kalerkantho


তীরন্দাজের সোনার গল্প

সনৎ বাবলা   

৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



তীরন্দাজের সোনার গল্প

আর্চারিতে রচিত হয়েছে অকল্পনীয় এক সোনার গল্প। গল্পের কুশীলব উঠতি তীরন্দাজরা, যাদের কাছে খুব বেশি চাওয়া না থাকলেও তাদের তীরেই রচিত হয়েছে আর্চারির সোনা ঝলমলে নতুন ইতিহাস।

আন্তর্জাতিক সলিডারিটি আর্চারি টুর্নামেন্টে তারা ৬ সোনা উপহার দিয়ে অপ্রচলিত ও অজনপ্রিয় খেলাটিকে নিয়ে এসেছে আলোচনায়।

আগে আর্চারিতে এমন গৌরবের কোনো অর্জন ছিল না। আর্চারির কোচ নিশীথ দাস এই গৌরবের কৃতিত্ব দিতে চান তাঁর নতুন তীরন্দাজদের, ‘এই টুর্নামেন্টে নতুনরা খুব ভালো করেছে। যেমন বন্যা, হীরামনি, বিপাশা, সানোয়ার, মিলনসহ আরো কয়েকজন খুব ভালো করেছে। নতুনদের ওপর কোনো চাপ থাকে না, তারা সহজাত খেলাটা মেলে ধরতে পারে। সিনিয়র আর্চারদের মধ্যে এক ধরনের স্নায়ুচাপ কাজ করে, এ জন্য কম্পিটিশনে তারা সেরাটা মারতে পারে না অনেক সময়। নইলে দেখুন, র‌্যাঙ্কিং রাউন্ডে সিনিয়ররা শীর্ষেই ছিল। তারপর অতিরিক্ত চাপ নিয়ে ফেলায় এককের লড়াইয়ে ভালো মারতে পারেনি। ’ প্রত্যাশা ছিল শ্যামলী-রোমান-সানাদের নিয়ে।

র‌্যাঙ্কিং রাউন্ডে শীর্ষে থেকে শেষ করেও পরের রাউন্ডগুলোতে ওই চাপের কাছে আত্মসমর্পণ করে তাদের একক অভিযান শেষ হয়েছে মাথা নুইয়ে। শুদু একজনই শেষ পর্যন্ত পেরেছে উন্নত শিরে সোনার পদক গলায় পরতে। তিনি হীরামনি, গত এসএ গেমসে এলিমিনেশন রাউন্ডে বাদ পড়া বিকেএসপির এই তীরন্দাজ ঘরের মাঠে রিকার্ভ বো এককের ফাইনালে আজারবাইজানের রামোজামোভাকে ৬-৪ সেটে হারিয়ে সোনা জিতেছেন। আগের চারটা আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে শূন্য হাতে ফেরা ঠাকুরগাঁওয়ের মেয়েটির প্রথম আন্তর্জাতিক পদক সোনায় মোড়ানোর রহস্যটা হলো, ‘আমি কোনো চাপ নিইনি। নিজের সহজাত খেলাটা দিয়ে লড়াই করব শেষ পর্যন্ত। হাল ছেড়ে দেব না, লড়াইয়ের পর যা হওয়ার হবে। ’

হীরামনির মতো এককে সোনা জেতার সম্ভাবনা ছিল বন্যা আক্তারের। ক্যারিয়ারের প্রথম আন্তর্জাতিক আসরে সোনার দোরগোড়ায় পৌঁছেও পারেননি প্রতিপক্ষ ইরাকের অভিজ্ঞ তীরন্দাজ ফাতিমার সঙ্গে। প্রথম অভিযানে রুপাও কিন্তু আনসারের এই তরুণীর জীবনে বিশাল ঘটনা, ‘আমার তো কোনো দুঃখ নেই। প্রথম আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে এ পর্যন্ত আসতে পেরেছি, রুপা জিতেছি। এটাই আত্মবিশ্বাস জোগাবে সামনের দিনগুলোতে। ’ হীরামনির রিকার্ভ বোয়ে সোনা জয় বাদে বাংলাদেশ বাকি পাঁচটি সোনাই জিতেছে দলগতে। এখানেও সিনিয়রদের পাশাপাশি জুনিয়ররা ভালো পারফরম করেছে। ‘এই টুর্নামেন্টটা আমাদের আর্চারির জন্য বিশাল এক উদ্দীপনা হয়ে থাকবে। উঠতি তীরন্দাজরা পেয়েছে সামনে এগোনোর সাহস। তারা এখন নতুন স্বপ্ন দেখার সাহস পাবে, তৈরি হবে নতুন চ্যালেঞ্জের জন্য। ’ বলেছেন আর্চারির কোচ নিশীথ দাস।

স্বাভাবিকভাবে সবাই তাকিয়ে থাকবে আগামী নভেম্বরে ঢাকায় অনুষ্ঠেয় এশিয়ান আর্চারি চ্যাম্পিয়নশিপের দিকে। এটা তীরন্দাজদের নতুন চ্যালেঞ্জ। কোচের বিশ্লেষণে এশিয়ান আর্চারি অনেক কঠিন জায়গা, ‘এশিয়ান আর্চারিতে এ রকম সাফল্য আশা করলে ভুল করা হবে। ওই টুর্নামেন্টে অলিম্পিয়ানরা অংশ নেন, লড়াইটা অনেক কঠিন। তবে ট্রেনিং ক্যাম্পের মধ্যে থাকলে আমাদের তীরন্দাজরাও খুব খারাপ করবে না। আমি তো মনে করি, এশিয়ান আর্চারিতে সেমিফাইনালে উঠাও কৃতিত্বের। ’ এশিয়ার টুর্নামেন্ট  অনেক বড় মঞ্চ, তা ছাড়া ইসলামিক সলিডারিটি আর্চারিতে ইরান অংশ নিলে বাংলাদেশের সোনার গল্প এত লম্বা হতো কি না, সেটাও একটা প্রশ্ন।

আসলে এই খেলাটা গণমানুষের নয়। ফুটবল-ক্রিকেটের মতো জনপ্রিয় খেলা নয় আর্চারি। এর পরও একটু একটু করে তার বিস্তৃতি ঘটছে, মুকুটে যোগ হচ্ছে নতুন সাফল্য। সাফল্যের নেপথ্য কারিগর নিশীথ দাসের চোখে সামনে আরো সুদিন অপেক্ষা করছে, ‘যে কোনো কিছুর শুরুটা বেশ চ্যালেঞ্জিং হয়। আর্চারির বেলায়ও তাই ছিল। এখন কিন্তু নতুন তীরন্দাজরা আসতে শুরু করেছে। ফেডারেশনের বিভিন্ন জেলাভিত্তিক প্রোগ্রামে নতুন প্রতিভার সন্ধান মিলছে। সম্প্রতি ১০টি জেলায় ট্রেনিং প্রোগ্রাম শেষ হয়েছে, নতুন তীরন্দাজ পাওয়া গেছে। বলতে পারি আমাদের পাইপ-লাইন তৈরি হয়ে গেছে। ’ তৃণমূল থেকে তীরন্দাজের জন্ম হচ্ছে। এই সোনার গল্পও তো অজনপ্রিয় খেলাটির জন্য বড় বিজ্ঞাপন। হঠাৎ নতুনদের তীর-ধনুকে দেশের আর্চারি এমন শোরগোল ফেলেছে, একবার ঘুরে তাকাতেই হবে। আর্চারিরও আছে সম্ভাবনার জায়গায়!


মন্তব্য