kalerkantho


কাউখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ৫০ শয্যায় উন্নীত

ভিত্তি নির্মাণেই ১০ বছর

দেবদাস মজুমদার, পিরোজপুর   

২৯ মে, ২০১৮ ০০:০০



ভিত্তি নির্মাণেই ১০ বছর

পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ৫০ শয্যার ভবনের নির্মাণকাজ ২০০৮ সালে শুরু হয়। ১০ বছর পার হলেও আর কাজ এগোয়নি। ছবিটি সম্প্রতি তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ৩১ থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করার লক্ষ্যে ২০০৮ সালে সম্প্রসারিত নতুন ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হয়। পরে ভবনের ভিত্তি আর কিছুটা পিলার ওঠে। এরপর কেটে গেছে ১০ বছর। কিন্তু তিনতলা ভবনটির কাজ আর হয়নি। ১০ বছর আগে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষিত ৩১ শয্যার পুরনো ভবনেই কোনোমতে চলছে চিকিত্সাসেবা। এদিকে হাসপাতালে রয়েছে চিকিৎসক সংকট। এসব কারণে স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে উপজেলার মানুষ।

সূত্র জানায়, ২০০৮ সালের ২৫ আগস্ট মেসার্স নূর-ই-এন্টারপ্রাইজ নামের বরিশালের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাউখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সম্প্রসারিত ৫০ শয্যার নতুন ভবন নির্মাণের কার্যাদেশ পায়। কার্যাদেশের ১৮ মাসের মধ্যে নির্মাণকাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। সে অনুযায়ী ২০১০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা। পরে ভবন নির্মাণের ভিত্তির জন্য দুটি পুকুর খনন করে ভিত্তি আর পিলার নির্মাণের পর ফেলে রাখা হয়।

এ অবস্থায় স্থবির হয়ে পড়ে হাসপাতাল নির্মাণকাজ। এ ব্যাপারে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বারবার আবেদনের পর ২০১৪ সালের ২৫ জুন নূর-ই-এন্টারপ্রাইজের কার্যাদেশ বাতিল করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

এ প্রকল্পে হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য চার ইউনিটের দুটি নতুন আবাসিক ভবন নির্মাণ, একটি নতুন দ্বিতল বহির্বিভাগ ভবন নির্মাণ, পুরনো হাসপাতাল ভবন ও কোয়ার্টারগুলোর সংস্কারকাজও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এসব কাজও নূর-ই-এন্টারপ্রাইজ পেয়েছিল। নতুন হাসপাতাল ভবন নির্মাণ প্রকল্পে দীর্ঘসূত্রতার জটিলতায় উপজেলার চিকিত্সাব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, পুরনো ৩১ শয্যার হাসপাতাল ভবনটি এখন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সামান্য বৃষ্টি হলেই ১০ বছর আগে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষিত স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভবনের ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে। আর সিলিং ও বিম থেকে কংক্রিট ভেঙে পড়া নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার।

স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ও কর্মচারীদের আবাসস্থলের অবস্থাও একেবারেই ভালো নয়। যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন চিকিৎসক-কর্মচারীরা।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় করুণ হাল বিরাজ করছে। প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও দুজন চিকিৎসক নিয়ে জোড়াতালি দিয়ে চলছে দেড় লক্ষাধিক মানুষের চিকিত্সাসেবা। ৭৯ দশমিক ৬৪ বর্গকিলোমিটার আয়তনের কাউখালী উপজেলা পাঁচটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৯ জন এবং পাঁচ ইউনিয়নে পাঁচটি এফডাব্লিউসিতে (ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র) একজন করে চিকিৎসক থাকার কথা। কিন্তু স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্বাস্থ্য কর্মকর্তাসহ তিনজন চিকিৎসক আছেন। শিয়ালকাঠির এফডাব্লিউসিতে ডা. ওসমান গনি থাকলেও ডেপুটেশনে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে একটি দুই বছরমেয়াদি কোর্সে অংশ নিয়েছেন। পাঁচটি এফডাব্লিউসিতেই কোনো চিকিৎসক না থাকায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের গরিব-অসহায় রোগীরা চিকিত্সাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

এ ছাড়া বিশেষজ্ঞ কোনো চিকিৎসক না থাকায় সাধারণ কোনো সমস্যায়ও ৬০ কিলোমিটার দূরে বরিশালের শের-ই-বাংলা চিকিত্সা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতালে যেতে হয় রোগীকে। গাইনি বিভাগ, অ্যানেসথেসিয়া বিভাগ, ডেন্টাল বিভাগ, প্যাথলজি বিভাগ, আরএমও বিভাগে চিকিৎসক দীর্ঘদিন ধরে না থাকায় চিকিত্সা পাচ্ছে না রোগীরা। এক বছর আগে ডেন্টাল সার্জন হিসেবে ডা. লিটন ভূষণ বড়ালকে পদায়ন করা হলেও তিনি যোগ দিয়ে সেদিনই ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে চলে যান।

অন্য একজন মেডিক্যাল অফিসার ২০১৬ সালের ৭ মে যোগ দিয়েই পাঁচ দিনের ছুটিতে যান। তিনি আর এ হাসপাতালে ফেরেননি। ওই চিকিৎসককে দুই দফা চিঠি দিলেও তা ফেরত আসে। কিছুদিন আগে তিনি দেড় মাসের মেডিক্যাল ছুটির আবেদন পাঠিয়েছেন। আর একজন মেডিক্যাল অফিসার ডা. ওয়ালিউর মিরাজ দুই মাসের ফাউন্ডেশন ট্রেনিং করে এসেছেন।

উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মো. ছিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘বহুবার আবেদন-নিবেদনের পরও ৩১ থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীতকরণের জন্য নতুন ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও প্রকৌশল বিভাগের গাফিলতির কারণে ভবন নির্মাণ থমকে আছে। ১০ বছর আগে ৩১ শয্যার পুরনো উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। বিকল্প ভবন না থাকায় জরাজীর্ণ ভবনেই হাসপাতালের ইনডোর ও আউটডোর চিকিত্সাসেবা দিতে হচ্ছে।’

পিরোজপুরের সিভিল সার্জন মো. ফারুক আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ভবন ও ডাক্তারদের আবাসিক ভবনগুলো চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। কোনো ডাক্তার এসে এখানে চাকরি করতে চান না বিধায় ডাক্তার সংকটও কাটছে না। অন্যদিকে প্রশাসনিক নানা জটিলতায় নতুন ৫০ শয্যার হাসপাতাল ভবন নির্মাণকাজও স্থবির। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।’ তিনি বলেন, ৫০ শয্যার নতুন হাসপাতাল ভবন নির্মাণ অতি জরুরি। তবে আগামী অর্থবছরের বাজেটে এ প্রকল্পে নতুন অর্থ বরাদ্দ ছাড়া আপাতত ভবন নির্মাণকাজ শুরু করা যাচ্ছে না।

 



মন্তব্য