kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


যেখানেই গিয়েছি ছাপ রেখে আসতে চেষ্টা করেছি

১১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



যেখানেই গিয়েছি ছাপ রেখে আসতে চেষ্টা করেছি

নারী অধিকার, সমতা ও উন্নয়নে তাঁর অনবদ্য ভূমিকা আছে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেছেন।

চতুর্থ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় নারী স্বার্থ রক্ষায় ভূমিকা রেখেছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রথম নারী উপদেষ্টা একুশে পদকে ভূষিত ড. নাজমা চৌধুরীর মুখোমুখি হয়েছেন ওমর শাহেদ ও রওশন-ই-ফাতিমা। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

 

বেগম রোকেয়ার সঙ্গে পরিচয় কিভাবে?

প্রতিবছরই বাংলা বইয়ে একটি করে জীবনী পেতাম। তাঁর জীবনীটি আমরা পড়তাম। তখন বোধহয় ফাইভ-সিক্সে পড়ি। (দীর্ঘশ্বাস) সেখানেই বোধহয় তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়, কখনো তো ভেবে দেখিনি (হাসি)।

 

কিভাবে তিনি আপনাকে আকৃষ্ট করলেন?

পাঠ্য বইতে তাঁর ছবি দেখে ভাবতাম-কল্পনা করতাম, তিনি একজন বাচ্চা মেয়ে, পরিবারের সকলের অগোচরে ভাইয়ের কাছে নিজের ঘরে বসে পড়ছেন। হয়তো খাট থেকে নেমে গিয়ে মাটিতে চাদর বিছিয়ে পড়ছেন, প্রদীপের আলোতে ভাই তাঁকে পড়াচ্ছেন। কল্পনাটি মনে খুব প্রভাব ফেলল। বড় হয়ে উপলব্ধি করলাম, কত বাধাবিঘ্ন তাঁকে উতরাতে হয়েছে। সে সময় পর্দাপ্রথা এত বেশি ছিল যে অনাত্মীয় মহিলাদের সঙ্গেও তাঁকে পর্দা করতে হতো। বয়োজ্যেষ্ঠরা দূর থেকে কাউকে আসতে দেখলে বলতেন, অমুক আসছেন, সঙ্গে সঙ্গে তিনি দূরে চলে যেতেন। কখনো তাঁকে মুরগির চালায়ও উঠে বসতে হতো। এ ধরনের কষ্ট সহ্য করে তিনি বড় হয়েছেন। বিয়ের পর লেখাজোখা চালিয়ে গেলেন এবং স্বামী মারা যাওয়ার পর লেখালেখির আরো ব্যাপ্তি ঘটল। এসব কারণে তাঁকে খুব শ্রদ্ধা করি, তাঁর লেখা ভালো লাগে, একজন ব্যক্তিত্ব, ইতিহাসের অগ্রপথিক, এ দেশের নারী আন্দোলনের পুরোধা হিসেবে তাঁকে মনে করি। তাঁর সব কিছুর মধ্যে আদর্শ খুঁজে পাই।

আচ্ছা ইউনিভার্সিটিতে অনার্স পরীক্ষায় আপনার প্রতি নাকি অবিচার করা হয়েছিল?

অনার্সে ফার্স্ট ক্লাস সেকেন্ড হলাম। ছেলেদের ইউওটিসির (ইউনিভার্সিটি অফিসার্স ট্রেনিং কোর্স) নম্বর যোগ হতো। বাড়তি কোর্স ছিল এটি। আমাদের অনার্স পরীক্ষা ৯০০ নম্বরে হতো, ৮০০ সাবজেক্টিভ, ১০০ টিউটোরিয়াল ও ভাইভা। আর ছেলেরা ইউওটিসি মিলিয়ে এক হাজারে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পেত। ছেলেদের অতিরিক্ত এই কোর্সটি যে আছে সেটি আমি জানতাম না। যাই হোক, এই ১০০ নম্বরে ডিভিশন চেঞ্জ হতো না কিন্তু পজিশন চেঞ্জ হতে পারত। এটি বোধহয় কোনো রকমে মিলিটারি ট্রেনিংয়ের মতো একটি কোর্স ছিল। এ ঘটনার মাধ্যমে সমাজকর্মী শামসুন্নাহার মাহমুদ আমার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে গেলেন। তাঁর কাছে গিয়ে বললাম, আমার প্রতি অবিচার করা হয়েছে। আমি আর আমার এক সুযোগ্য পুরুষ সহপাঠী একই নম্বর পেয়ে পাস করেছি; কিন্তু তাঁকে ফার্স্ট করা হয়েছে, আমাকে সেকেন্ড। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন ‘কেন?’ তখন পুরো ঘটনা বললাম। তিনি জানতে চাইলেন ‘মেয়েদের জন্য কী কিছুই নেই?’ বললাম, না। ইউনিভার্সিটির সিন্ডিকেটকে তখন কোর্ট বলা হতো। কিছুটা আন্দোলন করে...কোর্টের সদস্য হিসেবে সিন্ডিকেটে তিনি আমার জন্য প্রোটেস্ট করেছিলেন। তাঁরা তখন বললেন, কী করতে চান? তিনি বললেন, মেয়েদের জন্য তাহলে আলাদা কিছু করেন। তখন নার্সিং কোর্স করানো হবে বলে ঠিক হলো। কোনো মেয়ে করত কি না জানি না; কিন্তু তাতে আমি কোনো বেনিফিট পেলাম না। যা ঘটার সেটি তো ঘটেই গেছে। ফার্স্ট ক্লাস সেকেন্ডই রইলাম। আমার সম্মানিত সহপাঠীর প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, নারীর বঞ্চনার এটিই আমার প্রথম অভিজ্ঞতা।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনায় যোগদানের সময়ও নাকি বাধা দেওয়া হয়েছিল?

বিয়ের আগেই শ্বশুর মারা গিয়েছিলেন, স্বামী সংসারের বড় ছেলে ছিলেন। তাঁরা ছিলেন জমিদার পরিবার। এমএ পাসের পর শিক্ষকরা যখন প্রস্তাব দিলেন, ‘নাজমাকে আমরা নিতে চাই। ’ শাশুড়ি জবাব দিলেন, ‘বউয়ের কি টাকা-পয়সার অভাব হচ্ছে যে চাকরি করবে? আমাদের ঘরের বউ চাকরি করবে না। ’ উল্লেখ্য, তিনি নওয়াব ফয়জুন্নেসার উত্তরসূরি ছিলেন। তবে আমার নানি-শাশুড়ি মানে তাঁর মা আমার পক্ষে ছিলেন। তিনি বললেন, ‘যখন অফার করেছে, বউ যাক। ’ এরপর স্বামীর অনুমোদন, আমার নিজের মা-বাবার সম্মতি আর শেষ পর্যন্ত শাশুড়িকে রাজি করিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে যোগদান করেছিলাম। পরে আমরা উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেছি। ২০০৭ সাল পর্যন্ত শিক্ষকতা করেছি, বিভাগীয় গবেষণা করেছি। এরপর তো ইমেরিটাস অধ্যাপক হলাম।

 

কেন উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগ প্রতিষ্ঠা করতে হলো?

প্রয়োজনীয়তাটি উদাহরণ দিয়ে বলি, পলিটিক্যাল সায়েন্সে কেন কোনো নারী রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বা দার্শনিক নেই, তা কখনো পড়ানো হয় না, নারী কেন রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে নেই বা থাকলেও বা কেন আছে—তা কখনো পড়ানো হয় না। নারী ভোটারদের ভোট বিশ্লেষণ হয় না। ভোটার বলতে আমরা মনে করি দুটোই সমান, এক করে দেখি। কিন্তু নারীকে আলাদা করে দেখার দরকার আছে। কারণ নারীর প্রয়োজন ভিন্ন, জীবনধারা ভিন্ন। নারীকে আলাদা করার দরকার আছে—এটি আমরা মনে করেছি। আমরা যাঁরা নারী উন্নয়ন সম্পর্কে লেখাজোখা করতাম, আমরা চাইতাম, কোনো একটি মাধ্যমে নারী সম্পর্কে অধ্যয়ন করা হোক। এ চিন্তা থেকে আমি, মাহমুদা ইসলাম, রওনক জাহানসহ আরো নারী যাঁরা লেখালেখি করতেন তাঁরা মনে করলেন, এখানে একটি সেন্টার হওয়া দরকার। সেন্টার করতে গিয়ে দেখলাম পুরুষদের সমর্থন প্রয়োজন হবে; কিন্তু সে সমর্থন আমরা পেলাম না।

 

তখন কী করলেন?

ভাইস চ্যান্সেলরকে ধরে, তাঁকে দিয়ে আমাদের একটি সেন্টারের অনুমোদন করিয়ে নিলাম কোনো রকম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটি বাস্তবে প্রয়োগ করার আগেই ফাইলটি হারিয়ে গেল। মানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে নেই হয়ে গেল।

 

বলেন কী?

হ্যাঁ, আমরা আর খুঁজেটুজে পেলাম না।

 

তারপর?

আমরা ভাবলাম এখানে আর কষ্ট করে লাভ নেই, বিভাগেই চেষ্টা করে দেখি। আশির দশকের শেষের দিকের ঘটনা বলছি—আমি পলিটিক্যাল সায়েন্সে, নাজমুন নেসা মাহতাব পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে, মাহমুদা ইসলাম সোসিওলজিতে—এই তিন বিষয়ের সিলেবাসের মধ্যে বিষয়টি সংযোজন করলাম। আমরা তিনজন তখন পদের দিক থেকে ওপরের দিকে স্থান পেয়ে গিয়েছি, সহযোগী অধ্যাপক, সুতরাং আমাদের কথার দাম ছিল। আমরা নিজ নিজ ক্ষেত্রে ইনফ্লুয়েন্স করতে পারলাম—একটি সিলেবাস হোক, পেপার হোক, উইমেন পলিটিকস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট হিসেবে একটি কোর্স হোক। আমার ডিপার্টমেন্টে আমি করলাম। সোসিওলজিতে এবং পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনেও তাঁরা বিভাগের সঙ্গে মিল রেখে কোর্স চালু করলেন।

 

আপনার পুরুষ সহকর্মীরা ব্যাপারটিকে কিভাবে দেখলেন?

যখন প্রস্তাব ওঠালাম, একজন প্রথিতযশা রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রস্তাবটির পক্ষে এভাবে সায় দিলেন, মিসেস চৌধুরী যখন বলেছেন তখন প্রস্তাবটি আমরা মেনেই নিলাম। (অট্টহাসি) আসলে বিষয়ের গুণাগুণ না দেখেই তিনি বললেন। (হাসি) বুঝতে তাহলে অসুবিধা হয় না, নেহাত দায়সারা করে কোর্সটি নেওয়া হলো কিন্তু ১৯৮৪-৮৫ সালে যখন চেয়ারম্যান ছিলাম, সিলেবাস সম্পূর্ণ নতুনভাবে করেছিলাম। তাতে উইমেন পলিটিকস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কোর্স হিসেবে ঢুকিয়ে দিলাম এবং অন্যান্য পেপারের মধ্যেও যেমন পলিটিকস অব বাংলাদেশের মধ্যে উইমেন লিডারশিপ নিয়ে এলাম। এভাবে বাংলাদেশের রাজনীতির প্রতিপাদ্যের মধ্যে নারীকে নিয়ে এলাম, যাতে একে যথাসম্ভব ছড়িয়ে দেওয়া যায়, এক জায়গায় আবদ্ধ হয়ে না থাকে। অন্য যাঁরা উদ্যোগটি নিয়েছিলেন তাঁদেরও আমারই মতো অবস্থা ছিল। আমাদের ক্লাসে ছাত্রছাত্রী বেশি হতো, পেপারটিকে অপশনাল করে দিয়েছিলাম। পরে দেখলাম, শুধু একটি কোর্স চালু করে নারী-পুরুষের বৈষম্য সম্পর্কে জানান দেওয়া সম্ভব হলো না। সে ধারণা থেকেই আমরা বললাম, তাহলে আলাদা ডিপার্টমেন্ট করা হোক।

 

উপাচার্যের কেমন সাহায্য পেয়েছিলেন?

তখন আজাদ চৌধুরী (এ কে আজাদ চৌধুরী) ভাইস চ্যান্সেলর ছিলেন, তাঁর নতুন বিষয়ের প্রতি খুব আগ্রহ ছিল। আমাদের সমর্থন দিতে তিনি রাজি হলেন। এ সময় যেসব পুরুষ শিক্ষকের সঙ্গে আমরা আলোচনা করলাম, তাঁদের মোটামুটি সবাই বিভাগ স্থাপনের ব্যাপারে সম্মতি জানাতে রাজি হলেন। ফলে আশির দশকে যেসব বাধার মুখোমুখি আমরা হয়েছিলাম, নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে এসে সেগুলো অতিক্রম করতে সক্ষম হলাম। ইতিমধ্যে সরকার নারী উন্নয়ন নীতিমালাটি গ্রহণ করেছে, জাতীয় উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় নারীর ভূমিকা মেনে নিয়েছে। এটি আমাদের কাজকে অনেক সহজ করে দিল। তখন তাঁরা বললেন, আপনারা একজনকে নিয়ে আসেন, যিনি সবর্জনগ্রাহ্য হবেন এবং কাজটি করতে পারবেন। সবাই এসে বলল, ‘তুমি সই দাও। নারী শিক্ষকদের পক্ষ থেকে আমাদের আবেদনটি আমার একার সইয়ে গেল। এটি ১৯৯৯ বা ২০০০ সালের ঘটনা। তবে এটি শুধু আমার একার সংগ্রাম নয়, অনেকের সংগ্রাম।

 

তারপর কী হলো?

নতুন বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে আজাদ চৌধুরী আমাকে নিয়োগ দিলেন এবং অন্যান্য বিভাগের যাঁরা আমাদের সঙ্গে ছিলেন, তাঁরা নিজ নিজ পেপারটি এসে পড়াতেন। সিলেবাস কমিটি করলাম। আমি চেয়ারম্যান ছিলাম আর আরেকজন শিক্ষক ছিলেন নাজমুন নেসা মাহতাব। ২০০০ সালে প্রথম ব্যাচে ছাত্রছাত্রী মিলে ১০-১২ জন পেলাম।

 

উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগে ছাত্র কেন দরকার?

এ জন্য যে সমাজকে তো পরিবর্তন করতে হবে। যেকোনো সমাজে পরিবর্তন আনার জন্য তো উভয়কেই দরকার। আমার মনে হয়, পুরুষদের দিকেই বেশি নজর দেওয়া দরকার। কারণ তারাই তো ক্ষমতার চাবিকাঠি নিয়ন্ত্রণ করে।

 

ডিপার্টমেন্ট নিয়ে এমন কোনো স্বপ্ন আছে, যেটি এখনো পূরণ হয়নি?

ডিপার্টমেন্টটি নিয়ে আমি একটু অসন্তুষ্ট। ভেবেছিলাম একে সেন্টার অব এক্সিলেন্স করা যাবে, সেটি করা হচ্ছে না, বাস্তবসম্মত কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানা নেই। সেটিই আমার দুঃখ। তবে আমি আশাবাদী, হয়তো কোনোদিন হবে।

 

এবার অন্য প্রসঙ্গআপনার একটি বিশ্বখ্যাত বই আছেউইমেন অ্যান্ড পলিটিকস ওয়ার্ল্ড ওয়াইড।

আমার পত্রবন্ধু বারবারা জে নেলসন ইউনির্ভাসিটি অব মিনেসোটায় হিউবার্ট হামফ্রে ইনস্টিটিউটে পড়ায়। ১৯৮৫ সালে নাইরোবিতে তৃতীয় বিশ্ব নারী সম্মেলনে গিয়েছি আমরা। সেখানেই আমরা ঠিক করলাম বইটি লিখব। প্রথমে ছিল ১৩টি রাষ্ট্র, বাড়তে বাড়তে শেষে ৪৩টি দেশে এসে দাঁড়াল। এই বইয়ের জন্য আমরা অনেক মিটিং করেছি। কনফারেন্সে অংশ নিতে যেখানে গিয়েছি, মিটিংয়ের পরে যত লেখক পেয়েছি, মিটিং করেছি। আমাদের যেসব বিষয় প্রয়োজন সেগুলো তাঁদের বলতাম, তাঁদের লেখা নিয়ে আলোচনা হতো। দেশে গিয়ে তাঁরা বাকিটুকু লিখে পাঠাতেন।

 

এই বইটির মধ্যে কী আছে?

এখানে ৪৩টি দেশের প্রায় ৫৭ জন লেখক ছিলেন। নারীর রাজনৈতিক অবস্থান বিশ্লেষণে বইটি গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এতে নারীর রাজনীতিতে অংশগ্রহণের বিভিন্ন প্যারামিটার নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে বিভিন্ন রাষ্ট্রে নারীর অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে, যাতে সে রাষ্ট্রগুলোর রাজনীতিতে নারীরা কী অবস্থায় আছে বা তাদের সমস্যাগুলো কী—সেগুলোর তুলনামূলক চিত্র বেরিয়ে আসে। আমিও তিনটি বিষয় নিয়ে লিখেছিলাম। বইটি ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। অনেকে বলেছেন, তাঁরা, তাঁদের ইউনির্ভাসিটি বইটি ফলো করে। ১৯৯৪ সালে বইটিকে আমেরিকার পলিটিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন ‘বেস্ট বুক অন উইমেন ইন পলিটিকস’ হিসেবে ডিক্লেয়ার করে।

 

চতুর্থ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়ও তো অবদান আছে।

উইমেন ফর উইমেনের দুই মেয়াদের সভাপতি হিসেবে আমার সবচেয়ে বড় অবদান, মূলধারায় নারীকে সন্নিবেশিত করার কার্যক্রম ত্বরান্বিত করার জন্য চতুর্থ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা গ্রহণের আগে পরিকল্পনামন্ত্রীর সঙ্গে প্রচুর প্রস্তুতি বৈঠক এবং এ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সব নারী সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে তাদের একটি অভিন্ন মত তৈরি। আমাদের সাফল্য এই যে অন্য পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাগুলোয় খুব সীমিত পরিসরে নারী উন্নয়নের কথা বলা আছে। তবে সব নারী সংগঠনকে একত্র করে সরকারের সঙ্গে সে সময় দেনদরবারের মাধ্যমে নারীর স্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্যে এ পরিকল্পনা প্রণীত হয়েছে। ১৯৯৫ সালের শেষের দিকে বেইজিংয়ে চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলন হয়ে যাওয়ার পর প্রায় সব দেশের সরকারই এটি পাস করে। সে সম্মেলনে এমন কিছু ধারা ছিল, যেগুলো রাষ্ট্রগুলোকে নারী উন্নয়ন বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে সাহায্য করে। তারা একটি সময়সীমা বেঁধে দেয় যে আগামী এক-দুই বছরের মধ্যে তারা কাজটি করবে। একে সামনে রেখে ১৯৯৫ সালে সরকার একটি কোর গ্রুপ ও একটি টাস্কফোর্স গঠন করে। দুটোতেই আমার নাম দেখতে পাই। খুব কম সদস্যই দুই গ্রুপে ছিলেন। আমি তাঁদের একজন। ১৯৯৬ সালের ৩ এপ্রিল মহিলা মন্ত্রণালয়ে উপদেষ্টা হিসেবে গেলাম। তখন আমার জন্য বিরাট সুযোগ এলো। সিদ্ধান্ত নিলাম, নারী আন্দোলন এবং সরকারকে একই লেভেলে আনার জন্য পার্টনারশিপ দরকার। সে জন্য প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে স্ন্যাট (সেক্টোরিয়াল নিডস অ্যাসেসমেন্ট টিম) করা হয়েছিল। প্রতিটি টিমে অন্যদের মধ্যে সে মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিনিধি আর নারী আন্দোলনের একজন প্রতিনিধি আছেন। স্ন্যাট রিপোর্ট টাস্কফোর্সে উপস্থাপন করা হয় এবং কোর গ্রুপের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে এটি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা হিসেবে গৃহীত হয়। শুনেছি এ কর্মপরিকল্পনা এখনো জাতীয় উন্নয়ন নীতিতে প্রভাব ফেলছে। নিজের তারিফ না করেই বলছি, যেখানেই গিয়েছি, ছাপ রেখে আসতে চেষ্টা করেছি।

 

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রথম নারী উপদেষ্টা হিসেবে কাজ শুরুর দিনগুলো কেমন ছিল?

একদিন প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সাহেবের ফোন পেলাম, ‘নাজমা আপনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারে কাজ করতে রাজি আছেন? রাজি থাকলে বলেন কিন্তু কাউকে বলতে পারবেন না। এও হতে পারে, কালই ফোন পেতে পারেন। ’ পরে তিনি ফোন করলেন। তারপর তো যুক্ত হয়ে গেলাম। গিয়ে দেখলাম তিনি আমাকে দিলেন সমাজকল্যাণ ও মহিলা মন্ত্রণালয় আর কী যেন ছিল...শ্রম ও জনশক্তি। প্রথম দিকে তিন মন্ত্রণালয় নিয়ে হিমশিম খেতাম। ইউনূস (ড. মুহম্মদ ইউনূস) সাহেবকে একদিন বললাম, ‘বুঝতে পারছি না কিভাবে কাজ এগিয়ে নেব, কোনটিতে মন দেব?’ তিনি বললেন, ‘এক কাজ করেন, একটিতে মন দেন, একটিকে খুঁটি করেন, বাকিগুলোতে যাওয়া-আসা করেন আর কিছু করার দরকার নেই। ’ যেহেতু আগে থেকেই মহিলাবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল, তাই সিদ্ধান্ত নিলাম, এটিতেই সময় বেশি দেব। তাতে আমার খুব লাভ হয়েছিল। আমি যে কিছু জানি এবং আমার পক্ষে যে মেয়েদের জন্য কিছু করা সম্ভব সেটি প্রমাণ করতে পারলাম।

 

বাংলাদেশে নারী উন্নয়নের ক্ষেত্রে কী কী বাধা আছে?

যাঁরা নীতি প্রণয়ন করেন, তাঁদের আসলে নারীর অবস্থান সম্পর্কে যথার্থ জ্ঞান নেই। নারীর অবদান, নারীর অধিকার যেমন নারীর কী কী অধিকার থাকা উচিত সে সম্পর্কে জ্ঞান নেই। থাকলেও তাঁরা এমন পরিবেশে মানুষ হয়েছেন, এমন পরিসরে কাজ করেন যেটি রক্ষণশীল। ফলে তাঁদের মনোভাবও রক্ষণশীল হয়। আর যেহেতু নারী সম্পর্কে তাঁরা কিছুই জানেন না, ফলে দেখি যে খুব উন্নয়নমূলক একটি নীতি গ্রহণ করা হলেও প্রায়োগিক ক্ষেত্রে গোঁজামিল থেকে যাচ্ছে। এমন একজন এই নীতি প্রয়োগ করছেন, যিনি নারী উন্নয়নে বিশ্বাস করেন না, নারীর সম-অধিকারে বিশ্বাসী নন। এটিই আমাদের ক্ষেত্রে নারী উন্নয়নের সবচেয়ে বড় সমস্যা। নারী উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড ঠিকই হচ্ছে কিন্তু যাঁরা এসব কর্মকাণ্ড করছেন, তাঁরা তাঁদের পেছনের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এখনো বেরিয়ে আসতে পারেননি।

 

প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতাসহ যেসব নারী অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছেন নারী উন্নয়নে তাঁদের ভূমিকা কতটুকু?

শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া দুজনই সাধারণ নির্বাচনী এলাকা থেকে একাধিক আসনে এমপি হয়েছেন। তাই তাঁরা জনগণের নেতা বলে বিবেচিত হন কিন্তু তাঁরাই আবার নারীদের কেবল সংরক্ষিত আসনে নমিনেশন দিচ্ছেন। আমি বলতে চাই, যেসব বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত তাঁদের নেওয়া উচিত ছিল তা তাঁরা নেননি। তাঁদের নীতি ও সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নারীদের আরো সামনে নিয়ে আসা প্রয়োজন ছিল। তবে আনন্দিত ও আশাবাদী হই যে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর কিছু সিদ্ধান্ত নারীর অগ্রগামিতায় সহায়ক ভূমিকা রাখছে। গর্বিত বোধ করি, দেশের গুরুত্বপূর্ণ বেশকটি সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী পর্যায়ে নারীর অবস্থান দেখে।

 

আপনার দুই মেয়েই তো সমাজে প্রতিষ্ঠিত।

হ্যাঁ প্রতিষ্ঠিত। এক মেয়ে ও জামাই দুজনই ডেন্টিস্ট—লামিয়া চৌধুরী ও আবুল হাসান মাহমুদ। তারা টরন্টো চলে গেছে, এখন সেখানেই থাকে। আমার জামাই একটি ডেন্টাল কলেজে পড়ায় ও প্র্যাকটিস করে। মেয়ে হাসপাতালে চাকরি করে। সে ডেন্টাল লাইনে যায়নি। ওখানে ডেন্টাল লাইনে যাওয়া অনেক পরিশ্রমের কাজ। নিউট্রিশনে পড়ে সে হাসপাতালে নিউট্রিশন অ্যাডভাইজার হিসেবে আছে। ছোট মেয়ে বুশরা হাসিনা চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক। তার স্বামী ওবায়দুল হকও একই বিভাগে একই পদে অধ্যাপনা করে।

 

একটু ব্রেক দিই?

দাও।

 

রোগটি কিভাবে হলো?

বাবা [চৌধুরী ইমামুজ্জামান, সি আই জামান নামে পরিচিত] মারা যাওয়ার পর মোনাজাত করছিলাম—দেখি হাত কাঁপছে। ভাবলাম, কেন হলো? পরে মনে হলো, তখন তো মানসিক অবস্থা ভালো ছিল না। আব্বা মারা গেছেন হয়তো সেই শকে হয়েছে। ৯-১০ মাস পরে আম্মা [আমিরুন্নেসা খাতুন] মারা গেলেন, তখনও দেখি হাত কাঁপছে। ফের মনে হলো, হয়তো আম্মার মৃত্যুর মানসিক প্রভাবে হচ্ছে; কিন্তু হাত কাঁপার জন্য যখন ডাক্তার দেখালাম, তিনি বললেন, এটি মানসিক নয়, শারীরিক ব্যাপার। আপনার পারকিনসন্স হয়েছে।

 

কেন হলো?

কেন হলো সেটির কোনো ব্যাখ্যা নেই।

 

তারপর?

ওষুধ দেওয়া হলো। হাজব্যান্ডের (সাবেক প্রধান বিচারপতি প্রয়াত ব্যারিস্টার মাইনুর রেজা চৌধুরী) চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর যেতাম। ওখানে কিছুদিন চিকিৎসা করালাম। সেখানে ডাক্তার বললেন, এটি এমন একটি রোগ—যার সঙ্গে আপনাকে যুদ্ধ করতে হবে। যখন মাথা নত করবেন আরো চেপে বসবে। কিছুতেই মাথা নত করবেন না। সেই থেকে পারকিনসনিজমের সঙ্গে ফাইট করছি। ১৯৯৩ সাল থেকে প্রায় ২৩-২৪ বছর হয়ে গেছে, অসুখটি আছে।

 

একদম সেরা সময়ে রোগটি ধরে বসল।

এ জন্য আমার আফসোস হয়, মাঝেমধ্যে মনে হয়, আমি একটি প্রান্তে দাঁড়িয়ে গিয়েছি, সবাই সামনে দিয়ে একটি গতিপথ নিয়ে চলে যাচ্ছে। আর আমি এক পাশে পড়ে আছি।

 

কিভাবে দিন কাটান?

নিরিবিলি থাকতেই ভালো লাগে। কখনো আত্মীয়স্বজনের বাসায় বেড়াতে যাই, না হলে বাসায় থাকতে পছন্দ করি। ভাইবোন, দেবর-ননদের পরিবারের সদস্যরা এলে অনেক ভালো লাগে। তবে সবচেয়ে ভালো লাগে, আমার নাতি-নাতনিদের সঙ্গ।

শ্রুতলিখন : রত্না সরকার ও

মাসুদ রানা আশিক

[ ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৬, ঢাকা ]


মন্তব্য