kalerkantho

26th march banner

...বাকি সব গানে রথীন্দ্রনাথের কণ্ঠ আছে

বাবার হাত ধরে সংগীত দুনিয়ায় প্রবেশ, ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন দেশের অন্যতম প্রধান এক লোকশিল্পী। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রেরণাময় গানগুলোর প্রায় সবটাতেই মিশে আছে রথীন্দ্রনাথ রায়—এর উদাত্ত গলা। তিনি রেডিও, টিভি, সিনেমারও বহু অমর গানের গায়ক। মার্কিনপ্রবাসী এই শিল্পীর মুখোমুখি হয়েছেন ওমর শাহেদ। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

১৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



...বাকি সব গানে রথীন্দ্রনাথের কণ্ঠ আছে

গানের প্রতি ভালোবাসার জন্ম কিভাবে?

বাবা হরলাল রায় ছিলেন ভাওয়াইয়ার একনিষ্ঠ সাধক—গীতিকার, সুরকার, শিল্পী। নিজে দোতারা বাজিয়ে গান করতেন। সে সূত্রে আমরা ছয় ভাইবোনই গান করতাম। আমাদের গ্রামের নাম সুবর্ণখুলী, থানা নীলফামারী, জেলা তদানীন্তন রংপুর, এখন নীলফামারী। আমার জন্ম ১৯৪৯ সালের ২৩ জানুয়ারি।

 

আর গান শেখার শুরু?

১৯৫৬ সাল থেকে বাবা ঢাকা রেডিওতে জড়িয়ে পড়েন। মাঝেমধ্যে বাড়ি এলে বৈঠকখানায় প্র্যাকটিসে বসতেন। তখন আমি খুব ছোট—টু-থ্রিতে পড়ি, বৈঠকখানায় ঢোকার তো অনুমতি ছিল না। কিভাবে বাবা গান করেন বেড়ার ফাঁক দিয়ে দেখতাম। স্কুল ছুটি হলে ফিরে এসে দেখতাম, বাবা দুপুরের খাওয়া খেয়ে ঘুমাচ্ছেন। জলদি করে খেয়ে ঘরে ঢুকে চাবি চুরি করে ক্যাশবাক্স খুলে তাঁর গানের খাতাটি নিয়ে দুপুরের কড়কড়ে রোদে আধা মাইল-এক মাইল দৌড়ে দূরে চলে যেতাম। ক্ষেতের আইলে বসে গতকাল যে গানটি তিনি করেছেন, সেটি বের করে চিত্কার করে গাইতাম। আবার সন্ধ্যায় তাঁর গান প্র্যাকটিসের সময় খেয়াল করে শুনতাম—কোন জায়গায় ভুল হয়েছে। এভাবে কারেকশন করতাম।

 

রেডিওতে সুযোগ পেলেন কিভাবে?

তখন ১৯৬০ সাল, বাবার এক বন্ধুর বাসায় থেকে নীলফামারী হাই স্কুলে পড়ি। রোজার ছুটিতে বাড়ি এসে দেখি, দিনেই বাবা লোকজন নিয়ে গান করছেন। মাকে [বীণাপাণি রায়] জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কী ব্যাপার, এত লোক নিয়ে বাবা গান করছেন কেন?’ মা বললেন, ‘এরা ঢাকায় যাবে। ঢাকা রেডিওতে প্রোগ্রাম আছে। ’ আমার খুব ইচ্ছা, ঢাকা যাব। বললাম, ‘মা আমি ঢাকা যাব। তুমি বাবাকে বলো। ’ মা বললেন, ‘যা, তুই গিয়ে বল। ’ আমাদের মা-ছেলের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল কিন্তু বাবাকে ভয় লাগত বলে বললাম, ‘আমি বলতে পারব না, তুমি বলে দাও। ’ মা বললেন, ‘বৈঠকখানায় গিয়ে দাঁড়িয়ে থাক। তোর বাবা যখন গানে ব্রেক নিয়ে পান খাবে তখন বলব। ’ আমি তো গিয়ে দাঁড়িয়ে আছি, বাবা পান মুখে দিয়ে ডিরেকশন দিচ্ছেন, এক ফাঁকে থামলে মা বেড়ার ফাঁক দিয়ে রংপুরের ল্যাঙ্গুয়েজে বলছেন, ‘এই যে, রথীন জানি তোমাকে কী বলবে। ’ বাবা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কী ব্যাপার?’ ভয়ে মাথা নিচু করে বললাম, ‘বাবা, মুই ঢাকা যামু। ’ বাড়িতে আমরা দেশি ল্যাঙ্গুয়েজে কথা বলতাম। ‘কেন, ঢাকা যাবি কেন? গান জানিস?’ ‘হ্যাঁ, জানি। ’ ‘গাও দেখি। ’ গেয়ে ফেললাম। বাবা তো আশ্চর্য, বললেন, ‘ঠিক আছে, প্র্যাকটিস কর। ’ জীবনে কোনো দিন অনুষ্ঠানে গান করিনি, তার পরও ১৯৬০ সালে রেডিওতে গান করে আমার জীবন শুরু হয়েছে বিকজ অফ মাই ফাদার।

 

সে অনুষ্ঠানের কথা মনে আছে?

ইস্ট পাকিস্তান রেডিওর আরডি [রিজিওনাল ডিরেক্টর বা আঞ্চলিক পরিচালক] ছিলেন শামসুল হুদা চৌধুরী; যিনি পরে স্পিকার ও মন্ত্রী হয়েছিলেন। রেডিও তখন কেবল নাজিমউদ্দিন রোড থেকে শাহবাগে এসেছে। রেডিওর পেছন দিকটি তখন খোলামেলা ছিল। সেদিন সাধারণ মানুষও গান শুনেছে কিন্তু আমাকে দেখা যাচ্ছিল না। এ জন্য তারা চিত্কার করে বলছিল, কে গাইছে? তাকে তো দেখছি না। শামসুল হুদা চৌধুরী তাঁর পিয়নকে বলেছিলেন, ‘বাচ্চাটাকে দাঁড় করিয়ে দাও। ’ স্যারের হুকুম পেয়ে সে আমাকে চোর ধরার মতো করে ধরে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমি কিন্তু গান থামাইনি। রেডিও পাকিস্তান আয়োজিত এই লোকসংগীত উৎসব উদ্বোধন করেছিলেন তখনকার গভর্নর জেনারেল আজম খান। খুব নামকরা, বিখ্যাত লোক।

 

তাঁর সঙ্গে কী দেখা হয়েছিল?

১৯৮৪ সালে যখন পাকিস্তানে গিয়েছিলাম, আজম খান আমার অনুষ্ঠান দেখতে এসেছিলেন। আমার গান শুনে তিনি এবং দর্শকরা এত বিমোহিত হয়ে গিয়েছিলেন যে এক গান দুবারও গাইতে হয়েছিল। দুই-তিন দিন পর তিনি আমাদের বাড়িতে দাওয়াত দিয়েছিলেন। তাঁর ছেলে গান শুনতে যেতে পারেনি, হয়তো ব্যস্ত ছিল, ছেলেকে ডেকে বলেছেন, ‘তুমি একটি বিরাট জিনিস মিস করেছ। ও যে কী ভালো গান করে বোঝাতে পারব না। ’ আমাকে ‘রায় কাম হেয়ার’ বলে একটা ঘরে নিয়ে বিরাট কাচের ফ্রেমে বাঁধানো ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটির বিদায় সংবর্ধনাপত্রটি পড়ে শোনাতে বললেন। বাংলায় পড়ে বললাম, ‘বলছে, আপনি আমাদের অকৃত্রিম বন্ধু, আমাদের জন্য অনেক কিছু করছেন। ’ আমি বলছি, তিনি শুনছেন, কাঁদছেন। কাঁদতে কাঁদতে আমাকে জড়িয়ে ধরে বৈঠকখানায় নিয়ে গেলেন। পরে একটি ছোট টেপ রেকর্ডার বের করে বললেন, ‘তোমাকে মনে রাখার জন্য তোমার ওই জিহাদি গান গাও। ’ গেয়েছিলাম, ‘ও কী ও বন্ধু কাজল ভোমরা রে’। গানের শেষের দিকে আমি কাঁদছি, তিনিও কাঁদছেন।

 

টিভিতে কিভাবে গাওয়ার শুরু?

টেলিভিশনের শুরুতে কলিম শরাফী সাহেব টেলিভিশনের চিফ ছিলেন। বাবাকে তিনি পছন্দ করতেন, তাঁকে টেলিভিশনের স্টাফ আর্টিস্ট করেছিলেন। বাবা একদিন কলিম চাচাকে বলছেন, ‘কলিম ভাই, আমার ছেলে তো গান করে। ওকে একটা সুযোগ দেওয়া যায়?’ তখনো পূর্ব পাকিস্তানের অনেক নামকরা শিল্পীর টেলিভিশনে গান গাওয়ার সুযোগ হয়নি। কলিম চাচা বললেন, ‘ঠিক আছে, দেখব। ’ সম্ভবত মে-জুন মাসের পল্লীগীতির এক অনুষ্ঠান, বোধ হয় ‘বাঁশরি’ নাম, তাতে ফেরদৌসী আপার গান করার কথা ছিল। তিনি চট্টগ্রামে এক অনুষ্ঠানে গিয়েছেন। কথা ছিল, বিকেলের ফ্লাইটে ফিরে সন্ধ্যায় প্রোগ্রাম করবেন, কিন্তু আবহাওয়া খারাপ হওয়ায় ফ্লাইট আসেনি। কলিম চাচা তো বিপদে পড়ে গেছেন, যাকে-তাকে দিয়ে তো তিনি প্রোগ্রাম করাবেন না। তখন সবার বাড়িতে টেলিফোনও ছিল না। হঠাৎ হন্তদন্ত হয়ে এসে তিনি বাবাকে বললেন, ‘হরলাল বাবু, আপনার ছেলের কথা বলেছিলেন, ও এসেছে?’ ‘হ্যাঁ, এসেছে। ’ ‘এক্ষুনি স্টুডিওতে নিয়ে আসেন। ’ বাবা স্টুডিওতে নিয়ে গেলেন। ‘তুমি গান গাও?’ মুখটি পর্যন্ত গেয়েছি, তিনি থামিয়ে দিলেন, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ চলবে। ওকে মেকআপ রুমে পাঠান। রেডি হন। ১৫ মিনিটের চাংক। ’ কলিম চাচা হঠাৎ কি মনে করে আবার বললেন, ‘হরলাল বাবু, দাঁড়ান, কথা আছে। সে তিনটি গান পারবে?’ বাবা বললেন, ‘পারবে। ’ ‘এক কাজ করেন।   আগে আপনি একটি গান করেন, তাতে ওর ভয় কেটে যাবে। তারপর ও গিয়ে দুটি গান গাইবে। ’ এই গিয়ে গান করে ফেললাম।

 

তারপর?

কলিম চাচা আমাকে পছন্দ করতেন। ১৯৬৬ সালে ম্যাট্রিক দিয়ে তাঁর আগ্রহে ঢাকায় এসে ঢাকা কলেজে ভর্তি হলাম। ভর্তির পর বাবা চাচাকে বলছিলেন, ‘কলিম ভাই, যা বেতন পাই, তাতে তো রথীনকে রাখতে পারব না। ওর খরচ জোগাব কী করে? ছেলেমেয়েরা সবাই সঙ্গে থাকে। ’ চাচা বললেন, ‘সে চিন্তা আপনাকে করতে হবে না। লিভ ইট টু মি। ’ তিনি প্রতি মাসে আমার জন্য প্রোগ্রাম কনফার্ম করে ফেললেন। এক প্রোগ্রামে ১২০ টাকা পেতাম, বিরাট ব্যাপার। যে প্রডিউসার প্রতি সপ্তাহে পল্লীগীতির অনুষ্ঠান করতেন, তাঁকে বলে রাখলেন, ‘কোনো শিল্পী ফেল করলেই রথীন যাবে। গত সপ্তাহে গেয়ে থাকলেও পরের সপ্তাহে যদি কেউ ফেল করে রথীনকে দিয়ে গাওয়াবে। যদি কেউ প্রশ্ন করে, উত্তর আমি দেব। ’ অ্যান্ড হি ডিড ইট। কলেজে ক্লাস করছি, আর্টিস্ট ফেল করলে সাইকেল পিয়ন কলেজে গিয়ে আমার ক্লাস কোথায় হচ্ছে খুঁজত। ওকে দেখলেই বুঝতাম, প্রোগ্রাম এসে গেছে। ক্লাস করে বেরোলেই বলত, ‘বাবু সই করে যান। সন্ধ্যার সময় আপনার প্রোগ্রাম। ’ কলিম চাচা আমার জন্য যা করেছেন হয়তো বাবাও সেটি করতেন না, বাবা হয়তো আমাকে নীলফামারী ফেলে রাখতেন। তিনি বুঝতেন না। হয়তো আমি রথীন রায় হতাম না। যদি গডফাদার বলতে হয়—আমি বলব, কলিম শরাফী ইজ মাই গডফাদার। তিনি আমাকে এস্টাবলিস্ট করেছেন।

 

রেডিওর পাশাপাশি নানা অনুষ্ঠানেও তো গাইতেন?

১৯৬৬ সালে ঢাকা কলেজে ভর্তি হলাম। কলেজের সব স্যারই খুব ভালোবাসতেন। ১৯৬৮ সালে কলেজ থেকে বেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হয়েছিলাম। এর আগে গণ-আন্দোলনেও গান গেয়েছি। তখনো পলিটিকস করিনি, এখনো করি না। ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন এমনকি আওয়ামী লীগ, ভাসানী, ন্যাপ সবাই তো ডাকত। ওদের সব প্রোগ্রামে গাইতাম।

 

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দিলেন কিভাবে?

ঢাকা থেকে খুব কষ্ট করে, পালিয়ে কলকাতায় চলে গেলাম। এখনো মনে আছে, বালিগঞ্জ ফাঁড়ি স্টপেজে বাস থেকে নেমে হেঁটে বালিগঞ্জ সার্কুলার রোড ধরে গেলে বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজ। হাতের ডানে প্রাইভেট বাড়িটি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। নিচতলায় বিএসএফ গার্ড আটকাল। বললাম, ‘ঢাকা থেকে আসছি, আমি শিল্পী। ’ ওপরে নিয়ে গেল। ঢোকার পরের রুমটি স্টুডিও। বাইরে একটি ড্রেসিং টেবিল। তার পরের রুমে আবদুল জব্বার, আপেল মাহমুদ. মান্না হক, মোকছেদ আলী সাঁই—এই চার আর্টিস্ট মোটে থাকেন। চট্টগ্রাম থেকে যাওয়া ১১ জন, কামাল লোহানী ভাই, সুব্রত বড়ুয়া, সাংবাদিক সাদেকিন ভাই, বঙ্গবন্ধুর প্রেস সেক্রেটারি বাদশা ভাই থাকতেন। ছোট্ট আরেক রুমে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ইনচার্জ আবদুল মান্নান থাকতেন।

 

প্রথম দিনের কথা মনে আছে?

ঠিক সন্ধ্যার আগে আপেল এসে ডাকল,‘ মামু, মামু ওঠ। ’ উঠে বললাম, কী হয়েছে? ‘হাত-মুখ ধুয়ে ওপরের স্টুডিওতে আয়, গানের সুর করছি, তুই খালি একটা টান দিবি। ’ ফ্রেশ হয়ে গিয়ে বললাম, ‘আগে গানটি শোনা। ’ তখন কিছুই ছিল না, খালি একটি তবলা আর একটি হারমোনিয়াম, অন্য কোনো মিউজিক নেই। এই দিয়ে গান হচ্ছে। তো গানটি শোনাল। সেই বিখ্যাত গান—‘তীরহারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেব রে। ’ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে আমার প্রথম গানটি ওর সঙ্গে গেয়েছি। [হাসি] এই শুরু হলো স্বাধীন বাংলা বেতারের জীবন।

 

এর পর?

এর পরে গেয়েছি—‘চাষাদের মুটেদের মজুরের/আমার এ দেশ সব মানুষের’, ‘তারা এই দেশের সবুজ ধানের শিষে/চিরদিন আছে মিশে’, ‘ও বগিলারে, কেন বা আলু বাংলাদেশে/মাছের আশা নিয়া। ’ এখন অনেকে বলে না, আমি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের বিরাট আর্টিস্ট কিন্তু তখন তাদের সলো গান গাওয়ার কোনো যোগ্যতা ছিল না। সত্য কথা, তাদের অনেকে এখন স্টার হয়ে গেছে বাট তখন তারা স্টার ছিল না, তারা আমাদের সঙ্গে, পেছনে দাঁড়িয়ে কোরাস গেয়েছে। এটাও ঠিক, তাদের সাহায্য ছাড়া তো কোরাস গান হতো না। আমি আর আপেল গাইলে তো আর কোরাস হতো না। ইতিহাসকে স্বীকার করতে হয়, আমি যেমন করছি। তখন সলো গান শুধু আমি, আপেল মাহমুদ, আবদুল জব্বার, অজিত রায়, সুজেয় শ্যাম, প্রণদীপ বড়ুয়া গেয়েছেন। আমার বাবা হরলাল রায় দু-একটি গেয়েছেন। একমাত্র মেয়ে হিসেবে জব্বার খানের মেয়ে রুপা খান অজিতদার সুরে ‘চাঁদ তুমি ফিরে যাও’ নামে একটি ঈদের গান গেয়েছে। বাকি সব কোরাস, লিডিং ভয়েস রথীন্দ্রনাথ রায়ের। সমর দাস আমাকে ছাড়া কোনো কোরাস গান লিড করতেন না। ওরা সব পেছনে, আমাকে ফলো করত। এই গানগুলো তো বাজে না, কেউ জানেও না [দীর্ঘশ্বাস]।

 

কেন?

সাড়ে তিন বছর পর তো বন্ধ হয়ে গেছে, এখনো বন্ধ। ‘ও বগিলা রে ক্যান বা আলু বাংলাদেশে/মাছের আশা নিয়া’, এ প্রজন্ম তো বলতেই পারবে না। ‘পরানের বন্ধু রে, বলব কী তোরে’, ‘ও ভাই খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি আমার দেশের মাটি’—গানটি আমার গাওয়া [হাসি]। সমরদা যা করেছেন, সেসব কোরাসের ম্যাক্সিমাম লিডিং ভয়েস আমার। শুধু চার দিন না পাঁচ দিনের জন্য দিল্লিতে গিয়েছিলাম, গৌরিপ্রসন্ন মজুমদার বঙ্গ সাংস্কৃতিক সম্মেলনে পাঠিয়েছিলেন, সেই পাঁচ দিন ছাড়া বাকি সব গানে রথীন্দ্রনাথের কণ্ঠ আছে।

 

মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো কেমন ছিল?

আমরা একটি পরিবারের মতো হয়ে গেলাম। সব সময় মনের মধ্যে শক্তি ছিল যে আমি যুদ্ধে লিপ্ত আছি। ইয়ার্কি, ফাজলামো করতাম কিন্তু যে মুহূর্তে ডাকত—গান করতে হবে সঙ্গে সঙ্গে আমরা সিরিয়াস হয়ে যেতাম। মনে পড়লে এখনো আমার গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায়, তখনো যেত...একাগ্র মনে গানটি তুলতাম। তিন-চার দিন ঠিকমতো রিহার্সাল দিয়ে রেকর্ডিং করতাম। রেকর্ডিং করা মানে একটা ছোট্ট রুমে পর্দা আছে, সাউন্ডপ্রুফ রুম নয়; সেখানে ছোট্ট একটি ওয়ান চ্যানেল মেশিন আছে, ওই একটি চ্যানেলের মধ্যেই গান গেয়েছি, বাজিয়েছি। ওটুকু ঘরে এতগুলো শিল্পী গান গেয়েছে মানে এটি অলৌকিক ব্যাপার যে এত সুন্দর গান কী করে হলো? ছোট্ট একটি মেশিনে আমরা কী করে এতগুলো গান করলাম! ওটুকু ঘরের মধ্যে নাটক-গান, কথিকা-আবৃত্তি সবকিছু হয়েছে। কোনার দিকের রুমটি একটু বড় ছিল। ওখানে আরেকটা স্টুডিও করা হলো। স্টুডিও মানে জাস্ট একটি মেশিন, [হাসি] ওখানে রেকর্ডিং হতো। ওই সময়টিই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। সবাই বলে ১১টি সেক্টরে যুদ্ধ হয়েছে, আমি বলি, না এটা ঠিক না, ১২টি সেক্টর ছিল। ১২ নম্বর সেক্টর হলো স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। আমাদের বন্ধুবান্ধব যাঁরা সম্মুখ সমরে যুদ্ধ করেছেন, যাঁরা শহীদ হয়েছেন তাঁদের প্রত্যেকের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই, তাঁরা আমার সহসাথী, সহযোদ্ধা; তাঁরা অবশ্যই শ্রদ্ধা পাওয়ার যোগ্য। তাঁদের মূল্যায়ন করা হয়েছে কিন্তু আমাদের মূল্যায়ন করা হয়নি। আমরা অবশ্য কোনো মূল্যায়নের জন্য যুদ্ধ করিনি। তাঁরাও করেননি। কিন্তু যদি একজনকে মূল্যায়ন করা হয়, তাহলে অন্যদের কেন করা হলো না? সেটিই আমার প্রশ্ন। তাঁরাও চাননি, আমরাও চাইনি, চাইও না। কিন্তু যেহেতু তাঁদের বীরশ্রেষ্ঠ, বীর-উত্তম, বীরপ্রতীক, বীরবিক্রম করা হয়েছে, তাহলে আমরা কী করলাম? আমাদের জন্য কোনো চিন্তা হয় না? এটা কেমন কথা? আমাদের স্রেফ শব্দসৈনিক বলে খালাস করে দিল। অথচ এটি কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ একটি সেক্টর।

 

এটি ছাড়া তো যুদ্ধ হতো না...

নো নো। একদিন শুধু রেডিও বন্ধ ছিল। সরকারের মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল—হোয়াট ইজ দিস [হাসি]। প্রাইম মিনিস্টার তাজউদ্দীন আহমদ নিজে আমাদের সঙ্গে কথা বলার জন্য এসেছিলেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রকে সেভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। এটা ঠিক না। বেশি লোক ছিল না, আমরা ৩২ জন ছিলাম পার্মান্যান্ট স্টাফ অব মুজিবনগর গভর্নমেন্ট। অক্টোবরের দিকে বলল, তোমরা স্টাফ হয়ে যাও। সমর দাস, জব্বার, আপেল, আমি, মান্না হক, আমার বাবা মিউজিকের এই ৮-১০ জন আর ওদিকে নাটকের রাজু ভাই, কল্যাণ মিত্র এভাবে প্রত্যেক সেক্টর থেকে স্টাফ আর্টিস্ট করে নিল, স্বাধীন বাংলা বেতারের তালিকাভুক্ত শিল্পী হলাম। আমরা হচ্ছি, মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী। তখন বলল, এখন আর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে থাকা যাবে না। এটি রেডিও হিসাবে গণ্য হবে। এখন তোমাদেরকে বেতন দেওয়া হচ্ছে, বাইরে বাসা ভাড়া করে থাকো। চাকরি যেমন করে সেভাবে সকালে আসবে, বিকেলে যাবে; কাজ করবে, চলে যাবে। সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা বেতন পেতেন সমর দাস। আমি পেতাম ৩৭৫ টাকা [হাসি]। তখন এ টাকার অনেক, অনেক মূল্য ছিল।   জব্বার ভাই ৪০০ না ৪২৫ টাকা, আপেল আমার সমান পেত, মান্না হকও তাই।

 

প্রোগ্রামে সিডিউল ছিল?

প্রথম দিকে কিছুই ছিল না। তখন তো আমরা বেতার কেন্দ্রেই থাকতাম। হঠাৎ গভীর রাতে খবর এলো, বঙ্গবন্ধুর ফাঁসির কথাবার্তা চলছে, পাকিস্তান রেডিওতে নিউজ দিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে রাতভর যাঁরা রেকর্ডিং করতেন, তাঁদের বের করে দেওয়া হলো। তখনই এর ওপর গান লেখা আরম্ভ হয়ে গেল, আমাদের এক্ষুনি গাইতে হবে, কাল প্রচার করতে হবে। যেমন শহিদুল ইসলাম ছিল, সে লিখত, টি এস শিকদার লিখত। গান লেখা হলো, সঙ্গে সঙ্গে গানের সুর করা হচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে রেকর্ডিং—এ রকম হতো। একদম আর্মির মতো ওয়ান, টু, থ্রি বলে দাঁড়িয়ে যেতাম। খুব শৃঙ্খলা ছিল, একটি কমান্ডের মতো ছিল।

 

গান পেতেন কিভাবে?

আমাদের গান ছিল, বাইরের লোকেরাও এসে তাদের লেখা দিয়ে যেতেন। গোবিন্দ হালদারের বিখ্যাত গান ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে’র সুর করেছেন সমরদা। তিনি [গোবিন্দ হালদার] তো বাংলাদেশের না, ওখানকার লোক। এমন অনেকে এসে খাতা জমা দিতেন। গোবিন্দদার গানটি সমরদা বাছাই করেছেন। আমার কাছেও কোনো গান এলে বাছাই করতাম। আপেল যেমন বাছাই করে গোবিন্দ হালদারের ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি’ গাইল। ‘তারা এই দেশের সবুজ ধানের শীষে’ ড. মনিরুজ্জামানের লেখা, সমরদার সুর করা গান। মনিরুজ্জামান সাহেব এটি আগে এখানে রেডিওতে করেছিলেন। পরে স্বাধীন বাংলা বেতারে গিয়ে আমাকে দিয়ে আবার রেকর্ডিং করান। সমরদার ওই যে ‘নোঙর তোলো, তোলো, সময় যে হলো হলো’ সেটির লিডিং আর্টিস্ট তো আমি। ভেতরের টানটি তো আমার। বললাম তো, আমাকে ছাড়া সমরদা কিচ্ছু করেননি। কোনো কিছু করলে সমরদা আগে আমাকে বলেছেন, ‘তুই এই জায়গাটি তোর মতো করে করে ফেল। ’ এভাবে কাজ করতাম।

 

দেশ স্বাধীন হলো ১৬ ডিসেম্বর। আপনি কবে এলেন?

আমি তো অনেক পরে এসেছি, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার আটকে দিয়েছিলেন। তিনিই ‘শোন একটি মুজিবরের কণ্ঠধ্বনি’ লিখেছেন। তিনি বহু বিখ্যাত গানের গীতিকার। এপ্রিল পর্যন্ত কলকাতাতে ছিলাম। প্রায় দিন সন্ধ্যার পর বেতারের কাজ শেষ হলে হেঁটে গৌরীদার আড্ডায় যেতাম। ওখানে শিল্পী নীতা সেন, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, তরুণ মজুমদার, তপন সিনহা, অশোক তরু বন্দ্যোপাধ্যায়, পাহাড়ী স্যানাল, হেমন্তদা [হেমন্ত মুখোপাধ্যায়], শ্যামল মিত্র একেক দিন একেকজন আসেন। সে আড্ডাখানায় আমি সবার চেয়ে ছোট, চুপচাপ মাথা নিচু করে গল্প শুনতাম। যেমাত্র বাংলাদেশ সম্পর্কে কোনো কিছু আসত, গৌরীদা বলতেন, ‘জয় বাংলা আছে, ওকে জিজ্ঞাসা কর, বলতে পারবে। ’ এত কাছ থেকে এসব বিখ্যাত মানুষকে দেখার, কথা বলার, মেলামেশার সুযোগ হয়েছে বিকজ অব গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার। তিনি নিঃসন্তান ছিলেন তবে ছেলের মতো আমাকে ভালোবেসে ফেলেছিলেন।

 

এবার অন্য প্রসঙ্গ—সিনেমাতেও প্রচুর হিট গান উপহার দিয়েছেন।

১৯৬৭ সালে খান আতাউর রহমানের ‘সাত ভাই চম্পা’ দিয়ে সিনেমার গান শুরু। অনেক গান করেছি। আতা ভাইয়ের সুজন সখী, অঙ্গার, ফকির মজনু শাহ, নালিশ, দেশ-বিদেশে আরো অনেক ছবিতে গান করেছি এবং সবই মোটামুটি হিট—ফকির মজনু শাহর ‘সবাই বলে বয়স বাড়ে/আমি বলি কমে রে’, সারেং বউয়ের ‘হীরামতি, হীরামতি, ও হীরামতি’, নাগরদোলার ‘তুমি আরেকবার আসিয়া/যাও মোড়ে কান্দাইয়া’, এটি চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতির পুরস্কার পাওয়া, তারপর ‘এ কেমন অবিচার, বানাইয়া সাধের সংসার/তোরে দয়াল আমি বলব কেন বল’—এটি বিনি সুতার মালার, বেদের মেয়ে জোসনার—‘তুই ডাকলি যারে আপন করে’ হিট গান। আলী হোসেনের—‘ও লোকে বলে বোবার কোনো শত্রু নাই’, নারায়ণ ঘোষ মিতার তাসের ঘর—‘বিধি তোমার এই দুনিয়া/এই দুনিয়া যেন তাসের ঘর’—এটিও আমার গান। ডাকত, গান গাইতাম। বিশেষ করে বন্ধু আলাউদ্দিন আলী, আলম খান পরে আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, সুবল দাস, আলী হোসেনের সঙ্গে কাজ করেছি।

 

পেশাগত জীবন?

বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনে অ্যাসিসট্যান্ট ম্যানেজার মার্কেটিং থেকে জয়েন্ট ম্যানেজার মার্কেটিং হিসেবে একই জায়গায় চাকরি করছি। ২০০৫ সালে সেলফ রিটায়ারমেন্ট নিয়েছি। সে বছরই আমেরিকা চলে যাই।

 

বিদেশে কেন গেলেন?

বিদেশে ছেলেমেয়েরা থাকে। ছেলেমেয়েদের দেখতে হবে না? আমি বাপ না? আমি কী শুধু গায়ক রথীন্দ্রনাথ রায়? আমি তো কারো বাপ, সে দায়িত্ব আছে না? তাই করছি।

 

আগের মতো আর লোকগানের কদর নেই কেন?

এখন সব ডিজিটালাইজড হয়েছে। ভালো, স্বীকার করি—মানতে হবে আধুনিক সভ্যতা, সব মানলাম। কিন্তু এভাবে একটি সেক্টরকে নেগলেট করা হচ্ছে। মিডিয়ার দায়িত্ব এগুলোকে বুস্টআপ করা। কিন্তু তা হচ্ছে না, মিডিয়া অন্য কিছু নিয়ে ব্যস্ত। আমার সংস্কৃতি, আমার লোকসংস্কৃতি নিয়ে মিডিয়া কিছু করছে না। বিটিভি বাদে বাকি সব মিডিয়া অন্য কিছু নিয়ে ব্যস্ত, যেটি আমার সংস্কৃতি না। সেসব বাদ দিতে হবে বলছি না—সেসব করেন, সঙ্গে একেও রাখেন। এটিই আমার মূল পরিচিতি, নিজস্ব সম্পদ।

 শ্রুলখন : মাসুদ রানা আশিক

[১৪ নভেম্বর, ২০১৫, ঢাকা]


মন্তব্য