kalerkantho


লেখকের টাকা নেই

জন্মেছিলেন গ্রামে। জীবিকার তাগিদে ঢাকা চলে আসেন। দীর্ঘকাল শিশু একাডেমিতে চাকরি করেছেন। সেখানের বাগানটি গড়ে তুলেছেন মমতায়। প্রকৃতি-পরিবেশ নিয়ে লিখে চলেছেন একুশে পদকে ভূষিত বিপ্রদাশ বড়ুয়া। তাঁর বন্ধুবান্ধব, সাহিত্যিক জীবন এবং ব্যক্তিগত ভুবনে আলো ফেলেছেন ওমর শাহেদ। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

১ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



লেখকের টাকা নেই

 

৭৬ বছর বয়সেও ঘুরে বেড়ান কেন?

লন্ডন, আমেরিকা বা সারা পৃথিবী তো দেখতে পারব না। একবার না হয় বার্মা যেতে পারব, আরেকবারও না হয় যেতে পারব; কিন্তু সারা বিশ্ব কি দেখতে পারব? সুযোগ আছে? পয়সা কোথায়? বার্মা গিয়ে তাদের সঙ্গে যেভাবে একাত্ম হতে পারব, আমেরিকায় গিয়ে তো পারব না। বার্মায় গিয়ে দোকানে গিয়েছি, দিব্যি সময় দিয়েছে। তামাক খেল, গল্প করল। যে খাবার দিয়েছে, অদ্ভুত। নিজের টাকায় বার্মা যেতে হয়েছে। বেশি যাইনি, নেপাল ও বার্মা গিয়েছি। অফিসের কাজে দুইবার জাপান গিয়েছি, একবার এক মাস ছিলাম।

 

চাকরি করতেন কোথায়?

শিশু একাডেমিতে কাজ করেছি। ১৯৯৭ সালে অবসর নিয়েছি। আমাদের হাতেই এটি গড়ে উঠেছে। যদিও প্রকাশনা বিভাগের প্রধান ছিলাম, লাইব্রেরিটি আমার অধীনে ছিল, বাগানও ছিল। শিশু একাডেমির বাগান নিজের পরিকল্পনায় করা। অবশ্য দ্বিজেনদাদের [দ্বিজেন শর্মা] সহযোগিতা নিয়েছি। মিলনকে [ইমদাদুল হক মিলন] দিয়ে দুটি গাছ রোপণ করিয়েছি, তার একটি মাধবী। আমি, নাসরিন [নাসরিন জাহান] আর সৈয়দ ইকবাল—তিনজনে চালতাগাছ রোপণ করেছি। কুর্চিও রোপণ করেছি। এটি বুনো গাছ। পার্বত্য চট্টগ্রামে থরে থরে স্থানীয় কুর্চি আছে, এইটুকু হয়, কাটে, জুম চাষ করে আবার ওঠে। প্রথম কুর্চি দেখেছিলাম রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনে। বাগানের জন্য বলধায় আমাজন লিলি আনতে গিয়েছি। ওরা বলে, দেওয়া যাবে না, আমরা বীজ দিই না, ডালও দিই না। কোথায় যাব? বলল, অ্যাগ্রিকালচার অফিসে। গেলাম, আমাকে তো চিনে ফেলেছে, বলল, চিঠি দিন। প্যাড নিয়ে, চিঠি লিখে দিয়েছি, তারপর বীজ দিয়েছে। শিশু একাডেমির মাঠের সামনে, ইট ভেজানোর জন্য দুই হাত গভীর গর্তে বাঁশ কিনে এনে চারদিকে বেড়া বানিয়ে ঘেরাও করে লিলি রোপণ করলাম। পরে ছবি তুলে পত্রিকায় দিয়েছি। সে ছবি দেখে নদীর ওপার থেকে [কেরানীগঞ্জ] এক লোক এসে বলল, ভাই, আমাজন লিলি কোথায় ফুটেছে? দেখালাম। বেড়া তো দুই বছর পর ভেঙে নষ্ট হয়ে গেছে। মানে আমি চেষ্টা করেছি; কিন্তু ওরা সেভাবে টিকিয়ে রাখেনি।

 

বাগান নিজের ইচ্ছায় করেছেন, না পরিকল্পনা ছিল?

পরিকল্পনা ছিল। তখন একাডেমি হচ্ছে, ডিরেক্টর ডেকে বললেন, জায়গা যখন আছে, বাগানটি দেখো। প্রথমে পাখির ঘর বানিয়েছি। ১২ শ টাকা খরচ হয়েছে। সে টাকা তো আর দেয় না। চাইলে বলে, একটি ঘরের পেছনে এত টাকা লাগল? বললাম, হ্যাঁ, নিজে কিনেছি। সে বলে, এত টাকা? বললাম, তার মানে? আপনি কী মনে করেছেন, আমি টাকা মেরেছি? নিজের হাতে কাঠ কিনে মিস্ত্রি দিয়ে ঘর বানিয়েছি। তখন ডিরেক্টর ছিল গোলাম কিবরিয়া। বললাম, আরো টাকা দেন। সে বলল, না। অফিসের পিয়নকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে কাঠ কিনে মিস্ত্রি এনে কাঠ লাগিয়েছি। ওদের টাকা দিয়ে সব বিল অফিসে জমা দিয়েছিলাম। ঘর করে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শালিক এসেছে। মাত্র তিন বছর আগে ঘরটি ভেঙেছে। ক্যামেরাম্যান দিয়ে ছবি তুলিয়ে পত্রিকায় ব্যাক পেজে পাখির বাসা, ছাতিমগাছ নিয়ে লিখেছি। তখন গোলাম কিবরিয়া বলল, ‘এত বছর চেষ্টা করেও আমি শিশু একাডেমির কোনো খবর পত্রিকার প্রথম বা শেষ পাতায় ছাপাতে পারলাম না। আপনারটি ছাপাল?’ মোকারমও [হোসেন] বলল, এটি তো ভালো প্রভাব ফেলেছে। আগে কেউ কেউ গাছে কলসি-টলসি লাগিয়ে পাখির বাসা করে দিত। একবার এক কর্মশালায় ব্র্যাকে গিয়ে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দেখি, গাছের মধ্যে পাতিল এবং তাতে একটি প্যাঁচা। প্যাঁচাকে আমি এমন করি, প্যাঁচাও ওমন করে। দিনের বেলা! ওর সঙ্গে খেলছি, তারপর কী বুঝে উড়ে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর এলো। আবার খেললাম। তার আগে কিন্তু কলেজে শিক্ষকতা করেছি।

কোথায়?

সালেহ নূর ডিগ্রি কলেজ, পটিয়াতে। বাংলা পড়াতাম। ’৭৫ পর্যন্ত শিক্ষকতা করেছি। তারপর তো অ্যাড-হকে সরকারি কলেজে নিচ্ছে। জানিও না কিভাবে নেয়? কে ঘুরবে? দূর। শেষে বুঝলাম, গ্রামে থাকা যাবে না। জীবন এখানে আর কাটাতে পারব না, ঢাকা চলে যেতে হবে। ঢাকায় এসে ব্র্যাকে চাকরি পেয়ে এক বছর চাকরি করেছি। গণকেন্দ্র বলে ওদের একটি পত্রিকা ছিল। স্টাফ রাইটার ছিলাম। তখন শিশু একাডেমি হচ্ছে, বিজ্ঞাপন দিয়েছে। ইন্টারভিউ দিয়ে টিকে গিয়েছি।

 

লেখালেখির কথা ওঠল। নানা বিষয়ে লেখেন।

আকাশ সম্পর্কে আমার বই আছে, তারা সম্পর্কে লিখি। নিজে নিজে পড়াশোনা করেছি। আব্দুল জব্বারের ‘তারা পরিচিতি’ পড়ে পড়ে আকাশের সঙ্গে মিলিয়ে, ছাদে উঠে শুয়ে শুয়ে তারা দেখেছি। কোথায় কোনটা ছবিতে মিলিয়েছি। গ্রামে গেলেও বইটির ফটোকপি নিয়ে যেতাম। এ নিয়ে বাচ্চাদের উপন্যাসও আছে। শিশু একাডেমি থেকে বেরিয়েছে, পরে বোধ হয় অ্যাডর্ন করেছে—‘রাতের রেলগাড়িতে ছায়াপথে ভ্রমণ’। নক্ষত্রের ওপরও বই আছে—‘তারার দেশে হাতছানি। ’ জব্বার সাহেবের আরেকটি বই পড়েছি—‘প্রাচীন জ্যোতির্বিদ্যা’। এটিতে বেসিক জিনিস আছে। আকাশে শুকতারা উঠলে, মিসরীয়রা বুঝত নীলনদে বান আসবে, এখন চাষের সময়। তারা উঠলে অস্ট্রেলীয়রা বুঝত, গম কাটার সময় হয়েছে।

 

আপনার আরেকটি জগৎ আছেরূপকথা।

হ্যাঁ, প্রাচীন রূপকথা নিয়ে বই আছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে বই আছে, ভৌতিক বই—‘পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌতিক ও রহস্য গল্প’। এগুলো পার্বত্য চট্টগ্রামের পটভূমিতে লেখা প্রাচীন জেনদের কাহিনী। গ্রামে মানুষ মরে গেলে ওখানে রেখে আসে, রাতে ভূত আসে, সেটি আসলে ভূত নয়, অন্য কেউ ইত্যাদি। এটি আমার অনেক পছন্দের বই। সাহিত্য প্রকাশ বের করেছে।

 

আরেকটি বিখ্যাত বইসবুজ মলাটের শ্রামণ গৌতম।

ও তো প্রথম সংস্করণ। বইটি আরো বড় করেছি। পরে ঐতিহ্য প্রকাশ করেছে, এখন কথাপ্রকাশ করছে। ’৯১ সালের দিকে লিখেছি। ছোটবেলায় বৌদ্ধ ভিক্ষুদের ব্যক্তিগত জীবন দেখেছি, ঢাকায় এই বিহারে [বাসাবো ধর্মরাজিক বৌদ্ধ বিহার] এসে আরো দেখতে পেরেছি। তাদেরও তো পতন আছে। জাতকের মধ্যেও ভিক্ষুর পতন হতে দেখেছি, নৈতিক স্খলন হয়েছে। একদিন এক মেয়ের সঙ্গে আমার স্খলন হয়ে গেছে। নিয়ম হচ্ছে, এমন কিছু হলে, তার গুরুদণ্ড হয়। আর সে ভিক্ষু বা শ্রামণ থাকতে পারে না। এই কাপড় ছেড়ে গৃহী হয়ে যেতে হয়। এরপর তো ওর মনের মধ্যে অনুতাপ এসেছে। ‘শ্রামণ গৌতম’ উত্তম পুরুষে লিখেছি। উপন্যাসকে একটু অন্যভাবে, অন্যদিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমি দিয়ে লেখা। তারপর সে সত্ভাবে ব্যবসা করে, কাউকে ঠকায় না। চট্টগ্রাম থেকে রাঙামাটি, সেখান থেকে খাগড়াছড়ি গিয়েছে। সেখানে চাকমাদের ওপর বাঙালিদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, বাঙালি হয়েও আদিবাসীদের বাঁচায়। আরো কাহিনী আছে। বিহারের বুদ্ধ গয়াতে গিয়ে লেখা শেষ করেছি। ইচ্ছা ছিল, শেষ করব—সিদ্ধার্থের কপিলাবস্তুতে।

 

রিঅ্যাকশন কেমন পান? বিশেষ করে ভিক্ষুদের?

আমার সমাজের ভিক্ষুরা বইটি পড়েছেন। চট্টগ্রামের কিছু জায়গায় আমার অনুরাগী আছেন। যোগাযোগ না করেই তাঁরা ওখানে ছোয়াইংতে তরুণ ভিক্ষুদের বইটি দিয়েছেন। যাঁরাই পড়েছেন, ভালোভাবেই নিয়েছেন, অত্যন্ত ভালোভাবেই নিয়েছেন। কেউ কেউ আমাকে বলেছেন, তুমি কী ভিক্ষু হয়েছিলে? আমাদের সবাইকে সাত দিনের জন্য হলেও ভিক্ষু হতে হয়; কিন্তু আমি হইনি। হওয়ার সুযোগই যে পাইনি। অথচ আমার পরিবার খুবই ধর্মভীরু। ছোটবেলায় মা মারা গেছেন। আমি তো ঠাকুমার হাতে মানুষ। তিনি ভূত-প্রেত, দৈত্য-দানো, রাক্ষস-খোক্ষসের গল্প বলতেন, এসব তো বলতেন না।

 

জন্ম তো রাঙ্গুনীয়ায়। গ্রামের পাশে তিনটি নদীসুন্দরী-কর্ণফুলী-ইছামতী। শৈশব খুঁজে বেড়ান?

এ শৈশব তো কোনো মূল্যেই পাব না। ওই এলাকা নিয়ে কিন্তু আমার বহু গল্প আছে। হয়তো ঢাকা বা কোনো এক গ্রামের গল্প; কিন্তু যখন ছেলেবেলায় গিয়েছি, চট্টগ্রাম শহর সম্পর্কে আমার যে ধারণা, সেটি চলে এসেছে। লেখক তো এমনই হয়। পাঠককে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যায়। জানালা বন্ধ করে যাওয়ার সময় মেয়েটি চোখ তুলে তাকিয়েছে, আর কিছুই হয়নি, মেয়েটি তো জানে না এটুকু তাকানো এক কবির জন্য কী? সে তো কবিতা লিখে ফেলেছে। জানালা খুলছে, ঝড় আসছে, সাদা হাতটি বের করে জানালাটি টেনে বন্ধ করছে। ওই হাতটি দেখে বুদ্ধদেব বসু বিখ্যাত ‘সাদা হাত’ লিখেছেন, অসাধারণ কবিতা। আরো প্রিয় কবি আছেন আমার—সুধীন দত্ত, জীবনানন্দ দাশ।

 

কিন্তু আপনি তো কবিতা লেখেন না।

কবিতা দিয়েই তো শুরু করেছিলাম, কলেজজীবন থেকে লিখেছি। সংবাদে ছাপা হতো। পরে যে কী করে কবিতা থেকে গদ্যে চলে গেলাম! চট্টগ্রামের ম্যাগাজিনেও ছাপা হতো। কবিতার ওপর আমার বিখ্যাত বই ‘কবিতায় বাক্প্রতিমা’, ‘দ্য ইমেজারি অব পোয়েট্রি’ মুক্তধারা বের করেছে। কবিরা ইমেজ কিভাবে পেয়েছেন তার ওপর লেখা। যেমন—নির্মলেন্দু গুণের পাঁচটি বইতে ইমেজ কোথায় কিভাবে গেছে সেটি আলোচনা করেছি। সেখানে শামসুর রাহমান, সৈয়দ আলী আহসান, আহসান হাবীব, রফিক আজাদ কিভাবে ইমেজ তৈরি করেছেন সে আলোচনা আছে। যা-ই হোক, তারপর কবিতা লেখা হয়নি। গল্প-উপন্যাসে কিভাবে কিভাবে যে চলে এলাম! সাগর-মহাসাগর নিয়ে ও সমুদ্র নিয়েই আমার বেশি গল্প। নদী আর মাছের ডিম নিয়ে লিখতে গিয়ে হালদা নদীতেও গিয়েছি।

 

মা-বাবা, ছেলেবেলা?

আব্বা ডা. মৃত অরুণকুমার বড়ুয়া। এখান থেকে ম্যাট্রিক পাস, ব্রিটিশ আমলে কলকাতা গিয়ে ডাক্তারি পড়েছেন। ঠাকুরদা অনন্তকুমার বড়ুয়াও ডাক্তারি পড়েছেন, তিনি ক্যাম্বেল থেকে পাস। ক্যাম্বেল এখন নীলরতন হয়েছে। বাবা ব্রিটিশদের কলেজে না পড়ে স্বদেশি কলেজ থেকে পাস করেছেন। মা সুষমা বড়ুয়ার মামাবাড়ি পাঁচুরিয়া। আমরা সাত ভাইবোন। আমি ষষ্ঠ, ছোট বোন আভা বড়ুয়া। তার ছেলে পার্থ বড়ুয়া, বিখ্যাত গায়ক। এই বোন কিন্তু আমার আগে বিএ পাস করেছে। আমি তিন বছর ড্রপ দিয়েছি। ১৯৫৮ সালে ম্যাট্রিক পাস করে ঢাকায় এসে জগন্নাথ কলেজে নাইটে ভর্তি হয়েছি। তারপর অ্যাপেনডিক্স হলো। পরে চট্টগ্রামে গিয়ে স্যার আশুতোষ কলেজে কমার্সে ভর্তি হয়েছিলাম। চেয়েছিলাম, জগন্নাথে বিজ্ঞানে ভর্তি হব। রেজাল্ট খারাপ ছিল। থার্ড ডিভিশনে পাস করেছি। তবে এই রেজাল্ট নিয়েও ভর্তি হওয়া যেত। কেন যে করল না!

 

এখন যে সারা দিন পড়াশোনা করেন, ছোটবেলায় এত পড়তেন?

পড়তাম। বইয়ের নিচে সব সময় গল্পের বই থাকত। গ্রামে লাইব্রেরি ছিল, দুই বছর পর সেটির ১০০ বছর হবে। আমি তার সম্পাদক ছিলাম। নিয়ম ছিল, নাইনের নিচে সম্পাদক হওয়া যাবে না। নাইনে সে পদ পাইনি, ম্যাট্রিক পাস করে হলাম। তার আগেই লাইব্রেরির সব বই পড়ে ফেলেছি। এক লাইব্রেরির বই শেষ করা কিন্তু আক্ষরিক অর্থে অনেক। কিছু বই অবশ্য পড়িনি। যেমন প্রবন্ধের বই। তখন এসব কে পড়ে? সবচেয়ে বেশি পড়েছি ‘নবজাতক’ গোর্কির গল্প, অসাধারণ বই। একটি শরৎ সন্ধ্যা, ২৬ জন পুরুষ ও একটি মেয়ে, নবজাতক—এ রকম পাঁচ-ছয়টি গল্প আছে। এটি আমার এ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশিবার পড়া বই। গোর্কি যে কী মারাত্মক লেখক! বইটির সৌন্দর্য আমাকে পাগল করেছে। কী করে ভুলব? শুধু অল্প করে একটি গল্প বলি—একটা ছোট জাতি আর একটা বড় জাতি। বড় জাতির অত্যাচারে ছোটরা বনের মধ্যে ঢুকে গেছে। গভীর বন, প্রচুর গাছ। বনের মধ্যে দলবেঁধে ওদের মারতে যায়, তারা যেতে যেতে গভীর অরণ্যে চলে গেল। আর যেতে পারছে না, তখন তাদের সামনে নায়ক, ইয়াং ছেলেটি বলছে, চল আমরা পালাই। বন পেরিয়ে গেলে আর বিপদ নেই। তখন গভীর রাত, পেছনে শত্রু আক্রমণ করতে আসছে। যুবকটি নিজের হূিপণ্ড বের করে দিল। সঙ্গে সঙ্গে চারদিক আলোকিত হয়ে গেল। সবাই তার পেছনে পেছনে বন থেকে বেরিয়ে গেল। বিপদ কাটল। এই গল্প ভুলতে পারব না। এই না হলে মানুষ কিসের?

 

বলছিলেন ছোটবেলা অন্য রকম ছিল?

বিশাল ভিটা আছে আমাদের, জমিও অনেক। ঠাকুরদা খাগড়াছড়ির মানিকছড়ির মং রাজার ডাক্তার ছিলেন। বাবা চাকরি করেননি। ঠাকুরদা পুরো রাঙ্গুনীয়া থানায় প্রথম পাস করা ডাক্তার, তারপর বাবা। আমাদের ধান কাটতে অনেক মহিলা-পুরুষ লাগত। এসব কাজও শিখেছি। বেড়া বানানো থেকে শুরু করে বাঁশ কাটা, কুঠি বানানো, ঘরের চাল বাঁধা, ছন দিয়ে ঘর ছাওয়া—সব জানি, সব শিখেছি। হালচাষ, মই দেওয়া, চারা ফেলা, তামাক-মরিচ-বেগুন চারা, কচু রোপণ—প্রতিটি কাজ জানি। দেখেছি-শিখেছি, সারা দিন তো এ সবই করতাম। বাবা অবশ্য মানা করতেন, তিনি চাইতেন লেখাপড়া করি; কিন্তু ছেলেবেলা থেকেই তো জীবনকে অন্যভাবে দেখেছি। নিজের হাতে বহু মড়া পুড়িয়েছি। এখন যখন গল্প তৈরি করি, তাতে মড়া পোড়ার ঘটনা আছে, সেসব অভিজ্ঞতা কাজে লাগছে। লেখার সময় এখন সে কাজগুলোই আমার ওপর ভর করে। প্রতিটি সাইক্লোনে গিয়েছি। সম্ভবত ১৯৮৫ সালের সাইক্লোনের পর আমি আর মাহমুদুল হক বটু উড়িরচর গিয়েছিলাম। ‘সমুদ্রচর ও বিদ্রোহীরা’ পড়ে জানতে পারবে, সব বর্ণনা আছে, আমার নিজের দেখা।

 

তিনি বন্ধু ছিলেন?

হ্যাঁ। রফিক আজাদ, আসাদ [চৌধুরী]—এরা সবাই তো আমার প্রাণ। আবুল হাসান যখন ঢাকায় আসে, আমি এমএ ক্লাসের ছাত্র, ওরা তখন লিখছে। ঢাকায় ক্লাসমেট হয়েছে হুমায়ুন আজাদ, পান্না কায়সার। যৌবনে হুমায়ুন আজাদ এত অ্যারোগেন্ট ছিল, খুব মিলত। ওর প্রিয় কবি সুধীন দত্ত, আমারও প্রিয়। ভালো বন্ধু ছিল। বিখ্যাত গীতিকার রফিকুজ্জামান ক্লাসমেট ছিল, মুসাও ছিল, টেলিভিশনে চাকরি করেছে, প্রযোজক হয়েছিল। গুণ [নির্মলেন্দু], রফিক আজাদ, আবুল হাসানের সঙ্গে পরিচয়। তখন লেখক হিসেবে তারা লিখছে, আমিও লিখছি, এভাবেই পরিচয়।

 

গুণ-হাসানের জুটি?

গুণ-হাসান তখন কোথায় থাকে, কোনো ঠিক নেই। একদিন আমার সঙ্গে ফার্মগেটের বড় ভাইয়ের বাসায় থাকে, একদিন বাংলা একাডেমির সামনের লেখক সংঘে রাত কাটায়। কোনো দিন হয়তো দারোয়ানের সঙ্গে ঝগড়া করে বেরিয়ে গেছে। কোথায় থাকবে ঠিক নেই। বই লিখে যা পায়, তাতে চলছে। হাসান তখন ওদের গ্রামের দিকের একটি মেয়ের প্রেমে পড়েছে। সারাক্ষণ ওর গল্প বলছে, পাগল হয়ে যাব, এই-সেই।

 

যদি এ দুজনের কোনো গল্প শেয়ার করতে বলি?

গুণ বিয়ে করে বউ নিয়ে আমার ঘরে ওঠল। আমিও বিয়ে করেছি। বাসায় কারেন্ট নেই, গুণ বলছে—আছে। সুইচ টিপে বলল, মনে কর ফ্যান ঘুরছে, এমন পাগল ছিল। একদিন মৃত্তিকার মাকে নিয়ে আমরা ক্রিকেট খেলা দেখতে স্টেডিয়ামে গিয়েছি। কাঁধের ব্যাগ নামিয়ে গুণের বউকে বললাম, ব্যাগের ওপর বসো। খেলা শেষে চলে এসেছি। ব্যাগের কথা তো কারো মনে নেই। ও তো লাহিড়ীবাবুর মেয়েকে বিয়ে করেছে। বিখ্যাত মানুষ, মুক্তধারার সম্পাদক ছিলেন, সেখানেই পরিচয়। তখন সে রিভিউ করত, আমিও করতাম। মুক্তধারা আমাকে রিভিউ পাঠাত। তখন চাকরি করি। চিত্তদার [চিত্তরঞ্জন সাহা] সঙ্গে দেখা হয়েছিল একাত্তর সালে কলকাতায়। তখন গল্প সংকলন বেরিয়েছিল—‘বাংলাদেশ কথা কয়’, সেটির সম্পাদক গাফ্ফার ভাই [আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী] গল্প চেয়েছেন। লিখে দিলাম, খুব পছন্দ করলেন। বইটি তিনি আমার গল্প দিয়ে শুরু করেছিলেন।

 

তারপর?

স্বাধীনতার পর গ্রামে চলে এসে কলেজে চাকরি করেছি। ১৯৭৫-৭৬ সালে ঢাকায় এসেছি, আবার চিত্তদার সঙ্গে দেখা। বললেন, কোথায় ছিলে? আমরা তো তোমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। স্ক্রিপ্ট দরকার, দিতে হবে। তার পর থেকে তাঁকে গল্প দিতে শুরু করলাম। টাকার খুব দরকার ছিল তখন, বউয়ের কাছে পাঠাব। ও কলকাতায় এমএ পড়ছে। চিত্তদাকে বললাম, পাঁচ হাজার টাকা লাগবে। বললেন, তুমি তো এত টাকা পাবে না। বললাম, বিপ্রদাশ বড়ুয়া একজন লেখক এবং চিত্তদা একজন প্রকাশক। লেখক প্রকাশকের কাছে টাকা চেয়েছে—এই বলে বাসায় চলে এলাম। সন্ধ্যায় পুরো টাকা পাঠিয়ে দিলেন। ভেবেছিলাম, পাঠাবেন না; কিন্তু পাঠালেন।   

 

বিখ্যাত বন্ধু রফিক আজাদ?

বিচিত্রার সম্পাদক শাহাদাত চৌধুরী বললেন, একটি ধারাবাহিক লেখা লেখেন। শামসুর রাহমান থেকে শুরু করে আবুল হাসান—সবার সম্পর্কে লিখবেন। তিনি বিশেষ সংখ্যা করলেন, বেশ বড় করে লেখা লিখেছিলাম। সবাই তো তারিফ করছে। রফিক বলল, তুমি দোস্ত এত ভালো লেখো কী করে? উত্তরে বলেছিলাম, ব্যর্থ কবিরা ভালো সমালোচনা করে।

 

মাহমুদুল হকের সঙ্গে পরিচয়?

হায়াৎ মামুদের মাধ্যমে। ও তো রাজা। কথা বলতে বলতে জমে গেছে। বউটি তার খুব ভালো, ওদের বাসায় আড্ডা দিতাম। একটি ঘটনা বলি—আমার প্রথম সন্তান হবে। যে ডাক্তারের কাছে দেখাতাম, তিনি হাসপাতালে নিয়ে যেতে বললেন। পরদিন নিয়ে গেলাম। ওরা বলল, এখনো সময় হয়নি, বাড়ি নিয়ে যান। বললাম, তাতে কী? তত দিন এখানেই থাকুক। ওরা রাজি নয়, বাড়ি নিয়ে এলাম। সন্ধ্যায় আবার ব্যথা ওঠল, হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। ওরা ভর্তি নেবে না। বটুকে ডাকলাম, বলল, ব্যাপার না। বাসার পাশের গাইনি হাসপাতালে নিয়ে সে আমার স্ত্রীকে ভর্তি করিয়ে দিল।

 

সাইক্লোন দেখতে যেতেন, সেই ঘটনা?

সাইক্লোন দেখতে আগেও গেছি, বাড়ি তো চট্টগ্রামে। বটুকে [মাহমুদুল হক] বললাম, ‘চল’। ওর তখন বায়তুল মোকাররমে সোনার দোকান। ভাইদের নামের আদ্যক্ষর দিয়ে দোকানটির নাম—তাসমান জুয়েলার্স। পাথর-মুক্তোও বিক্রিবাট্টা করে। বটু বলল, ‘ঠিক আছে চল। টাকা-পয়সা আছে?’ যা আছে, দুজনেই যেতে পারব। পরদিন সকালে বেরিয়ে পড়লাম। ট্রেনে কিছু দূর গেলাম, কিছু দূর বাসে। কোথায় যাচ্ছি জানি না। লোকজনকে জিজ্ঞেস করি, ওরা বলল, চরজব্বারে ঘূর্ণিঝড় হয়েছে, ওখানে যান। বাসে উঠেছি। হঠাৎ একটি লোক বাসে উঠল, আমার চেয়েও প্রায় এক ফুট লম্বা, দশাসই চেহারা, হাতে থলে, চা পাতা বিক্রি করছে। চোখ দুটি নেই। সে ছিল ডাকাত সর্দার। ধরা পড়ল, গ্রামের সালিস তো, মাতব্বররা ‘যাতে তুই আর ডাকাতি করতে না পারিস, তোর চোখ তুলে নেব’ বলে খেজুরের কাঁটা দিয়ে চোখ গেলে দিল। এটা শুনে ওর প্রতি মমতা বেড়ে গেল। আমার ‘সমুদ্রচর ও বিদ্রোহীরা’তে সে আছে। এটি আমার খুব প্রিয় উপন্যাস, যেমন শ্রামণ গৌতম। ওখানে কত শ চরিত্র আছে, হিসাব করিনি। বই হয়ে যাওয়ার পর কবীর চৌধুরীকে পড়তে দিয়েছি। তিনি পড়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘পূর্বমেঘ’ পত্রিকায় খুব সুন্দর আলোচনা লিখেছেন। বলেছেন, বাংলা সাহিত্যে সমুদ্রের চর নিয়ে তো এমন উপন্যাস আর নেই। চর, মারামারি, সাইক্লোন ইত্যাদি নিয়ে এভাবে কখনো লেখা হয়নি। পরে ৩৩৩ পৃষ্ঠার উপন্যাস হয়েছে, বের করেছে জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ। দুইবার বের হয়েছে।

 

প্রেমে পড়েছেন?

১৯৭৪ সালে সত্যিই প্রেমে পড়েছি, সে আমার বউ। রুবী [রুবী বড়ুয়া] কলকাতা থেকে চট্টগ্রামে বেড়াতে এলো। তখন কলেজে পড়ে। প্রথম দেখাতেই কুপোকাত। ওর মা-বাবা সঙ্গে এসেছিলেন, এক মাস থেকে তাঁরা চলে গেলেন। আসলে আমাদের একই গ্রাম। ওর বাবাকে চিনি, কিন্তু ও থাকে কলকাতায়, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বে এমএ পড়ে। বাবার ব্রিটিশ সরকারের চাকরি সূত্রে ওখানে গিয়ে ওরা থেকে গেল। তখন কয়েক বছর জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করছি। আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, কলেজ ছেড়ে চলে আসব; কিন্তু বিয়ে করলে তো আর বেরোতে পারব না, সংসারের চিন্তা করতে হবে। জীবিকার জন্য, লেখার জন্য ঢাকায় থাকতে হবে। তখন বেশ কিছু লেখা বেরিয়েছে। বাংলা একাডেমির পত্রিকা ধানশালিকেও ছাপা হয়েছে। একাত্তরের পর থেকে আমার ভালো গল্প বেরোতে শুরু করেছে। তখন গল্প লিখতে অন্য রকম লাগত। সমকাল মানে সিকান্দার আবু জাফর ভাইয়ের পত্রিকায় গল্প লেখার শুরু। একে তো জীবিকা, তার ওপর প্রেম—দুটি মিলিয়ে আমায় ঢাকা চলে আসতে হবে। যদি স্টাবলিশট না হই এবং বিয়ে করে ফেলি, আর যদি নিশ্চয়তা না থাকে...? সংসার, কত ব্যাপার আছে। সত্যিই একদিন হুট করে চাকরি ছেড়ে দিলাম। ঢাকায় এসে ব্র্যাকে চাকরি পেলাম। ব্র্যাকে থাকতেই শিশু একাডেমির চাকরি যেই পেয়ে গেলাম, ১৯৭৭ সালে বিয়ে করে ফেললাম। বউ ভাবল, চলে যাওয়াই ভালো। ওখানে সে লেখাপড়া করে। ভাবলাম, থাকুক কলকাতায়, অসুবিধা কী? দুনিয়া তো অন্য রকম হয়ে গেছে।

 

এমন সংসারজীবন কিভাবে মেনে নিলেন?

আরো ছয় মাস ও এখানে ছিল। পরে পরীক্ষা দিয়ে ঢাকায় এসে দু-তিন বছর ছিল। তারপর চলে গেছে। আবার দু-চার বছরের মতো ছিল, আবার গেছে। এর পর থেকে আমি রেগুলার যাই, ও আসে। রুবী শিক্ষকতা করত, এখন করে না, ৬০ বছর হয়ে গেছে। আগে খ্রিস্টান স্কুলে পড়াত। যাঁরা ফাদার হন, তাঁদের বাংলা শেখাত। কলকাতায় ঠাকুর পুকুরের পরে জেসুইট মিশনারি স্কুলে বহু বছর কাজ করেছে।

 

ছেলেমেয়ে?

মেঘনা বড়ুয়া বড় আর তূর্য বড়ুয়া ছোট। মেঘনা এমএসসি পাস করে পশ্চিমবঙ্গে চাকরি করে। ছেলে ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ার। দেশের বাইরে বিভিন্ন জায়গায় কাজ করেছে। তারপর চলে এসেছে। বলে, বিদেশে থাকব না।

 

লেখকের জীবন কতটা সুখের এবং দুঃখের?

মানসিকভাবে সুখকর, কিন্তু লেখকের জীবনকে আর্থিক দিক থেকে গোছানো খুব কঠিন। কারণ এখানে অনবরতই বঞ্চিত করা হয়, পত্রিকা থেকে শুরু করে প্রকাশক—সবাই ঠকায়। বাংলাদেশে এমন কোনো পত্রিকা নেই, যেখানে টাকা পাব না। এমনও পত্রিকা আছে, যেখানে এক লাখ টাকার মতো পাব। সবাই বেতন পেয়ে যায়, কিন্তু লেখকের টাকা নেই। এ জন্য পত্রিকায় অনেক দিন টাকা আটকে থাকলে লেখা বন্ধ করে দিই।

শ্রুতলিখন : শাওন আবদুল্লাহ

[১২ জানুয়ারি ২০১৬, বাসাবো, ঢাকা]


মন্তব্য