kalerkantho


সিদ্দিকের লড়াই বড় পাওয়া

শাহজাহান কবির

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



সিদ্দিকের লড়াই বড় পাওয়া

বসুন্ধরা বাংলাদেশ ওপেনের তৃতীয় আসরটি ছাপ রেখে গেল সবচেয়ে বেশি। সিদ্দিকুর রহমানের লড়াই, তাঁর শিরোপা জয়ের সম্ভাবনা প্রতিটি দিন দুলিয়েছে রোমাঞ্চ, উত্তেজনায়।

দেশসেরা এই গলফার ট্রফি জিতে গেলে হতো সোনায় সোহাগা। না জেতায় দুঃখ নেই। সিদ্দিকেরই নেই, ‘শিরোপা ওরই (জ্যাজ ইয়ানুয়াতানন) প্রাপ্য ছিল। আমি এত দূর আসতে পেরেই খুশি। ’

২৯তম থেকে দ্বিতীয় হয়ে টুর্নামেন্ট শেষ করেছেন সিদ্দিক। আগের দুই আসরের কথা মনে করেও হয়তো তৃপ্তি পেয়েছেন তিনি। প্রথমবার ৩৮তম হয়েছিলেন, পরেরবার ৩৫তম। অথচ শিরোপা জয়ে বরাবরই তিনি ছিলেন ফেভারিট। ঘরের কোর্স বলেই স্থানীয় গলফারদের নিয়ে আশা ছিল।

সেই তাঁদের মধ্যে সিদ্দিক তো উজ্জ্বলতম। কিন্তু দেশের সবচেয়ে বড় টুর্নামেন্টে প্রথম দুবার তিনিই হতাশ করেছেন সবচেয়ে বেশি। সিদ্দিকের নিজের কাছেও তাই চ্যালেঞ্জ হয়েছিল এই আসরটা। শেষ পর্যন্ত তা মাতালেন তিনি। শিরোপা জিততে না পারলেও নিজের সামর্থ্য দেখিয়েছেন আরো একবার। বড় আসর জিততে হলে হয়তো ভাগ্যও লাগে। নইলে প্রথম দিনই ওমন ওভার বাউন্ডারি হবে কেন তাঁর! সিদ্দিক অবশ্য এটাকে খেলার অংশই মনে করেন। টুর্নামেন্ট শেষে যেমন বলেছেন, ‘অনেক খারাপ শট কোনো কোনো হোলে আমি বার্ডি পেয়েছি। এটা খেলার অংশ। ’ তিনি কৃতিত্বটা থাই গলফারকেই দিয়েছেন বেশি।

প্রথম দিন চার নম্বর হোলে ওভার বাউন্ডারির খেসারতে তিনটি বোগি হজম করা সিদ্দিক দিনশেষে সেটি কাটিয়ে উঠেছিলেন তিনটি বার্ডি খেলে। কিন্তু সেদিন ২১ বছর বয়সী জ্যাজ বার্ডিই খেলেন আটটি, বিপরীতে একটি বোগি। প্রথমদিনই সাত আন্ডার পার খেলে শিরোপার পথে বড় একটা ধাপ পেরিয়ে গিয়েছিলেন। প্রথম দিনে কোনো টুর্নামেন্টের গতি-প্রকৃতি বোঝা যায় না। যেমন সিদ্দিককেও বোঝা যায়নি। আগের দুটি আসরের মতো আরও একটা হতাশার আসরই কাটাতে যাচ্ছেন তিনি, দ্বিতীয় দিনের আগ পর্যন্ত অন্তত এমন ধারণা করাটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক ছিল। পরের দিন সেই সিদ্দিক যখন সকাল সকালই পাঁচ আন্ডার পারে রাউন্ড শেষ করে ফেললেন, তখন তাঁর সেই কীর্তি মুখে মুখে। বসুন্ধরা ওপেনের তিন বছরের ইতিহাসে এমন ভালো রাউন্ডও যে তিনি খেলেননি আগে। গেট দিয়ে ঢোকার মুখে নিরাপত্তা রক্ষীরা পর্যন্ত অতিথিদের জানিয়ে দিচ্ছিলেন সিদ্দিকের এই পাঁচ আন্ডারের খবর। বাংলাদেশের গলফের মুখ তিনি, সমার্থকও বলা যায়। এই কুর্মিটোলা থেকেই তাঁর রাজপাটের শুরু। সেখানে সিদ্দিক বারবার আড়ালে থেকে যাবেন—তা যে কারো জন্যই ছিল বিস্ময়ের। লোকাল হিরো অবশেষে জ্বললেন। পরের দুই দিনেও খেললেন সেই জ্যাজের চেয়ে ভালো গলফ। কিন্তু সর্বনাশটা হয়ে গিয়েছিল প্রথম রাউন্ডেই। সাত আন্ডার পারের ব্যবধান কম তো নয়। শেষ তিন দিনে জ্যাজ যেখানে খেলেছেন ১০ আন্ডার, সেখানে ১৩ আন্ডার খেলেছেন সিদ্দিক। সাতটি শটের মধ্যে চারটি শটের ব্যবধান তাতে থেকেই গেছে।

তবু সিদ্দিকের লড়াইয়ে ফেরাটা চমক নয়, চমক বরং জ্যাজের ধারাবাহিকতা দেখানো। আগের আসরেই তো প্রথম দিন যিনি শীর্ষে ছিলেন, পরে তাঁকে আর খুঁজেই পাওয়া যায়নি। প্রথম আসরের দ্বিতীয় রাউন্ডে দুলাল হোসেন আট আন্ডার পার খেলে শীর্ষ পাঁচে ঢুকে গিয়েছিলেন, তিনি পরে শেষ করেছেন ৩৮তম হয়ে। কিন্তু জ্যাজ কোনো ভুলই করেননি বলতে গেলে। ভারতীয় তরুণ শুভঙ্কর শর্মার সঙ্গে তুলনা করলে এই থাইয়ের জাত চেনা যাবে। প্রথম দিন সাত আন্ডার খেলে সমবয়সী শুভঙ্করও তাঁর সঙ্গে যুগ্মভাবে ছিলেন শীর্ষে। দ্বিতীয় দিন শুভঙ্করকে আলতোভাবে পেছনে ফেলেন তিনি এক শটের ব্যবধানে। এদিন চার আন্ডার খেলেন জ্যাজ, শুভঙ্কর খেলেন তিন আন্ডার। সিদ্দিক পিছিয়ে থেকে লড়াই করার যে চাপটা নিতে পেরেছিলেন শুভঙ্কর তা পারেননি। দ্বিতীয় দিনের এক শটের ব্যবধান কাটাতে তৃতীয় দিন খেলেন এক ওভারের সবচেয়ে বাজে রাউন্ড। সেখানে জ্যাজ তাঁর করণীয়টা বুঝে গিয়েছিলেন। পরের দুই রাউন্ডে কোনো ঝুঁকিই নেননি তিনি। তিন আন্ডার করে খেলে বেরিয়ে গেছেন শিরোপা জিতে। সিদ্দিক সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। শেষটায় তাঁকেও মেনে নিতে হয়েছে, ‘জ্যাজ খুবই ভালো গলফার। ’ এমন একটা আসরে নিজের সেই প্রতিভাটাই দেখিয়েছেন জ্যাজ, যেখানে শুধু সিদ্দিক নন, প্রথম বসুন্ধরা ওপেনসহ পাঁচটি এশিয়ান ট্যুর টুর্নামেন্ট জয়ী মার্দান মাম্মাত ছিলেন, ছিলেন জিভ মিলখা সিংয়ের মতো কিংবদন্তি, অভিজ্ঞতায় রশিদ খান, রিচার্ড লি, চিরাগ কুমাররাও ছিলেন ফেভারিট। থাই এই গলফার একরকম অচেনা থেকেই নিজেকে চিনিয়েছেন।

শেষ আসরটা সিদ্দিকের ফেরার হলেও বাংলাদেশের অন্যান্য পেশাদারের জন্য হতাশার। চেনা কোর্সে তাঁদেরই কেউ মাত করবেন—এমন একটা স্বপ্ন গত তিন আসরজুড়েই। কিন্তু দেখা গেল সেরাদের লড়াই কোর্সই সব নয়, মানটাই আগে। এশিয়ান ট্যুরে থাই গলফারদেরই রাজত্ব। সবচেয়ে বেশি ছয়বার অর্ডার অব মেরিট জিতেছেন থাইরা। এখনো পর্যন্ত আয়ের দিক দিয়ে থংচাই জাইদি ও থাওয়ান উইরাচান্তকে ছাড়িয়ে যেতে পারেননি কেউ। সেখানকার একজন তরুণ গলফারও মানের দিক দিয়ে কতটা এগিয়ে জামাল, দুলাল, সাখাওয়াতদের তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে গেছে এই আসর। অনেক দিন থেকেই সিদ্দিকের উত্তরসূরি খোঁজা হচ্ছে দেশে, কিন্তু এত দিনেও যে কেউ সেভাবে উঠে আসতে পারেননি—সেই বাস্তবতাটাও জানা গেল আবার নতুন করে।


মন্তব্য