kalerkantho

তালিকায় ৬৯ বাস্তবে ২০টি

শেবাচিম হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগে রোগ পরীক্ষা

আজিম হোসেন, বরিশাল   

২৯ মে, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগে রোগ পরীক্ষার তালিকায় ৬৯টি পরীক্ষার নাম রয়েছে। যেগুলো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সহজেই করতে পারবে তা ওই তালিকায় তারা সংযোজন করেছে। কিন্তু তালিকায় থাকা ৬৯টি পরীক্ষার মধ্যে শুধু ২০টি পরীক্ষা করাতে পারছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। বাকি ৪৯টি পরীক্ষাই এ হাসপাতালে হচ্ছে না। যে পরীক্ষাগুলো হচ্ছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্লাড সুগার, প্রসব (প্রেগনেন্সি), প্রসব (রুটিন), সিরাম কোলেস্টেরল, ব্লাড গ্রুপিং, ব্লাড ক্রসমেচিংয়ের মতো ছোটখাটো পরীক্ষা। এর বাইরে বড় ধরনের কোনো পরীক্ষা প্যাথলজি বিভাগে হচ্ছে না। কারণ হিসেবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানাল যন্ত্রপাতি ও টেকনোলজিস্ট সংকটের কথা।

শেবাচিম হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, প্যাথলজি বিভাগে ৬৯টি পরীক্ষার তালিকা রয়েছে। এই পরীক্ষাগুলোকে ক্লিনিক্যাল প্যাথলজি, বায়োকেমিস্ট্রি বা ক্লিনিক্যাল কেমিস্ট্রি, রক্ত পরিসঞ্চালন কেন্দ্র ও মাইক্রোবায়োলজি এবং ইমুইনোলজি বিভাগে ভাগ করার নির্দেশনাও রয়েছে। তবে মাইক্রোবায়োলজি এবং ইমুইনোলজি বিভাগের ১৮টি পরীক্ষার মধ্যে মাত্র দুটি, রক্ত পরিসঞ্চালন বিভাগের চারটি পরীক্ষার মধ্যে একটি, বায়োকেমিস্ট্রি বা ক্লিনিক্যাল কেমিস্ট্রি বিভাগের ৩১টি পরীক্ষার মধ্যে ১০টি ও ক্লিনিক্যাল প্যাথলজি বিভাগের ১৭টি পরীক্ষার মধ্যে সাতটি পরীক্ষা করা হয়। বাকি পরীক্ষাগুলো শুধু তালিকায়ই রয়ে গেছে। গত বুধবার বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিত্সা নেন আকতার হোসাইন সরদার নামের এক ব্যবসায়ী। ব্লাডে সুগারের (ডায়াবেটিস) পরিমাণ বেশি হওয়ায় চিকিৎসক তাঁকে এইচবিএ ১সি নামক একটি পরীক্ষা করতে দেন। শেবাচিম হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগের পরীক্ষার তালিকায় এটি থাকায় আকতার সেখানেই যান।

তবে ওই বিভাগের কর্মরতরা তাঁকে জানিয়ে দেন এ পরীক্ষাটি এই হাসপাতালে করা হয় না। কারণ এই পরীক্ষার জন্য যে মেশিনের প্রয়োজন তা অনেক ব্যয়বহুল। শেবাচিম হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ বিভাগে চিকিত্সাধীন মো. এসহাক আলী। তাঁকে চিকিৎসক লিভার ফাংশন পরীক্ষা করাতে দেন। হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগের তালিকায় এ পরীক্ষাটি থাকায় সেখানে করানোর জন্য যান এসহাক আলীর স্বজনরা। তবে প্যাথলজি বিভাগ থেকে জানানো হয়, এ পরীক্ষাটিও এখানে করা হয় না। আর তালিকায় নাম থাকার বিষয়ে বলেন, ‘মন্ত্রণালয় যে চার্ট দিয়েছে আমরা তা টাঙিয়ে দিয়েছি। তালিকার সব পরীক্ষা এখানে হয় না।’ তাই শুধু এসহাক আর আকতার হোসেনই নয়, এ রকম অসংখ্য রোগী হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগে এসে পরীক্ষা করাতে না পেরে হয়রানির শিকার হন।

তবে ওই পরীক্ষাগুলো না হওয়ার কারণ হিসেবে জনবল সংকট ও যন্ত্রপাতি না কিনতে পারাকেই দায়ী করেন প্যাথলজি বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। রক্ত পরিসঞ্চালক বিভাগে টেকনোলজিস্ট রয়েছেন মাত্র একজন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে মহাপরিচালকের আদেশে চুক্তিভিত্তিক আরো চারজন টেকনোলজিস্ট কাজ করছেন। এ বিভাগে শুরু থেকে টেকনোলিজস্ট সংকট রয়েছে। টেকনোলজিস্ট নাজেম সিকদার অবসরে যাওয়ার পর এখন কাজ করছেন একমাত্র সুনীল চন্দ্র বাড়ৈ।

রক্ত পরিসঞ্চালন বিভাগের টেকনোলজিস্ট সুনীল চন্দ্র বাড়ৈ বলেন, ‘রক্ত পরিসঞ্চালন বিভাগে দেড় শতাধিক রোগীর রক্ত ক্রস ম্যাচিং করা হয়। এর বাইরে সাড়ে তিন শতাধিক রোগীর শুধু রক্তের গ্রুপিং করা হয়। কারণ অনেক রোগীর স্বজনরা ডোনার নিয়ে আসেন, তবে জানে না তাঁর রক্তের গ্রুপ কী। অনেক সময় একজন রোগীর রক্তের জন্য আমাদের ১০ জনের রক্তের গ্রুপিং করার প্রয়োজন হয়। আর এক ব্যাগ রক্তের ক্রস ম্যাচিংয়ের জন্য আমাদের সাতটি পরীক্ষা করতে হয়। এতে যে সময়ের প্রয়োজন তাতে অন্য কোনো পরীক্ষা করা এখানে সম্ভব হয় না।’

প্যাথলজি বিভাগের টেকনোলজিস্ট ও বরিশাল জেলা টেকনোলজিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আশিষ কুমার সোম বলেন, ‘এ বিভাগে আমরা পাঁচজন কর্মরত আছি। আমরা পাঁচজনে প্রতিদিন দুই শতাধিক রোগীকে সেবা দিই। সেই সেবাটা কতটা কষ্ট করে দিতে হয় তা একমাত্র আমরাই অনুধাবন করি।’ প্যাথলজি বিভাগে (অন্ত ও বহির্বিভাগ) প্রতিদিন দুই শতাধিক রোগী সেবা নেয়। একজন রোগীর পরীক্ষার বিষয় (আইটেম) থাকে পাঁচ-ছয়টি করে। তবে এখানে টেকনোলজিস্ট আছেন মাত্র পাঁচজন। সৃষ্ট পদ সাতটি থাকলেও দুজন আছেন প্রেষণে (ডেপুটেশন)। ফলে সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে টেকনোলজিস্টদের। এ ছাড়া অনেক পরীক্ষা রয়েছে যার জন্য আলাদা করে একটি মেশিনের প্রয়োজন হয়, যা ব্যয়বহুল। এগুলো সরবরাহ না করার কারণে ওই পরীক্ষাগুলো হয় না। তা ছাড়া সব মিলিয়ে তাদের বিভাগে ৬৯ পরীক্ষার প্রায় ৪০টির মতো হয় বলেও দাবি করেন আশিষ কুমার।

শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. বাকির হোসেন বলেন, ‘আমরা ৬৯টি পরীক্ষার তালিকা টাঙিয়ে দিয়েছি যা করা সম্ভব। তবে সেগুলোর মধ্যে অনেক পরীক্ষা করা হচ্ছে না যন্ত্রপাতি না থাকায়। আর ওই যন্ত্রপাতি কেনার জন্য বরাদ্দের টাকাও আটকে আছে। আমরা ওই যন্ত্রপাতিগুলো কেনার চেষ্টা করছি। যদি তা সম্ভব হয় তবে ৬৯ পরীক্ষার সিংহভাগ আমরা করতে পারব।’

মন্তব্য