kalerkantho


ক্রিকেট বদলালে স্বস্তি বাংলাদেশেরই

রাহেনুর ইসলাম

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



ক্রিকেট বদলালে স্বস্তি বাংলাদেশেরই

আকাশের যত তারা ক্রিকেটের নাকি তত ধারা! কখন কোন নিয়ম চালু হয় কোনটাই বা যায় ঝরে, হিসাব রাখা কঠিন। গত কয়েক বছর আবার আইসিসির একেকটা সভা মানে ছোট দলগুলোর জন্য আতঙ্ক। ওয়ানডেতে বিশ্বকাপে তারা দল কমিয়ে এনেছে ১০টি! অথচ ফিফা ৩২-এর বদলে ফুটবল বিশ্বকাপ করতে যাচ্ছে ৪৮টি দল নিয়ে। ‘বিগ থ্রি’ নাম দিয়ে ক্রিকেটটা নিজেদের খেয়ালখুশিমতো চালানোর বন্দোবস্তও করে ফেলছিল ভারত, ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়া। ২০১৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত আইসিসির আয়ের ২৭.৪ শতাংশই নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা পাস পর্যন্ত করিয়ে নেয় তিন দেশের ক্রিকেট বোর্ড।

বাংলাদেশের জন্য আতঙ্কের হয়ে আসে আবার টেস্টের দ্বিস্তর পরিকল্পনা। র‌্যাংকিংয়ের প্রথম ৮ দল প্রথম স্তরে আর বাকিরা দ্বিতীয় স্তরে থাকলে অস্ট্রেলিয়া, ভারত, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কালেভদ্রেই খেলার সুযোগ হতো বাংলাদেশের। শেষ পর্যন্ত পাস হয়নি সেই সিদ্ধান্ত। তবে নতুন মোড়কে দ্বিস্তর ফিরে আসতে পারে আবারও। গত সপ্তাহে দুবাইতে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের যে সভা শেষ হয়েছে, সেখানে সুপারিশ করা হয়েছে সূচি আমূল বদলে ফেলার।   আগামী এপ্রিলের আইসিসি সভায় সুপারিশগুলো পাস হওয়ার অপেক্ষা এখন।

সুপারিশ করা হয়েছে দুই বছরব্যাপী টেস্ট লিগের। যেখানে প্রথম স্তরে খেলবে র‌্যাংকিংয়ের সেরা ৯-এ থাকা দলগুলো। পরের স্তরে তিনটি। সম্ভাবনা বেশি জিম্বাবুয়ের সঙ্গে নতুন দুটি টেস্ট দলের সেখানে থাকার। সে দুটি দল হতে পারে আয়ারল্যান্ড ও আফগানিস্তান। এর বাইরে ১৩টি দল নিয়ে তিন বছরব্যাপী ওয়ানডে লিগের সুপারিশও করা হয়েছে দুবাইয়ের সভায়। ২০২৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপের দলগুলো এর মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়ার কথা। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের জন্য থাকবে বাছাই পর্ব। আঞ্চলিক সেই বাছাই পর্ব পেরিয়ে দলগুলোকে খেলতে হবে কুড়ি-বিশ ফরম্যাটের এই ক্রিকেটে। সেটি এ বছর থেকে নয়। ২০১৯ সাল থেকে টেস্ট, ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টির এই নতুন সূচি চালু হতে পারে ক্রিকেট বিশ্বজুড়ে।

এমন বদল হলে বাংলাদেশের লাভ না ক্ষতি? এপ্রিলের সভায় ক্রিকেটে দ্বিস্তর চালু হলে লাভ কিন্তু বাংলাদেশেরই। কেননা বরাবরই বাংলাদেশের সঙ্গে খেলার আগ্রহ দেখায় না অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, ভারতের মতো দলগুলো। টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার ১৭ বছর পর ভারতে প্রথম টেস্ট খেলছেন মুশফিকুর রহিমরা। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সেই ২০০৩ সালে প্রথম ও শেষবার টেস্ট খেলার আমন্ত্রণ পেয়েছিল বাংলাদেশ। তা-ও সেবার টেস্ট দুটি খেলতে হয়েছে ড্রপ ইন পিচে ডারউইন ও কেয়ার্নসের মতো ভেন্যুতে। ইংল্যান্ডে সবশেষ ২০১০ সালে খেলেছে বাংলাদেশ। আর দক্ষিণ আফ্রিকায় খেলেছে আট বছর আগে। চেষ্টা করেও পরাশক্তিদের এমন অনাগ্রহে বদল আনতে পারেনি বিসিবি। সেখানে দ্বিস্তর টেস্ট লিগ চালু হলে আট দলের সঙ্গেই ঘর ও প্রতিপক্ষের মাঠে খেলার সুযোগ পাবে বাংলাদেশ। একটি সিরিজের পর আরেকটির জন্য অপেক্ষা করতে হবে না তীর্থের কাকের মতো। ৮-২ বদলে দ্বিস্তরের ক্রিকেট ৯-৩ হবে বলে ও উত্তরণ ও অবনমন পদ্ধতি বাদ দেওয়ায় বাংলাদেশের টেস্ট মর্যাদা যে পুরোপুরি শঙ্কামুক্ত হচ্ছে, সে নিশ্চয়তা মিলে গেছে এরই মধ্যে। বিসিবি প্রধান নাজমুল হাসানের কণ্ঠে এ জন্যই স্বস্তি ঝরেছে, ‘টেস্টে কোনো উন্নতি-অবনতি থাকবে না। দ্বিস্তরের টেস্ট চালু করার প্রাথমিক প্রস্তাবে যদিও এমনটাই উল্লেখ ছিল। ওয়ার্কিং পেপারে আমাদের অবস্থান সুরক্ষিত আছে। সেখানে দেখেছি এমন কিছু নেই, যাতে করে আমাদের কোনো সমস্যা হবে। বিশ্বের সেরা দলগুলোর সঙ্গে নিয়মিত খেলার সুযোগ আমরা পাব। ’ সম্প্রতি দেশের মাটিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট জয় আইসিসির অপর সদস্য দেশগুলোর বাংলাদেশের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে দেওয়ায় বিশেষ ভূমিকা রেখেছে।

একইভাবে ম্যাচ বাড়বে তিন বছরব্যাপী চক্রে ওয়ানডে লিগেও। ১৩ দল নিয়ে একটি ওয়ানডে লিগের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই লিগের পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে ২০২৩ সালের বিশ্বকাপে সরাসরি খেলার যোগ্যতা। ১৩ দলের লিগে টেস্ট খেলুড়ে বর্তমান ১০ দলের সঙ্গে থাকবে আফগানিস্তান ও আয়ারল্যান্ড। এ ছাড়া আইসিসির সহযোগী সদস্য দেশগুলোকে নিয়ে প্রতিযোগিতা ওয়ার্ল্ড ক্রিকেট লিগের চ্যাম্পিয়ন দল খেলবে ১৩ নম্বর দল হয়ে। এই লিগে খেলা ম্যাচের পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে যেহেতু জায়গা নির্ধারিত হবে ওয়ানডে বিশ্বকাপে, তাই কোনো ম্যাচই আর গুরুত্বহীন থাকবে না। বাংলাদেশ, জিম্বাবুয়ে, আফগানিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচগুলোর মাহাত্ম্যও তখন বাড়বে বড় দলগুলোর কাছে। রেটিং পয়েন্টের ব্যাপার থাকায় পাঁচ ম্যাচের সিরিজ ৩-০ জিতলেও শেষ দুটি ম্যাচ ‘ডেড রাবার’ হবে না কারো জন্য। তেমনি ফুটবলে যেমন বিপক্ষ দলগুলোর ম্যাচে চোখ রাখে বড় দলগুলো, ক্রিকেটেও আসবে সেটা।

এবার আসা যাক আয়ের ভাগ-বাটোয়ারায়। ৪ ফেব্রুয়ারি আইসিসির বোর্ড সভায় কার্যত সমাধি রচিত হয়েছে ক্রিকেট বিশ্বের পজিশন পেপারের। আঁকা হয়েছে তিন মোড়লের দিন ফুরানোর মানচিত্র। অভাবিত কিছু না ঘটলে এপ্রিলের সভাতেই ‘চিরনিদ্রা’য় যাচ্ছে ক্রিকেট বিশ্বের ক্ষমতা কুক্ষিগত করার চক্রান্ত। ‘বিগ থ্রি’ বাতিলের পক্ষে ভোট দিয়েছে বাংলাদেশসহ সিংহভাগ সদস্য দেশ। এর বিরোধিতা করেছে ভারত আর তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছে শ্রীলঙ্কা। ভোট দানে বিরত ছিল জিম্বাবুয়ে। এপ্রিলে চূড়ান্তভাবে ‘বিগ থ্রি’ বাতিল হলে ২০১৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত আইসিসির আয়ের ২৭.৪ শতাংশ পাবে না তিন দেশের বোর্ড।

নামে তিন মোড়ল হলেও আসল মোড়ল ছিল ভারত। কেননা অস্ট্রেলিয়া পেত ২.৭ শতাংশ অর্থ, যুক্তরাজ্যের ৪.৪ শতাংশ আর ভারত একাই ২০.৩ শতাংশ! এ জন্য আইসিসির নতুন প্রধান শশাঙ্ক মনোহর ‘তিন মোড়ল’ তত্ত্ব বাতিলের যে প্রক্রিয়া শুরু করেছেন তাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিটা ভারতেরই। তাদের আয় হওয়ার কথা ছিল ৪৫০ মিলিয়ন ইউএস ডলার। সেটাই হয়ে যাবে ২৯০ মিলিয়ন ডলার বা দুই হাজার ৩০৬ কোটি ২৩ লাখ টাকা! এ জন্যই এর বিরোধিতা করে এটা ঠেকানোর চেষ্টাও করবে বিসিসিআই। আইসিসির যেকোনো প্রস্তাব পাস হতে হলে কমপক্ষে তিন-চতুর্থাংশ ভোট পেতে হয়। এপ্রিলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যখন নেওয়া হবে তার আগেই আর্থিকভাবে দুর্বল ওয়েস্ট ইন্ডিজ, জিম্বাবুয়ের মতো বোর্ডগুলোকে নিজেদের দিকে টানার চেষ্টা করবে বিসিসিআই। সভায় ভারতীয় বোর্ডের পক্ষে অংশ নেওয়া প্রতিনিধি বিক্রম লিমায়ের বিরোধিতা—‘যে সংশোধিত আর্থিক বণ্টনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তা বিশ্বাস ও নিরপেক্ষতার ভিত্তিতে তৈরি বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু এর কোনো বৈজ্ঞানিক বা যুক্তিনির্ভর ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না। তাই আমাদের পক্ষে এখনই এতে সায় দেওয়া অসম্ভব। ’

আগের প্রস্তাবে বাংলাদেশের পাওয়ার কথা ছিল ৫৪৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট পেত ৫২৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও শ্রীলঙ্কান বোর্ডের পাওয়ার কথা ছিল ৬৪৬ কোটি টাকা। বিগ থ্রি বাতিল হলে সুষম বণ্টননীতির নতুন প্রস্তাবে অনেক বেশি টাকা পাবে এই বোর্ডগুলো। অর্থাৎ এখানেও লাভ বাংলাদেশের মতো ছোট দলগুলোর। বাংলাদেশ ঠিক কত টাকা পেতে পারে? নাজমুল হাসান ধারণা দিলেন, ‘আমাদের আয় কী পরিমাণ বাড়ছে, সেটি বলতে পারছি না। তবে অস্ট্রেলিয়া যা পাবে, আমরা সে পরিমাণ অর্থ পাব। ’

তাই এপ্রিলে যখন পরবর্তী বোর্ড সভায় বসবে ক্রিকেট দুনিয়া, তখন যে ছবিটা বদলে যাবে, এমন সম্ভাবনা কম। আইসিসিতে ভারত এমন কোণঠাসা হয়নি এর আগে। সবচেয়ে বিস্ময়ের ভারতেরই শশাঙ্ক মনোহর কিন্তু আইসিসির প্রধান এখন! ক্রিকেট বিশ্বে মারাত্মক বিভেদ সৃষ্টির আশঙ্কায় তিনি সমান হারে লভ্যাংশ বণ্টনের পক্ষে। এ জন্য দেশে বোর্ডকর্তাদের তোপের মুখে পড়তে হলেও পরোয়া করেননি মনোহর। তবে এটা ঠিক এপ্রিলে চূড়ান্ত ভোটাভুটির আগে নানা প্রলোভনে দল ভারী করার চেষ্টা করবে বিসিসিআই। দ্বিপক্ষীয় সিরিজ কিংবা ত্রিদেশীয় টুর্নামেন্টের প্রলোভন দেখিয়ে অতীতে অনেকবারই নিজেদের পক্ষে টেনেছে ভারতীয় বোর্ড। আপাতত ক্রিকেটের আমূল বদলে যাওয়া তাই কার্যকর হওয়া থেকে এখনো বহু দূরে। তার পরও বাংলাদেশের দুটি লাভ শতভাগ নিশ্চিত—টেস্ট অবনমনের শঙ্কা নেই ও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে আইসিসি থেকে প্রাপ্য ফান্ড। ভোটের বাজারে লাভের অঙ্ক বাড়তে পারে আরো!

এবার দেখে নেওয়া যাক আর কী কী বদল আসতে যাচ্ছে ক্রিকেটে। ২০১৭ সালে ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে প্রথমবারের মতো সেমিফাইনাল ও ফাইনাল ম্যাচটা টাই হলে ‘সুপার ওভারে’র ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। একই ব্যবস্থা থাকবে নারী বিশ্বকাপেও। এ ছাড়া প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে আঞ্চলিক টি-টোয়েন্টি প্রতিযোগিতার। এই আঞ্চলিক টি-টোয়েন্টি প্রতিযোগিতার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হবে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা। বাজে উইকেট, মাঠ ও দর্শক আচরণের জন্য ডিমেরিট পয়েন্টের প্রস্তাব করা হয়েছে। কোনো মাঠ পাঁচটি ডিমেরিট পয়েন্ট পেলে এক বছরের জন্য হারাবে আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজনের অধিকার। পয়েন্ট ১০ হলে নিষেধাজ্ঞার কোপে পড়বে দুই বছর। এ ছাড়া  তিন সংস্করণের ক্রিকেটেই থাকবে ডিআরএস। এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু হবে জুন থেকে। আগামী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও ব্যবহার হবে ডিআরএস। সেই টুর্নামেন্টে অবশ্য একটির বেশি রিভিউ নিতে পারবে না দলগুলো। বড় দলগুলোর প্রতি আম্পায়াররা অনেক সময় যেমন সদয় হন, তাতে ডিআরএস কার্যকর হলে লাভ তো বাংলাদেশের মতো উদীয়মানদেরই।


মন্তব্য