kalerkantho


বেশির ভাগ মামলায়ই ‘আদালতের বন্ধু’ ছিলাম

ত্রিকালদর্শী মানুষ তিনি। পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্টের শুরুর দিনে ছিলেন। তখনই আইন পেশায় এলেন। বহু স্মরণীয় মামলা লড়েছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রুয়ান্ডা ট্রাইব্যুনালের বিচারক ছিলেন। দেশের অনেক মামলায় অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে আইনের বিশ্লেষণ করেছেন। প্রবীণতম আইনজীবী বিচারপতি টি এইচ খানের (তাফাজ্জল হোসেন খান) আইনজীবীজীবনের গল্প শুনেছেন ওমর শাহেদ। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



বেশির ভাগ মামলায়ই ‘আদালতের বন্ধু’ ছিলাম

আপনার আইন পেশার শুরু হয় কবে?

১৯৪৭ সালে এলএলবি ‘পার্ট-১’ পরীক্ষা দিয়েছি। এর পর থেকে চেম্বারে বসা শুরু করি। ছাত্রাবস্থায়ই স্বনামধন্য আইনজীবী বীরেন্দ্রকুমার দের (বি কে দে) আর্টিকল ক্লার্ক ছিলাম। তাঁর অধীনে আইন পেশার শুরু। তিনি বিখ্যাত সিভিল লইয়ার ছিলেন। তাঁর চেম্বার ছিল পুরান ঢাকার রাজার দেউরিতে। আমাদের সময় ছাত্রাবস্থায়ই আর্টিকল ক্লার্ক হওয়া যেত। কিন্তু পরীক্ষায় পাস না করলে সেই আর্টিকল জজের কাছে উপস্থাপন করা যেত না। তবে পার্ট-২ পরীক্ষা দিতে দেরি হয়েছে। ভারত-পাকিস্তান আলাদা হয়ে যাওয়ায় নানা কারণে পরীক্ষা নেওয়া যাচ্ছিল না। বোধ হয়, ১৯৪৯ সালের নভেম্বর কি ডিসেম্বরে পরীক্ষা দিয়েছি। ১৯৫০ সালে ফলাফল প্রকাশিত হয়েছিল। ফল প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে চেম্বারে বসা শুরু করি। ১৯৫০ সালে চেম্বার পরীক্ষা দিয়েছি। তখনো পূর্ণাঙ্গ বার কাউন্সিল গঠন সম্পন্ন হয়নি। আগে তো বার কাউন্সিল অ্যাক্টও ছিল না। ফলে লিগ্যাল অ্যাক্টের অধীনে বার কাউন্সিল পরীক্ষা দিয়েছি। ১৯৫১ সালের ১৪ মার্চ আমার এনরোলমেন্টের তারিখ ছিল। এখনো হাইকোর্টের রেজিস্ট্রিতে তারিখটি আছে। তবে তার আগে অনেক কিছু করতে হয়েছে। পত্রিকায় টানা ছয় সপ্তাহ বা ৪২ দিন ছাপাতে হয়েছে যে আমি অ্যাডভোকেট হতে চাই, কারো কোনো আপত্তি আছে কি না। সবার অনাপত্তির পর, গেজেট প্রকাশের পর আইনজীবী হিসেবে প্র্যাকটিস শুরু হয়। এর পর থেকে নবিশ হিসেবে হাইকোর্টে মামলা শুরু। তখন থেকে নিয়মিত হাইকোর্টে যাতায়াত শুরু করি। মাঝেমধ্যে জজকোর্টে যেতাম।

 

১৯৫১ সালের ১৪ মার্চ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত টানা ২০ বছর হাইকোর্টের আইনজীবীর জীবন?

অনেক মামলা করেছি, অনেক স্মরণীয় মামলা আছে। দু-একটির নাম উচ্চারণ করা বিপজ্জনক হবে (হাসি)। যেমন তখন সাংবিধানিক মামলা হয়েছিল। ১৯৫৬ সালে যখন সংবিধান হলো, এর বিপক্ষে জমিদাররা তাঁদের স্বার্থের হানি হয় বিধায় মামলা করতে শুরু করলেন। সংবিধান চ্যালেঞ্জ করে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার জমিদাররাও মামলা করলেন। অনেক উকিল জমিদারদের পক্ষে, আবার অনেকে সরকারের পক্ষে ছিলেন। সরকারপক্ষে বিখ্যাত আইনজীবী ডি এন পিট এবং এ কে ব্রোহি প্রধান আইনজীবী ছিলেন। জমিদারদের পক্ষে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের ছোট ভাই প্রিয়রঞ্জন দাশ ছিলেন। তিনি পাটনা হাইকোর্টে প্র্যাকটিস করতেন। ১৯২২ সালে পাটনায় হাইকোর্ট হলে তিনি সেখানে চলে গিয়েছিলেন। তাঁর আরেক ভাই সুধীররঞ্জন দাশ প্র্যাকটিসে আসেননি। তিনি হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারক ছিলেন। এ ছাড়া চিত্তরঞ্জনের নাতি সিদ্ধার্থ শংকর রায়—এ তিনজন মামলাটিতে জমিদারদের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন। তখনকার নামকরা সব ব্যারিস্টার ও উকিল মামলাটিতে কোনো না কোনো পক্ষের হয়ে লড়েছিলেন। একেই সে সময়ের সবচেয়ে বড় মামলা বলা যায়। আমি জমিদারদের পক্ষে জুনিয়র আইনজীবী হিসেবে লড়েছি। মামলায় সরকারের পক্ষে রায় হয়েছিল। জমিদাররা রায়ের বিপক্ষে আপিল করলেও হেরে যান।

 

তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্টের উদ্বোধনী দিনের আপনি একজন সাক্ষী।

এটি ১৯৪৭ সালের আরো কিছু পরের ঘটনা। নির্দিষ্ট দিন-তারিখ মনে নেই। তখনো আমি অ্যাডভোকেট নই, আর্টিকল ক্লার্ক। তখন আর্টিকল ক্লার্কশিপ পরীক্ষায় পাস না করলে উকিল হওয়া যেত না। সেদিন প্রধান বিচারপতি সালেহ মোহাম্মদ আকরাম, মাদ্রাজ হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি আইসিএস জজ শাহাবুদ্দিন, ব্যারিস্টার জজ অরমন, আইসিএস জজ টি এইচ এলিস (টমাস হোবার্ট এলিস), আমির উদ্দীন আহমেদ ও আমিন আহমেদ উপস্থিত ছিলেন। আমি, আবদুল হাই চৌধুরী, সাবেক প্রধান বিচারপতি ফজলে মুনিম ছাত্রাবস্থায়ই সেখানে গিয়েছিলাম। তখন আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে থাকি। এত দিন ধরে আমাদের খুব উৎসাহ ছিল যে এখানে হাইকোর্ট হচ্ছে, কোর্টে প্র্যাকটিস করব। শেষ পর্যন্ত সেটির উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হচ্ছে, সেই অনুষ্ঠান দেখতে গেলাম। হিন্দু-মুসলিম মিলিয়ে কলকাতা থেকে এক-দেড় শ উকিল এসেছিলেন। প্রধান বক্তা ছিলেন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। তিনি সেদিন অনেক কথাই বলেছেন। তবে তাঁর বক্তব্যের সারকথা হলো—ব্রিটিশরা চলে যাচ্ছে। তবে তারা আমাদের অনেক আইন দিয়ে যাচ্ছে। ক্রিমিনাল প্রসিডিউর কোর্ট, সিভিল প্রসিডিউর কোর্ট, কন্ট্রাক্ট অ্যাক্ট, প্যানেল কোড, রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট—আইনের ক্ষেত্রে এগুলো একেকটি মাইলফলক। চেঙ্গিস খান থেকে শুরু করে অনেকেই ভারতবর্ষ শাসন করেছেন, তবে আইনের ক্ষেত্রে এমন পদক্ষেপ আগে কেউ রাখতে পারেনি। তাঁর বক্তৃতায় খুব খুশি হয়েছিলাম। সেদিনের বক্তৃতা সম্মোহিত হয়ে শুনেছি।

 

এখানকার আইনি ব্যবস্থায় ব্রিটিশদের অবদান কতটুকু?

এখানে আধুনিক আইনের গোড়াপত্তনই তাঁরা করেছেন। বিলেতের সেরা আইনগুলো তাঁরা এখানে দিয়েছেন। প্যানেল কোড, এভিডেন্স অ্যাক্ট—এগুলো খুব জটিল আইন। তাঁরা সেগুলো এখানে বিস্তারিতভাবে লিখে দিয়েছেন। এখনো আমাদের এখানে সেগুলোই চলছে। তবে মানুষ বেড়েছে, সমস্যা বেড়ে যাচ্ছে। ফলে অনেক নতুন আইন হচ্ছে। প্যানেল কোডে যে শাস্তিগুলো ছিল, সেগুলো এখন অপ্রতুল হয়ে গেছে। এখন অনেক নতুন নতুন আইন হচ্ছে। বিশেষ ক্ষমতা আইন, নারী-শিশু নির্যাতন মামলা, দুদকের মামলার আইন হচ্ছে। তবে এগুলো সবই ব্রিটিশদের সেই আইনি কাঠামো থেকে তৈরি হচ্ছে।

 

শুরুর দিকে হাইকোর্টের চেহারা কেমন ছিল?

জজকোর্ট তো ব্রিটিশদের করা, এটির শুরু ১৮ শতকের দিকে। হাইকোর্টের শুরু ১৯৪৭ সালে। নৌকা ভরে যখন কলকাতা থেকে চেয়ার-টেবিল, বড় বড় ছবি এলো, সেগুলো রাখার জায়গাও হলো না। তখন হাইকোর্টের রেজিস্ট্রার ছিলেন বদিউজ্জামান। তাঁর আগে অল্প কয়েক দিন আরেকজন রেজিস্ট্রার ছিলেন, তাঁর নামটি এখন মনে পড়ছে না। সব ধকল বদিউজ্জামানকেই সামলাতে হয়েছে। চাটাই বিছিয়ে ফ্লোরে ফাইলপত্র রাখা হলো। হাইকোর্ট তখন এত বড় ছিল না, এখনকার মতো এত ভবনও ছিল না। গম্বুজওয়ালা প্রধান ভবনটিই কেবল ছিল। সেটি ১৯০৫ সালে গভর্নরস হাউস ছিল। এখন যেটি মেডিক্যাল কলেজ, তখন সেটি সেক্রেটারিয়েট ছিল। নানা অসুবিধার মধ্যে কর্মচারীদের কাজ করতে হয়েছে। শুরুর দিকে কাজ এত বেশি ছিল যে রেজিস্ট্রার রাত ১০টা-১১টার সময় বাসায় যেতেন।

 

হাইকোর্টের বিচারপতি হলেন কবে? উল্লেখযোগ্য মামলা?

১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্টের অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে শপথ নিলাম। তবে আগে থেকেই কানাঘুষা চলছিল যে বিচারপতি হতে পারি। একদিন প্রধান বিচারপতি শপথ নেওয়ার জন্য আহ্বান জানালেন। শপথ নিলাম। দুই বছর হাইকোর্টের অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। অনেক মামলায় বিচারক ছিলাম। ওএকটি ক্রিমিনাল কেসের কথা বলতে পারি। বরিশালে এক লোক মা, স্ত্রী—সবাইকে নিয়ে নৌকায় রওনা দিলেন। উদ্দেশ্য—চর এলাকায় কিছুদিন চাষি হিসেবে কাজ করে আবার ফিরে আসবেন। পথিমধ্যে ঝড় শুরু হলো। জীবন বাঁচাতে তাঁরা এক বাড়ির ঘাটে নৌকাটি থামালেন। বাড়ির মালিকের কয়েকটি ছেলে ছিল। তারা ছিল ডাকাত। নৌকারোহীদের সবাইকে মেরে তারা টাকা-পয়সা, ধান-চাল সব নিয়ে নিল, নৌকায় লাশগুলো তুলে ভাসিয়ে দিল। তবে একটি মেয়ে অলৌকিকভাবে বেঁচে গেল। নৌকাটি তীরে ভিড়লে তার জ্ঞান ফিরে এলো। পরে তো মামলা শুরু হলো। নিম্ন আদালতে হামিদুল হক চৌধুরীর ভাই আবুল হোসেন চৌধুরী সব আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিলেন। আপিল হলো। হাইকোর্টে সেই মামলার আমি ও হাবিবুর রহমান বিচারক ছিলাম। মামলাটির শুনানির পর আমি বলেছিলাম—এই মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিলে তো বিচার করা হয় না, অবিচার করা হয়। কারণ তারা প্রথমে ভালো ভালো কথা বলে নৌকাটি তাদের বাড়ির ঘাটে থামাল। এরপর রাতের অন্ধকারে সবগুলো মানুষকে মেরে নৌকায় তুলে লাশ ভাসিয়ে দিল। মামলাটির ফ্যাক্টস খুব বীভৎস। সাবকনশাস এভিডেন্সে দেখা গেল—ডাকাতিই তাদের পেশা। আসামিদের চরিত্র খুব খারাপ। এর আগেও তারা মানুষ খুন করেছে। আমি সব আসামিকে ফাঁসির আদেশ দিলাম। উচ্চ আদালতেও তাদের আপিল ডিসমিস হয়ে গেল। আরেকটি কেস লড়েছিলাম, সেটিও বরিশালের। এক ডাকাত পালিয়ে বেড়ায়। পুলিশ তাকে ধরতে পারে না। একদিন সে বাড়ি এলো। পুলিশও তার খোঁজে এসে বাড়ি ঘেরাও করল। সে রান্নাঘরে লুকিয়ে আছে। একপর্যায়ে সে তার ভাতিজিকে কুপিয়ে মেরে ফেলল, যাতে পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা করা যায়। মামলাটিতে প্রথমে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হলো। পরে আপিল হলো। মামলাটি আমার বেঞ্চে এলো। আমি ফাঁসির আদেশ দিলাম। তখন কোনো মামলায় এখনকার মতো এত রি-অ্যাকশন হতো না, স্বাভাবিক বিচারে যা হওয়ার সেটিই হতো।  

 

পাকিস্তান আমলে বিচার বিভাগের ওপর চাপ কেমন ছিল?

আমি যা বলব, তা এখনকার কারো বিশ্বাস হবে না। কারণ সবাই অনেক প্রপাগান্ডার কথা শুনে আসছেন। সে জন্য আমার কথা কারো মনে দাগ কাটবে না। তবে আমি তো একজন মানুষ, এখনো জীবিত আছি। কোনো কেসেই চাপ সৃষ্টি করতে দেখিনি। তেমন কোনো নজিরও পাইনি। দু-তিন বছর বিচারক হিসেবে চাকরি করেছি, কোনো চাপ ছিল না। তখন পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্টের সব বিচারক বাঙালি ছিলেন। আজকের যে ‘রিকুইজিশন ল’—যার মাধ্যমে গুলশান, ধানমণ্ডি, মিরপুর রিকুইজিশন করা হয়েছে—এই আইনটি ফজলে আকবর, হামুদুর রহমান, আমিরউদ্দিন আহমদ—এই তিন-চারজন মিলে করেছেন। দুই বছর অস্থায়ী বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ১৯৭১ সালে নিয়মতান্ত্রিকভাবেই আমার নিয়োগ স্থায়ী হয়। মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দিকে কিছুদিন কোর্টে যাতায়াত করেছি। পরে আর যাইনি। স্বাধীনতার পর শ্যামলীতে ভাড়া বাসায় চলে এসেছি। দেশ স্বাধীনের পর তো নতুন আইন-কানুন হলো। আমরাও নতুন করে আইন পেশা শুরু করলাম।

 

রাজনীতিতে যুক্ত হলেন কিভাবে?

বিচারপতি আবদুস সাত্তার আমাকে পছন্দ করতেন। তিনি আমাকে আহ্বান জানালেন, আপনারা বিএনপিতে আসেন। সরকার গঠনে সহায়তা করেন। এভাবেই রাজনীতিতে এলাম এবং বিএনপিতে সম্পৃক্ত হলাম। ১৯৮১ সালের ১৫ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হলো। বিচারপতি আবদুস সাত্তার ড. কামাল হোসেনকে হারিয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন। তারপর তাঁর কেবিনেটে আইন, ধর্ম, শিক্ষা, ভূমি, রাজস্ব ও ক্রীড়ামন্ত্রী হলাম। তিন মাস ২৫ দিন সেই মন্ত্রিসভার মন্ত্রী ছিলাম। একদিন দেখি, আমি আর মন্ত্রিসভায় নেই। অথচ সেদিনই, ১৯৮১ সালের ২৪ মার্চ, আমার ভাইস প্রেসিডেন্ট হওয়ার কথা ছিল। সেদিনই জেনারেল এইচ এম এরশাদ সামরিক আইন জারি করে বিচারপতি সাত্তারের হাত থেকে ক্ষমতা দখল করে নিলেন। তিনি পার্লামেন্টও ভেঙে দিলেন।

 

জিয়াউর রহমান সম্পর্কে মূল্যায়ন?

কোনো ব্যক্তিগত আলোচনায় আমি যেতে চাই না। কথায় কথায় মতামত দেওয়ার কোনো দরকার আমার নেই। তবে তিনি অদ্বিতীয়, সৎ মানুষ ছিলেন। তিনি এতটাই সৎ ছিলেন যে তাঁর আত্মীয়স্বজনও তাঁর বাড়িতে যেতে সাহস পেত না। তাঁর শ্বশুর রেড ক্রসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, আমিও ছিলাম। ফলে জানি—ঢাকায় এলে তিনি অন্য কোথাও থাকতেন, মেয়ের জামাইয়ের বাড়িতে যেতে সাহস পেতেন না। জিয়াউর রহমান অনেক অর্পিত সম্পত্তি রেড ক্রসকে দিয়েছেন।

 

এরশাদবিরোধী আন্দোলনেও তো যুক্ত ছিলেন?

অবশ্যই। যেহেতু তখন থেকেই বিএনপির রাজনীতি করতাম, ফলে ১৯৮৬ সালে বিএনপি এরশাদের দেওয়া নির্বাচন বয়কট করলে সেই আন্দোলনের পক্ষে কাজ করেছি। তবে কখনো জ্বালাও-পোড়াওয়ে যাইনি। আমাকে তাঁরা যেতে বলেছিলেন। কিন্তু আমি জ্বালাও-পোড়াওয়ের রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিলাম না। মিটিংয়ে গিয়েছি। নির্বাচনের আগে আগে বেগম জিয়াকে নিয়ে আমরা জামালপুর গিয়েছিলাম। ফেরার পথে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে পুলিশ রাস্তার ওপর আমাদের ঘিরে ধরল। বেগম জিয়াকে তাঁর ভাই নিরাপদে নিয়ে চলে গেলেন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে আমি গ্রেপ্তার হয়ে ১০-১২ দিন জেল খাটলাম। এরশাদের হাত ধরেই হাইকোর্টে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের শুরু হয়।

 

জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের বিচারক কিভাবে নিযুক্ত হলেন?

১৯৯২ সালে তখনকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী কর্নেল মোস্তাফিজুর রহমান আমার নামটি নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রিয়াজ রহমানের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। তিনি ভারত, নেপাল, ভুটান, আফগানিস্তান, শ্রীলঙ্কা, ইরাক, ইরান ও বাংলাদেশ—এই অঞ্চলের মধ্যে ইউনাইটেড নেশনের হিউম্যান রাইটস কমিশনের মাইনরিটি গ্রুপের বিচারক হিসেবে আমার ও মকসুমুল হাকিমের নাম প্রস্তাব করলেন। জাতিসংঘের সাধারণ সভায় প্রাথমিক ভোটাভুটি হলো। আমরা পাস করলাম। মকসুমুল হাকিম আমার সিনিয়র ছিলেন। তিনি চেয়ারম্যান, আমি ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলাম। আমরা মানবাধিকার কমিশনের মিটিংয়ে অংশ নিয়েছি। তখন অনেক ভালো ভালো সিএসপি অফিসার নিউ ইয়র্কে ছিলেন।

 

দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চল থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রুয়ান্ডা ট্রাইব্যুনালের বিচারপতি কিভাবে নির্বাচিত হলেন?

এটি ১৯৯৪ সালের ঘটনা। আগের মতোই আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রিয়াজ রহমানের মাধ্যমে নিউ ইয়র্কে সিকিউরিটি কাউন্সিলের কাছে মকসুমুল হাকিম ও আমার নাম প্রস্তাব করেছিল। মকসুমুল হাকিম এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান দুজনই সাতক্ষীরার লোক ছিলেন। সেখানে ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, থাইল্যান্ড, ইরাক, ইরান ইত্যাদি দেশের অনেকে ছিলেন। শর্ট লিস্টে তিনি বাদ পড়ে গেলেন, আমি টিকে গেলাম। এরপর ছয়জনের শর্ট লিস্ট হলো। জাতিসংঘের সাধারণ সভায় আমাদের ছয়জনের নাম নিয়ে ভোটাভুটির পর বাংলাদেশ থেকে আমি পাস করলাম। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রুয়ান্ডা ট্রাইব্যুনালের বিচারপতি ছিলাম। এই ট্রায়ালের একেকটি মামলার বিচার হতে এক থেকে দুই বছর লেগেছে। বিশ্বের এই কোনা থেকে সেই কোনায় সাক্ষী আনতে হয়েছে। কেস খুব ধীর লয়ে চলেছে। ফলে রায় হতেও অনেক দেরি হয়েছে। আমাদের ছয়জন বিচারকের দুটি বেঞ্চ ছিল। আমার বেঞ্চে সহবিচারক ছিলেন রাশিয়ার ইয়াকুব অস্ত্রোভস্কি ও তানজানিয়ার উইলিয়াম হোসেন সেকুলে। আমাদের বেঞ্চে কায়েশিমা ও রোজেনদানা হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়েছে। বিচারক হিসেবে আমি এই দুটি মামলার রায় দিয়েছিলাম। গণহত্যার বিষয়ে এই মামলা দুটির একটিতে আমি যে রায়টি দিয়েছিলাম, সেটি এখনো সারা পৃথিবীর সবাই মেনে চলে। অল্প কথায় বলি—বিচারকরা সেখানে বলেছিলেন, কোনো আসামির বিপক্ষে যদি পাঁচটি অভিযোগ পাই, বিচারে এর মধ্যে সবগুলোর অভিযোগ প্রমাণিত হলেও আমরা সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগের সাজা দেব। তবে আমি বলেছিলাম, না, সেটি হবে না। প্রতিটি ঘটনা আলাদা করে দেখতে হবে। পাঁচটি অভিযোগের পাঁচটিই প্রমাণিত হলে তার সবগুলোর জন্য আমরা আলাদা সাজা দেব। না হলে এত সাক্ষী, জাতিসংঘের এত খরচের কী প্রয়োজন? আপিল কোর্টে গেলে সেই একটি অভিযোগ নাও টিকতে পারে। এখনো আন্তর্জাতিক আদালত তা মেনে চলেন। আরো বলেছিলাম, গণহত্যার কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। এর আগে যুগোস্লাভিয়ায় বসনিয়া-হারজেগোভিনা, আলবেনিয়া—এই দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক আদালত গঠিত হয়েছিল। তারা বসনিয়ায় কিভাবে গণহত্যা, গণধর্ষণ হয়েছিল সেসব মামলার রায় দিয়েছিলেন। কায়েশিমা মামলায় কায়েশিমা ছিলেন বিলাত ফেরত খুব ভালো ডাক্তার, তিনি জাতিতে হুতু। তিনি রুয়ান্ডার এক প্রদেশের গভর্নর ছিলেন। তাঁর সময় নিরীহ মানুষকে স্টেডিয়ামের মধ্যে ঢুকিয়ে রাতের অন্ধকারে ব্রাশফায়ার করে মেরে ফেলা হয়েছে। এক-দুজন নয়, এভাবে শত শত মানুষ মারা হয়েছে। তারা গির্জায় আশ্রয় নিয়েছিল, জীবন বাঁচাতে গাছেও উঠেছিল। কিন্তু তাদের বাঁচতে দেওয়া হয়নি। লেক কিবুতে মানুষ মেরে ফেলে দেওয়া হয়েছে। নিজের হাতে কোনো মানুষ খুন না করলেও গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারেননি বলে আমরা তাঁকে শাস্তি দিতে বাধ্য হয়েছি। রোজেনদানা ছিলেন সরকারি ঠিকাদার। এটিও একই ধরনের মামলা ছিল। এই মামলাটি নিয়ে সিঙ্গাপুরেও বিতর্ক হয়েছে। হেগে জাতিসংঘের যে আপিল কোর্ট আছে, তাঁরাও আমার রায় গ্রহণ করেছেন। আমার অন্য দুই সহবিচারকের রায় আন্তর্জাতিক আদালত বিবেচনা করেননি। পরে মেয়াদ শেষ হলে চলে এসেছি।

 

এই আদালত কোথায় বসেছিল?

রুয়ান্ডায় নিরাপত্তাব্যবস্থা ভালো ছিল না বলে তাঞ্জানিয়ার আরুশা নামের একটি প্রদেশে আদালত বসেছিল। এখান থেকেই বিশ্ববিখ্যাত তাঞ্জানিয়ান সাফারির শুরু। বিরাট এক কমপ্লেক্সে আদালত বসেছিল। বিভিন্ন দেশ থেকে আসামি নিয়ে এসে জাতিসংঘের মাধ্যমে বিচার হতো। সেখানেই আমরা থাকতাম। জাতিসংঘের মাধ্যমে ভারত, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের তদন্তকারীরা মামলাগুলো তদন্ত করতেন, জাতিসংঘের কাছে রিপোর্ট দিতেন। কানাডা, পর্তুগাল, বেলজিয়াম, ফ্রান্সসহ অনেক দেশের আইনজীবী মামলাগুলোয় কাজ করেছেন। আসামিপক্ষের সবচেয়ে বেশি আইনজীবী ছিলেন ডেনমার্কের। আইনগুলো জাতিসংঘেই পাস হয়েছিল। রুয়ান্ডার সরকারের কোনো হস্তক্ষেপই সেখানে ছিল না।

 

জীবনের শেষ প্রান্তে প্রবীণতম আইনজীবী হিসেবে এ দেশের বিচারব্যবস্থা নিয়ে কিছু বলবেন?

এটি কনফিডেনশিয়াল, কিছুই বলা যাবে না। কারণ ব্রিটিশদের গালাগাল দিলে তারা জেলে ভরত না। উচিত কথা বললে ব্রিটিশরা সহ্য করত। এখন তো এখানে এসব নিয়েও আইন করা হয়েছে। তখন আইনের সদ্ব্যবহার হতো। পাকিস্তান আমলেও ল অ্যান্ড অর্ডার মসৃণ ছিল। যদিও দুই-চার আনা গরমিল হয়েছে। সেই আমলে ৫৪ ধারার জন্য বিচারব্যবস্থার কম-বেশি দুর্নাম হয়েছে। তখন ‘ডিফেন্স অব পাকিস্তান’ নামের ধারাগুলো ব্যবহার করে বিচারব্যবস্থাকে দুর্বল করে ফেলা হয়েছে। আর আমাদের দেশে তো বিচারব্যবস্থার সততা কমে যাচ্ছে। আমার জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলব, আমরা গোলামি সমর্থন করে চলেছি। দেশের অবস্থা ভালো না হলে বিচারব্যবস্থাও ভালো হবে না।

 

শিক্ষকতাও করেছেন জেনেছি।

শিক্ষকতা করেই প্রথম টাকা উপার্জন করেছি। পাবনায় শ্বশুরবাড়ি ছিল। আমার শ্বশুর সেখানে জেলা জজ ছিলেন। বেড়াতে গেলাম, এডওয়ার্ড কলেজে চাকরি হলো। ১১ মাস শিক্ষকতা করলাম। এরপর ঢাকায় চলে এলাম। আইন পেশায় আছি বলে অনুমতি নিয়ে কোর্টের সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে জগন্নাথ কলেজে শিক্ষকতা করা শুরু করলাম। তখন আমি শিক্ষানবিশ আইনজীবী। তখন তো তেমন পসার ছিল না। কোনো সিনিয়র কেস লিখে দিতে বললে লিখে দিতাম, বিনিময়ে টাকা পেতাম। পরে তো কোর্টে দাঁড়ানো শিখলাম। সেখানে থাকতেই প্র্যাকটিস শুরু করেছি। আমার অনেক ছাত্র আছে। ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামকে জগন্নাথ কলেজে পড়িয়েছি। এখনকার আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বাবা সিরাজুল হক আমার ছাত্র। সাবেক আইজিপি হোসেন আহম্মদও আমার ছাত্র ছিলেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও সাইকোলজি পড়িয়েছি। মাস্টার্সে ফিলোসফি আমার চতুর্থ বিষয় ছিল।    

 

অনেক মামলায় অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে ছিলেন।

অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে মুন সিনেমা হল মামলায় সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর সমালোচনা করেছি। ১/১১-এর পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করা হলে তাঁর কোনো এক মামলায় অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে বেল ম্যাটার বা জামিনের বিষয়ে অংশ নিয়ে আমি বলেছিলাম, এই মামলায় তিনি গ্রেপ্তার হতে পারেন না। তাঁরা যে কারণে তাঁকে গ্রেপ্তার করেছিলেন, সেটিকে আমি অবৈধ বলেছিলাম। মামলাটির নাম এখন আর মনে নেই। অ্যামিকাস কিউরিকে বাংলায় ‘আদালতের বন্ধু’ বলা হয়। বিভিন্ন বিষয়ে আদালত আমার কাছে ব্যাখ্যা চাইতেন। ফলে স্বাধীন বাংলাদেশের বেশির ভাগ মামলায়ই ‘আদালতের বন্ধু’ ছিলাম। গেল ২০ বছর ধরে অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে আমিই সবচেয়ে সিনিয়র আইনজীবী। বিভিন্ন মামলায় আমি আদালতের বন্ধু হিসেবে কাজ করেছি, আইনের ব্যাখ্যা দিয়েছি। প্রায় সময়ই কোর্ট আমার মতামত মেনে নিয়েছেন। বিডিআর বিদ্রোহের মামলায় বলেছিলাম—কোনো ঘটনা ঘটে গেলে সেটি আগের কোনো ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে, সেই আইন অনুসারে বিচার করতে হয়। ফলে পুরনো আইনেই অপরাধীদের বিচার করা হয়েছে। এই মামলায় সুপ্রিম কোর্ট আমার মতামত চেয়েছিলেন। শুনেছি, সেই মামলাগুলোর আসামিরা এখনো আমাকে দোয়া করেন। সংবিধানের এয়োদশ সংশোধনীতেও অ্যামিকাস কিউরি ছিলাম। খালেদা জিয়াকে বাড়ি থেকে উত্খাতের মামলায়ও অ্যামিকাস কিউরি ছিলাম। তবে তাঁরা আমার কথা শোনেননি।

 

এখন কিভাবে দিন কাটে?

পত্রিকা পড়ে। শরীর ভালো থাকলে এই ৯৭ বছর বয়সে এখনো মাঝেমধ্যে কোর্টে যাই।

শ্রুতলিখন : ইব্রাহীম খলিল

[৯ ডিসেম্বর ২০১৬, তাজমহল রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা]


মন্তব্য