kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


আমি ছিলাম অপ্রতিষ্ঠিতদের সম্পাদক

সফল এক সাহিত্য আন্দোলনের তিনি পুরোধা। ষাটের দশকে তাঁর ‘কণ্ঠস্বর’-এর তলায়ই এসে জড়ো হয়েছেন আবদুল মান্নান সৈয়দ, রফিক আজাদ, নির্মলেন্দু গুণ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আবুল হাসান, হুমায়ূন কবির, মহাদেব সাহা, মুহম্মদ নূরুল হুদা—এমন বহু লেখক। ওমর শাহেদকে তাঁর কণ্ঠস্বর জীবনের বৃত্তান্ত শোনালেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

১৪ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



আমি ছিলাম অপ্রতিষ্ঠিতদের সম্পাদক

কেন কণ্ঠস্বর করলেন?

১৯৬১ সালে যখন ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে পাস করে বেরোলাম, তখন মনে হলো, একটি নতুন সময়ে আমরা এসে দাঁড়িয়েছি, যখন আশা করার মতো আমাদের চারপাশে আর কিছু নেই। ১৯৫৮ সাল থেকে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনে সারা জাতি শৃঙ্খলিত।

পাকিস্তানিদের ক্রমাগত চাপ আর শোষণের ফলে হতাশা গভীর। বাঙালিত্বের জাগরণের চেষ্টাও অবরুদ্ধ। সামরিক শাসনের ফলে বৈচিত্র্য আর বিশালতা ছেড়ে সব কিছু এককেন্দ্রিকতার দিকে চলে এসেছে। নিজস্ব বিবরের মধ্যে ঢুকে গেল মানুষ। প্রত্যেকে আলাদা, একা হয়ে গেছে। অবক্ষয়, নৈরাশ্যবাদ, আত্মকেন্দ্রিকতার মধ্যে চলে এলাম আমরা। একটি অবক্ষয়ী কালকে টের পেলাম, যেটি আগে ছিল না। আমি একা নই, দেখলাম, তরুণরা সবাই এই অবক্ষয়ের আক্রমণে নিঃসঙ্গ, একাকী। এই আলাদা কালকে আলাদা ভাষায় প্রকাশের দাবি এলো। উত্থান যেমন আবেগ, পতনও তেমনি একটি আবেগ। সত্যি বলতে কি—উত্থানের চেয়ে পতনের আবেগই সাধারণত বড় শিল্পীর জন্ম দেয় বেশি। কারণ তখন ব্যক্তির মুক্তির কাল। উত্থান সচেতন বিষয়, কিন্তু পতন ব্যক্তিগত বিচ্ছিন্নতা ও রোদনের কাল। প্রত্যেকে তখন একা একা কাঁদে। সুতরাং শুধু উত্থান বা গঠন যুগের নয়, অবক্ষয়েরও কবি হয়; অবক্ষয়েরও রোমাঞ্চ-বিস্ময় আছে। একটি বড় কবিতার যত গুণ, সবই অবক্ষয়ের ভেতর থাকে। তা না হলে কালে কালে মহান অবক্ষয়ীশিল্পী আমরা পেতাম না। আরবের অন্ধকার যুগের কবি ইমরুল কায়েস আজও আরবি ভাষার শ্রেষ্ঠ কবি। বোদলেয়ার পতন ও অবক্ষয়ের রোমাঞ্চকে ধারণ করেই বড় কবি হয়েছিলেন। বুদ্ধদেব বসুর অসাধারণ অনুবাদের ফলে বোদলেয়ারের কবিতা তখন আমাদের হাতে হাতে। ঢাকার তরুণরা তখন ব্যাপকভাবে বোদলেয়ার প্রভাবিত। আগে এই জগতের সঙ্গে আমরা অপরিচিত ছিলাম। ওই বইয়ের সেই বোহেমিয়ান নিঃসঙ্গ কবি আর শিল্পীর জগৎ আমাদের খুব প্রভাবিত করেছিল। ফলে দেখলাম, এই জগতের সঙ্গে আমাদের চেতনার মিল পাওয়া যাচ্ছে, সচেতনভাবেই আমরা এর সঙ্গী হয়ে গেছি। স্বপ্ন দেখতে লাগলাম, জীবনের সর্বব্যাপী ঐশ্বর্য ও গভীরতার সঙ্গে এই অবক্ষয়ের উপাদানটিকে সমন্বিত করে সাহিত্যে এক আগন্তুক ধারার সূচনা ঘটাব আমরা। ভাবতে লাগলাম, সাহিত্যের একটি সম্পন্ন যুগ এসে দাঁড়িয়েছে। সামনে আমাদের চেষ্টা, শ্রম, স্বেদে তাকে ফলবান করে তুলতে হবে।

 

শুরু কিভাবে হলো?

১৯৬২ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে প্রশান্ত ঘোষালের ঘরে এসব নবাগত তরুণের একটি সভা বসল। সভায় ঠিক করলাম—সাহিত্যের ভেতর দিয়ে এ যুগের এক ভিন্ন ধারা আমরা ধারণ করব। কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধের আলাদা পত্রিকা হবে। নাম হবে ‘সূচিপত্র’, ‘শব্দরূপ’ ইত্যাদি। যা যা স্বপ্ন দেখা যেতে পারে, কোনোটিই বাদ রাখলাম না। ‘বক্তব্য’ নামে লিফলেট বের করলাম। সেখানে আমরা কী করতে চাই, সে ঘোষণা ছিল। এরপর কবিতা পত্রিকা ‘স্বাক্ষর’ বের হলো। এরই মধ্যে ‘সাম্প্রতিক’ নামের একটি ছোট কাগজ পাতা ছড়াল। সেখানে আবদুল মান্নান সৈয়দকে দেখা গেল। এভাবে শুরু। ‘প্রতিধ্বনি’ বেরোলো। সেখানেও সবাই একসঙ্গে ছিলাম। তখনো ঠিক হয়নি, আমাদের মূল কাগজটি কী হবে? ফলে এ কাগজ, ও কাগজ বেরোচ্ছে। সে যুগে কাগজ বের করা সহজ ছিল না। টিকিয়ে রাখা ছিল আরো কঠিন। এই করতে করতে আমরা একটি কাগজে স্থির হলাম। যার নাম ‘কণ্ঠস্বর’। যা কিছু আমরা তখন ভাবছিলাম, করছিলাম, করার স্বপ্ন দেখছিলাম, তার মুখপাত্র যেন এটি।

 

 

ডিক্লারেশন কিভাবে পেলেন?

তখন তো আইয়ুবের যুগ, সব কিছু রুদ্ধ। নতুন পত্রিকার ডিক্লারেশন প্রায় অসম্ভব। বুঝলাম, আমি বা অন্য কেউ চেষ্টা করলে কিছুতেই পাব না। রাজনৈতিক লোকরাই শুধু এটি পেতে পারে। খালেদা হাবীব তখন পার্লামেন্টের সেক্রেটারি, তাঁকে সবাই চিনত। তাঁর বাবা লেখক ও শিক্ষাবিদ ইব্রাহিম খাঁ বিখ্যাত মানুষ। তিনি আমার আব্বার বন্ধু। সেই সূত্র ধরে খালেদা আপা আমার বড় বোনের বান্ধবী। ফলে আমারও আপা। তিনি কিভাবে যেন ডিক্লারেশন বের করে দিলেন।

 

তিনি তো পরেও আপনাদের নানা বিপদ থেকে রক্ষা করেছেন!

রফিক আজাদের ‘বেশ্যার বেড়াল’ কবিতাটি ছাপার পর সরকারের পক্ষ থেকে ‘কণ্ঠস্বর’ বন্ধের পাঁয়তারা শুরু হলো। সে সময় তো সমাজ এসব রুগ্ণতা বা অবক্ষয়ের জন্য তৈরি ছিল না। এর মধ্যে মান্নানের [আবদুল মান্নান সৈয়দ] ‘সত্যের মতো বদমাশ’ নিষিদ্ধ হয়ে গেল। তখনো তাঁর কাছে সাহায্য পেয়েছি। স্বাধীনতার পর তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণে এই সরকারি নিষেধাজ্ঞা রদ করা সম্ভব হয়েছিল।

 

প্রথম সংখ্যাটি ছিল ৪০ পাতার। সেখানে আপনারও লেখা ছিল।

হ্যাঁ, ‘দুর্বলতায় রবীন্দ্রনাথ’। স্বাভাবিকভাবে আমাদের সে সময়কার সমাজ রবীন্দ্রনাথের ওপর এ ধরনের সরাসরি আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিল না। লেখাটিতে কিন্তু তেমন কিছু আমি বলিনি। তাঁর প্রতি গভীরভাবে সশ্রদ্ধ থেকেই তাঁর কিছু অসংগতি তুলে ধরতে চেয়েছিলাম। বক্তব্যগুলো এখন খুব একটা মনে নেই। আমার প্রথম বই ‘দুর্বলতায় রবীন্দ্রনাথ ও অন্যান্য’তে এটি আছে। তবে আশ্চর্য যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের বাংলা বিভাগের প্রধান ও সে সময় এ দেশে রবীন্দ্র সাহিত্যের প্রাতিষ্ঠানিক কর্তা মুহম্মদ আবদুল হাই ব্যক্তিগতভাবে আমাকে পছন্দ না করলেও লেখাটির প্রশংসা করেছিলেন। তখনকার রবীন্দ্র-সংস্কৃতির মূল ধারক, ছায়ানটের মূল স্বাপ্নিক ওয়াহিদুল হকও আমার গদ্য পড়ে খুবই খুশি হন। তিনি আমাকে ও আবদুল মান্নান সৈয়দকে বললেন, ‘আপনাদের ভাষা সুন্দর, আপনারা গান নিয়ে লেখেন। ’ আমরা বললাম, গান তো জানি না। কী করে লিখব? এর পর থেকে প্রতি রবিবার তাঁদের বাসায় তিনি আমাদের দুই ঘণ্টা ধরে সংগীত বোঝাতেন। তিনি শেষ করলে সন্জীদা [খাতুন] আপা অনেকক্ষণ রবীন্দ্রসংগীত শোনাতেন। লেখাটি হয়তো সেকালের গড়পড়তা পাঠককে জোর ধাক্কা দিয়েছিল। হয়তো অনেকে আহতও হয়েছিলেন। যাক, পত্রিকার কথায় ফিরে আসি। আগেই বলেছি, যুগের অবক্ষয় পত্রিকাটির গায়ে গেড়ে বসেছিল। যৌনতার বাড়াবাড়ি ছিল তাতে। ঢাকা তো তখন নেহাত মফস্বল শহর। সাত বা আট লাখ লোকের শহরে এমন একটি পত্রিকা বেরোচ্ছে, আলোড়ন তো হবেই। ফলে ১৯৬৫ সালের শেষদিকে প্রকাশিত কণ্ঠস্বরের প্রথম সংখ্যাই খুব আলোচিত, বিতর্কিত হলো। আমাদের স্লোগান ছিল তাজা আর রগরগে। তা-ও উত্তেজনা জোগাল। সেটি এ রকম : ‘যারা সাহিত্যের সনিষ্ঠ প্রেমিক, যারা শিল্পে উন্মোচিত, সৎ, অকপট, রক্তাক্ত, শব্দতাড়িত, যন্ত্রণাকাতর; যারা উন্মাদ, বিকারগ্রস্ত, অসন্তুষ্ট, বিবরবাসী; যারা তরুণ, প্রতিভাবান, অপ্রতিষ্ঠিত, শ্রদ্ধাশীল, অনুপ্রাণিত; যারা পঙ্গু, অহংকারী, যৌনতাস্পৃষ্ট—কণ্ঠস্বর তাদেরই পত্রিকা। প্রবীণ মোড়ল, নবীন অধ্যাপক, পেশাদার লেখক, মূর্খ সাংবাদিক, পবিত্র সাহিত্যিক ও গৃহপালিত সমালোচক এই পত্রিকায় অনাহূত। ’

 

কাভার কী ছিল?

শিল্পীকে দিয়ে যে কাভার করাব, সে টাকা তো ছিল না। কাজেই কাভারে লেখকদের নামগুলো চৌকোভাবে, ওপর-নিচে সাজিয়ে, তার পাশে লাল রঙের বড় অক্ষরে ‘কণ্ঠস্বর’ কথাটি লিখে দিয়েছিলাম। আমাদের পত্রিকার সব কাভারই হতো কার্ডবোর্ডে। এই সংখ্যারও ছিল তাই। কার্ডবোর্ডের কাভার ছিল। টাইপের নানা কারুকার্য এমনকি গাছের পাতা দিয়েও প্রচ্ছদ করেছি। কাইয়ুম চৌধুরীর কাছ থেকে প্রচ্ছদ ম্যানেজ করতে পারিনি, তিনি একসময় নামটি লিখে দিয়েছিলেন মাত্র।

 

তখন আপনিই একমাত্র আয় করেন। অন্যরা তো ছাত্র, রোজগার নেই।

হ্যাঁ। কারো কোনো রোজগার নেই। ফলে পত্রিকার জন্য তারা দেবে কী? অনেক সময় আমাকেই তাদের অনেককে ‘লালন-পালন’ করতে হয়েছে [হাসি]। অমুকের কিছু টাকা লাগবে, দিতে হবে; কারো আলসার হয়েছে, বাসায় এলেই তার জন্য এক গ্লাস দুধ বরাদ্দ। এক-আধজনকে তো বলেই দেওয়া হলো, দুপুর হলেই তোমাদের খাওয়ার নিমন্ত্রণ। একান্নবর্তী পরিবারে বড় ভাই যা করে, আমাকে সবই করতে হয়েছে। স্বার্থ বা অন্য কিছু নয়, সবাই মিলে তখন অদ্ভুত আনন্দে কাটাচ্ছি। একসঙ্গে কাজ করছি, স্বপ্ন দেখছি। কী যে ম ম করা মাতাল দিন-রাত্রি সেসব! আমার ওপর চাপ বেশি ছিল, কেননা আমার বয়স বেশি, দলের মধ্যে একমাত্র চাকরিজীবী।

 

এত সৃজনশীল মানুষকে সামলাতে অসুবিধা হয়নি?

এটি কিন্তু খুব আশ্চর্য ব্যাপার—পুরো একটি যুগ চলে গেল। আমাদের সবাই স্পর্শকাতর, প্রচণ্ড ব্যক্তিত্বসম্পন্ন; কিন্তু কারো সঙ্গে কোনো দিন কারো বিরোধ হয়নি। এই যে মৃত্যু আমাদের দু-একজনকে ছাড়া সবাইকে আজ বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে, কিন্তু কারো সঙ্গে কারো কোনো দিন বিবাদ-বিরোধ হয়েছে বলে শুনিনি। হলেও খুবই সাময়িক। হয়তো এ দেশে আমরাই একমাত্র সাহিত্যদল, যাদের ৬০ বছরে ঝগড়া, বিরোধ হয়নি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আমরা বন্ধু থেকে গেলাম। যারা মারা গেছে, তারাও বন্ধু হয়েই মারা গেছে। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আবদুল মান্নান সৈয়দ আর রফিক আজাদ তো আমার একদম ছোট ভাই ছিল। মান্নান ওর লেখায় অন্তত পঁচিশবার আমাকে ‘প্রিয়তম বন্ধু’ বলে উল্লেখ করেছে। তারা সবাই ছিল কণ্ঠস্বরের প্রাণ। আমি মনে করি, পত্রিকাটি এসেছিল সময়ের ঢেউয়ের সঙ্গে, এর মধ্যে ছিল যুগের আনন্দ। সে আনন্দে আমরা কেউ সম্পাদক, কেউ লেখক, কেউ ভাই, কেউ বন্ধু হিসেবে কাটিয়েছি।

 

লেখা কিভাবে জোগাড় করতেন?

এই একটি জায়গায় আমি পুরো নিশ্চিন্ত ছিলাম। কখনো আমাকে লেখা জোগাড় করতে হয়নি। হয়তো কখনো কিছু লাগলে কাউকে বলতাম, এমনি একটা লেখা লিখে দাও তো। লেখা হাজির হয়ে যেত। এটি ছিল একটি বড়সড় দলের পত্রিকা, এত লেখক থাকলে কি লেখার অভাব হয়!

 

বিজ্ঞাপন কিভাবে জোগাড় হতো?

রসিকতা করে বলি, সকালে উঠেই বাংলা একাডেমির প্রকাশনা দপ্তরের কর্মকর্তা ফজলে রাব্বীর সামনে গিয়ে তাঁর স্তূতি গাইতে হতো, তাঁকে আনন্দ দিতে হতো। জোকস বলে হাসাহাসি করতাম, যাতে তিনি খোশমেজাজে থাকেন। কারণ আর কিছুই নয়, যদি দুই সংখ্যা পরে তাঁর কাছ থেকে একটি বিজ্ঞাপন মেলে। সাধনা ঔষধালয়ের বিজ্ঞাপনের রেট ৩০ টাকা, কিন্তু কাগজের দাম আর ছাপা খরচের হিসাব করে দেখা গেল, বিজ্ঞাপনের কাগজ আর ছাপার খরচ মিলিয়ে ৩০ টাকার চেয়ে বেশি পড়েছে। তবুও ছাপতাম। কারণ পত্রিকায় বিজ্ঞাপন আছে দেখলে হয়তো আরো কোনো কোনো বিজ্ঞাপনদাতা বিজ্ঞাপন দিতে পারে। বেশির ভাগ সময়ই সবখানে হেঁটে যেতাম। রিকশায় কমই গেছি। পয়সা ছিল না। সে এক নির্মম জীবন। এত কষ্ট জীবনে আর কখনো করিনি। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের জন্যও কষ্ট করেছি, কিন্তু সেখানে অন্তত রিকশা ভাড়াটুকু জুটত। এক সরকারি প্রতিষ্ঠানের জনসংযোগ কর্মকর্তা ছিলেন। তাঁর হাতেই ছিল বিজ্ঞাপন। শুধু তাঁর সামনে বসে আছি, এই গৌরবটি নেওয়ার জন্য তিনি আমাকে বসিয়ে রাখতেন। তখন তো দেশে আমি পরিচিত, বিটিভিতে অনুষ্ঠান করি। সবাই এসে দেখত, তাঁর সামনে কাঁচুমাঁচু হয়ে আমি বসে আছি। বন্ধুদের কাছে পরে তিনি বলে বেড়াতেন, বিজ্ঞাপনের জন্য এসে বসে থাকে, কী যে করি! এত যে ইঙ্গিতে বোঝাই, তবুও রেহাই দেয় না, কিন্তু ভদ্রলোকের কাছে ১৫০-২০০ টাকার বিজ্ঞাপন, এ না হলে তো পত্রিকা বের হবে না। তাই এত অপমানের পরও বসে থাকতাম। একজনকে একবার গোটা সংখ্যার বিজ্ঞাপনের টাকা তুলে আনতে পাঠালাম। সে পুরো সংখ্যার টাকাই মেরে দিল, কিন্তু এ ধরনের লোক আমাদের মধ্যে বেশি ছিল না। ‘মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক’-এর মীজানুর রহমান ভাই আর মাহমুদুল হকের গাংচিল প্রেস ছিল রামকৃষ্ণ মিশনের আশপাশে। ওদের ওখানে কাগজ ছেপে বোধ হয় কিছু টাকা না দিয়েই সটকে পড়েছিলাম। পরে ওঁদের প্রেসও উঠে গেল, আমরাও বেঁচে গেলাম। এত কষ্টের পরও যে পত্রিকা চালিয়ে যাওয়ার মতো মোটামুটি বিজ্ঞাপন পাচ্ছি—এ আনন্দেই তো বাঁচতাম না। স্বপ্নের জন্য আত্মোৎসর্গ করা ভারি মিষ্টি।

 

এই সংকট কী সব সময়ই ছিল?

স্বাধীনতার পর বিজ্ঞাপনের সংকট একটু কমল। আমাদের বন্ধুবান্ধব বা পরিচিত যাঁরা, মোটামুটি আমাদেরই বয়সী, চেনা, পাকিস্তান আমলে বিভিন্ন সংস্থার জনসংযোগ বিভাগে ২ বা ৩ নম্বর পদে ছিলেন, স্বাধীনতার পর তাঁরা রাতারাতি ১ নম্বরে উঠে এলেন। ফলে স্বাধীনতার পর প্রথম সংখ্যায়ই চার হাজার টাকার বিজ্ঞাপন পেলাম। সেবার দুই হাজার কপি ছাপলাম। এর পর থেকে দুই হাজার কপি ছেপে ১০০ কপি স্টক করতাম। আর বাকি এক হাজার ৯০০ কপিই বিক্রি করতাম। আট লাখ লোকের ঢাকা তখন ছিল একটি মননশীল শহর। না হলে এমন একটি সিরিয়াস কাগজ কী করে দুই হাজার কপি বিক্রি হয়! এখন ৩০০-৪০০ কপি বেচতে লিটল ম্যাগগুলোর জীবন বেরিয়ে যায়।

 

এই তরুণ লেখকরা যে খুব প্রতিভাবানকিভাবে টের পেয়েছিলেন?

মান্নান একবার আমার সাক্ষাত্কার নিতে গিয়ে প্রথমেই বলেছিল, আমরা অবাক হয়ে গিয়েছিলাম যে অত সঠিকভাবে আপনি সেই সময়ের সত্যিকার লেখকদের কী করে শনাক্ত করেছিলেন? শনাক্ত কিভাবে করে সে কি মানুষ জানে? সে তো শুধু ‘টের পায়’। আমাদের আবদুল মান্নান সৈয়দ, রফিক আজাদ, নির্মলেন্দু গুণ, আবুল হাসান, হুমায়ুন কবির, মুহম্মদ নূরুল হুদা, মহাদেব সাহা—প্রত্যেকেই কবিতার শরীরে নতুন সুর সংযোজন করেছে।

 

আর গল্পকাররা? আখতারুজ্জামান ইলিয়াস?

ইলিয়াসের লেখা পরিণতি পেয়েছে মাঝ বয়সের পরে। ও প্রথম থেকেই আমাদের পত্রিকায় লিখত, কিন্তু ওর মধ্যে তখন কিছুটা অতি কাব্যিয়ানা ছিল। ইলিয়াসকে নিয়ে আমার তখনো মনে হয়নি—ও খুব ভালো লেখক হতে যাচ্ছে। ভেবেছি, বেশ প্রতিভা আছে ওর। ইলিয়াস পরে পরিণত হয়েছে। ও আরো পরিণত হওয়ার দিকে যাচ্ছিল। অপরিণত মৃত্যু ওকে থামিয়ে দিয়েছে। শুনেছি, খোয়াবনামার পর ও আরো বড় কিছুতে হাত দিয়েছিল।

 

মান্নান সৈয়দ?

মান্নানের গদ্যভাষা বিস্ময়কর। ও যে গদ্য নিয়ে এলো, তা একদম নতুন। ওর প্রথম কবিতার বই ‘জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ’ বেরোলে বইটির বিস্ময়কর নতুনত্ব সবাইকে চমকে দিয়েছিল। বইটার ওপর আমি ২১ পৃষ্ঠা আলোচনাও করেছিলাম। শওকত ওসমান ওই বইয়ের ওপর ২৪ পৃষ্ঠা আলোচনা করেছিলেন। জীবনানন্দ দাশের পর তো আমাদের সুররিয়ালিস্টিক লেখক বলতে মান্নানই। তবে আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে ওর নাট্যকাব্য। খুব ভালো এগুলো। নানা কারণে লোকে ওগুলো সম্পর্কে খুব একটা জানে না। ও খুব একটা সমালোচনা সহ্য করতে পারত না, কিন্তু আমি ওর ওপর দুবার আলোচনা করে দুবারই ওর কবিতার সত্য মূল্য নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলাম। প্রায় স্পষ্টভাবে বলেছিলাম, মান্নান কবি কি না সে সম্পর্কে আমি পুরো নিশ্চিত নই। কিন্তু এ নিয়ে ও কখনো অনুযোগ করেনি। কেন যেন আমার ওপর ওর একটা আন্তরিক আস্থা ছিল।

 

রফিক আজাদ বা অন্যরা?

রফিক একদম আলাদা কবি। আমি এখনো যেন ওদের সবার নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাই, ওদের কথাবার্তাগুলোও কানে বাজে। মনের দিক থেকে সর্বতোভাবে শহীদ কাদরীও আমাদেরই দলে ছিল, কিন্তু বন্ধুত্ব সূত্রে পঞ্চাশের লেখকদের সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়ায় ও পুরোপুরি আমাদের একজন হয়েও হয়নি। ও ছিল আমাদের ধারার, আমাদের ভাষা, বোধ আর মনমানসিকতার মানুষ। ষাটের দশকের একটি গদ্য ভাষা আছে। আমরা সবাই মিলে সে ভাষাটি দাঁড় করিয়েছিলাম। আজও সে ভাষা আমাদের সাহিত্যকে শাসন করে। এখনো এ দেশের সাহিত্য সে ভাষার বাইরে যায়নি। হুমায়ূন আহমেদ, জাফর ইকবালের মতো পাঠকপ্রিয় লেখকরা হয়তো ঠিক ও ভাষায় লেখেননি; কিন্তু মান্নান, ইলিয়াস, মাহমুদুল হক থেকে আজকের শহীদুল জহিরের লেখার ভেতর দিয়ে সে ভাষা বয়ে চলেছে।

 

কণ্ঠস্বরে তো মান্নান সৈয়দের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা পেয়েছেন?

একজন সম্পাদক কাকে পেলে সবচেয়ে বেশি খুশি হন? খালি কবি দিয়ে তো তাঁর চলে না। সেই কবির কবিতা দিয়ে তো প্রত্যেক সংখ্যার পাতা ভরানো যায় না। শুধু গল্প লেখক দিয়েও তাঁর অভাব মেটে না। তাঁর নানা ধরনের লেখা চাই। পত্রিকায় তাই দরকার হয় সব্যসাচী লেখকের। লেখক হিসেবে মান্নান আমার কাছে ছিল খুবই লাভজনক। সমালোচনা, প্রবন্ধ, কবিতা, গল্প, নাট্যকাব্য—যা চাই, মান্নান দিতে পারত। ফলে প্রত্যেক সংখ্যায় ওর লেখা ছাপতে পারতাম। ওর নানা ধরনের লেখা যে কণ্ঠস্বরের সম্পদ—এটা মান্নান জানত। এ প্রসঙ্গে ও লিখেছিল, ‘কণ্ঠস্বর ছিল আমার যৌবন। আর কণ্ঠস্বরের যৌবন ছিলাম আমি। ’

 

কিন্তু মান্নান সৈয়দের চেয়েও কণ্ঠস্বরে আপনার চারটি লেখা বেশি ছাপা হয়েছে। আপনি ওতে চার ছদ্মনামে লিখেছেন।

কণ্ঠস্বরে অনেক লিখেছি। প্রত্যেক সংখ্যায় আমার লেখা থাকত। কিন্তু যেহেতু আমি সম্পাদক, ফলে লেখাগুলোয় আমার নাম বেশি থাকা উচিত নয় বলে মনে হতো। তাই ওসব ছদ্মনাম। এদিকে আবার পত্রিকার জন্য ভালো লেখা চাই। প্রবন্ধ, গল্প, কবিতা না হলেই নয়, অথচ তা সব সময় পাওয়া যাচ্ছে না। তাই নানা নামে লিখতে হয়েছে। প্রথম সংখ্যায়ই দেখলাম, পত্রিকার মূল প্রবন্ধ পাওয়া যাচ্ছে না। কী করা? ‘দুর্বলতায় রবীন্দ্রনাথ’ প্রেসে বসে লিখে ফেললাম। কণ্ঠস্বরে যা বের হতো—সমালোচনা, গল্প, কবিতা সবই লিখেছি। প্রবন্ধই লিখেছি বেশি। লোকে জানত, নতুন নতুন লেখক লিখছে। দেখে মনে মনে হাসতাম। তখন মাথায় আইডিয়া গিজগিজ করত। চাওয়া মাত্র লেখা হয়ে যেত, কিন্তু লেখার সময় আর পেতাম না। দল নিয়ে সারাক্ষণ হইচই, খাটাখাটনি, দৌড়াদৌড়ি, বিজ্ঞাপন জোগাড়, সম্পাদনা, ছাপা, বিক্রির ব্যবস্থা করা, তার ওপর ঢাকা কলেজের চাকরি, একই সঙ্গে টিভির অনুষ্ঠান—ফলে নিজের লেখা আর হয়নি। জীবনে এ দুঃখ থেকে গেল যে আমার লেখক হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু হলো না। জীবনের পুরো ১০টি বছর টেলিভিশনে শেষ করে দিলাম। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র নিয়ে ৩৮ বছর কেটে যাচ্ছে। কণ্ঠস্বর নিয়ে গেল এক দশক। লেখার সময় আর পেলাম কোথায়?

 

পরিকল্পনা করে পত্রিকা করতেন?

না, যা লেখা পেতাম, সাজিয়ে-গুছিয়ে সম্পাদনা করে পত্রিকা বের করে দিতাম।

 

কিছু কবিতা সংখ্যা করেছেন।

দু-তিনটি করেছি। সেগুলো বেশ আদৃত হয়েছিল। তখন তো লেখকদের মধ্যে বেগবান একটি স্রোত ছিল। দেশে তখন জোরালো আদর্শবাদ চলছে। পঞ্চাশের দশক থেকে দেশাত্মবোধ, সাম্যবাদ একসঙ্গে চলেছে। এর পরের দশকে শুরু হয়েছে অবক্ষয়ী ধারা। তবে এ ধারা খুব বেশি দিন অবক্ষয়ী থাকেনি। ষাটের দশকের শেষের দিকে যখন জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, দেশপ্রেম তুঙ্গে উঠল, তখন অবক্ষয়ের চেতনাটি দুর্বল হয়ে এলো। ফলে আমাদের ধারার প্রত্যেকের মধ্যে দুটি বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়। একটি অবক্ষয়ী চরিত্র—‘ব্যক্তিবাদ’। এটিও সাহিত্যের জন্য প্রয়োজনীয়। আর যখন জাতীয়তাবাদ, সাম্যবাদ হচ্ছে, তখন দেশপ্রেম, মানবপ্রেম। আমাদের দলে যারা ছিল, তাদের লাভটি হয়ে গেল যে তারা ব্যক্তি ও সমষ্টি দুটিকেই একসঙ্গে ধারণ করে ফেলল। মান্নান ও গুণ দুজনের মধ্যেই ধারা দুটি পাশাপাশি ছিল। রফিক অবক্ষয়ী কবিতাও লিখেছে, আবার ‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’ লিখেছে, দেশপ্রেমের বিস্তর কবিতাও আছে ওর। ইলিয়াসের গল্প-উপন্যাসও তা-ই। সব মিলিয়ে আমাদের লেখকদের মধ্যে টোটালিটি পাওয়া যায়। ফলে ষাটের দশক ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত দুটি চেতনায়ই সমৃদ্ধ হয়েছে।

 

কোথায় ছাপা হতো?

শুরুতে পুরান ঢাকার ইস্ট বেঙ্গল বিউটি প্রেসে। আমাদের পত্রিকার কাগজ ছিল বাজারের সেরা। প্রকাশনা সৌকর্যের ব্যাপারে কোনো দিনই কোনো ছাড় দেইনি। করলে সেরা, না হলে দরকার নেই। ভালো ছাপার জন্য প্রাণপণ খেটেছি। যাতে টাইপগুলো নতুন হয়, সে জন্য যত রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা দরকার করেছি। হ্যান্ড কম্পোজ থেকে মনো টাইপ, পরে লাইনো টাইপে কণ্ঠস্বর ছাপা হয়েছে। কিভাবে লাইনগুলো আরো পরিচ্ছন্ন আর সৌকর্যপূর্ণ করা যায়, সে জন্য প্রতিটি টাইপ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছি। পরিচ্ছন্ন ও দৃষ্টিনন্দন পত্রিকা হিসেবে কণ্ঠস্বর ছিল সে যুগের সেরা। বে-ইস্টার্ন কম্পানির কর্ণধার—পরে রাজনীতিবিদ এবং সংসদ সদস্য মোশাররফ ভাই ১৯৭৩-৭৪ সালের দিকে রসিকতা করে প্রায়ই বলতেন, “বাংলাদেশে রপ্তানিযোগ্য জিনিস এই মুহূর্তে মাত্র দুটো। একটি হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, অন্যটা তোমাদের ‘কণ্ঠস্বর’। ”

 

পত্রিকার দাম শুরুতে ৫০ পয়সা ছিল। বিক্রি করে কত পেতেন?

প্রথম দিকের কথা মনে নেই, কিন্তু পরের দিকে বিজ্ঞাপন বেশি পাওয়ায় আর্থিক কষ্ট কমে গেল। স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত প্রতিটি সংখ্যা এক হাজার কপি ছাপতাম। স্বাধীনতার পর বিজ্ঞাপন পাওয়ায় দুই হাজার কপি ছাপতে শুরু করলাম। সব শহরেই আমাদের কর্মী আর লেখক ছিল। বিভিন্ন শহরে ছোট ছোট বুকস্টল ছিল। সেগুলোতে সাহিত্যিকরা আড্ডা জমাতেন। তাঁরাই ছিলেন আমাদের প্রধান সমঝদার। সেখানে কণ্ঠস্বর বিক্রি হতো। স্বাধীনতার পর কলকাতায় কলেজ স্ট্রিটে পাতিরামের দোকানেও দুই শ কপি ‘কণ্ঠস্বর’ বিক্রি হতো। পত্রিকাটি কলকাতার লেখকদেরও অকুণ্ঠ প্রশংসা পেয়েছিল।

 

নানা লোকের সহযোগিতা পেয়েছেন জেনেছি।

আল মনসুর, গালিব আহসান খানসহ অনেকে সহযোগিতা করেছে। তবে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করেছেন শফিক খান। তিনি সহযোগিতা না করলে পত্রিকাটি থাকতই না। তখন শফিক খানের শাহজাহান প্রিন্টিং প্রেসে পত্রিকা ছাপতাম। প্রুফের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হতো, প্রুফ পেতাম না। অনেক সময় পকেটে পয়সা থাকত না, ঠিকমতো খাওয়া হতো না। অনেক সময় এমন নেশায় থাকতাম যে খেতেও ইচ্ছা করত না। মনে হতো, এর মধ্যে যদি নতুন প্রুফ এসে পড়ে—সময়টা পানিতে পড়বে। বছরের পর বছর এই করতে করতে শরীর খুব খারাপ হয়ে গেল। আলসার হয়ে পাকস্থলী থেকে দুবার রক্তপাত হলো। মনটা ভেঙে গেল—আর যে পারছি না, পত্রিকা বের করার শক্তিও যেন আর নেই। কোন দিকে যাব? ঠিক করলাম, কণ্ঠস্বর বন্ধ করে দেব। এ সময় উদ্ধারে এগিয়ে এলেন শফিক খান। তিনি সাহিত্য অনুরাগী, ব্যবসায়ী মানুষ। একদিন জিজ্ঞেস করলেন, ঠিক কোথায় আটকে যাচ্ছেন? বললাম, সবই পারা যাচ্ছে। বিজ্ঞাপন, পত্রিকা বিক্রি থেকে খরচের অর্ধেকটা আসছে, কিন্তু আপনার প্রেসের টাকা দিতে পারছি না। তিনি বললেন, যদি ছাপার দায়িত্ব আমি নিই, তাহলে কাগজ বের করবেন? বললাম, করব। শফিক খান সাহায্য করায় পত্রিকা টিকল। স্বাধীনতার পর বিজ্ঞাপন আসা শুরু করলে অন্য প্রেসে চলে গেলাম।

 

১৯৬৯ সালে কণ্ঠস্বর প্রথম সাহিত্য সম্মেলন করেছে।

এই সম্মেলনে সারা দেশের বহু তরুণ লেখক যোগ দিয়েছিল। মুনীর চৌধুরী আমাদের এই আন্দোলনের খুব একটা পক্ষে ছিলেন না। বলতে গেলে তিনি বিপক্ষেই ছিলেন। তাই বেছে বেছে তাঁকেই সভাপতি করলাম। তখন তিনিই দেশের মধ্যে বিদগ্ধ ও পরিশীলিত সাহিত্য সমালোচক। সেই তাঁকে সভাপতি করার উদ্দেশ্য—এই অছিলায় তাঁর মুখ থেকে আমাদের সপক্ষে কিছু কথা আদায় করা। তিনি খুব সুন্দর বক্তৃতা দিয়েছিলেন। তাঁর মধ্যে একটি সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। দলমতনির্বিশেষে সবাইকে শ্রদ্ধা করার মতো মহত্ত্ব তাঁর মধ্যে সব সময় দেখেছি। তিনি হয়তো আমাদের সরাসরি সমর্থন করতে পারছিলেন না, কিন্তু আমাদের বেদনা তিনি অনুভব করেছিলেন। সভাপতি হয়ে তিনি সূক্ষ্মভাবে আমাদের সমালোচনা যেমন করলেন, তেমনি কী কী আকুতি আমাদের এ পথে নিয়ে এসেছে, তা-ও বললেন। আমাদের অবক্ষয় নিয়ে তিনি নীরব ছিলেন, কিন্তু আমাদের শৈল্পিক নতুনত্বের দিকগুলো উজ্জ্বল করে তুলে ধরতে কার্পণ্য করলেন না। আমরা আলাদা হওয়ার চেষ্টা করছি—বৃদ্ধ, বয়স্ক, ক্ষয়িষ্ণুদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বেরিয়ে যেতে চাইছি, শিল্পে নতুন বক্তব্য ও প্রকরণ সংযোজন করতে চাইছি—এটিই ছিল তাঁর বক্তব্য। খুব সুন্দর অনুষ্ঠান হয়েছিল।

 

তখন অনেক লোকই আপনার ওপর চটা ছিলেন। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী আপনাকে পালের গোদা বলেছিলেন।

তিনি তখন একটা পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখতেন। সেখানে আমাকে আমাদের এই দলের ‘পালের গোদা’ বলে অভিহিত করেছিলেন। না, চটে গিয়ে বলেননি; পরিহাস করেই বলেছিলেন। তাঁর সঙ্গে আমার খুব সুন্দর সম্পর্ক ছিল। আমি ছিলাম তাঁর ছাত্র। আমাদের এতই সখ্য ছিল যে তাঁর সহকর্মীরা আমাকে দেখলেই তাঁকে বলতেন, “সিরাজ তোমার ‘ছাত্রবন্ধ’ু এসেছে। ” তিনি আমার এক সহপাঠিনীকে বিয়ে করেছেন। তাঁর বিয়েতে আমি ছিলাম বরের প্রধান সঙ্গী, কিন্তু একসময় তিনি বামপন্থী আন্দোলনে সম্পূর্ণ নিবেদিত হয়ে গেলেন। এ ধরনের বৈপ্লবিক আন্দোলনে যাঁরা আপাদমস্তক নিবেদিত হন, অনেক সময় দেখেছি, তাঁরা নিজেদের বিশ্বাসের বাইরে সাধারণত আর কিছু স্বীকার করতে চান না। তাঁরা ধরে নেন যে এটিই একমাত্র ও অনিবার্য পথ, সবার এ পথেই আসা উচিত। তাঁর সঙ্গে আমার ভিন্নতা তাঁকে উত্তেজিত করে তুলত। ফলে ভ্রান্তপথ অনুসরণের অপরাধে প্রায়ই ধমক জুটতে লাগল। তাঁর হয়তো মনে হতো, আমরা সময়ের বিরুদ্ধ পথে হাঁটছি। দরিদ্র, দুঃখী মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছি। কত দিন আর ধমক খাওয়া যায়? ফলে আস্তে আস্তে স্যারের সঙ্গে আমার দূরত্ব বাড়তে লাগল। তবে তিনি অসাধারণ মানুষ, তাঁর কিছু ধারণাও সঠিক ছিল, কিন্তু আমরাও যে সম্পূর্ণ ভুল ছিলাম না, শেষ পর্যন্ত আমাদের সাফল্যই সেটি প্রমাণ করেছে। এটি যদি একেবারে ভুয়া হতো, তাহলে এই উদ্যোগ থেকে এত লেখক, এত সাহিত্যিক বেরিয়ে আসত না। আর আমরা বলেছি, এটি তারুণ্যের কাগজ এবং যত দিন আমাদের মধ্যে সেই তারুণ্য ছিল, তত দিন পত্রিকা আমি চালিয়ে গিয়েছি। যখন দেখলাম, সবাই লেখকের ব্যক্তিত্ব নিয়ে জ্বলে উঠছে, সবাই লেখক হিসেবে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে, তখন ১৯৭৬ সালে ঘোষণা দিয়ে কাগজ বন্ধ করে দিই।

 

১১ বছরের এ আন্দোলনই কি পূর্ব পাকিস্তান ও বাংলাদেশের একমাত্র সফল সাহিত্য আন্দোলন?

এই আন্দোলন কিন্তু ১১ বছরের বেশি চলেছে। কারণ পত্রিকাটি ১৯৬৫ সালে বেরোলেও এর আয়োজন শুরু হয়েছিল ১৯৬২ সালে। দানা বাঁধতে সময় লেগেছে। পরিচয়, বন্ধুত্ব, মানস-বিনিময়, চিত্তের ঐক্য ঘটতে বহু পথ আমাদের একসঙ্গে হাঁটতে হয়েছে। দল বেঁধে আমরা ঘুরেছি, রক্তের ভেতর জাগুয়ারের শব্দ শুনে সচকিত হয়েছি, প্রথাবিরোধিতায় সোচ্চার হয়েছি ও একটি নতুন সাহিত্য যুগের স্বপ্নে উদগ্রীব থেকেছি। কণ্ঠস্বরের পর উন্নতমানের অনেক পত্রিকা বেরিয়েছে এখানে। যেমন খোন্দকার আশরাফ হোসেনের ‘একবিংশ’, আবুল কাশেম ফজলুল হকের ‘লোকায়ত’ ইত্যাদি। তবে ওই পত্রিকাগুলো থেকে বড়সড় লেখকদল বা খ্যাতিমান সাহিত্যিক ওভাবে খুব উঠে আসেনি। তারা লেখক তৈরি করেনি। ‘সমকাল’ ছিল ওই সময়ের সেরা, কিন্তু ঠিক নতুন লেখক তৈরি করেনি, সেকালের প্রতিষ্ঠিত লেখকরা সমকালে লিখেছেন, কিন্তু কণ্ঠস্বর থেকে একটি লেখকগোষ্ঠী উঠে এসেছে—এটাই ছিল কণ্ঠস্বরের সাফল্য। সমকাল সম্পাদক সিকান্দার আবু জাফর সেকালের প্রতিষ্ঠিত লেখকদের সম্পাদক ছিলেন। আর আমি ছিলাম অপ্রতিষ্ঠিতদের সম্পাদক। একমাত্র কণ্ঠস্বরেই সমধর্মী লেখকরা একসঙ্গে হয়েছে, বন্ধু হয়েছে, সমধর্মী সাহিত্যচিন্তায় উদ্বুদ্ধ হয়েছে এবং সে চিন্তাকে জোরালোভাবে বিকশিত করতে চেষ্টা করেছে। এটাই ছিল তাদের যাত্রার শুরু ও সম্ভাবনার বাহন। সে অর্থে এটিই হয়তো গত ৭০ বছরে আমাদের এখানকার একমাত্র সাহিত্য আন্দোলন।

 শ্রুতলিখন : মাসুদ রানা আশিক

[১২ জুলাই ২০১৬, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, ঢাকা]


মন্তব্য