kalerkantho


বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা ওপেনিং জুটি আমরা

৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা ওপেনিং জুটি আমরা

ছবি : মীর ফরিদ

ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে তখন বিশ্ব কাঁপাচ্ছেন গর্ডন গ্রিনিজ-ডেসমন্ড হেইন্স ওপেনিং জুটি। বাংলাদেশ ক্রিকেটের সেই বিবর্ণ জমানায় আমাদের রংমশাল ছিল জাহিদ রাজ্জাক মাসুম-নূরুল আবেদীন নোবেলের ব্যাটে। নাহ্, টেস্ট খেলার সৌভাগ্য তাঁদের হয়নি। যে কয়টি ওয়ানডেতে বিচ্ছিন্নভাবে সুযোগ পান, সেখানেও বলার মতো পারফরম্যান্স নয়। তবু বাংলাদেশ ক্রিকেটের পুরনো দিনের আড্ডায় এখনো অবধারিতভাবে উঠে আসে মাসুম-নোবেল ওপেনিং জুটি। তাঁদের কীর্তি, তাঁদের বীরত্ব। সেই জুটির একজন শাহ্ মো. জাহিদ রাজ্জাক মাসুমের সঙ্গে নোমান মোহাম্মদের সাক্ষাৎকারের শুরুও এ বিষয় নিয়ে। এরপর সেই কথোপকথন আনন্দ-উল্লাস-সাফল্যের রুপালি ঢেউ থেকে আক্ষেপ-আফসোস-হাহাকারের ধূসর স্রোতে এঁকেবেঁকে এগোয়। হয়ে ওঠে একজন ক্রিকেটারের পূর্ণাঙ্গ জীবনছবি।

 

 

প্রশ্ন : বাংলাদেশ ক্রিকেটের আলোচনায় জাহিদ রাজ্জাক মাসুমের কাছ থেকে নূরুল আবেদীন নোবেলকে আলাদা করা কঠিন। এই নোবেল-মাসুম জুটি থেকেই কি সাক্ষাৎকারটি শুরু করা যায়?

শাহ্ মো. জাহিদ রাজ্জাক মাসুম : অবশ্যই। বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা ওপেনিং জুটি আমরা। তা নিয়ে কথা বলতে আমি খুশিই হব।

প্রশ্ন : নিজেদের সেরা বললেন—সেটি তো ঘরোয়া ক্রিকেটের বিবেচনায়?

মাসুম : আমাদের সময়টা সেভাবেই দেখতে হবে। দুই বছর, চার বছরে এশিয়া কাপ খেলা হতো একবার। চার বছর পর পর আইসিসি ট্রফি। সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ, হায়দরাবাদ ব্লুুজ, ডেকান ব্লুজের মতো দলের বিপক্ষে মাঝেমধ্যে কিছু ম্যাচ। জাতীয় দলের খেলা বলতে এগুলোই। তা দিয়ে ওই সময়ের ক্রিকেটারদের বিবেচনা করাটা অন্যায়। নোবেল-মাসুম জুটিকে সেরা ওপেনিং জুটি বলছি তাই ঘরোয়া ক্রিকেটের প্রেক্ষাপটে। আর কেন আমরা সেরা, সে সময়ের ক্রিকেট অনুসারীদের জিজ্ঞেস করলেই জানতে পারবেন।

প্রশ্ন : একটু যদি আপনার কাছ থেকেই জানতে চাই—কেন আপনাদের জুটি সেরা?

মাসুম : অনেক কারণ। প্রথম কারণ, আমরা ব্যাটিংয়ে নামলে তিন নম্বর ব্যাটসম্যান টেনশনে থাকত কখন সে ব্যাটিং পাবে। কিংবা আদৌ পাবে কি না। এই সেদিন উত্তরা ক্লাবে এক দাওয়াতে যাই। সেখানে দুর্জয় (নাঈমুর রহমান) বলছিল, ‘আপনারা যখন ব্রাদার্সে ওপেন করতেন, তখন সুমনের (হাবিবুল বাশার) ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাওয়ার দশা। ও তিন নম্বরে খেলত। কিন্তু ৩০-৩৫ ওভারের আগে ব্যাটিংয়েই নামতে পারত না। ’ এখন যেটি জাতীয় লিগ, তখন তা জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ। সেখানে চট্টগ্রামের পক্ষে আমি আর নোবেলই ওপেন করতাম। পর পর পাঁচবার জাতীয় যুব চ্যাম্পিয়নশিপে চ্যাম্পিয়ন হই আমরা। সেই দলে খেলেছি একসঙ্গে। আন্তবিশ্ববিদ্যালয় প্রতিযোগিতায়ও। এ ছাড়া ঘরোয়া ক্রিকেটে মোহামেডানে একসঙ্গে খেলেছি। তবে আমাদের জুটি অন্যদের ছাড়িয়ে অনেক অনেক দূর এগিয়ে যায় ব্রাদার্সে খেলার সময়। কত যে এক শ রানের জুটি আছে! ৭-৮-১০ ওভারে ৭০-৮০ রান করেছি অহরহ। খতিয়ান দেখলে তা বুঝতে পারবেন।

প্রশ্ন : দুজনের রসায়নটা এত ভালো হয় কিভাবে?

মাসুম : একটা কারণ আমরা ছোটবেলার বন্ধু। চট্টগ্রামের আবেদীন কলোনিতে একসঙ্গে বেড়ে উঠি। একসঙ্গে খেলি। সারা দিন ঝগড়া, সারা দিন বন্ধুত্ব। দুজনের বোঝাপড়া তাই খুব ভালো। আরেকটা কারণ হতে পারে, আমাদের দুজনের শক্তির জায়গা আলাদা। নোবেল অফ সাইডে ভালো, আমি অন সাইডে। এ কারণে প্রতিপক্ষ বোলার-অধিনায়ককে খুব ঝামেলায় পড়তে হতো। তখন ফিল্ডিং সাজানোর নিয়ম অফ সাইডে পাঁচজন, অন সাইডে চারজন—মূলত এ হিসাবে। আমার ব্যাটিংয়ের সময় নিয়ম ভেঙে অন সাইডে ছয়জন ফিল্ডার পর্যন্ত রাখা হয়। তবু ছয় ফিল্ডারের মধ্য দিয়েই চার বের করে নিতাম। বিশ্বাস করবেন কি না, আমার স্ট্রোকের পর কেউ নড়তে পারত না।

প্রশ্ন : আচ্ছা, আশির দশকের ক্রিকেটে ওপেনারদের মূল কাজ তো ছিল উইকেটে সময় কাটানো। ধীরে-সুস্থে খেলে বল পুরনো করে দেওয়া। সেখানে আপনি অমন ডাকাবুকো ব্যাটিং করতেন কেন?

মাসুম : ওটাই ভালো লাগত বলে। আমি সহজাত স্ট্রোকমেকার ছিলাম। সাত ওভারে ৫০, আট ওভারে ৭০-৮০ রান নিয়মিত হয়ে যেত। এমনও দিন গিয়েছে, ৯ ওভারে ১০০ রান হয়ে গেছে। হ্যাঁ, যেটি বললেন, তখনকার ক্রিকেটটা ঠিক এমন ছিল না। হয়তো এখনকার ক্রিকেট আমি তখনই খেলেছি (হাসি)।

প্রশ্ন : আপনার আর নোবেলের জুটির কোনো স্মরণীয় ঘটনা?

মাসুম : জুটিতে অনেক অনেক রান করেছি। সেগুলো আর বললাম না। বরং অন্য আরেক ঘটনা বলি। আমাদের সময় খেলা শুরু হতো সকাল ৯টায়। ব্রাদার্সের খেলার দিন ওই সকালেই প্রচুর দর্শক চলে আসেন স্টেডিয়ামে মাসুম-নোবেলের ব্যাটিং দেখার জন্য। টসের পর হয়তো দেখা গেল আমাদের ব্যাটিং পরে। তখন দর্শকদের বড় একটি অংশ আবার চলে যান। লাঞ্চের পর আমাদের ব্যাটিংয়ের আগে আবার তারা এসে হাজির। কতজন এমন গল্প এখনো করেন যে, লাঞ্চের সময় অফিস থেকে আধঘণ্টা-এক ঘণ্টার ছুটি নিয়ে আসতেন আমাদের জুটির ব্যাটিং দেখার জন্য। সেদিন আমি একটি ব্যাংকে যাই লোনের জন্য। ব্যাংকের হেড অব করপোরেট ভদ্রলোক খুব খাতির করেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করি, ‘লোন অনুমোদন হতে কত দিন লাগবে?’ উনি বলেন, ‘নরমালি এক মাস লাগে। আপনারটি অ্যাবনরমালি দ্রুত হবে। ’ জিজ্ঞেস করি কেন? জবাব দেন, ‘আপনার খেলা কত দেখেছি!’ কিছু দিন আগে চাঁদনী চকের এক সিগারেটওয়ালা আমাকে সিগারেট দিয়ে কিছুতেই পয়সা নিলেন না। একই কারণ। আমি মাথায় হেডব্যান্ড পরতাম পেছনে গিট্টু দিয়ে; আমির সোহেলের মতো। বাংলাদেশে আর কেউ অমনটা পরত না। সিগারেট বিক্রি করা ৭০-৮০ বছরের দাঁড়িওয়ালা ওই ভদ্রলোক আমাকে মনে করিয়ে বলেন, ‘জীবনে এত আনন্দ দিয়েছেন ক্রিকেট খেলে, আপনাকে একটা সিগারেট না হয় মাগনা খাওয়ালাম। ’ এ সবই তো বড় প্রাপ্তি।

প্রশ্ন : পাশাপাশি অপ্রাপ্তির জায়গা কি এটি নয় যে, ঘরোয়া ক্রিকেটের ফর্মটা আপনারা কখনো জাতীয় দলে টেনে নিতে পারেননি?

মাসুম : আমরা তো বাংলাদেশ দলে একসঙ্গে ওপেন করার সুযোগই সেভাবে পাইনি। হয় আমি বাদ, নয় নোবেল বাদ। অথবা ব্যাটিং অর্ডারে নিচের দিকে নামতে হয়েছে। এটিকে তাই দুর্ভাগ্যই বলব।

প্রশ্ন : আপনার নিজের কথা আলাদা করে একটু জানতে চাই। ঘরোয়া ক্রিকেটে তুমুল সফল ব্যাটসম্যান অথচ বাংলাদেশের জার্সিতে আন্তর্জাতিক তিন ওয়ানডে ম্যাচে সাকুল্যে রান ১৪। এটি নিশ্চয়ই ভীষণ হতাশার?

মাসুম : রেকর্ডের দিকে তাকালে অবশ্যই হতাশার। তবে আমার কাছে আরো বেশি হতাশার আরো বেশি ম্যাচ খেলতে না পারা। বাংলাদেশ তখন আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলত কটি? দুই-চার বছর পর পর এশিয়া কাপ। মাঝে একবার অস্ট্রেলেশিয়া কাপ হয় শারজায়। সেখানে খেলেছি আমরা। হ্যাঁ, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আমি অবশ্যই সফল না। তবে ওই ব্যর্থতার চেয়ে আমার কাছে বেশি আক্ষেপের, বাংলাদেশের খুব বেশি ওয়ানডে খেলার সুযোগ না থাকা। এখনকার মতো যদি এত এত ম্যাচের সূচি থাকত, তাহলে অবশ্যই ঘরোয়ার মতো আন্তর্জাতিকেও করতে পারতাম অনেক রান।

প্রশ্ন : আপনার সিভিতে দেখলাম, দুটি এশিয়া কাপ খেলেছেন। অথচ রেকর্ড বলছে ১৯৮৮ সালের এশিয়া কাপে ভারতের বিপক্ষে একটি এবং ১৯৯০ সালে অস্ট্রেলেশিয়া কাপে নিউজিল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দুটি—এই তিন ওয়ানডেতে ছিলেন!

মাসুম : ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশের প্রথম ওয়ানডে ম্যাচের স্কোয়াডেও তো ছিলাম। অবশ্য শ্রীলঙ্কার ওই এশিয়া কাপে কোনো ম্যাচ খেলা হয়নি। সে কারণে হয়তো তা অনেকে জানেন না।

প্রশ্ন : এ নিয়ে কোনো হতাশা? মানে বাংলাদেশের প্রথম ওয়ানডে ম্যাচ ও টুর্নামেন্টের অংশ হয়েও কোনো ম্যাচ খেলতে না পারার?

মাসুম : সত্যি বলতে কী, হতাশা নেই। তখন আমার বয়স কত? ১৯ বছর। ওই বয়সে বাংলাদেশ জাতীয় দলের হয়ে প্রথম বিদেশ সফরে যাচ্ছি—এই রোমাঞ্চটাই বেশি। ম্যাচ খেলতে না পারার হতাশা সেভাবে না।

প্রশ্ন : জাতীয় দলে ডাক পাওয়ার খবর কার কাছ থেকে পান, মনে আছে?

মাসুম : (একটু ভেবে) দৌলত-উজ-জামান। মোহামেডান ক্লাবে ছিলাম। দৌলত ভাই এসে বলেন, ‘মাসুম ইয়ার, তুমকো তো বাংলাদেশ টিম মে কল মিলা। ’ আমি তো খুশিতে আত্মহারা। ঢাকায় তখন বোনের বাসায় থাকি। আব্বা-আম্মা ব্রাক্ষণবাড়িয়ায়। এখনকার মতো হাতে হাতে মোবাইলের যুগ সেটি না। মনে আছে, পরদিন সকালে পেপারে আমার নাম দেখে আব্বা-আম্মা ফোন দেন বোনের বাড়িতে। আমি জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ায় ওনারা ভীষণ খুশি।

প্রশ্ন : এশিয়া কাপে বাংলাদেশের প্রথম ম্যাচের প্রতিপক্ষ পাকিস্তান। ওদের অধিনায়ক ইমরান খানের সঙ্গে দেখা হওয়ার আলাদা কোনো রোমাঞ্চ ছিল?

মাসুম : ইমরানের বিপক্ষে তো এর আগে ম্যাচই খেলি আমি। এশিয়া কাপের আগে আগে ওমর কোরেশি একাদশ নামে পাকিস্তানের প্রায় জাতীয় দলের বিপক্ষে খেলা হয় বাংলাদেশের। ওদের দলে ইমরান খান, ওয়াসিম আকরাম, সেলিম মালিক, আবদুল কাদির, রমিজ রাজা, মহসিন কামালদের মতো ক্রিকেটার। আমি প্রথম বলে মুখোমুখি হই জাকির খানের। ইমরান, আকরামদের বোলিংয়ের বিপক্ষে লড়াই করে করি ২৭ রান। বাংলাদেশ ক্রিকেটের তখনকার প্রেক্ষাপটে ওই ২৭ রানই বিরাট ব্যাপার। আর এশিয়া কাপে ইমরানের সঙ্গে আবার দেখা হওয়া রোমাঞ্চকর নিশ্চয়ই। তবে ও তো সব সময় ব্যক্তিত্ব নিয়ে থাকত। ওর পাশে যাওয়া, আড্ডা দেওয়া খুব সহজ না। খেলার সময় দেখা হয়েছে, ব্যস!

প্রশ্ন : ওয়ানডেতে আপনার পারফরম্যান্স বিবর্ণ। বলছেন যে, সেখানে খেলার সুযোগ খুব বেশি পাননি। কিন্তু দু-দুটি আইসিসি ট্রফি দলে তো ছিলেন। সেখানেও বলার মতো রান নেই। ১৯৮৬ সালের আসরে ৪ ম্যাচে ৪৮ রান, ১৯৯০ সালে ৩ ম্যাচে ৩৫ রান। আইসিসি ট্রফিতে এত খারাপ করার কারণ কী?

মাসুম : একাদশে খেলবই এমন নিশ্চয়তা ছিল না। এক ম্যাচে খারাপ করলে বাদ, এমন চাপ নিয়ে খেলা কঠিন। পাশাপাশি ব্যাটিং অর্ডারেও নির্দিষ্ট জায়গা ছিল না। অনেক খেলাতে লেট অর্ডারে নামতে হয়েছে। তখন দ্রুত রান তোলার তাগিদে ভালো বোলারদের মারতে গিয়ে আউট হয়ে যাই। সব মিলিয়ে রান পাইনি।

প্রশ্ন : ১৯৯৪ আইসিসি ট্রফির স্কোয়াডেই সুযোগ পাননি। কোচ মহিন্দর অমরনাথ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘মাসুমের টেকনিকে সমস্যা। ’ ঘরোয়া ক্রিকেটে এত এত রান করার পর জাতীয় দলের কোচের কাছ থেকে অমনটা শুনতে নিশ্চয়ই ভালো লাগেনি?

মাসুম : অমরনাথের কথা বলে লাভ নেই। আমাকে বাদ দিতে হবে বলে যা খুশি বলে দিয়েছে। সে তো আরো অনেক কাণ্ড করেছে, মনে নেই? নোবেলকেও ব্যাটিং বাদ দিয়ে বোলিং করানো শুরু করে। পেসার বাবুলকে স্পিনার বানিয়ে দেয়। সাইফুলকে ব্যাটসম্যান বানিয়ে দিতে চায়। নান্নু-ফারুকের অধিনায়কত্ব নিয়ে নানা রকম ঝামেলা তৈরি করে। এসব নিশ্চয়ই কেউ ভোলেননি। একটি কথা অবশ্যই লিখবেন—আমার মতে, বাংলাদেশ ক্রিকেটের সবচেয়ে বাজে কোচ অমরনাথ।

প্রশ্ন : এবার শুরুর কথা জানতে চাই। জন্ম, বেড়ে ওঠা, ক্রিকেটের সঙ্গে সখ্য?

মাসুম : জন্ম চট্টগ্রামে, লাভ লেন আবেদীন কলোনিতে। নোবেল-নান্নু আমরা সব একই পাড়ার। স্টেডিয়ামের পাশেই বাসা। স্কুল বাদে সারা দিনই খেলতাম। ফুটবল-ক্রিকেট সব খেলা। আমার আব্বা শাহ্্ মো. আবদুর রাজ্জাক। উনি বাংলাদেশ শেল ওয়েল কম্পানিতে চাকরি করতেন। মা সালমা রাজ্জাক। আমরা চার ভাই-বোন। তিন বোনের একমাত্র ভাই আমি। আব্বা খেলাধুলায় উৎসাহ দিতেন। ওনার ভেসপা মোটরসাইকেল দিয়ে মাঠে দিয়ে আসতেন আমাকে। ফুটবলের প্রথম বুট-জার্সি কিনে দেন স্টেডিয়ামের সামনের দোকান ক্রীড়া বিতান থেকে। আম্মা বরং পড়াশোনার জন্য চাপাচাপি করতেন বেশি।

প্রশ্ন : প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট শুরু কিভাবে?

মাসুম : আমি ফুটবলও ভালো খেলতাম কিন্তু সফল হয়ে যাই ক্রিকেটে। ১৯৮০ সালে ম্যাট্রিক পাস করার পরপরই রেলওয়ে দলে ডাক পাই। চট্টগ্রামের পোলো গ্রাউন্ডে দলটি অনুশীলন করত। আমি তখন ওদের বল কুড়িয়ে দিতাম। ফিল্ডিং করতাম। মাঝেমধ্যে টুকটাক ব্যাটিং-বোলিংয়ের সুযোগ পাই। তখন রেলওয়ে দল চট্টগ্রাম থেকে আসত ঢাকায়। আগের রাতে ট্রেনে এসে পরদিন ম্যাচ খেলে রাতের ট্রেনে চট্টগ্রামে ফেরা। তো এক দিন রাত ৯টায় আাামার বাসায় ফোন আসে। রেলওয়ে দলের মাসুদ ভাই বলেন, ‘ঢাকা খেলতে যাবি? তাহলে স্টেশনে চলে যায়। ’ ট্রেন ছাড়বে সাড়ে ১০টায়। আব্বা-আম্মাকে বলে তাঁদের অনুমতির অপেক্ষা করলাম না। দৌড় দিলাম স্টেশনে।

প্রশ্ন : ঢাকায় প্রথম ম্যাচটি মনে আছে?

মাসুম : মনে থাকবে না? শূন্য করেছিলাম যে!

প্রশ্ন : একটু যদি স্মৃতিচারণা করেন?

মাসুম : রেলওয়েতে প্রথম ম্যাচে আমাকে তিন নম্বরে নামিয়ে দেওয়া হয়। প্রতিপক্ষ আজাদ বয়েজ। বোলার জিয়াউল ইসলাম মাসুদ ভাই। ভয়ংকর জোরে বোলিং করতেন। ওদিকে আমাদের তখন হেলমেট-চেস্ট গার্ড এসব ছিল না। মাসুদ ভাইয়ের প্রথম বলেই আমি বোল্ড। মনে আছে, লাঞ্চের সময় আমাদের ড্রেসিংরুমে এসে উনি বলেন, ‘আজ আমি পাঁচটি উইকেট পেয়েছি। এর মধ্যে আপনাকে যে বলটি করলাম, তা দিনের সেরা বল। কারণ তা লেট সুইং করেছে। ’

প্রশ্ন : শূন্য দিয়ে শুরু ঢাকার ঘরোয়া ক্রিকেটে পরবর্তীতে এত সাফল্য পাবেন, তা নিশ্চয়ই বোঝার উপায় ছিল না?

মাসুম : এক ম্যাচ দিয়ে তো আসলে কিছু বোঝা যায় না। তবে এ কথা ঠিক যে, রেলওয়ের সঙ্গে ঢাকায় এসে খেলা শুরু করার পর ক্রিকেটটা আরো বেশি করে ভালোবেসে ফেলি। আরো বেশি মনোযোগ দিয়ে শুরু করি খেলা। এখানে একটি কথা বলি, যা হয়তো অনেকে জানেন না। আমি কিন্তু ছোটবেলায় নতুন বলে পেস বোলিং করতাম।

প্রশ্ন : তাই!

মাসুম : হ্যাঁ। রেলওয়েতেও তা-ই করেছি। মোহামেডানে যাওয়ার পর যখন দেখি ব্যাটিংটা ভালো হচ্ছে, তখন পেস বোলিং ছেড়ে শুরু করি স্লো মিডিয়াম। ফার্স্ট/সেকেন্ড চেঞ্জ বোলিং করি। কিন্তু তবু শরীর ক্লান্ত লাগে। তখন ব্যাটিংটা পুরো মনোযোগে করা যায় না। ব্যাটিংয়ে মনোযোগ দেওয়ার জন্য তা ছেড়ে দিই; শুরু করি অফ স্পিন।

প্রশ্ন : রেলওয়েতে কয়েক বছর খেলার পর যান মোহামেডানে। যতটুকুন জানি,  লিগের মাঝপথে শহীদ স্মৃতি ক্রিকেট টুর্নামেন্টে অতিথি খেলোয়াড় হিসেবে ওই দলে খেলেন প্রথম। পরের বছর মোহামেডান আপনাকে নিয়ে নেয়। তাই তো?

মাসুম : ঠিক তাই। আমার স্পষ্ট মনে আছে। তখন দল বলতে তো মোহামেডান আর আবাহনী। সেই দুই দলের একটি আমাকে অতিথি খেলোয়াড় হিসেবে নিচ্ছে, এটি ছিল অন্য রকম ব্যাপার-স্যাপার। সেখানে ভালো খেলার চেষ্টা করি প্রাণপণ। পরের বছর তাই মোহামেডান পুরোপুরি দলে নিয়ে নেয়। এই মোহামেডানে ঢোকার পর আমি আর কখনো কোনো ক্লাবের একাদশ থেকে বাদ পড়িনি। কখনোই না।

প্রশ্ন : মোহামেডানের প্রথম মৌসুমে নাকি টানা চার ম্যাচে ফিফটি করেন?

মাসুম : টানা পাঁচ ফিফটি। আর তা প্রথম না, দ্বিতীয় মৌসুমে।

প্রশ্ন : শ্রীলঙ্কার অর্জুনা রানাতুঙ্গা যেবার মোহামেডানে খেলতে আসেন?

মাসুম : হ্যাঁ। জানেন, গ্যালারি থেকে মোহামেডান সমর্থকরা আমাকে ডাকত ‘মাসুমতুঙ্গা’। সেবার লিগে সর্বোচ্চ রান করি। সাড়ে সাত শর মতো। তখন ব্যাট ধরলেই ৫০/৭০/৮০ রান।

প্রশ্ন : নান্নু নাকি মাসুম—জনপ্রিয়তার নিরিখে মোহামেডান সমর্থকদের মধ্যে নাকি তখন এমন দ্বিধা পর্যন্ত ছিল?

মাসুম : ওই যে অনেক অনেক রান করেছি। সে কারণেই হয়তো-বা।

প্রশ্ন : রানাতুঙ্গার সঙ্গে কোনো স্মৃতি যদি ভাগাভাগি করেন?

মাসুম : সেবার এক সাক্ষাৎকারে রানাতুঙ্গা বলে যান, বাংলাদেশের সেরা ব্যাটসম্যান মাসুম। রমেশ রত্নায়েকেও এমনটা বলেছেন। এগুলো খুব অনুপ্রাণিত করেছে। তবে আমাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেছেন মুদাসসর নজর। শারজায় অস্ট্রেলেশিয়া কাপে যাওয়ার সময় উনি আমাকে বলেন, ‘আপ তো বর্ন ট্যালেন্ট হ্যায়। ’ মানে আমি জন্মগত প্রতিভাবান।

প্রশ্ন : মোহামেডান ছাড়লেন কেন? শোনা যায় যে আপনি নাকি অধিনায়ক হতে চেয়েছিলেন। নান্নুর সঙ্গে সেই দ্বন্দ্বেই ক্লাব ছেড়েছেন?

মাসুম : ভুল। এক শ ভাগ ভুল কথা। আবাহনী থেকে অনেক ভালো প্রস্তাব পাই। যেটি না করার উপায় ছিল না।

প্রশ্ন : কত টাকার?

মাসুম : আবাহনীর গাফফার ভাই, মামুুন ভাই, তামিম, এরশাদুল হক ওনারা গুলশানের কোন এক দাওয়াতে আমাকে পেলেন। প্রস্তাব দেন আড়াই লাখ টাকার। আগের বছর মোহামেডানে পাই দেড় লাখ। আবাহনীর প্রস্তাবে তাই না করতে পারিনি। সেটি ছিল ওই সময়ের অন্যতম আলোচিত দলবদল। অন্তত শ তিনেক মানুষ মিছিল করে। স্লোগান দেয়, ‘মাসুমের আগমন, শুভেচ্ছা স্বাগতম’। এখন যে খবর পড়েন মাহমুদুর রহমান, উনি তখন ‘নিউ নেশন’ পত্রিকায় ছিলেন। সেখানে আমার দলবদলের ছবি দিয়ে সংবাদ শিরোনাম করেন, ‘আবাহনী কট আ গোল্ড’।

প্রশ্ন : মোহামেডান সমর্থকরা নিশ্চয়ই খুব ক্ষুব্ধ হয়?

মাসুম : স্বাভাবিক। মোহামেডানের বিপক্ষে আবাহনীর হয়ে প্রথম ম্যাচেই আমি করি ৬১ রান। আউট হয়ে ফেরার সময় গ্যালারি থেকে সে কী গালি! যাঁরা আগে আমাকে ‘মাসুমতুঙ্গা’ বলত, সেই মোহামেডন সমর্থকদের মুখেই গালাগালি। কিন্তু কী করার আছে বলুন? ওই বছর আমার চেয়ে বেশি পারিশ্রমিক কোনো ক্রিকেটার মনে হয় পাননি। পেলে একমাত্র নান্নু পেতে পারে। আড়াই লাখ টাকার প্রস্তাবের কারণেই মোহামেডান ছাড়ি। এখানে নান্নুর সঙ্গে অধিনায়কত্ব নিয়ে গ্যাঞ্জামের কোনো ব্যাপার  নেই।

প্রশ্ন : মোহামেডানের তুখোড় ফর্মের ধারাবাহিকতা আবাহনীতে ছিল না। অন্তত স্কোরকার্ড সে কথা বলে। পরবর্তী সময়ে তাই কখনো কি মনে হয়েছে, দলবদলটা না করলেই পারতাম?

মাসুম : না। ওই সময়ের জন্য সেটি ছিল সেরা সিদ্ধান্ত। মোহামেডানের মতো মৌসুমে সাড়ে সাত শ রান হয়তো আবাহনীতে করতে পারিনি। আবার খুব খারাপও খেলিনি। সেরা দশের রেসে ছিলাম সব সময়।

প্রশ্ন : আবাহনী থেকে ব্রাদার্সেও কি যান ভালো প্রস্তাবের কারণে?

মাসুম : হ্যাঁ। আমাকে সাড়ে চার লাখ প্রস্তাব করা হয়। আর সেবার ব্রাদার্স দলও করে দুর্দান্ত। আমার পাশাপাশি নোবেল, প্রিন্স, ফার্নান্ডোকে নিয়ে নেয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে লিগ চ্যাম্পিয়ন হতে পারিনি।

প্রশ্ন : লিগ চ্যাম্পিয়ন হন কোন কোন ক্লাবে?

মাসুম : মোহামেডানে হয়েছি, আবাহনীতে হয়েছি। কিন্তু এরপর আর কোনো ক্লাবে না। দুর্ভাগ্যই বলতে হবে। কারণ সব সময় এমন দলে খেলি, যারা লিগ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মতো দল গড়ে। ব্রাদার্স, কলাবাগান, সূর্যতরুণ। কিন্তু লিগে শেষ পর্যন্ত শিরোপা জিততে পারিনি।

প্রশ্ন : সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক কি ব্রাদার্সের ওই সাড়ে চার লাখ?

মাসুম : হ্যাঁ। রেলওয়েতে প্রথমবার পাই সম্ভবত সাড়ে ছয় হাজার টাকা। সেখান থেকে সর্বোচ্চ সাড়ে চার লাখ।

প্রশ্ন : কয়েকটি স্মরণীয় ম্যাচের কথা যদি বলেন?

মাসুম : নোবেল ও আমার অনেক স্মরণীয় জুটি আছে। আলাদা করে একটু বলি রমন লাম্বার সঙ্গে একটি ওপেনিং জুটির কথা। দামাল সামারে অ্যাজাক্সের বিপক্ষে ৪০ ওভারের সেই ম্যাচে আমরা দুজনই সেঞ্চুরি করেছিলাম। আমি ১১৩ রান করে শেষ সময়ে আউট হই, লাম্বা অপরাজিত থাকে ১১০ রানে। দলের রান ১ উইকেটে ২৫৪। তখন ঢাকা স্টেডিয়ামে ২০০ রান করা মানে, লাঞ্চে ইসলামিয়া কিংবা প্রভেনসিয়াল হোটেল থেকে বিরিয়ানি আনা হতো। কারণ দলের নিশ্চিত জয়। দুই ওপেনারের সেঞ্চুরিতে ২৪৭ রান—এটি মনে হয় ঢাকার ক্রিকেটে এখনো রেকর্ড। আরেক দামাল সামার ফাইনালে মোহামেডানের হয়ে আবাহনীকে হারাই অপরাজিত ৭১ রান করে। ৪০ ওভারের ম্যাচ; ৩৭ নম্বর ওভারে সুরুকে একটি ছক্কা মারি। সেটি হয়ে যায় টার্নিং পয়েন্ট। আরেকটি ম্যাচ মনে পড়ছে, যেখানে সূর্যতরুণের হয়ে আবাহনীর বিপক্ষে ১২ ওভারেই করি ৭২। পিটিয়ে ওদের চামড়া খুলে দিই।

প্রশ্ন : বোলিং? আবাহনীর হয়ে শেষ ওভারে বোলিং করে হারান মোহামেডানকে, যেখানে রমন লাম্বাকে বল না দিয়ে অধিনায়ক ফারুক আহমেদ আপনার হাতে বল তুলে দেন। মনে আছে?

মাসুম : খুব মনে আছে। লাম্বা তো বল ঘষা শুরু করে দেয়। পরে ফারুক আমাকে ডাকলে ও বলে, ‘মাসুম দলকে হারিয়ে দেবে। ’ তবু আমাকে বল দেয় অধিনায়ক। মোহামেডানের সাত/আট রান লাগত। আমি অফ স্পিনে আবাহনীকে জিতিয়ে দিই দুই/তিন রানে। এমনিতে গড়পড়তা বোলিং করতাম। এক-দুই-তিন উইকেট করে নিতাম। ক্যারিয়ারে পাঁচ উইকেট একবারই পাই, আবাহনীর হয়ে কলাবাগানের বিপক্ষে। আর লাম্বার সঙ্গে ওপেনিং জুটিতে দুজনের সেঞ্চুরি করার কথা বললাম না, সেই ম্যাচে চার উইকেট নিই। আমার কাছে এখনো পরদিনের পেপার কাটিং আছে।

প্রশ্ন : গালিতে তুখোড় ফিল্ডারও তো ছিলেন...

মাসুম : কী বলব ভাই, আমি গালিতে যেসব ক্যাচ নিয়েছি, অন্যরা তা হাত দেওয়ার সাহসই করত না। রকিবুল মাঠে দাঁড়িয়ে নিজে আমাকে অমনটা বলেছে। আমার সময়ের যে কাউকে জিজ্ঞেস করলে জানবেন। এই যে বাংলাদেশ ক্রিকেট এখন এত এগিয়ে গেছে কিন্তু গালিতে আমার মতো ফিল্ডার এখনো দেখিনি।

প্রশ্ন : আপনাদের সময়ের সেরা ব্যাটসম্যান, সেরা বোলার কাদের বলবেন?

মাসুম : সেরা ব্যাটসম্যান নান্নু ও আকরাম। বোলার প্রিন্স ও বাদশা ভাই।

প্রশ্ন : পরবর্তী সময়ে আপনি বাংলাদেশ জাতীয় দলের নির্বাচক হন। আপনাদের সময়েই ২০১১ বিশ্বকাপ স্কোয়াড থেকে মাশরাফি বিন মর্তুজাকে বাদ দেওয়ার মতো মহা বিতর্কিত ঘটনা ঘটে। সিদ্ধান্তটি কি নির্বাচক প্যানেলেরই ছিল?

মাসুম : আর কার থাকবে?

প্রশ্ন : বাংলাদেশ ক্রিকেট দল নির্বাচনের পদ্ধতি সবার জানা। এখানে বোর্ড প্রেসিডেন্ট, কোচ অনেকের পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপার থাকে। আর মাশরাফি তো সবসময় বলেন যে, ২০১১ বিশ্বকাপ থেকে তাঁকে বাদ দেওয়াটা ছিল অবিচার?

মাসুম : মাশরাফি দুঃখ-কষ্ট-আবেগের জায়গা থেকে বলতেই পারে যে, বিশ্বকাপ স্কোয়াড থেকে বাদ দেওয়াটা অবিচার ছিল। কিন্তু আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি, ২০১১ বিশ্বকাপ স্কোয়াড থেকে ওকে বাদ দেওয়ার কারণেই ও এখনো ক্রিকেট খেলছে। নইলে ক্যারিয়ার কবে ধ্বংস হয়ে যেত! অস্ট্রেলিয়া থেকে বিশেষজ্ঞ ফিজিও, ডাক্তারের রিপোর্টের ই-মেইলটা আমার কাছে আছে। সেখানে লেখা, ‘মাশরাফি বিশ্বকাপে খেললে ওর পা ভেঙে দুই টুকরো হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। ’ আমরা নির্বাচকরা সেই ঝুঁকিটা নিইনি। কোচ জেমি সিডন্সও পক্ষে ছিলেন আমাদের। তবে বোর্ড প্রেসিডেন্ট মুস্তফা কামাল ভাই মাশরাফিকে চাইছিলেন। উনি তো বলেই দেন যে, মাশরাফি ছাড়া দল সই করবেন না। সে কারণে দল ঘোষণার সংবাদ সম্মেলন এক ঘণ্টা পর্যন্ত পিছিয়ে যায়। আবাহনী ক্লাব থেকে এমন চাপও ছিল যে, মাশরাফিকে না খেলালেও স্কোয়াডে রাখো। কিন্তু প্রধান নির্বাচক রফিক ভাইয়ের নেতৃত্বে আমরা ছিলাম নিজেদের সিদ্ধান্তে অটল। সে কারণে মাশরাফিকে ছাড়াই দল হয়।

প্রশ্ন : তাহলে মাশরাফি যে অবিচারের কথা বলেন...

মাসুম : ভুল। ওর সঙ্গে কোনো অবিচার করা হয়নি। বরং মাশরাফির মঙ্গলের জন্য সেই বিশ্বকাপ স্কোয়াডে ওকে রাখা হয়নি। ওর তো উচিত, আমাদের এখন ধন্যবাদ দেওয়া। নইলে এত দিন ওর ক্যারিয়ার থাকত না।

প্রশ্ন : জাতীয় দলের ম্যানেজার ছিলেন অল্প সময়। সময়টা কেমন উপভোগ করেন?

মাসুম : নির্বাচক হিসেবে কাজ করার চেয়ে বেশি উপভোগ্য অবশ্যই। কারণ নির্বাচকদের ওপরে টেকনিক্যাল কমিটি নামে আরেক নির্বাচক প্যানেল ছিল। কিন্তু ২০১২ সালে এশিয়া কাপ ও পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজে ম্যানেজার ছিলাম যখন, তখন অমন কোনো ওপরের খবরদারি ছিল না। ছেলেদের সঙ্গে সময়টা আরো বেশি উপভোগ করি। জাতীয় দলের ছেলেগুলো খুব ভালো, খুব ডিসিপ্লিনড...

প্রশ্ন : এই ডিসিপ্লিনের প্রসঙ্গে একটি অপ্রিয় প্রশ্ন করি। আবাহনীতে যাওয়ার পর আপনি নিজে মাঠের বাইরে খুব ডিসিপ্লিনড ছিলেন না বলে শোনা যায়। সে কারণেই ক্রিকেটে যত দূর যাওয়া সম্ভব, তত দূর যেতে পারেননি। এ বিষয়ে কী বলবেন?

মাসুম : ডিসিপ্লিনড ছিলাম না বলতে ঠিক কী বোঝাতে চাইছেন, ধরতে পারছি না। তবে যা-ই হোক না কেন, আমি তার সঙ্গে পুরোপুরি দ্বিমত পোষণ করছি। ডিসিপ্লিন ঠিক না থাকলে আবাহনীতে তিন বছর খেলতে পারতাম না। ব্রাদার্সে গিয়ে অত রান করতে পারতাম না। সূর্যতরুণ, কলাবাগান সব জায়গাতেই তো রান করেছি রে ভাই। কোনো ম্যাচের একাদশ থেকে বাদ পড়িনি। আমি ডিসিপ্লিনড ছিলাম না, এটি আপনি যেখান থেকেই শুনেছেন—আমি তা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করছি।

প্রশ্ন : পরিবারের কথা একটু জানতে চাই। বিয়ে করেছেন কবে?

মাসুম : ১৯৯১ সালে। স্ত্রীর নাম সানজিদা পারভীন ঊর্মি। ওর সঙ্গে আমার পরিচয়ও কিন্তু ক্রিকেটের সূত্রে। কোনো এক বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্টে সিঙ্গাপুর দলের লিয়াজোঁ ছিলাম। ওদের সঙ্গে ঢাকা থেকে যাচ্ছি রাজশাহী। বাংলাদেশ বিমানের সেই ফ্লাইটে ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট ছিল ঊর্মি। ট্রেনিং শেষে সেটি ওর প্রথম ফ্লাইট। সেখানে পরিচয় আমাদের। কয়েক মাসের মধ্যেই বিয়ে করি আমরা। আমাদের ছেলে মুস্তাকিম রাজ্জাক গত বছর পাইলট হয়েছে। মেয়ে মুসকুরান রাজ্জাক দিল্লি পাবলিক স্কুলে দশম শ্রেণিতে পড়ছে।

প্রশ্ন : শেষ প্রশ্ন। সব মিলিয়ে জীবন নিয়ে, ক্যারিয়ার নিয়ে তৃপ্তি কতটা?

মাসুম : শতভাগ তৃপ্ত। এখন ঢাকা ক্লাবের সদস্যপদ পাঁচ কোটি টাকা দিলেও কেউ পাবেন না, যদি না কেউ নিজেদের সদস্যপদ বিক্রি করেন। কিন্তু আমাকে, প্রিন্সকে ও ইশতিয়াক ভাইকে ঢাকা ক্লাবের স্থায়ী সদস্যপদ দিয়েছে। সেটি ওই ক্রিকেটের কারণে। ক্রিকেটের কারণে চমৎকার এক মেয়েকে স্ত্রী হিসেবে পাওয়ার গল্পটি তো বললামই। এ ছাড়া এখনো বিভিন্ন জায়গায় গেলে ক্রিকেটার হিসেবে সম্মান পাই। ব্যাংকের কর্মকর্তা কিংবা চাঁদনী চকের সিগারেটওয়ালার কথা তো আপনাকে বললামই। ক্রিকেট ছাড়ার পর চাকরি করেছি, ব্যবসা করেছি। এখনো তা-ই করছি। সেখানেও সাফল্য পেয়েছি। জীবন নিয়ে তাই কোনো অভিযোগ নেই। ক্যারিয়ার নিয়ে বরং একটু আফসোস আছে। বাংলাদেশ জাতীয় দলে আরো সাফল্য পেতে পারতাম।


মন্তব্য