kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


আমাদের মধ্যে নিশ্চয়ই কিছু ছিল

তাঁর উৎসাহেই হুমায়ূন আহমেদের টিভি নাটক লেখা শুরু। ফজলে লোহানী, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, জুয়েল আইচের স্মরণীয় সব অনুষ্ঠানের প্রযোজক তিনি। ২ অক্টোবর জন্মদিন সামনে রেখে বর্ণাঢ্য টিভি জীবনের গল্প বলেছেন বিটিভির সাবেক মহাপরিচালক নওয়াজিশ আলী খান। শুনেছেন ওমর শাহেদ। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



আমাদের মধ্যে নিশ্চয়ই কিছু ছিল

প্রযোজক জীবনের শুরু কিভাবে?

 

১৯৬৭ সালের নভেম্বরে করাচি টেলিভিশনে অনুষ্ঠান নির্মাতা হিসেবে কাজ শুরু করি। ইন্টারভিউয়ের মাধ্যমে চাকরি হয়েছিল।

রাওয়ালপিণ্ডির সিটিআইতে (সেন্ট্রাল টেলিভিশন ইনস্টিটিউট) ট্রেনিং নিয়েছি। সেখান থেকে করাচি। প্রথম দিকে অন্য নবীন প্রযোজকের মতো আমাকেও সহজ-সরল অনুষ্ঠান দেওয়া হলো। কিছু গান, কিছু আলোচনা অনুষ্ঠান করেছি। ক্রমান্বয়ে নানা ধরনের অনুষ্ঠান করতে হয়েছে। উল্লেখযোগ্য অনুষ্ঠান ‘বাংলা বলুন’। এটি অবাঙালিদের বাংলায় কথোপকথন শেখানোর অনুষ্ঠান। খুব নামকরা ব্যক্তিত্বরা এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন। অনুষ্ঠানের স্ক্রিপ্ট লিখতেন অধ্যাপক মুজিবুর রহমান খান। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের সময় তিনি ‘পাঠক মুজিব’ নামে সংবাদ পাঠ করতেন। স্ক্রিপ্টের ভাষাগত ও শিক্ষার দিকটি বিখ্যাত শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সৈয়দ আলী আশরাফ দেখে দিতেন। উপস্থাপনা করতেন এফডিসির প্রতিষ্ঠাতা নাজির আহমদ। বাংলা দিয়ে বাংলা শেখানোর এই অনুষ্ঠানে ফারাহ খান মজলিশ (ফারাহ কবীর), বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের স্ত্রী মিলি রহমান কাজ করেছেন। অনুষ্ঠানের ২৮টি পাঠ সংবলিত একটি গ্রামোফোন রেকর্ড তৈরি করেছিলাম আমরা, সঙ্গে একটি বুকলেটও ছিল। সেটি বাজারে ছেড়েছিলাম। শুনেছি, বিদেশিরা রেকর্ডগুলো কিনে বাংলা শেখার চেষ্টা করত। ১৯৬৮-৬৯ সালের শেষ থেকে শুরু করে অনুষ্ঠানটি মুক্তিযুদ্ধের আগ পর্যন্ত করেছি। পাকিস্তানের বিখ্যাত ডন পত্রিকায় এটি নিয়ে সম্পাদকীয় লেখা হয়েছিল। তারা একে ‘অসাধারণ অনুষ্ঠান’ বলে মন্তব্য করেছিল।

 

আর কী কী অনুষ্ঠান করেছেন?

করাচিতে মেহেদী হাসান, ফরিদা বেগমের মতো বড় শিল্পীদের অনুষ্ঠান করেছি। তার আগে লাহোর স্টেশনে তিন মাস ছিলাম। সেখানে রওশন আরা বেগম, নূরজাহানের অনুষ্ঠান করেছি। করাচিতে তো নবীন শিল্পীদের অনেক অনুষ্ঠান করতাম। ‘মোরাক্কা’ (অর্থ : অ্যালবাম) নামে গানের অনুষ্ঠান করতাম। বিশেষ দিবসের অনুষ্ঠানও করেছি। তৎকালীন পাকিস্তানের দুই অংশেরই প্রথম ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘জিয়া মহিউদ্দিন শো’র সঙ্গে জড়িত ছিলাম। করাচি টিভির সামগ্রিক প্রেজেন্টেশনের  দায়িত্বেও ছিলাম।

মুক্তিযুদ্ধের সময় কিভাবে কেটেছে?

করাচিতে তো আমরা অনেক বাঙালি ছিলাম। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর প্রায় সবাই খুব কোণঠাসা হয়ে গেলাম। ১৯৭২ সালের প্রথম দিকে আমাদের কাছে অপশন চাওয়া হলো—কোথায় থাকব? স্বভাবতই ‘বাংলাদেশে আসব’ লিখিত দেওয়ার পর চাকরি চলে গেল। নানাভাবে পালিয়ে দেশে আসার চেষ্টা করেছি। ধরা পড়েছি, আবার কৌশলে ছাড়াও পেয়েছি। ১৯৭২ সালের ৪ অক্টোবর আফগানিস্তান, ভারত হয়ে মাতৃভূমিতে পৌঁছলাম এবং বিটিভিতে প্রযোজক হিসেবে যোগ দিলাম।

 

বিটিভিতে শুরুর দিকের জীবন?

এখানে আসার পর আমাকে একটি গানের অনুষ্ঠান দেওয়া হলো। বিখ্যাত টিভি ব্যক্তিত্ব ও চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার ও মনিরুল আলম—দুজনই বললেন, ভালো কিছু করার মতো পরিকল্পনা দাও। শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানের অভিজ্ঞতা আগে ছিল বলে নাটকের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যকে পরিচিত করানোর জন্য ‘রত্নদ্বীপ’ নামে একটি আলেখ্যানুষ্ঠানের অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা জমা দিলাম। এডুটেইনমেন্ট ধরণের এই অনুষ্ঠানের স্ক্রিপ্ট রচনা ও উপস্থাপনা করতেন ড. আলাউদ্দিন আল আজাদ। ‘রত্নদ্বীপ’-এ লায়লা আপা (লায়লা হাসান) রাজকুমারী ছিলেন। আর গ্রুপ থিয়েটারের নামকরা অভিনেতা ও প্রকৌশলী গোলাম রাব্বানী রাজার চরিত্র করতেন। ম.হামিদ অনেকগুলো পর্বে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন। অনুষ্ঠানটি নাটকের মাধ্যমে শুরু হতো, এরপর কিছু কথা, আবৃত্তি, গান ইত্যাদি মিলিয়ে চলত। এক ঘণ্টার এই অনুষ্ঠান বেশ জনপ্রিয়তাও পেয়েছিল। এর পাশাপাশি পল্লীগীতির অনুষ্ঠান করেছি। সেই সুবাদে আবদুল লতিফ, আবদুল আলীম, নীনা হামিদসহ তখনকার নামকরা শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। ‘এসো গান শিখি’ শুরু করেছিলাম ১৯৭২ সালে। ফেরদৌসী (রহমান) আপা উপস্থাপক, প্রথম দিকে আজাদ রহমান সুরকার ছিলেন। এই অনুষ্ঠানে শিশুরা ‘সাত স্বরের রাজা’, ‘জাদুর পেনসিল’, ‘ভোঁ ভোঁ করে মশা’র মতো ভালো ভালো গান শিখেছিল। পরে দেখতাম, তারা প্রতিযোগিতায় সে গানগুলো গাইছে। ফেরদৌসী আপার সঙ্গে ১৯৭৫-৭৮ সাল পর্যন্ত এটি করেছি। ‘বর্ণালী’ নামের আরেকটি গানের অনুষ্ঠানের জন্য ১৯৭৫ সালে শ্রেষ্ঠ প্রযোজক হিসেবে ‘টেলিভিশন’ পুরস্কার পেয়েছি। এখনো বিটিভিতে বর্ণালী হয় এবং অন্যান্য চ্যানেলেও এই অনুষ্ঠানটির আদলে অনুষ্ঠান হয়। বর্ণালীতে মা, প্রেম, রাত, চাঁদ, বৃষ্টি, বর্ষা, ফুল, পথ, কাজের গান ইত্যাদি অজস্র বিষয়ভিত্তিক গানের অনুষ্ঠান করেছি। এখানে ব্যক্তির গান নিয়েও অনুষ্ঠান করেছি। সেগুলোতে রুনা লায়লা, শাহনাজ রহমতউল্লাহ, ফেরদৌসী রহমান, আনজুমান আরা বেগম, আবদুল হাদী একক গান গেয়েছেন। বর্ণালীতে আঞ্চলিক গানের অনুষ্ঠানও হয়েছে। সিলেটের গানে বিদিতলাল দাসকে তুলে ধরা হয়েছে। সেই অনুষ্ঠানে তাঁর চার খলিফার অন্যতম সুবীর নন্দীও গেয়েছিল। এটিই ছিল টিভিতে তার প্রথম পারফরম্যান্স। শেফালী ঘোষ-শ্যামসুন্দর বৈষ্ণবও বর্ণালীর মাধ্যমে পরিচিত হয়েছেন। এ ছাড়া নতুন শিল্পীদের নিয়ে গানের অনুষ্ঠান করেছি। ফাতেমা-তুজ-জোহরা, কিরণচন্দ্র রায়, সিফাত ই-রব্বানীর মতো অনেক শিল্পী  সেসব অনুষ্ঠান থেকে উঠে এসেছেন।

 

‘যদি কিছু মনে না করেন’-এর সঙ্গে কিভাবে যুক্ত হলেন?

আগে যেহেতু ম্যাগাজিনে কাজ করার কিঞ্চিৎ অভিজ্ঞতা ছিল, জিয়া মহিউদ্দিনের সঙ্গে তাঁর শোতে কাজ করেছি; করাচিতে উর্দু ভার্সনে ‘গর তু বুরা না মানে’ অর্থাৎ ‘যদি কিছু মনে না করেন’ নামে একটি ম্যাগাজিন হয়েছিল, সেটির উপস্থাপক মহসিন সিরাজীর সঙ্গে আমার বিশেষ বন্ধুত্ব ছিল, প্রযোজক আসলাম আজহারের সঙ্গে ছিলাম, তা বিটিভির কর্তাব্যক্তিরা জানতেন। একদিন জেনারেল ম্যানেজার আমিরুজ্জামান খান ডেকে পাঠালেন। বললেন, ‘তোমার তো এ ব্যাপারে জ্ঞান আছে, প্রোগ্রামটি করতে পারবে?’ বললাম, পারব। শুনেছি, অনুষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। কেন হচ্ছিল সেটি আমাকে বলা হয়নি, জুনিয়র ছিলাম বলে জিজ্ঞেসও করিনি। যা হোক, তারপর আমরা—ফজলে লোহানী, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, আমি, বেলাল বেগ—এই কজনের নাম মনে পড়ে, একটি মিটিং করলাম। এর আগে সায়ীদ সাহেবের সঙ্গে ‘সপ্তপর্ণা’ করেছি। আমরা ম্যাগাজিনে কী কী থাকবে, সেই ফরম্যাট দাঁড় করালাম। আট-নয়টি সেগমেন্ট তৈরি হলো—‘র‌্যাপিড ফায়ার’, ‘একটি গান’, ‘একটি নাচ’, ‘কইনচেন দেহি’, কোনো বিখ্যাত ব্যক্তিকে এনে তাঁর সঙ্গে কিছু কথোপকথন, জাদুর আইটেম ইত্যাদি। ‘কইনচেন দেহি’তে লালু ও মন্টু বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ফজলে লোহানীকে প্রশ্ন করতেন। তিনি বলতেন, ‘জানি না তো’। ‘আরে পারলেন না, এটি তো এই’ এই বলে তাঁরা সহজ কিন্তু মজার সব বিষয় নিয়ে প্রশ্নোত্তর করতেন। সর্বশেষ আইটেম ছিল—‘কিল আইটেম’। তাতে এমন সব বিষয় নিয়ে আসতাম, যেগুলো নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই আলোচনা হতো। মনে আছে, সে সময়ের চাঞ্চল্যকর ডা. ইকবালের স্ত্রী সালেহা খুনের ওপর আমরা একটি পর্ব করেছি। এরপর তো মিছিল হলো এবং তাঁর লাশ কবর থেকে উঠিয়ে আবার ময়নাতদন্ত করা হয়েছিল। সে সময়ের চমকপ্রদ, আলোচিত, সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ নানা বিষয় নিয়ে আমরা রিপোর্ট করতাম। এ ছাড়া যেসব বিষয় নিয়ে মানুষ ভাবে না, জানে না, কিন্তু খুবই কৌতূহলোদ্দীপক, সেগুলো নিয়েও রিপোর্ট করেছি। যেমন—ঢাকা শহরে যে আমরা এত মাছ খাই, এগুলো কিভাবে, কেমন করে, কত পরিমাণে আসে, কিভাবে নানা জায়গায় যায়, বাজারজাত হয়, মানুষের বাড়িতে বাড়িতে যায়, তা নিয়ে রিপোর্ট করেছি। শুরুই করেছি এভাবে—বিয়েবাড়িতে জামাইয়ের পাতে বিশাল আকারের একটি মাছের মাথা দেওয়া হচ্ছে। এটি একটি বিশাল মাছের মাথা, এটি এই পাতে কিভাবে এলো? আমরা কি জানি? আসেন, এই মাছটি কিভাবে এলো এবং ঢাকাবাসীরা কিভাবে মাছ খায় আমরা দেখি—এ কথা বলে মাছের মাথাটির ছবি নিয়ে জুম আউট করে গভীর রাতে আমরা সোয়ারীঘাটে চলে গেলাম। এক মণেরও বেশি ওজনের বিশাল এক কাতলা মাছ ট্রাক থেকে নামানো হলো, দামাদামি হলো, নিউ মার্কেটের এক মাছ ব্যবসায়ী সেটি কিনল, তিনজন মাথায় করে সে মাছটি গাড়িতে ওঠাল, মাছ নিউ মার্কেটের মাছ বাজারে গেল এবং বিয়ের জন্য একজন ভদ্রলোক সেটি কিনলেন—এভাবে মাছের পুরো জার্নিটি তুলে ধরলাম। নানা বিষয় নিয়ে ১০-১২ মিনিটের কৌতূহলোদ্দীপক, জীবনঘনিষ্ঠ ও হৃদয়গ্রাহী এই টিভি রিপোর্টিংগুলো খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। ঢাকার স্যুয়ারেজের দ্রব্যগুলো কোথা দিয়ে, কিভাবে নিষ্কাশন হয়—এই বলে স্যুয়ারেজ নিয়ে একটি পর্ব করতে গিয়ে ফজলে লোহানী ও ক্যামেরাম্যান সমীর কুশারীর কোমর কল্যাণপুরের এক স্যুয়ারেজের ড্রেনে ডুবে গিয়েছিলেন। লোহানী নামার সঙ্গে সঙ্গে ময়লায় হাঁটু পর্যন্ত ডুবে গেলেন। তার পরও তিনি ফিরে এলেন না। এরপর কুশারী নামল। ‘যদি কিছু মনে না করেন’ চার বছর করেছি। ১৯৭৮ সালে জাপানে ট্রেনিংয়ে যাওয়ার পর অনুষ্ঠানটি অন্যের হাতে চলে গেল।

 

‘আনন্দমেলা’ও তো করেছেন।

দীর্ঘদিন করেছি। রোজার ঈদেরটি করতে না পারলে কোরবানিরটি তো প্রযোজনা করতামই। সেসব অনুষ্ঠান আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, আফজাল (হোসেন), জুয়েল আইচ, আবেদ খান ও তাঁর স্ত্রী, আনিসুল হকের মতো বিখ্যাত ব্যক্তিরা উপস্থাপনা করেছেন। আনন্দমেলা এ কারণেই কঠিন ছিল যে এখানে অনবরত দর্শককে আনন্দ দিতে হতো। ৬০-৭০ মিনিটের অনুষ্ঠানের একটি আইটেমে ১০ মিনিট আনন্দ দিয়ে, বাকি আইটেমগুলোতে আনন্দ থাকবে না, সে সুযোগ ছিল না। ফলে বিষয়গুলো সেভাবেই সাজাতে হতো। প্রতিটি আইটেম তার ঔজ্জ্বল্য, পারফরম্যান্স, বিষয়ের গভীরতা, লাইটিং-ক্যামেরা-সাউন্ড—সব কিছুর মাধ্যমে দর্শককে ধরে রাখত। আমরা যে পারিনি তা নয়। এখন হয় না কেন জানি না, হয়তো একটিমাত্র টিভি চ্যানেল ছিল বলে যা করেছি, লোকজনকে বাধ্য হয়ে দেখতে হয়েছে। কিন্তু তখনো তো অনেক প্রডিউসার ছিল। সবাই যে পেরেছে, তা তো নয়। তার মানে আমাদের মধ্যে নিশ্চয়ই কিছু ছিল...আসলে আমরা যারা টেলিভিশনে কাজ করেছি, তারা অত্যন্ত মেধাবী কেউই নই, যদি নিজেকেই ধরি, আমি একদম মিডিওকার, আগাগোড়াই সেকেন্ড ক্লাস, কিন্তু আমার ধারণা, আমাদের সবারই কাজের ব্যাপারে পরিশ্রম, সততা, পেশাদারি, নিয়মানুবর্তিতা, একাগ্রতা ও কিছুটা পাগলামি ছিল।

 

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের সঙ্গে ‘সপ্তপর্ণা’ করেছেন।

এই অনুষ্ঠানে নতুন অনেক কিছু এসেছে। টিভিতে গানের পারফরম্যান্সের শুরুর ক্ষেত্রে সপ্তপর্ণা বড় রকমের ভূমিকা রেখেছে। কারণ ফেরদৌস ওয়াহিদ, আজম খান, ফিরোজ সাঁই, ফকির আলমগীর—এরা এখানেই পারফরম্যান্সনির্ভর গান করা শুরু করে। তার আগে বিটিভিতে শিল্পীরা দাঁড়িয়ে বা বসে গান করতেন। এই অনুষ্ঠানের কারণে বিলুপ্তপ্রায় পল্লীগীতিগুলো এসব শিল্পীর হাত ধরে জনপ্রিয় হয় এবং এখনো সেগুলো জনপ্রিয়। অনুষ্ঠানটি অনেক দিন চলেছে। উপস্থাপনা, বাচনভঙ্গি, স্টাইল দিয়ে বাংলাদেশের ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের উপস্থাপক হিসেবে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ নিজেকে ‘আইকন’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। পরে বেশির ভাগ উপস্থাপক তাঁর স্টাইলই অনুসরণ করেছে। অন্য স্টাইলটি ছিল ফজলে লোহানীর। সায়ীদ সাহেব বুদ্ধিবৃত্তিক, সাহিত্যিক স্টাইলের আর ফজলে লোহানী জার্নালিস্টিক অ্যাপ্রোচের ছিলেন। সায়ীদ সাহেবের সঙ্গে কাজের স্মৃতি খুব ভালো। তিনি একজন পারফেকশনিস্ট। কোনো জিনিস যতক্ষণ পর্যন্ত না তাঁর মনমতো হতো, রেকর্ড করতেন না। দু-তিন বছর সপ্তপর্ণা করেছি। তাঁর অন্য একটি টিভি প্রোগ্রামও করেছি, নাম মনে পড়ছে না।

 

জুয়েল আইচের সঙ্গে পরিচয়?

সপ্তপর্ণায়ই। এরপর তো জানলাম, তাঁর বাড়ি বরিশাল, আমারও। ফলে যোগাযোগ আরো বাড়ল। তিনি খুব সুন্দর করে কথা বলেন, মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক ছিলেন—এসব কারণেও ঘনিষ্ঠতা হলো। তাঁর কথাবার্তা, আচার-আচরণে মুগ্ধ হলাম। আমাদের পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে উঠল, সেটি এখনো আছে। সপ্তপর্ণায় তিনি ছোট ছোট আইটেম করতেন। হাতের খেলা, বল হারিয়ে যাওয়া ইত্যাদি জাদু দেখাতেন। এরপর তো তিনি তাঁর জাদু সাধারণ মানুষের সামনে প্রদর্শন করা শুরু করলেন। তাঁর উপস্থাপনায় অন্তত দুটি ম্যাজিকভিত্তিক আনন্দমেলা করেছি। অনেক আনন্দমেলায় তাঁর একক পারফরম্যান্সেও কাজ করেছি। জুয়েল সায়ীদ সাহেবের চেয়েও খুঁতখুঁতে। শতভাগ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি কাজ করতে চাইতেন না।

নাটকে কিভাবে ঝুঁকলেন?

সেই ১৯৬৭ সালে টিভিতে জয়েন করেছি, ১৯৭২ সাল থেকে বিটিভিতে প্রোগ্রাম করছি, কিন্তু নাটকে কাজ শুরু করেছি আশির দশকে। তখন দেখলাম, ১৬-১৭-১৮ বছর চাকরি করছি, আমার নামটিও কেউ জানে না। নাম জানে তাদের, যারা নাটক করে। ফলে পরিকল্পনা করে নাটক করা শুরু করলাম। তবে ডিআইটিতে থাকতেও কিছু নাটক করেছি। তখন বিখ্যাত গল্পগুলো ‘গল্প থেকে নাটক’ নামে নাট্যরূপ দেওয়া হতো। আমিও কয়েকটি গল্পের নাট্যরূপ দিয়েছি। সেগুলোর মধ্যে একটি এখনো ভুলতে পারি না—সৈয়দ মুজতবা আলীর বিখ্যাত পণ্ডিতমশাইয়ের তিন পায়ের কুকুরের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করে লেখা ‘পাদটীকা’র নাট্যরূপ দিয়েছিলাম। এটি করতে ভালো লেগেছিল, বেদনার্তও হয়েছিলাম। তাঁর ‘টুনি মেম’, শরত্চন্দ্রের ‘অভাগীর স্বর্গ’ করেছি।

 

হুমায়ূনের সঙ্গে পরিচয় কিভাবে হলো?

তখন ‘রত্নদ্বীপ’ শেষের দিকে। এই সিরিজ অনুষ্ঠানটি বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগে এসেছে। সিদ্ধান্ত হলো, আধুনিক যুগের একটি গল্প নাট্যরূপ দেব। ১৯৬৩-৬৪ সালে করাচিতে আমাদের সাহিত্য পাঠের আসর ‘প্রবাসী পাঠচক্র’তে ইব্রাহিম খাঁ ‘পাখির বিদায়’ গল্পটি পড়েছিলেন। উত্তম পুরুষে লেখা এই গল্পের ঘটনাস্থল দখিন হাওয়া। খবর নিয়ে জানলাম, খাঁ সাহেবের বাড়ির নামও দখিন হাওয়া, সেটি আছে ধানমণ্ডিতে। একদিন সেখানে গেলাম। গল্পে যেভাবে আছে, বাড়িটিও দেখলাম সে রকম। তিনি মারা গেছেন। তাঁর ছেলে হাবিবুর রহমান থাকেন। তাঁকে বললাম, এখানে আমরা এই নাটকের শুটিং করতে চাই। তিনি রাজি। নির্ধারিত দিনে শুটিং হচ্ছে। হঠাৎ শুনি—কাট কাট। একটি লোক ক্যামেরার সামনে চলে এসেছেন। তাঁর কোলে শিশু। কাট বলার পর তিনি সরে গেলেন। আরেক জায়গায় শুটিংয়ের সময় একই শব্দ হলো। শুনলাম, সহকারী আশরাফ তাঁকে বলছেন, ‘এই মিয়া, আপনি ক্যামেরার সামনে এভাবে ঘুরঘুর করেন কেন?’ ভদ্রলোক উত্তর দিলেন না, সরে গেলেন। শুটিংয়ের বিরতিতে চা খাচ্ছি। লাল শার্ট পরা বাচ্চা কোলে এক লোকের সঙ্গে হাবিব সাহেব পরিচয় করিয়ে দিলেন, ‘আমার বড় জামাই, আমেরিকা থেকে ডক্টরেট করে এসেছে, নাম হুমায়ূন আহমেদ। ’ তখন মাথায় খেলে গেল, তাঁর তো দুটি উপন্যাস পড়েছি। একটি ‘নন্দিত নরকে’, অন্যটি ‘শঙ্খনীল কারাগার’। বললাম, আপনি কি নন্দিত নরকের লেখক? বললেন, ‘হ্যাঁ। ’ তিনি দাঁড়িয়ে, আমরা বসে। বললাম, অসাধারণ কাহিনী, এত চমৎকার ডায়ালগ, বিটিভির জন্য নাটক লেখেন না কেন? তিনি তাঁর মতো করেই উত্তর দিলেন, ‘আমি টুকটাক গল্প লিখি, নাটক আমাকে দিয়ে হবে না। ’ বললাম, না, আমি তো স্ক্রিপ্ট পড়ে অভ্যস্ত, আপনার উপন্যাস পড়ে মনে হয়েছে, একে ডায়ালগ ফর্মে বসিয়ে দিলেই হবে। তিনি তো কোনোভাবেই রাজি নন। বললেন, ‘না ভাই, এটি আমার ক্ষেত্র নয়, আমি মাস্টার মানুষ, তা-ও আবার কেমিস্ট্রির। ’ পেছন থেকে তাঁর শ্যালিকা বলে উঠল, ‘ভদ্রলোক এত করে বলছেন, দুলাভাই লেখেন না। ’ পরে জেনেছি, হুমায়ূনের কোলে ছিল বড় মেয়ে নোভা। গুলতেকিন ভাবি পরে আমাকে বলেছেন যে তিনিও তাঁকে নাটক লিখতে অনুরোধ করেছিলেন। সেদিন হুমায়ূনের টেলিফোন নম্বর নিলাম। পরদিন ফোন করলাম, পেলাম না। তার পরদিন পেলাম। তাঁর সেই একই কথা, ‘না, আমি পারব না, আমাকে মাফ করেন। ’ তিনি খুব দ্রুতলয়ে কথা বলতেন। একদিন আমার সোবহানবাগ কলোনির বাসা থেকে তাঁর শ্যামলীর বাসায় চলে গেলাম। দুই পাশে ধানক্ষেত, মাঝে রাস্তা। দোতলা বাড়িতে থাকেন। বাসার এক মহিলা বলল, ‘ভাই-ভাবি মার্কেটে গেছে। বসেন, এসে পড়বে। ’ বসলাম, চা খেলাম। ১৫ মিনিটের মধ্যে তাঁরা চলে এলেন। আসার কারণ বললাম, নাটক লেখেন। গুলতেকিনও বললেন, ‘ভদ্রলোক এত করে অনুরোধ করছেন, চেষ্টা করে দেখো, পারবে না কেন?’ তখন তিনি বললেন, ‘আচ্ছা ঠিক আছে, চেষ্টা করে দেখব। ’ দু-তিন দিন পর তিনি টেলিফোন করলেন, ‘নওয়াজিশ ভাই, একটি স্ক্রিপ্ট দাঁড় করিয়েছি। আসব? হয়েছে কি না দেখেন। ’ তিনি আসার পর তাঁর সামনেই স্ক্রিপ্ট পড়লাম। বড়জোর ২৫-৩০ মিনিট  লাগল, পাণ্ডুলিপিটি ১৮-১৯ পাতার, এক ঘণ্টার নাটক হবে। পড়ার পর মুখ দিয়ে একটি শব্দই বেরোল—অসাধারণ। এটি ১৯৮২-৮৩ সালের ঘটনা। তবে তাঁর প্রথম ও দ্বিতীয় স্ক্রিপ্ট নিয়ে বিটিভির সীমাবদ্ধতায় নাটক করা যায়নি। তাঁর লেখা তৃতীয় পাণ্ডুলিপি নিয়ে ‘প্রথম প্রহর’ নামে বিটিভিতে প্রথম নাটক তৈরি হলো, প্রযোজক আমি।

    

তাঁর সঙ্গে তো অনেক কাজ করেছেন।

এর পরে তো আমাদের নিয়মিত কাজ শুরু হলো, যার শেষ হলো তাঁর মৃত্যু দিয়ে। তাঁর অনেক নাটক করেছি। বিটিভির উল্লেখযোগ্য নাটকের প্রায় সবই হুমায়ূনের লেখা—‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘বহুব্রীহি’, ‘অয়োময়’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘আজ রবিবার’। ‘বহুব্রীহি’, ‘অয়োময়’ আমার প্রযোজনা। আতিক (আতিকুল হক চৌধুরী) ভাই দুই পর্বের একটি, আবদুল্লাহ আল মামুন, মুস্তাফিজুর রহমান ও রিয়াজউদ্দিন বাদশা তাঁর একটি করে নাটক করেছেন। এর বাইরে তাঁর এক পর্বের সব নাটক আমার করা। তাঁর লেখা বেশির ভাগ ঈদের নাটকও আমি প্রযোজনা করেছি।

 

কিভাবে কাজ করতেন?

আমাদের এই পরিচয় তো পরে পারিবারিক সম্পর্কেও গড়িয়েছে। হুমায়ুনের ধারাবাহিকগুলোর একেকটি পর্বের চিত্রনাট্য একেকজনের বাড়িতে পড়া হতো। ফলে খুব মজা হতো, গেট টুগেদার হতো। রিহার্সাল, শুটিং, এডিটিং—সব কিছুতে তিনি উপস্থিত থাকতেন। এমন আর কাউকে দেখিনি। তিনি আসতেন, বসে থাকতেন। হঠাৎ যদি তাঁর মনে হতো দৃশ্যটি একটু বদলানো দরকার, তিনি বলতেন বা কোনো ডায়ালগ যুক্ত করতে হলে নিজেই যুক্ত করে দিতেন। যেখানেই আউটডোরে শুটিং করতে যেতাম, সব সময় সপরিবারে যেতেন। এই অসাধারণ ব্যাপারগুলো সচরাচর ঘটে না।

 

মতের অমিল হয়নি?

হুমায়ূন ছিলেন খেয়ালি ও অহংকারী মানুষ। তাঁর চিত্রনাট্যের ব্যাপারে তিনি বেশ ‘রিজিড’ ছিলেন। বদলাতে হলে তিনিই বদলাতেন, অন্য কেউ নয়। হয়তো নাটকের একটি দৃশ্যে দুজনের মতের ভিন্নতা হলো। দৃশ্যটি দুভাবেই চিত্রায়ণ করা হতো। যেটি বেশি ভালো মনে হতো, সেটি গ্রহণ করা হতো। সৃষ্টিশীল মানুষের সঙ্গে কাজ করলে বিবাদ কখনো চরম আকার ধারণ করে না। আমি মানব না—এটি হুমায়ূনের কখনো ছিল না। আবার চট করে কোনো কথা মেনে নেবেন, তিনি তেমনও ছিলেন না। কথাকাটাকাটি হয়েছে সত্য, কিন্তু কখনোই ঝগড়া হয়নি।

 

তাঁর অয়োময়ের মতো সিরিয়ালও করেছেন।

হুমায়ূনের মতেও এটি তাঁর সেরা নাটক। এটি অনেক খরুচে নাটক ছিল। বাজেট সীমা অতিক্রম করায় বিটিভি জানাল, এত খরচ দিয়ে নাটকটি করা যাবে না, এই নাটক হবে না। তখন আমরা বসে খরচ কিভাবে কমানো যায়, সেই চেষ্টা করলাম। যেহেতু বেশির ভাগ শুটিং ঢাকার বাইরে করতে হবে, তাই ময়মনসিংহ রাজবাড়িতে শুটিংয়ের সিদ্ধান্ত নিলাম। ব্যয় সংকোচনের জন্য একবারে গিয়ে চার-পাঁচ পর্ব করে নিয়ে আসা হলো। এই কাজ করতে গিয়ে সকাল-বিকাল, রাত-দুপুর, প্রখর রোদ, তুমুল বৃষ্টি—কোনো কিছুই গায়ে মাখিনি। একই প্যান্ট দিনের পর দিন রোদ, বৃষ্টি, ঘুমের সময়ও পরতে পরতে কোমরে ইনফেকশন হয়ে গেল। সেই দাগ যেতে যেতে ১০ বছর লেগেছে (হাসি)। এখনো দাগটি আছে।

শ্রুতলিখন : ওমর শাহেদ ও মাসুদ রানা আশিক

(২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬, ঢাকা)


মন্তব্য