kalerkantho


অন্যের লেখা পড়েই তো জীবন কেটে গেল

সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা সেই ছেলেবেলাতেই। ‘সংবাদ’-এর বার্তা বিভাগে এক দশক চাকরির পর হঠাৎ করেই সাহিত্যের দায়িত্ব পেলেন। টানা ২৬ বছর এ দেশের অন্যতম সেরা সাহিত্য সাময়িকীর সম্পাদক ছিলেন। শামসুর রাহমান, কাইয়ুম চৌধুরী, সৈয়দ শামসুল হক, শহীদ কাদরী ও মাহমুদুল হকের সঙ্গে তুমুল ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল। মাসিক ‘গণসাহিত্য’ সম্পাদনা করেছেন। ১৪ বছর ধরে ‘কালি ও কলম’-এর সম্পাদক আবুল হাসনাত। লেখক, লেখালেখির সেই ভুবনে ফিরে গেলেন তিনি। শুনেছেন ওমর শাহেদ। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



অন্যের লেখা পড়েই তো জীবন কেটে গেল

সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ কিভাবে জন্মাল?

যখন নবাবপুর সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে নিম্ন শ্রেণীতে পড়ি, তখন থেকেই সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ জন্মেছে। স্কুলের পাঠ্য বইয়ের বাইরে অনেক বই পড়তাম। রোমাঞ্চকর বইয়ের প্রতি খুব ঝোঁক ছিল। ‘দস্যু মোহন’ ইত্যাদি বই পড়ে একটি রুচি গঠন হয়। এরপর ষাটের দশকে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হলাম, স্কুলের বন্ধু, খ্যাতনামা সাংবাদিক মতিউর রহমানের সান্নিধ্যে এসে সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ আরো বেড়ে গেল। তাঁরও সাহিত্যের প্রতি খুব অনুরাগ ছিল। তিনিও খুব বই পড়তেন। আমরা সেগুলো বিনিময় করতাম। বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে ভারতীয় হাইকমিশনের একটি লাইব্রেরি ছিল, আমরা সেখানে যেতাম, অনেক বই সংগ্রহ করতাম। সেসব পাঠ করতাম। বই পড়ার নেশাটি আজও কাটেনি।

রবীন্দ্রনাথ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব বসু আমার প্রিয় লেখক। লেখালেখির কথা তখনো মাথায় আসেনি। লেখক হব, লিখব, লেখার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হব—এমন কোনো দৃষ্টিভঙ্গিও ছিল না। কেবলই পড়ে যেতাম।

 

ষাটের ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে কিভাবে যুক্ত হলেন?

ষাটের দশকের প্রথম দিকেই যখন প্রবল ছাত্র আন্দোলনের প্রস্তুতি চলছে তখন মতিউর রহমানের সঙ্গে আমিও বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হলাম। তিনি আমাকে সংগঠনের অফিসে নিয়ে গেলেন। পরে এ সংগঠনের প্রথম সারির কর্মী হয়ে গেলাম। আরো পরে ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃত্বেও আসীন হলাম। ছাত্র ইউনিয়নের কালচারাল সেক্রেটারি, পরে কার্যকরী সংসদের সদস্য, আরেক মেয়াদে ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলাম। তখন নুরুল ইসলাম নাহিদ সভাপতি, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম সাধারণ সম্পাদক। ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী হিসেবে যখন যে কর্মসূচি হয়েছে, তাতে অংশ নিয়েছি। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় পড়ি। খুব যে পড়াশোনা করেছি, তা নয়। ছাত্র ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন নিয়েই মেতে ছিলাম। রাতে সংবাদে চাকরি করতাম, দিনে ছাত্র ইউনিয়ন করতাম। ফলে ছাত্রজীবনেও কিছু গ্যাপ হয়। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর এক বছর আগে থেকেই ছাত্র ইউনিয়নের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলাম। ১৯৭১ সালের মে মাসের শেষ দিক থেকে ষোলোই ডিসেম্বর পর্যন্ত আমি কলকাতার ১৬ আমির আলী এভিনিউয়ের দোতলায় বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির লিয়াজোঁ অফিসের দায়িত্বে ছিলাম। তখন প্রচণ্ড পরিশ্রম করেছি। কোনো দিন ১৮ ঘণ্টাও কাজ করেছি। এ ছিল আমার জীবনে গৌরবের কাল। লিয়াজোঁ অফিসে রাজনৈতিক সংযোগই শুধু নয়, ওষুধপত্র, পুরনো কাপড়, গরম কাপড় যা সংগ্রহ করা হতো সেগুলো আগরতলায় নেতাদের কাছে পাঠিয়ে দিতাম। তাঁরা সেগুলো বিভিন্ন জায়গায় পাঠিয়ে দিতেন। আমাদের মাধ্যমে দুই ব্যাচে প্রায় পাঁচ শ ছাত্র, যুবক দেরাদুনে প্রশিক্ষণের জন্য গিয়েছে। তখন অসাধারণ সৃজনশীল কথাসাহিত্যিক দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগ ও সখ্য হয়েছে। তিনি আমাকে যে কী স্নেহ করতেন ভাবা যায় না। তিনি ‘বুদ্ধিজীবী সহায়ক সমিতি’র সেক্রেটারি ছিলেন। প্রায়ই আমাদের অফিসে আসতেন, আড্ডা হতো। আরেকজনের কথা খুব মনে পড়ে—বিখ্যাত ইতিহাসবিদ গৌতম চক্রবর্তী। তিনিও অফিসে আসতেন, গল্প করতেন। আরেকজন অসাধারণ মানুষ স্বাধীন গুহ কলকাতা থেকে দূরে থাকলেও প্রতিদিন অফিসে আসতেন। মুক্তিযুদ্ধে বাম ছাত্রদের সাহায্য করতে তাঁরা দিবারাত্র পরিশ্রম করেছেন। আমাদের জন্য ইলা মিত্র, রমেন মিত্রের ড্রইং রুম সর্বক্ষণ অবারিত ছিল। আরো ছিলেন শান্তিময় রায়। তাঁরা প্রত্যেকেই আমাদের সহায়তার হাত প্রসারিত করেছেন।

 

 

অনেক বিখ্যাত বাম রাজনীতিবিদের সঙ্গ পেয়েছিলেন। তাঁরা কিভাবে আপনার মনোজগৎ গড়ে দিয়েছিলেন?

এটি মুক্তিযুদ্ধের আগের ঘটনা। ষাটের দশকে আন্ডারগ্রাউন্ড কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে মোহাম্মদ ফরহাদ বাম ছাত্র আন্দোলনকে দিকনির্দেশনা দিতেন, দেখাশোনা করতেন। ১৯৬২ সালের ছাত্র আন্দোলনের পর তাঁর নামেও হুলিয়া জারি হয়েছিল। কখনো কখনো তাঁর সঙ্গে দেখা হতো। তিনি খুব গতিশীল মানুষ ছিলেন, তাত্ক্ষণিক সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা তাঁর ছিল। বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাজনীতির মনকে তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারতেন। রুচিবান মানুষ ছিলেন তিনি। সাহিত্যের প্রতিও অনুরাগ ছিল। কবিতা, ছোটগল্প পড়তেন। আমাদের সঙ্গে সেগুলো আলোচনা করতেন। আমরা তখন বামপন্থী সাহিত্য খুব পড়তাম। এ ছাড়া কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে তাত্ত্বিক নেতা অধ্যাপক আবদুল হালিম আমাদের ক্লাস নিতেন, মার্ক্সবাদ চর্চায় উৎসাহিত করতেন। তাঁর মতো পণ্ডিত খুব কম দেখেছি। তিনিও আমাদের সাহিত্যের রুচি গঠনে খুব সহায়তা করেছেন। অনেক সময় তিনি বলতেন, মানিক পড়েন, সুকান্তের লেখা পড়েন, সুভাষ মুখোপাধ্যায় পড়েন। তাঁর নির্দেশে সেসব লেখা সংগ্রহ করতাম, পড়তাম। পড়তে পড়তেই কিন্তু আমাদের সাহিত্যের রুচি তৈরি হয়েছে।

 

সংবাদপত্রে চাকরি নিলেন কবে?

১৯৬৫ সালের ১ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অবস্থায় ‘সংবাদ’-এর বার্তা বিভাগে যোগদান করেছিলাম। জীবনের প্রয়োজনে, নিজের ও ভাই-বোনদের লেখাপড়ার খরচ চালিয়ে যাওয়ার জন্য চাকরি নিতে হয়েছে; যদিও বেতন খুব নগণ্য ছিল। সাব-এডিটরদের তখন বেতন ছিল মাত্র ১৩০ টাকা। এ টাকাতেই সংসার খরচ, লেখাপড়া চালানোসহ অনেক কিছু করতে পেরেছি। দীর্ঘদিন নিউজে ছিলাম। এপিপিবিসহ অন্যান্য সংবাদ সংস্থা থেকে টেলিপ্রিন্টারে যেসব নিউজ আসত, অনুবাদ করতাম। রাতের শিফট শেষে গভীর রাতে পুরান ঢাকার যোগীনগরের বাসায় ফিরে যেতাম; যদিও বংশালের সংবাদ অফিস থেকে বাসাটি খুব কাছেই ছিল। তবু নিঝুম শহরে ফিরতে খুব ভয় লাগত। নিউজে সাব-এডিটর হিসেবে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত চাকরি করেছি। মাঝে ১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বরে এক বছরের জন্য মস্কোতে সাংবাদিকতা নিয়ে পড়তে গিয়েছিলাম।

 

কেন বার্তা বিভাগ থেকে নিয়ে এসে আপনাকে সাহিত্যের দায়িত্ব দেওয়া হলো?

১৯৭৪ সালের শেষ বা ১৯৭৫ সালের প্রথম দিকের ঘটনা। তখন কিছুদিনের জন্য কবি দাউদ হায়দার সংবাদ সাময়িকীর দায়িত্বে ছিলেন। তিনি তাঁর পাতায় একটি কবিতা ছাপলেন। কবিতাটি ঘিরে মহাবিতর্ক হলো, তিনি দেশত্যাগে বাধ্য হলেন। সম্পাদক আহমেদুল কবির ও অন্যরা জানতেন যে সাহিত্যের প্রতি আমার অনুরাগ আছে, কালেভদ্রে দু-চারটি কবিতা লিখি, বইপত্রও পড়ি। ফলে তাঁরা ভেবেছিলেন, আমি হয়তো দায়িত্বটি পালন করতে পারব। সম্পাদক যখন আমাকে ডেকে কথাটি বললেন তখন মনে খুব দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল যে এই বিরাট দায়িত্ব পালন করতে পারব কি? ১৯৫১ সালের ১৭ মে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই কিন্তু সাহিত্য পাতাটি খুব ভালো হতো। তখন থেকেই এটি সুনাম কুড়িয়েছে, নানা ঘাত-প্রতিঘাতের ভেতর দিয়েও ততকালীন বাংলাদেশের সাহিত্যের পরিচর্যা করেছে। প্রথম দিকে কবি হাবিবুর রহমান এটি সম্পাদনা করতেন। পরে রনেশদা (দাশগুপ্ত) দেখেছেন, শহীদুল্লা কায়সারও কিছুদিন দেখেছেন। তাঁরা সবাই খ্যাতিমান লোক। লেখকদের সঙ্গে তাঁদের খুব বন্ধুত্ব ছিল। তাঁরা অনুরোধ করলে কেউ লেখা দিতেন না—এমনটি হতো না। ফলে আমার জন্য এও চ্যালেঞ্জের ছিল যে আমি একজন সাধারণ মানুষ, সাধারণ কর্মী, আমি সেই মান বজায় রাখতে পারব? সত্যি কথাই বলি, একদিন সহকারী সম্পাদক ও সংবাদের অন্যতম ব্যক্তিত্ব বজলুর রহমানের সঙ্গে গল্প করতে করতে বলেছিলাম, এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারব? তিনি আমাকে প্রবল উৎসাহ দিয়ে বলেছেন, ‘অবশ্যই পারবেন। ’ কিভাবে পাতাটিকে সাম্প্রতিক বাংলাদেশের সাহিত্যচর্চার একটি দর্পণ করে তুলতে পারি সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই আমি কাজ করার চেষ্টা করেছি। কতটা সার্থক হয়েছি, হইনি—কাল বিচার করবে, পাঠকরা করবেন। কিন্তু চেষ্টা করেছি। আগে এটি দুই পাতা ছিল। আমি দায়িত্ব নেওয়ার কিছুদিন পর চার পাতা হলো। আমার চিন্তাই হয়ে গেল, কিভাবে এই পাতাকে আরো উন্নত করা যায়, বিষয়-বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ করা যায়, সাহিত্যের নানা বিষয় নিয়ে তর্ক করা যায় বা জিজ্ঞাসা সঞ্চারিত করা যায়। শুরুতেই সেলিনা হোসেনের একটি ধারাবাহিক উপন্যাস শুরু করলাম। বিষয়-বৈচিত্র্যে আরো সমৃদ্ধ করতে বইয়ের আলোচনা বেশি করে ছাপাতে লাগলাম। স্থাপত্য, চিত্রকলা এবং শিল্প-সাহিত্য বিষয়ের লেখা যাতে আরো প্রতিফলিত হয় সে জন্য নানাজনকে অনুরোধ করলাম। তাঁরা লেখা দিয়ে পত্রিকাটিকে সমৃদ্ধ করেন।

 

সৈয়দ শামসুল হকের হূৎকলমের টানেকথা সামান্যই কিভাবে ছাপা হলো?

তিনি তো আমাদের সাহিত্যের একজন প্রধান ব্যক্তিত্ব। তিনি যা-ই লিখতেন, সেটিই ঘটনা হয়ে যেত। ‘হূৎকলমের টানে’ নামটি তাঁর দেওয়া। একদিন কথা প্রসঙ্গে বলেছিলাম, একটি কলাম লেখার কথা ভাবা যায়? তিনি বললেন, ‘ভাবা যায়। ’ প্রায় ১৫ দিন পর তিনি বললেন, “ভেবে দেখেছি—এর নাম হবে ‘হূৎকলমের টানে’ এবং কলামটি শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে লেখা হবে। ” তিনি তাতে সেই সময়ের সংস্কৃতি, নাট্যচর্চা, বইয়ের আলোচনা করেছেন। এমনকি এমন অনেক ব্যক্তিত্ব যাঁদের কথা কেউ কখনো উল্লেখ করেনি, তাঁদের নিয়েও তিনি কলামটিতে লিখেছেন। বৃহস্পতিবারের পত্রিকা ‘হূৎকলামের টানে’র জন্যই জনপ্রিয় হয়েছিল। কলামটি শেষ হয়ে যাওয়ার কিছুদিন পর আবার আমি চেয়েছিলাম, সৈয়দ হক নতুন কিছু লিখুন। তখন তিনি ‘কথা সামান্যই’ লেখা শুরু করেন। এটি তো অসাধারণ কলাম। এ কলামে তিনি বাংলা বানানরীতি, শব্দের প্রয়োগ, ব্যাকরণ নিয়ে কাজ করেছেন। আমরা যে না বুঝে পরীক্ষায়-বক্তৃতায় কখনো কখনো যেসব শব্দ প্রয়োগ করি—তিনি সেগুলোর ভুল নিরসন করেছেন। এ কলামের মাধ্যমে অনেকেই জানতে পেরেছে যে শব্দের মানে না জেনে বহু শব্দ আমরা ব্যবহার করি। এসব ভুল তিনি ধরিয়ে দিয়েছেন, তাঁর মতো করে বিশ্লেষণ করেছেন। বাংলা সাহিত্যে এ এক অসাধারণ কাজ। এ ছাড়া ‘বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ’ নামে অসাধারণ একটি ধারাবাহিক উপন্যাস এখানে তিনি অনেক দিন ধরে লিখেছিলেন। এটি তাঁর অন্যতম প্রধান উপন্যাস। এখানে তো তিনি একটি বড় জনপদ নিয়ে কাজ করেছেন, তাঁদের আশা-আকাঙ্ক্ষা-স্বপ্ন তুলে ধরেছেন। পরে এটি সুবিশাল বই হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে।

 

শহীদ কাদরী, সৈয়দ মনজুরুল ইসলামসহ আরো অনেকের লেখা এখানে প্রকাশিত হয়েছে।

শহীদ কাদরী ‘ধ্বনি প্রতিধ্বনি’ নামে অসাধারণ কলাম লিখেছেন। টানা ছয় মাস তিনি এটি লিখেছিলেন। প্রজ্ঞাবান লোক ছিলেন তিনি, ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র ছিলেন। এই সাহিত্যের প্রতি তাঁর খুব অনুরাগও ছিল, পঠন-পাঠনের ব্যাপ্তিও অনেক। এ কলামে তিনি মূলত বাংলা সাহিত্যের কয়েকজন, লাতিন ও ইউরোপীয় সাহিত্যে কারা উল্লেখযোগ্য কাজ করছেন, তাঁদের নিয়ে লিখেছেন। ইতালির কবি ‘রীৎসস’কে নিয়ে তিনি একটি অসাধারণ লেখা লিখেছিলেন। তাঁর কলামের নানা বিষয় নিয়ে সাহিত্যের পাঠকদের মধ্যে তর্ক হতো। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ‘অলস দিনের হাওয়া’ নামে কলাম লিখেছিলেন। এটি মূলত বিদেশি সাহিত্যের বিশ্লেষণ ছিল। কলামটিতে তখনকার লাতিন, ইংরেজি সাহিত্যে যেসব কাজ হচ্ছিল, তাঁর পঠন-পাঠনের ব্যাপ্তি তো অনেক; সেই অভিজ্ঞতা থেকে তিনি কখনো সাহিত্য, কখনো কোনো বই, কখনো কোনো প্রবণতা নিয়ে লিখেছেন। এই কলামও খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। পরবর্তীকালে অনেকেই এখানে কলাম লিখেছেন। এভাবে প্রতিনিয়ত পরিবর্তন আনতে চেষ্টা করেছি। ফলে সাহিত্য পাতাটি সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে। সত্তর ও আশির দশকের বাংলাদেশের এমন কোনো লেখক ছিলেন না, যাঁরা এতে লেখেননি। হাসান আজিজুল হক তো রাজশাহী থাকেন, তিনি আমার পাতায় ও বিশেষ সংখ্যায় গল্প-প্রবন্ধ লিখেছেন। সেলিনা হোসেন, ইমদাদুল হক মিলন, রশীদ হায়দার, কবিদের মধ্যে মোহাম্মদ রফিক, মহাদেব সাহা, নির্মলেন্দু গুণ, আসাদ চৌধুরী, মুহম্মদ নূরুল হুদা—তাঁরা সবাই লিখেছেন।

 

প্রচ্ছদ শিল্পী কারা ছিলেন?

খুব ভালো একজন আর্টিস্ট পেয়েছিলাম—কাজী হাসান হাবীব। তাঁর সঙ্গে ছাত্রজীবন থেকেই বন্ধুত্ব ছিল। তিনিও ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী ছিলেন। তাঁর ভেতরে পরীক্ষা-নিরীক্ষার চেষ্টা ছিল। নিজেকে খুব পরিবর্তন করতেন। এটি একজন শিল্পীর খুব বড় গুণ। তাঁর কথা এখন আর কেউ বলে না। কিন্তু অকালপ্রয়াত এই শিল্পী আমাদের সাহিত্য পাতা থেকেই কাজ শুরু করেছেন। তিনিও আমার মতো সাহিত্য পাতা নিয়ে ভাবতেন। দুজনে মিলে পরিকল্পনা করতাম, মেক আপ করতাম। আঙ্গিক পরিবর্তন থেকে শুরু করে সব কিছুতে তিনি অংশ নিতেন। তাঁর ইলাস্ট্রেশন অসাধারণ ছিল। মেক আপ করতে করতে মেক আপেও খুব সিদ্ধহস্ত হয়ে উঠেছিলাম। পাতাগুলো দেখলে দেখা যাবে—প্রতিটি সংখ্যায় মেক আপে নতুনত্ব আনতে চেষ্টা করেছি, সচিত্রকরণে নতুন কিছু করতে চেষ্টা করেছি। পরে কাজী হাসান হাবীব ‘রোববার’-এ চলে যান। বীরেন সোম যোগদান করলেন। তিনিও আমার সঙ্গে কাজ করে পাতার উন্নয়নে যথেষ্ট চেষ্টা করেছেন। তখন প্রতিটি সংখ্যাই আলাদা করার চেষ্টা করতাম। না বললেই নয়—পিকাসো, মাতিস, গাঁগা, ভ্যানগগের মতো বিখ্যাত শিল্পীদের প্রচুর প্রতিলিপিও প্রথম পাতায় বড় করে ছেপেছি। আমি চেয়েছি, আস্তে আস্তে যেন শিল্পরুচি মানুষের মধ্যে সঞ্চারিত হয়। ফলে শিল্পকলা, চিত্রকলার ওপরও জোর দিয়েছিলাম। প্রথম দিকে এটি রবিবারে বেরোত, পরে বৃহস্পতিবার। চার পাতার প্রতিটি সংখ্যায় নতুন কিছু করার চেষ্টা করেছি। প্রতিটি সংখ্যায় লিড কী করব, কারো জন্মদিন, কাউকে স্মরণ করব কি না, কোন বইটি সামনে আনলে ভালো হবে, কোন প্রদর্শনীটি উল্লেখযোগ্য, শিল্পকলা বিষয়ে কোন বিষয়টিকে প্রাধান্য দেব—এভাবে পরিকল্পনা করে সংবাদের সাহিত্য সাময়িকী বেরোত।

 

বিশেষ সংখ্যাও তো করতে হয়েছে?

আজকের মতো সেকালেও প্রতিটি কাগজ একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, পহেলা বৈশাখ এবং ঈদ সংখ্যা করত। পঁচিশে বৈশাখ উপলক্ষে রবীন্দ্র সংখ্যা প্রকাশিত হত। সংখ্যাগুলোতে লেখার বৈচিত্র্য এবং অলংকরণে আলাদা কিছু করার চেষ্টা করেছি। প্রতিটি বিশেষ সংখ্যার কাভার কাইয়ুম চৌধুরী করেছেন। তিনি পাতার সাজসজ্জায়ও অনেক পরামর্শ দিতেন। সেসব গ্রহণ করতাম। কামরুল হাসানও কাভার করেছেন।

 

লেখকরা কেমন সাহায্য করেছেন?

পেছন ফিরে তাকালে বুঝি, লেখকরা জানতেন, আমার আন্তরিকতা আছে, সাহিত্যের প্রতি অনুরাগও আছে। সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই তাঁরা সবাই খুব সাহায্য করতেন। তাঁরা সম্মানী খুব বেশি পেতেন না। কিন্তু তাঁদের সবার ভেতরই একটি বিষয় কাজ করেছে যে আমি অনুরোধ করছি, চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে কাজটি করছি, বাংলাদেশের সাহিত্যের নানা দিক এ পাতায় তুলে ধরছি, পাতাটিকে বাংলাদেশের সাহিত্যের দর্পণ করে তুলছি। ফলে তাঁরা সবাই আমাকে সাহায্য করেছেন। এভাবে সমকালীন সব লেখকের সঙ্গেই কিন্তু আমার বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। ইমদাদুল হক মিলন বহুদিন সংবাদে গেছেন, আড্ডা দিয়েছেন। তখন কিন্তু তিনি এত খ্যাতিমান হননি। তাঁকে নিয়ে আমার একটি লেখাও আছে। সেটি পড়লে বোঝা যাবে প্রতি বুধবার মেক আপের দিন আমাদের দেখা হতো, আড্ডা হতো। এক কাপ চা খেয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দিতাম। শামসুর রাহমানের সঙ্গে ছাত্রজীবনেই সখ্য হয়েছিল। তখন সংবাদে এমন কোনো বিশেষ সংখ্যা হয়নি, যেটিতে তাঁর লেখা ছাপা হয়নি। সনত্কুমার সাহা, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, মুশাররফ হোসেন, আলী আনোয়ার, সালাউদ্দিন আহমদের মতো বরেণ্য লেখকরা লেখা দিয়েছেন। ফলে বিশেষ সংখ্যাগুলো সমৃদ্ধ হয়েছে। ১৯৭৫ সালের পর থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত—এই দেড় দশক আমাদের চিন্তা এবং পদক্ষেপকে স্তব্ধ করার জন্য সরকারি তরফ থেকে নানাভাবে চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু কবীর (চৌধুরী) স্যারসহ যাঁদের নাম উচ্চারণ করলাম, তাঁদের লেখা দেখলে দেখবেন, তাঁরা কিন্তু প্রতিবাদী হয়ে নানা ধরনের লেখা দিয়েছেন। সেসব লেখা পত্রস্থ করেছি। ১৯৭৫ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত টানা ২৬ বছর সংবাদের সাহিত্য সম্পাদক ছিলাম। সত্যি কথাই বলি, আর্থিক টানাটানিতে লেখকদের খুব একটা টাকা-পয়সা দেওয়া যেত না। কিন্তু তাঁরা সবাই কিন্তু সেরা লেখাটিই সংবাদে দিয়েছেন। কারণ সুন্দর করে একটি পত্রিকা প্রতি বৃহস্পতিবার বেরোচ্ছে, নানা বৈচিত্র্যের লেখা থাকছে, সাহিত্যের প্রাধান্য পাচ্ছে, তার সঙ্গে শিল্পও আছে। আমি সংবাদ সাময়িকীর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই শিল্প-সমালোচনা যুক্ত করেছিলাম। তখন এখানে এটি প্রায় ছিলই না, শিল্প সমালোচনা হতোই না। আমিই এটি চালু করেছি। দেশে-বিদেশের শিল্পসমালোচনা খুব প্রাধান্য পেত। বিদেশের শিল্পকলাবিষয়ক লেখা ও দেশের পেইন্টিংসের আলোচনা ছাপা হতো। কোনো উল্লেখযোগ্য প্রদর্শনী হলে সেগুলো প্রকাশ করতাম।

 

অনেক বিখ্যাত লেখকের সান্নিধ্য পেয়েছেন।

শঙ্খ ঘোষকে আমি খুব শ্রদ্ধা করি। তিনিও আমাকে খুব স্নেহ করেন। আলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের সান্নিধ্য পেয়েছি। তিনিও আমাকে প্রচণ্ড স্নেহ করেন। তিনি যখন জার্মানির হাইডেলবার্গে থাকেন, সেখান থেকেই আমাদের যোগাযোগ হয়। এখন তিনি কলকাতায় আছেন, এক মাস পর চলে যাবেন। এখনো তাঁদের যেকোনো বই বেরোলেই সংগ্রহের চেষ্টা করি। ইদানীং শঙ্করলাল ভট্টাচার্য, ইন্দ্রানী ভট্টাচার্য, চিন্ময় গুহ, কানাই কুণ্ডুর সঙ্গে খুব বন্ধুত্ব হয়েছে। তাঁরা আমার খুব আপনজন।

মাহমুদুল হক আপনার খুব বন্ধু ছিলেন।

কথাটি ঠিক। তিনি আমার খুবই বন্ধু ছিলেন। বায়তুল মোকাররমে ‘তাসমেন জুয়েলার্স’ নামে তাঁর সোনার দোকান আছে। সন্ধ্যায় সেখানে তিনি থাকতেন। আমাদের বন্ধু আখতার হুসেন একদিন বললেন, ‘আপনি তো গণসাহিত্য করেন। তাঁর লেখা ছাপতে পারেন। ’ ‘গণসাহিত্য’ পত্রিকা নিয়ে তাঁর কাছে গেলাম, পত্রিকাটি দিলাম। তিনি উল্টেপাল্টে রেখে দিলেন। এরপর নানা বিষয়ে আড্ডা, একের পর এক বিষয়ান্তরে তিনি গেলেন। সেদিন থেকে তাঁর সঙ্গে আড্ডা জমে উঠল। এই বন্ধুত্ব আমৃত্য ছিল। বহু সন্ধ্যা একসঙ্গে কাটিয়েছি, বহু রাত আড্ডা দিয়েছি। তিনি পশ্চিমবঙ্গের বারাসাত থেকে এসেছিলেন। সমগ্র জীবন দেশভাগের যন্ত্রণা ও কষ্ট বয়ে গেছেন। সাহিত্যের প্রতি তাঁর যে মনেপ্রাণে অনুরাগ ছিল, গল্পে-আড্ডায় নানা কিছুতে সেগুলো বেরিয়ে আসত। যখন তিনি এলিফেন্ট রোডে থাকতেন, সপ্তাহের অন্তত তিন-চার দিন তাঁর বাড়িতে আড্ডা দিয়েছি। পরে যখন অন্য জায়গায় চলে গেলেন, সেখানেও আড্ডা দিয়েছি। নির্বাচিত বন্ধুবান্ধব ছাড়া তিনি মিশতে পারতেন না। সাহিত্যপ্রীতি এবং রুচিবান মানুষ ছাড়া করো সঙ্গে মিশতে পারতেন না। আমরা একসঙ্গে ঢাকার বাইরে যেতাম। আমার জীবনেও সেটি সংকটের কাল ছিল। নানা কারণে রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বন্ধুদের সঙ্গ ধূসর হয়ে আসছিল। তখন তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। তাঁর চলে যাওয়ায় আমি আমার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বন্ধুকে হারিয়েছি। প্রতিনিয়ত তাঁর কথা মনে পড়ে। এত বর্ণময় তাঁর জীবন যে ভাবা যায় না। সব কিছুতেই তাঁর সুরুচির পরিচয় ছিল। তাঁর বাড়িতে এক কাপ চা দিলেও কিভাবে সুন্দরভাবে দেওয়া যায় সেটি ছিল। অসাধারণ মানুষ ছিলেন। তাঁর মতো পরোপকারী, বন্ধুবৎসল মানুষ খুব কম দেখেছি। তাঁর বাড়িতে গেলে আসতে পারতাম না। আমি মনে করি, মাহমুদুল হক বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে একটি মাইলফলক। তাঁর ‘কালো বরফ’ পড়লে এখনো শিহরিত হতে হয়, ‘জীবন আমার বোন’ পড়লে এখনো আনন্দ লাগে, নতুন জীবনের সন্ধান পাই। তাঁর গদ্যশৈলী অসাধারণ। এমন গদ্য বাংলা সাহিত্যে খুব কম লোকই লিখেছেন। এই ভাষা তিনি রপ্ত করেছেন, চর্চা করেছেন। তাঁর বিরাট পঠন-পাঠনের ছাপ এর মধ্য থেকে বেরিয়ে এসেছে।

 

এই ভালোবাসা তো শহীদ কাদরীর কাছেও পেয়েছেন।

তিনি কিন্তু সব সময় মনে করতেন যে প্রতিনিয়ত তাঁর লেখা উচিত। কিন্তু লিখতে পারতেন না। হয়তো এখান থেকে আমি তাগিদ দিতাম। সেভাবে লেখা পেতাম। তাঁর মৃত্যুর পর যে ক্রোড়পত্র ছেপেছি, তাতে ‘কালি ও কলম’-এ প্রকাশিত তাঁর লেখার তালিকা আছে। তাতে দেখা যায়, তিনি শেষ ১০ বছর যে লেখাগুলো লিখেছেন, সেগুলোর বেশির ভাগই আমার অনুরোধে লেখা। ফোনে মাঝেমধ্যে কথা হতো। কুশল জানতে চাইতাম। তিনিও দেশের জন্য কাতরতা প্রকাশ করতেন, বন্ধুদের জন্য আকুলতা প্রকাশ করতেন। কারো মৃত্যু হলে কেঁদে ফেলতেন। বলতেন, ‘ও চলে গেল, আমাকে রেখে গেল। ’ শামসুর রাহমানের মৃত্যুতে তিনি কাতর হয়েছিলেন, আবদুল মান্নান সৈয়দের মৃত্যুতে বেদনাহত হয়েছিলেন।

 

গণসাহিত্য কত দিন সম্পাদনা করেছেন?

১৯৭২ সাল থেকে এটি ১০ বছর বেরিয়েছিল। এটি খুব ভালো, উন্নতমানের সাহিত্য পত্রিকা ছিল। এটি মাসিক ছিল। গল্প-কবিতা তো ছিলই, বই আলোচনা, ভ্রমণ, নিসর্গ ইত্যাদিও ছাপা হতো। ৫০০ কপি ছাপা হলেও আলোচিত ছিল। প্রথম দিকে নিয়মিত বেরোত, পরে অনিয়মিত হয়ে যায়। এ ছাড়া সন্ধানী প্রকাশনী থেকে বেরোনো মুক্তিযুদ্ধের গল্প, মুক্তিযুদ্ধের কবিতারও আমি সম্পাদক। গাজী শাহাবুদ্দিন আহমদ ও কাইয়ুম চৌধুরীর অনুরোধে এগুলো সংকলন ও সম্পাদনা করেছি। সংবাদের সাহিত্য পাতায়ও নানাভাবে মুক্তিযুদ্ধকে তুলে এনেছি।

 

কালি ও কলমের সঙ্গে যুক্ত হলেন কিভাবে?

২০০১ সালে বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আবুল খায়ের আমাকে অনুরোধ করলেন, ‘কালি ও কলম নামটি পিতৃব্য মানে জ্ঞানতাপস অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের দেওয়া। তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী এই নামে সাহিত্য মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করতে চাই। অনেকে আপনার কথা বলেছেন, দায়িত্ব নিন। ’ অনেক ভেবে দেখলাম। তখন সংবাদে খুব আর্থিক সংকট চলছিল। ১১-১২ মাসের বেতন পাইনি। লেখকদেরও টাকা দিতে পারছি না। সব দিক মিলিয়ে প্রায় তিন মাস পর এখানে যোগদান করলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান পত্রিকাটির সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি হলেন। প্রাথমিকভাবে আমরা এক মাস ডামি প্রকাশ করে প্রস্তুতি নিলাম। এখন যেভাবে মানসম্পন্নভাবে এটি প্রকাশিত হচ্ছে, প্রথম দিকে সেভাবে হয়নি। কিন্তু কালক্রমে নানা অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে এখন ‘কালি ও কলম’ বাংলাদেশের সাহিত্য পত্রিকার জগতে একটি বিশিষ্ট জায়গা করে নিয়েছে। কালি ও কলমে নানা ধরনের বৈচিত্র্যময়, সাহিত্য বিকাশে উন্মুখ লেখকদের লেখা, বিশ্লেষণধর্মী লেখা ছাড়াও গল্প-কবিতা প্রকাশিত হচ্ছে। এগুলোর মাধ্যমে এটি একটি চরিত্র নির্মাণ করতে পেরেছে। সম্পাদক হিসেবে এখনো সর্বক্ষণ চেষ্টা করছি—পত্রিকায় যাতে নবীনদের লেখা স্থান পায়। প্রতিটি সংখ্যায়ই নবীনদের লেখা আছে, তারা এখানে মর্যাদার সঙ্গে লেখা দিয়ে থাকে। বাংলাদেশের যাঁদেরই ভালো লেখা পেয়েছি, ছেপেছি। পাশাপাশি বিশেষ সংখ্যা ও সাধারণ সংখ্যায়ও পশ্চিমবঙ্গে যাঁরা বাংলা ভাষার চর্চা করেন, তাঁদের লেখা পত্রস্থ হয়েছে। সুনীলদা (গঙ্গোপাধ্যায়), শীর্ষেন্দু (মুখোপাধ্যায়), বাণী বসু, সমরেশদা (মজুমদার) লিখেছেন। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, শঙ্খ ঘোষ, আলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের মতো প্রতিষ্ঠিত কবিদের সবাই এখানে লিখেছেন।

 

  

অনেক উল্লেখযোগ্য সংখ্যাও প্রকাশিত হয়েছে।

আমরা প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী নাম দিয়ে প্রতি পয়লা ফাল্গুন পত্রিকা প্রকাশ করি। শামসুর রাহমানের মৃত্যুর এক মাসের মধ্যে শামসুর রাহমান সংখ্যা, ওয়াহিদুল হক সংখ্যা, চিত্রকলা সংখ্যা, ছোটগল্প সংখ্যা, কাইয়ুম চৌধুরী সংখ্যা, মাজহারুল ইসলাম সংখ্যার মতো প্রচুর সংখ্যা করেছি; যার মধ্য দিয়ে এর চরিত্র ফুটে উঠেছে। সর্বশেষ সৈয়দ শামসুল হক সংখ্যা করেছি। প্রতিটি সংখ্যার জন্যই প্রয়াত লেখকদের পরিবার, বন্ধুদের সাহায্য পেয়েছি। সৈয়দ হক সংখ্যার জন্য তাঁর স্ত্রী (আনোয়ারা সৈয়দ হক) বিরল কিছু ছবি দিয়েছেন। তাঁর ছেলেও লিখেছেন। তাঁর মৃত্যুর পরপরই এটি প্রকাশ করেছি বলে সেই অর্থে সময় নিয়ে প্রকাশ করলে হয়তো আরো ভালো হতো। কিন্তু আমি তাঁর মৃত্যুর পরপরই শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাতে চেয়েছি। প্রতিটি সংখ্যাই কিন্তু লেখকদের মৃত্যুর এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে বেরিয়েছে। ফলে সংখ্যাগুলোর লেখাগুলোতে তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।

 

কালি ও কলম তরুণ লেখক পুরস্কার কবে থেকে চালু হলো?

এই আইডিয়া ঠিক আমার নয়। সম্পাদকমণ্ডলীর সভায় সমবেতভাবে আমরা এমন একটি পুরস্কার প্রবর্তন করা যায় কি না সে আলোচনা করে এটি প্রবর্তন করি। প্রথমে এইচএসবিসি ব্যাংকের করপোরেট হেড মাহবুবুর রহমানকে আমরা অনুরোধ করলাম। তাঁরা সেটি সঙ্গে সঙ্গে লুফে নিলেন। চার বছর তাঁরা আমাদের সহায়তা করেছেন। এখন এককভাবে আমরা এটি দিয়ে চলেছি। এবার নবম পুরস্কার দিলাম। পাঁচটি ক্ষেত্রে আমরা এ পুরস্কার দিচ্ছি। আমি বিশ্বাস করি, তরুণদের সৃজনযাত্রায় এ পুরস্কার নানাভাবে উৎসাহিত করছে। পশ্চিমবঙ্গ ও ঢাকার দু-চারজনকে আমরা আমন্ত্রণ জানাই। তাঁরা এসে তরুণদের নানাভাবে উৎসাহ দেন। তাঁদের মধ্যে শীর্ষেন্দু, সমরেশ মজুমদার, বাণী বসু, শঙ্করলাল ভট্টাচার্য এবং সর্বশেষ চিন্ময় গুহ বক্তব্য দিয়ে গেছেন।

 

নিজের লেখা?

অন্যের লেখা পড়েই তো আমার জীবন কেটে গেল। নিজের লেখা আর তেমনভাবে হলো না। আমার তিনটি কবিতার বই আছে—‘জ্যোত্স্না ও দুর্বিপাক’, ‘ভুবনডাঙার মেঘ’ ও ‘ভুবনডাঙা ও কালো বেড়াল’। এ ছাড়া কিশোরদের জন্য পাঁচটি উপন্যাস লিখেছি। ১৯৮১ সালে ‘টুকু ও সমুদ্রের গল্প’ বইটির জন্য অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার পেয়েছিলাম। এটি শিশু একাডেমি থেকে বেরিয়েছে। এ ছাড়া ‘ইস্টিমার সিটি দিয়ে যায়’ মুক্তধারা থেকে বেরিয়েছে। ‘যুদ্ধদিনের ধূসর দুপুর’ সাহিত্য প্রকাশ থেকে বেরিয়েছে।

 

শ্রুতলিখন : ওমর শাহেদ

(৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৬, উত্তরা, বেঙ্গল সেন্টার, ঢাকা)


মন্তব্য