে না।

ও রকম ডাণ্ডাপেটাও করতে পারবে না। তুমি অধ্যাপনা ও গবেষণার মধ্যেই থাকো। ’ আমিও ভেবে দেখলাম, এটাই আমার জন্য ভালো হবে।

 

একসময় তো ছাত্র থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকও হয়ে গেলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা ঐতিহ্য ছিল। ক্লাসের সবচেয়ে ভালো ছাত্রটা পড়ালেখা শেষ করে একই ডিপার্টমেন্টে যোগদান করতে পারত। অনার্সে মাত্র কয়েক নম্বরের জন্য ফার্স্ট ক্লাস পাইনি। এমএতে যখন ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হই, তখন তো সবাই বুঝে ফেলল, আমি এখানেই জয়েন করব। প্রথম দিনই আমাকে ইংরেজিতে ক্লাস নিতে হয়েছে। কী বলেছিলাম আজ আর মনে নেই, খালি মনে আছে টানা ৪৫ মিনিট ইংরেজিতে বক্তৃতা দিয়েছিলাম। এভাবেই আমার অধ্যাপনা ও গবেষকজীবনের শুরু।

১৯৬৬ সালে লেকচারার হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়ে দেড় বছর চাকরি করলাম।

 

তারপর তো পিএইচডি করতে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলেন।

পাস করার এক-দেড় বছরের মধ্যেই মানুষ জিজ্ঞেস করতে লাগল, কবে পিএইচডি করতে যাচ্ছেন? কমনওয়েলথ স্কলারশিপ পেতে হলে হয়তো আরো দু-তিন বছর অপেক্ষা করতে হতো। এ ছাড়া কমনওয়েলথ স্কলারশিপ সব সময় ইতিহাস থেকে দেওয়াও হয় না। ফলে স্টেট স্কলারশিপ নিয়ে ১৯৬৮ সালে লন্ডনে চলে যাই। তখন পাকিস্তান সরকার উচ্চশিক্ষার জন্য স্কলারশিপ দিত। অক্সফোর্ড থেকে বি.লিট করার পর লন্ডন ইউনিভার্সিটির স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ থেকে পিএইচডি করি। পরে নানা কারণে প্রায় ১০ বছর ইংল্যান্ডে থাকি। প্রথমে একাডেমিক কাজ করতাম, পরে একটা অ্যাকাউন্টিং ফার্মে কাজ করেছি। ওখানে থাকা অবস্থায় আমার ঢাকার থিসিসটা ইংল্যান্ডের কার্জন প্রেস থেকে বের হয়।

আমি যখন লন্ডনে পড়াশোনা শুরু করলাম, তখন ওরা দেখল যে ভারতীয় উপমহাদেশের আরবান হিস্ট্রি নিয়ে তেমন কোনো কাজ করা হয়নি। কর্তৃপক্ষ ঠিক করল, দক্ষিণ এশিয়া থেকে যত ছেলে-মেয়ে আসবে তাদের আরবান হিস্ট্রি পড়ানো হবে। তাই আমরা সেই সময়ে বোম্বে, বেনারস, এলাহাবাদ, ঢাকা প্রভৃতি জায়গার ইতিহাস তৈরি শুরু করলাম। এর মধ্যে বাংলাদেশও স্বাধীন হয়েছে। নতুন স্বাধীন দেশের সীমানা নিয়ে কাজ করার জন্য আমাকে বাছাই করা হলো। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট করেছি, এটাকে ওখানে ‘বি.লিট’ বলে।

 

পিএইচডির বিষয় কি আগেই ঠিক করে নিয়েছিলেন, নাকি লন্ডনে গিয়ে ঠিক করলেন?

১৯৭২ সালে ভর্তি হই পিএইচডির জন্য। কোর্স টিচার ঢাকা নিয়ে কাজ করার কথা বললেন। অনেকে বিষয়টি ভালো চোখে দেখল না। তারা ভাবল, একে তো শহরের ইতিহাস, তার ওপর আবার পিএইচডি। পিএইচডি মানেই হলো কোনো রাজনৈতিক বিষয়, তথা বড় কিছু নিয়ে কাজ। যা হোক, শেষ পর্যন্ত পিএইচডির বিষয় হিসেবে ঢাকাকেই বেছে নিলাম।

 

১৮৪০ থেকে ১৮৮৫-ঢাকার এই ৪৫ বছর সময়কালকেই কেন বেছে নিলেন?

সেই ১৭৬৫ সাল থেকেই এ শহরের রেকর্ড তৈরি শুরু হয়। তার পরও ইচ্ছা করেই ১৭৬৫ থেকে ১৮৪০ সালের ঢাকা নিয়ে কাজ করতে চাইনি। কারণ বুঝতে পারছিলাম, এই ইংরেজদের কাছ থেকে ডিগ্রি নিতে হলে একটু বুদ্ধি করে কাজ করতে হবে। ১৭৬৫ থেকে ১৮৪০ সালের ইতিহাস হচ্ছে ঢাকার কালো ইতিহাস, দুঃখের ইতিহাস। আর সেই কালো ইতিহাসের সৃষ্টিকর্তা এই ব্রিটিশরাই। কিভাবে তারা মানুষকে শহর ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করেছে, কিভাবে এ দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য ধ্বংস করেছে, সেসব রেকর্ডে পাওয়া যায়।

আমাদের উপমহাদেশের পূর্ববর্তী ইতিহাস দেখলে জানা যায়, এখানে অনেক শহর ছিল। সেসব শহর পতনের পর আর তার পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরতে পারেনি। এগুলোর মধ্যে ছিল লখনউ, গৌড়, পাণ্ডুয়া ইত্যাদি। ঢাকার পতন হলেও এই শহর কিন্তু মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। এসবের পেছনে অনেক কারণ আছে। এর সঙ্গে ব্রিটিশ পলিসিও জড়িত। দেখলাম, এই সময়টা দুই দিক থেকেই ভালো। একদিকে ঢাকার ইতিহাস সংরক্ষিত হচ্ছে, অন্যদিকে আমার পিএইচডির জন্যও ভালো। কারণ পরীক্ষকরা ভাববেন যে ব্রিটিশরা তো অনেক কিছু করেছে। পাশাপাশি এটাও ভেবে দেখলাম, এটা আরবানাইজেশনের ক্ষেত্রে নতুন থিওরিও দিতে পারে। থিওরিটি হলো, কেন শহরের উৎপত্তি হয়?

 

আপনার থিসিসটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮৬ সালে, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে।

আমার থিসিসটা খুবই ভালো হয়। আমাকে ওরা এ বিষয়ে আরো কাজ করতে বলে। ১৯৮৬ সালে লন্ডনের কার্জন প্রেস থেকে আমার থিসিসটা বই আকারে প্রকাশিত হয়। নাম রাখা হয় ‘ঢাকা—এ স্টাডি ইন আরবান হিস্ট্রি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, ১৮৪১-১৮৮৫’। তবে তার আগে অবশ্য নিজস্ব রিভিউয়ারদের দিয়ে আমার থিসিসটা রিভিউ করল।

 

১৯৮৮ সালে দেশে ফিরে আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিলেন। তখন ঢাকাকে নিয়ে চর্চাটা কেমন দেখতে পেলেন?

লন্ডনে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে তথ্যের বিশাল ভাণ্ডার দেখে এসেছি, ওই সব ঐতিহাসিক দলিলপত্রের মূল্যায়ন করতে শিখেছি। তার পরও মনে হচ্ছিল, সেসবের মধ্যেও কিছু মিসিং আছে, যেসব আমাদের বাংলাদেশে থাকতে পারে। সব তো আর ইংরেজরা নিয়ে যেতে পারেনি। তাই দলিলপত্র সম্পর্কে উৎসাহী হয়ে উঠি, সেগুলো কোথায় আছে, কিভাবে আছে—সেসব খুঁজে খুঁজে বের করতে শুরু করি।

এসব করতে গিয়ে দেখলাম, এখানে যে ঢাকাচর্চা হচ্ছে, সেটা খুবই জনপ্রিয়। কিন্তু এটা গবেষণার ধারেকাছেও নেই। তাই একটা ট্রেন্ড দাঁড় করানোর চেষ্টা করলাম, ঢাকা স্টাডি হবে বেশির ভাগ রিসার্চ ওয়ার্ক ও রেকর্ডের ভিত্তিতে। আর সে জন্যই আবারও এশিয়াটিক সোসাইটির সঙ্গে যুক্ত হই। সে সময় এশিয়াটিক সোসাইটির জেনারেল সেক্রেটারি ছিলেন অধ্যাপক ওয়াকিল আহমেদ। তাঁর অনুরোধেই মাল্টিডিসিপ্লিনারি ঢাকা নিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিলাম। উদ্দেশ্য ঢাকার নগরায়ণের ইতিহাস সার্বিকভাবে তুলে ধরা। তাই ঢাকার ইতিহাস তৈরির লক্ষ্যে প্রস্তাব দিলাম। সে সময় এশিয়াটিক সোসাইটিতে দুজন ব্যক্তি নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। একজন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম, অন্যজন অধ্যাপক ওয়াকিল। আর সে সময় থেকেই বলা যায়, এশিয়াটিক সোসাইটিতে ইতিহাস চর্চা ও গবেষণার কাজ আরো জোরেশোরে শুরু হয়। নগরচর্চাটা আমিই প্রথম শুরু করি। আগে যে ঢাকাচর্চা হতো, সেখানে মূলত দেখানো হতো কোথায় কয়টা বস্তি আছে, ইনফরমাল ট্রেড আছে কি না ইত্যাদি। মূলত ঢাকার তখনকার পরিস্থিতি কেমন ছিল, সেটা বোঝানো হতো। এটা ছিল তথ্যনির্ভর। এই কাজ করত মূলত জিওগ্রাফাররা। ঠিক করলাম, শুধু ইতিহাসভিত্তিক চোখ হলে চলবে না, ঢাকাকে জানা দরকার বিভিন্ন চোখ দিয়ে। এখানে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী থেকে শুরু করে ভূগোলবিদ, সমাজতাত্ত্বিক, নৃতাত্ত্বিক, পরিবহন বিশেষজ্ঞসহ নানা ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞদের দরকার। প্রস্তাব দিলাম। কিন্তু এশিয়াটিক সোসাইটির ততকালীন সভাপতি আবদুল্লাহ আল-মুতী শরফুদ্দিনসহ কয়েকজন দু-তিনবার আমার প্রপোজাল দেখলেন। তাঁরা প্রপোজালটা ততটা পছন্দ করলেন না। তবে শেষ পর্যন্ত রাজি হলেন এবং আমরা কাজ শুরু করলাম। শুরু করার পরপরই দেশের মধ্যে ও বাইরে ভালো সাড়া পেলাম। এভাবেই শুরু হলো ‘ঢাকা পাস্ট প্রেজেন্ট ফিউচার’ বইটার কাজ। এখন পর্যন্ত এটা রেফারেন্স ওয়ার্ক হিসেবে বিবেচিত হয়। আমার পরবর্তী সিরিজ বের হওয়ার আগে এটাই সবার জন্য মুখ্য রেফারেন্স ওয়ার্ক হয়ে উঠল। প্রথম দিকে বুঝতে পারিনি এতটা সাড়া ফেলবে। একটা বইয়েই বিভিন্ন ডিসিপ্লিন থেকে ৭০-৮০টি আর্টিকল এলো। বিভিন্ন দেশের বিশেষজ্ঞরা তাঁদের নিজস্ব পারসেপসন নিয়ে এ দেশে এসে তথ্য সংগ্রহ করলেন। তাঁদের মধ্যে অর্থনীতিবিদ, নগর পরিকল্পনাবিদ প্রভৃতি ধরনের মানুষও ছিলেন। বইটা ১৯৯১ সালে ফোর্ড ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে প্রকাশিত হয়।

 

এর মধ্যে তো অধ্যাপনার পাশাপাশি অন্যান্য কাজের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে গেলেন।

ঠিক। বাংলাদেশ ইতিহাস সমিতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হলাম, এশিয়াটিক সোসাইটির সঙ্গে তো আগেই যুক্ত ছিলাম। বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো শুরু করলাম গবেষণামূলক আঞ্চলিক ইতিহাস লেখার কাজ। এভাবে দুটি কাজ (সম্পাদনা) করলাম, যা আজও রেফারেন্স হিসেবে গণ্য করা হয়। একটি সিলেটের বাংলা ও ইংরেজিতে—‘সিলেট : হিস্ট্রি অ্যান্ড হেরিটেজ’ ও বাংলায় ‘সিলেট : ইতিহাস ও ঐতিহ্য’, অন্যটি দিনাজপুরের ওপরে—‘দিনাজপুর : ইতিহাস ও ঐতিহ্য’।

 

ঢাকা বইটি তো বাংলায়ও প্রকাশ করলেন।

ইংরেজিতে করার জন্য দেশে ও বিদেশে বইটির ব্যাপক চাহিদা। এই চাহিদা শুধু ইতিহাসের ছাত্রদের নয়, বরং যাঁরা সড়ক ও পরিবহন, জেন্ডার স্টাডি, কলা, স্থাপত্য, প্রকৌশল, পরিবেশবিদ্যা নিয়ে পড়ছেন তাঁদের জন্যও। ফলে বইটির চাহিদা আছে এবং একে একে তিনটি সংস্করণ বেরিয়েছে। পরে বইটির বাংলা বেরিয়েছে। এটি কিন্তু ইংরেজিটার হুবহু নয়। ‘ঢাকা : ইতিহাস ও নগরজীবন ১৮৪০-১৯২১’ নামের এ বইকে মূলের বর্ধিত রূপ বলা যেতে পারে। কেননা ইংরেজি বইটিতে ১৮৮৫ সাল পর্যন্ত কাজ করেছি, কিন্তু বাংলাটিতে ১৯২১ সাল পর্যন্ত। আসলে বইটি একটু পরিবর্ধন করেছি, কিন্তু ফোকাস পয়েন্টটা একই ছিল। ১৯২১ সালে শেষ করা হয়েছে, কারণ ১৯২১ সাল পর্যন্ত ঢাকা শহর একটা বিশেষ ধারায় বেড়ে উঠেছে। এর আগ পর্যন্ত এটা ছিল একটা মফস্বল শহর; উন্নয়ন হচ্ছিল, কিন্তু গণ্ডিটা ছিল সীমাবদ্ধ। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হলো। তার পরপরই এই শহরের সব কিছুই পাল্টে গেল। একটা নতুন এলাকায় রূপ নিল। ফলে ইতিহাসটাও একটু অন্য রকম হয়ে গেল। তাই ইচ্ছা করেই ১৯২১ পর্যন্ত করলাম। না হলে আমাকে অনেক কিছু চিন্তা করতে হতো, অনেক কিছু নতুন করে ভাবতে হতো। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয়টি না নিয়ে এলে তা অসম্পূর্ণ থেকে যেত, বই হতো না। তাই নিয়ে এলাম। আমার ইচ্ছা ছিল, ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত কাজ করব। কিন্তু নানা ব্যস্ততার কারণে তা আর হয়ে ওঠেনি।

 

দেশে ও বিদেশে কাজের অভিজ্ঞতার আলোকে তথ্য সংগ্রহের দিক থেকে আমরা কোন জায়গায় আছি?

গবেষণার জন্যই আমাকে যেমন ব্রিটিশ লাইব্রেরি, ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরি অ্যান্ড রেকর্ডস, লন্ডন সিনেট হল লাইব্রেরি, ভারতের ন্যাশনাল আর্কাইভসে কাজ করতে হয়েছে; তেমনি কাজ করতে হয়েছে বাংলাদেশে ন্যাশনাল আর্কাইভস, সেক্রেটারিয়েট লাইব্রেরিতেও। সেই হিসেবে বলতেই হয়, প্রথমে এগিয়ে আছে পাশ্চাত্য, এরপর ভারতবর্ষ। পাশ্চাত্যের যে কয়েকটি লাইব্রেরি বা আর্কাইভসে গেছি, সেগুলো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠগুলোর অন্যতম। অতএব, বোঝাই যায় যে এসবের মানও অত্যন্ত ভালো। এরা গবেষকদের নিয়েও গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করে। লাইব্রেরি বা আর্কাইভগুলোকে তারা এতটাই গবেষকবান্ধব করে তুলেছে যে এককথায় অবিশ্বাস্য! ওদের আর্কাইভগুলো আপনাকে গবেষণার ভেতরে নিয়ে যাবে। সেখানে আপনার কোনো সুপারভাইজারের প্রয়োজন নেই। আপনি যখন যেটা চাইবেন খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পেয়ে যাবেন। কারণ সেখানে সব কিছু বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা হয়। তারা প্রতিদিনের, এমনকি প্রতিমুহূর্তের সব কিছুর রেকর্ড সংগ্রহ করছে। এই ব্যবস্থা আমাদের এ উপমহাদেশে নেই। এমন সব জিনিসও আছে, যা আমাদের চিন্তার মধ্যেও আসে না। ব্রিটিশ বা ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে এগুলো এখনো ইংরেজরাই দেখভাল করে এবং সেটা তারা খুব আন্তরিকতার সঙ্গেই করে থাকে। তাদের এই ভালো সেবার জন্যই সারা বিশ্বের মানুষ গবেষণা করতে সেখানে যাচ্ছে।

 

আপনি যখন বাংলাদেশ ন্যাশনাল আর্কাইভসের দায়িত্ব নিলেন, তখন কী অবস্থা পেলেন?

১০ বছর ন্যাশনাল আর্কাইভসের পরিচালকের দায়িত্বে (১৯৯৭-২০০৭) ছিলাম। যুক্তরাজ্যের আর্কাইভস দেখে মনে হয়েছে, আমরা কেন আমাদের দেশে এমনটা করতে পারব না। আমাদের দেশের অনেক তথ্য তাদের দেশে আছে, কিন্তু আমরা যদি একটি বাংলাদেশের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনা করতে চাই, তাহলে আরো তথ্যের প্রয়োজন। তা শুধু আমাদের দেশের এবং এই উপমহাদেশেরই। এখানে-ওখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। ফলে পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস তৈরি করতে গেলে আরো তথ্য লাগবে। তাই আমি সেগুলো সংগ্রহে আগ্রহী হয়ে উঠলাম এবং বিভিন্ন জেলা পর্যায়ের রেকর্ডগুলো সংগ্রহ করতে শুরু করলাম। ওই রেকর্ডগুলো না থাকলে মাঠপর্যায়ে কী হয়েছে জানা যাবে না। আমাদের ইতিহাস আগের মতোই রাজধানীকেন্দ্রিক এবং অপূর্ণই থেকে যাবে।

সত্যি বলতে কি, আর্কাইভস সম্পর্কে আমাদের অনেকেরই তেমন কোনো সচেতনতা নেই। অনেকে জানেনই না এটা কী জিনিস। অন্যদিকে সরকারি কর্মকর্তাদের ৯৯ শতাংশই এ সম্পর্কে জানেন না। আর্কাইভস যে শুধু ইতিহাসবিদের কাজে লাগে, তা কিন্তু নয়। আর্কাইভস বিজ্ঞানী থেকে শুরু করে ডাক্তার, ভাষাবিদ, ইতিহাসবিদসহ বিভিন্ন পেশার মানুষের প্রয়োজন হতে পারে। আমি যখন ওখানে ছিলাম, তখন বারডেমের অনেক তথ্য নিয়ে এসেছিলাম। কারণ পরে কোনো ডাক্তার যদি ডায়াবেটিস রোগের ওপর গবেষণা করতে চান তাহলে এখান থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে পারবেন তিনি। এসব তথ্য সংগ্রহ করার জন্য বিভিন্ন সরকারি অফিসে গেছি। সেখানে গিয়ে দেখেছি, কর্তাব্যক্তিরা তথ্যগুলো হাতছাড়া করতে চান না, আবার যত্নসহকারে সংরক্ষণও করতে পারেন না। জেলা শহর বা মফস্বলগুলোতে গিয়ে দেখেছি, লাইব্রেরি ভর্তি বই। আলমারি খুলে দেখা গেল, অযত্ন-অবহেলায় বইগুলো স্রেফ মাটিতে রূপান্তরিত হয়েছে। তারা কোনো দিন খুলেও দেখেনি এ বইগুলোতে কী আছে। স্থানীয় সরকারি নথিপত্রের ক্ষেত্রেও তা-ই ঘটেছে। তার পরও আমরা যেগুলো মনে করেছি আমাদের কাজে লাগবে, সংরক্ষণ করেছি। এই কালেকশনের গুরুত্ব হলো, এর দ্বিতীয় কোনো কপি পৃথিবীর আর কোথাও নেই। কারণ ইংরেজরা জেলা পর্যায়ের কাগজপত্র নিজেদের দেশে নিয়ে যায়নি। তারা শুধু রাজধানী থেকে আনুষঙ্গিক কাগজপত্র নিয়ে গেছে। আমার সময় যথেষ্ট পরিমাণে রেকর্ড সংগ্রহের চেষ্টা করেছি, সহকর্মীদের বোঝাতে চেষ্টা করেছি এর গুরুত্ব এবং কিভাবে এসব সাজিয়ে রাখতে হবে। এ ছাড়া আমার সময়ই আর্কাইভসের প্রথম ডিজিটাল প্রগ্রাম শুরু হয়। তখনই প্রথম প্রতিটি জেলা শহরের রেকর্ড ডিজিটালি সংরক্ষণ করে রাখার সিদ্ধান্ত নিই। বর্তমানে আমাদের সব জেলার রেকর্ড সিডি করে সংরক্ষণ করা আছে।

ঢাকার ওপর যত বই লিখেছি, তার অনেকটাই সম্ভব হতো না, যদি সিটি করপোরেশনের রেকর্ডগুলো দেখতে না পেতাম। ঢাকায় এসে দুটি জিনিস আবিষ্কার করলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে থাকা ‘ঢাকা প্রকাশ’ পত্রিকার প্রায় ১০০ বছরের অসাধারণ এক সংগ্রহ আর ঢাকা সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার তথ্যাদি। সিটি করপোরেশনে এই নথিপত্র দেখে আমার খুব আগ্রহ জন্মে এবং একসময় ভাবতে থাকি, কিভাবে এগুলো ন্যাশনাল আর্কাইভসে নিয়ে আসা যায়। পরে অনেক চেষ্টা করে সেগুলো আনতে পেরেছিলাম। কিন্তু আনার পর বুঝতে পারলাম, এগুলো সংগ্রহ করা আর না করা একই কথা। কারণ নথিগুলোর ভেতরে সময়ের কোনো ধারাবাহিকতা নেই। তাই সহকর্মীদের ডেকে বললাম, এগুলো সাজাতে হবে। যদিও আমাদের অবকাঠামো নেই, লোকবলের অভাব, কাজ বোঝে এমন মানুষের অভাব, তার পরও সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি। শতভাগ না হলেও অনেকটাই গোছাতে পেরেছিলাম। এই কাজ করতে গেলে শরীরও অনেক খারাপ হয়ে পড়ে, ঠাণ্ডা-কাশি, অ্যালার্জির সমস্যা দেখা দেয়। আমার তো পোকার কামড়ে অনেক সময় হাত-পা ফুলেও গেছে। তবে এটা মাথায় রাখতে হবে, আমি কিন্তু আর্কিভিস্ট নই, ইতিহাসবিদ।

 

বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির সঙ্গে সম্পর্ক তো বেশ গাঢ়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রজীবন থেকেই এর সঙ্গে জড়িত। ৪০-৪৫ বছর হয়ে গেছে। এশিয়াটিক সোসাইটির সব ধরনের গবেষণার সঙ্গেও যুক্ত ছিলাম; যেমন—এশিয়াটিক সোসাইটির জার্নালের সম্পাদক ছিলাম, সোসাইটির জয়েন্ট সেক্রেটারি ছিলাম। ন্যাশনাল আর্কাইভসের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মাঝে কিছু দূরত্ব তৈরি হয়েছিল অবশ্য। পরে সেটা কেটে গেছে। এখন আমি এশিয়াটিক সোসাইটির ভাইস প্রেসিডেন্ট।

 

রাজধানী ঢাকার ৪০০ বছর উপলক্ষে বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে যে ২১টি বই বের হয়, সেগুলোরও প্রধান সম্পাদক তো আপনি।

২০১০ সালে রাজধানী ঢাকার ৪০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ভেবে দেখলাম, আমাদের মানে বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটিরও কিছু করা উচিত। তবে এমন কিছু নয়, যা এক-দুই দিনেই হারিয়ে যাবে। কলকাতা তাদের ৩০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে কয়েকটি ভলিউম প্রকাশ করেছে। বিষয়টি নিয়ে ড. সিরাজুল ইসলাম স্যারের সঙ্গে আলোচনা করি। এরপর ড. গোলাম রব্বানির সঙ্গে বসি। কারণ আমার পর ড. রব্বানিই দ্বিতীয় ব্যক্তি, যিনি ঢাকার ওপর বিলাতের নটিংহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করে এসেছেন। দুজন বসে ঠিক করলাম, শুধু ইতিহাস নয়, বইগুলো হবে মাল্টিডিসিপ্লিনারি। সব মিলিয়ে আমরা ৪০টির মতো বিষয় ঠিক করেছিলাম। এ প্রজেক্টে অনেকের সহযোগিতাও পেলাম। এই কাজের জন্য অনেককে যুক্ত করা হলো। বিভিন্নজনকে বিভিন্ন দায়িত্ব দেওয়া হলো। এ পর্যন্ত ২১টি বই আমরা বের করেছি। গুরুত্বপূর্ণ খণ্ডগুলো দুটি ভার্সনে বের হয়েছে।

 

আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাস চর্চার কী অবস্থা?

ইতিহাসে অনেক ধারা আছে। এর মধ্যে প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসও খুব গুরুত্বপূর্ণ। বলা যেতে পারে, আমিই প্রথম প্রতিষ্ঠান তথা ঢাকা কলেজের ওপর গবেষণামূলক কাজ শুরু করি। বাংলাদেশ এবং ঢাকার ইতিহাস পড়তে গিয়ে দেখি, ঢাকা কলেজই হলো আধুনিক বাংলাদেশের জনক। বাংলাদেশ হওয়ার পেছনে ঢাকা কলেজের অবদান অপরিসীম। এই কলেজ নিয়ে আমার লেখা ‘ঢাকা কলেজ : ইতিহাস ও ঐতিহ্য (১৮৪১-১৯২১)’ বইটি প্রকাশিত হয়। এরপর মিটফোর্ড হাসপাতালের ওপর কাজ করেছি। কারণ সেই একই। এটিও পূর্ব বাংলার চিকিৎসাক্ষেত্রে পথপ্রদর্শক। সেই মিটফোর্ড হাসপাতালের ইতিহাসটা তুলে ধরেছি ‘মিটফোর্ড হাসপাতাল এবং ঢাকা মেডিক্যাল স্কুল : ইতিহাস ও ঐতিহ্য, ১৮৫৮-১৯৪৭’ বইয়ে।

 

সব কিছু মিলিয়ে ঢাকা নিয়ে গবেষণা কতটুকু হচ্ছে?

ঢাকা যেহেতু বিভিন্ন সময় এ অঞ্চলের রাজধানী হয়েছে এবং এখনো রাজধানী, তাই এর প্রতি কৌতূহল, এর ইতিহাস-সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক নিয়ে কাজ করার জন্য প্রতিনিয়ত আগ্রহ সৃষ্টি হচ্ছে। এটা ভালো দিক। তবে আমাদের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে যদি বলি তাহলে আগেও ভুলত্রুটি ছিল এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। কেননা প্রয়োজনীয় তথ্য, দলিলপত্র ও নথিপত্র সংগ্রহের ক্ষেত্রে একটুও উন্নতি করতে পারিনি আমরা। তাই ইতিহাসচর্চাটা ভবিষ্যতেও খুব দুর্বলভাবেই চলবে।

 

লম্বা সময় ধরে ঢাকা নিয়ে কাজ করেছেন। সব মিলিয়ে আপনার উপলব্ধি কী?

উপলব্ধিটা অবশ্যই আনন্দময়। ঢাকা নিয়ে গবেষণা শুরু করেছিলাম এমন একটা সময়, যখন ঢাকার অস্তিত্ব নিয়েই একটা বড় প্রশ্ন ছিল। ঢাকা কি থাকবে, নাকি গৌড়, পাণ্ডুয়া কিংবা সোনারগাঁর মতো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। ঠিক সেই জায়গা থেকে ঢাকা আজ একটি শক্তিশালী জায়গায় এসে পৌঁছেছে। শুধু গবেষক হিসেবেই নয়, একজন ঢাকাপ্রেমী হিসেবেও বেশ আনন্দিত। আরবান হিস্ট্রির থিওরিটা হলো, সভ্যতার বিকাশই হয়েছে নগর থেকে। নগরই সভ্যতা সৃষ্টি করেছে, আবার নগরই সভ্যতা ধ্বংস করেছে। এই থিওরি অনুযায়ী বিশ্বাস করি, ঢাকা বাংলাদেশকে উন্নতির পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

 

[১৭ মে ২০১৬, ঢাকা] 


মন্তব্য