kalerkantho


তাঁদের ওপর আলো

মাজহারুল ইসলাম   

৬ জানুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



তাঁদের ওপর আলো

করুণ নায়ার

এ যেন রূপকথার কোনো গল্প। জীবনের প্রথম শতরানটাই কিনা ট্রিপল! টেস্ট ইতিহাসের যে বীরোচিত কীর্তি এত দিন ছিল মাত্র দুজনের— ওয়েস্ট ইন্ডিজ কিংবদন্তি গ্যারি সোবার্স ও অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ব্যাটসম্যান বব সিম্পসনের।

অবশেষে বিরল এ ক্লাবে আরো একজন সঙ্গী পেয়েছেন সোবার্স-সিম্পসন। করুণ নায়ার। ভারতের নতুন ব্যাটিং সেনসেশন। জীবনের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিটাকেই অনন্য ট্রিপলে রূপ দেওয়া টেস্ট ইতিহাসের তৃতীয় ব্যাটসম্যানের একজন।

নিজের একজন সঙ্গী পেয়েছেন বীরেন্দর শেবাগও। ভারতের হয়ে এত দিন একমাত্র ট্রিপল সেঞ্চুরিয়ান ছিলেন ‘বীরু’। ১২ বছর ৮ মাস পর দ্বিতীয় ভারতীয় হিসেবে ৩০৩ রানের নান্দনিক এক ইনিংস খেলে শেবাগের সঙ্গী হয়েছেন নায়ার। ২০০৮ সালে চিপকের যে মাঠে ভারতীয়দের ট্রিপল সেঞ্চুরির আক্ষেপ ঘুচিয়েছিলেন শেবাগ, এক যুগেরও বেশি সময় পর চেন্নাইয়ে সেই চিদাম্বরম স্টেডিয়ামে নতুন ইতিহাস গড়েন ২৫ বছরের নায়ার।   ক্যারিয়ারের তৃতীয় ইনিংসেই রানের এ এভারেস্ট্র চূড়া ছুঁয়ে।

 

রেকর্ড এটাও। এত কম ইনিংসে ট্রিপল করার কীর্তি যে নেই আর কারো। এত দিন সবচেয়ে কম ৯ ইনিংসে ট্রিপল সেঞ্চুরি করার রেকর্ডটা ছিল লেন হটনের। হটনের সেই রেকর্ডটাও গুঁড়িয়ে দিয়ে প্রত্যাশার পারদটাও চড়িয়ে দিলেন নায়ার। নতুন বছরে কেমন উজ্জ্বল আলো তিনি বাইশ গজের মঞ্চে ছড়াবেন—এ নিয়ে ক্রিকেট বিশ্বের কৌতূহল থাকবে নিঃসন্দেহে। তবে অনন্য ওই ট্রিপলের পরও তিনি যে ভারতীয় একাদশে জায়গা পাবেনই এর নিশ্চয়তা অবশ্য নেই। জয়ন্ত যাদবের ক্ষেত্রের কথাটা নিরেট সত্য। ভাইজাগে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পাঁচ দিনের ক্রিকেটে পথচলা শুরুর পর একেবারে খারাপ সময় কাটেনি তাঁর। চার ইনিংসে একটি শতরানসহ ৭৩.৬৬ গড়ে রান। নতুন বছরে যাদবও নিশ্চয় চাইবেন ধারাবাহিকতার দুর্দান্ত প্রদর্শনীতে ভারতীয় দলে নিজের জায়গা পাকা করে নিয়ে প্রচারের আলোটা নিজের ওপর ফেলতে।

বিস্ময় জাগিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পথচলা শুরু করেছেন মেহেদী হাসান মিরাজও। বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের সাবেক এ অধিনায়ক চট্টগ্রামে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অভিষেকে নেন ৬ উইকেট। এরপর মিরপুরে দ্বিতীয় ম্যাচে তাঁর বোলিং কীর্তিতেই তো রচিত হয়েছে ইংলিশ বধের বীরত্বগাথা। বাংলাদেশের রূপকথার ওই জয়ে স্পিন জাদুতে ১২ উইকেট নিয়েছেন মেহেদী হাসান মিরাজ। দুই ম্যাচে নিয়েছেন ১৯ উইকেট। এর মধ্যে তিনবার ইনিংসে নিয়েছেন ৬টি করে উইকেট। ২০১৭ সালে বাইশ গজে নতুন কোনো রূপকথা তিনি রচনা করতে পারেন কি না, ক্রিকেটের অন্য দুই ফরম্যাটেও জায়গা করে নিতে পারেন কি না—এ নিয়ে ক্রিকেট বিশ্বের কৌতূহল থাকবে—এটাই তো স্বাভাবিক।

ক্রিকেটপ্রেমীদের চোখ থাকবে ইংলিশ ব্যাটসম্যান হাসিব হামিদের ওপরও। আলোচনা ছড়িয়ে ইংলিশ জার্সিতে টেস্ট অভিষেক। ষোলোআনা প্রত্যাশা অবশ্য মেটাতে পারেননি তিনি। তবে দ্রুত হারিয়ে না গিয়ে ক্রিকেট আকাশের উজ্জ্বলতম এক ধ্রুবতারা হয়ে যে অনেক দিন টিকে থাকতে এসেছেন, ভারতের বিপক্ষে সিরিজে তা ঠিকই প্রমাণ করতে পেরেছেন ‘বেবি বয়কট’খ্যাত এই ইংলিশ ব্যাটসম্যান। ১৯ বছরের আরেক ইংলিশ তরুণ কিটন জেনিংসের শুরুটাও হয়েছে স্বপ্নিল। অভিষেকে শতরান আছে দক্ষিণ আফ্রিকান বংশোদ্ভূত এই ক্রিকেটারের। নতুন বছরে সেই আলোটা তিনি ছড়াতে পারেন কি না সেটাই এখন দেখার বিষয়।

অস্ট্রেলিয়ার উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান পিটার হ্যান্ডসকম্ব, ট্রাভিস হিড, ম্যাট রেনশ, নিউজিল্যান্ডের লকি ফার্গুসনদেরও নিজেদের প্রমাণের বছর এটা। অস্ট্রেলিয়ার পিটার হ্যান্ডসকম্বের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শুরুটা হয়েছে স্বপ্নিল। চার টেস্টে দুটি সেঞ্চুরি আর দুটি হাফ সেঞ্চুরি। নতুন বছরটা শতরান করেই শুরু করেছেন হ্যান্ডসকম্ব! তাঁর অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় দলের সতীর্থ রেনশ ২০১৭ সালটা শুরু করেছেন শতরান করে। দুর্দান্ত এ ছন্দটা নিশ্চয় তাঁরা টেনে নিয়ে যেতে চাইবেন অনেকটা দূর! দক্ষিণ আফ্রিকার স্টিফেন কুকেরও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে খুব বেশি দিন আগে আগমন হয়নি; গত বছরের জানুয়ারিতে পাঁচ দিনের ক্রিকেটে অভিষেকের অল্প কিছুদিনের মধ্যেই অবশ্য রেখেছেন নিজ প্রতিভার স্বাক্ষর। ৭ ম্যাচে ৩টি শতরান ও ২টি হাফ সেঞ্চুরি কুকের। এ সাফল্যের পুরস্কার হিসেবে নতুন বছরে অন্য দুই ফরম্যাটেও প্রোটিয়া একাদশে নিজের একটা জায়গা চাইতেই পারেন কুক।  

ব্রাজিলের বিখ্যাত হলুদ জার্সিতে স্বপ্নিল অভিষেক হয়েছে গ্যাব্রিয়েল জেসাসেরও। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের হয়ে ৬ ম্যাচে ৪ গোল করে নজর কেড়েছেন এই ফরোয়ার্ড। ২০১৮ বিশ্বকাপ বাছাইয়ে দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলে ব্রাজিলকে শীর্ষে রাখার অন্যতম রূপকার এই জেসাস। ম্যানচেস্টার সিটির মতো ক্লাব তো আর এমনিতে তাঁর পেছনে মিলিয়ন মিলিয়ন পাউন্ড ব্যয় করেনি! নতুন বছরে নতুন ঠিকানা ইতিহাসে নিজেকে মেলে ধরার চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি ব্রাজিল জার্সিতে দুর্দান্ত ছন্দটা অনুবাদ করে নিজেকে নতুন উচ্চতায় নিশ্চয় তুলে ধরতে চাইবেন এই ব্রাজিলিয়ান।

টটেনহামের ডেল আলীর লক্ষ্যটাও ভিন্ন হওয়ার নয়। স্পার জার্সিতে গত মৌসুমটা স্বপ্নের মতো কাটিয়েছেন তিনি। ক্লাবের দুর্দান্ত ফর্ম ইংল্যান্ড জাতীয় দলে শুরুর একাদশেও জায়গাটা পাকা করে নিয়েছেন এ ফরোয়ার্ড। ২০১৬ সালে থ্রি লায়নস জার্সিতে খেলেছেন ৯ ম্যাচ। ২০১৭ সালে আগের সাফল্য ছাড়িয়ে গিয়ে নিজেকে আরো উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারবেন তো ডেল আলী! তাঁদের বাইরে সুইজারল্যান্ডের ক্যামেরুনিয়ান বংশোদ্ভূত ১৯ বছরের ফুটবলার ব্রিল এম্বোলো, রোমায় যোগ দেওয়া ব্রাজিলের ১৯ বছরের অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার গারসন, মাত্র ১৬ বছর বয়সে চ্যাম্পিয়নস লিগে খেলা বেলজিয়ান তরুণ ইউরি তিয়েলেমানস, ম্যানচেস্টার সিটিতে নাম লেখানো লিরয় সানে কিংবা বায়ার্ন মিউনিখের কিংসলে কোমানদের মতো উদীয়মান ফুটবলারদের ওপরও থাকবে ফুটবলপ্রেমীদের পাখির চোখ।     

টেনিসে ‘বিগ ফোর’, স্তানিসলাস ওয়ারিঙ্কা, জো উইলফ্রাইড সঙ্গাদের পাশাপাশি নজর থাকবে নিক কিরগিওস, আলেকজান্ডার জিভেরেভের মতো উঠতি তারকাদের ওপরও। তাঁদের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ান কিরগিওস অতীতে যতটা না নজর কেড়েছেন টেনিসের ফর্ম দিয়ে তাঁর চেয়ে বেশি আলোচনায় ছিলেন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে। সেই নীতিবাচক দিকগুলো পরিহার করে এবার নিশ্চয় চাইবেন টেনিস দিয়ে আলোচনায় আসতে। মেয়েদের টেনিসে গারবিনে মুগুরুজা, ইউজেনি বুচার্ড, এলিনা সভিতোলিনা, ম্যাডিসন কাইসরাও থাকবেন নজরে। তাঁদের মধ্যে স্প্যানিয়ার্ড গারবিনে গতবছরই ফ্রেঞ্চ ওপেন জিতে ঘুচিয়েছেন গ্র্যান্ড স্লামের অতৃপ্তি। এবার তাঁর সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ সোনালি সেই সাফল্যের পুনরাবৃত্তি করা। আর বুচার্ড-কাইসদের সামনে চ্যালেঞ্জ গ্র্যান্ড স্লাম জয়ীদের ব্র্যাকেটবন্দি হওয়ার।

তুলনায় অনেক অভিজ্ঞ মারিয়া শারাপোভা। নামের পাশে পাঁচ-পাঁচটি গ্র্যান্ড স্লাম রাশান সুন্দরীর। সেই শারাপোভাও কিন্তু নতুনভাবে শুরু করতে যাচ্ছেন টেনিসে এ বছর। ডোপ কেলেঙ্কারিতে নির্বাসন কাটিয়ে এপ্রিলে ‘দ্বিতীয় জীবন’ শুরু করবেন শারাপোভা কোর্টে। সেই শুরুটা কেমন হয় রুশ তারকার সেদিকে টেনিসপ্রেমীদের বাড়তি একটা কৌতূহল থাকাটা মোটেও অস্বাভাবিক নয়।

২০১৭ জ্যামাইকান গতি-দানব উসাইন বোল্টের অবসরের বছর। ট্র্যাক মাতিয়ে রাখার মতো উঠতি কোনো স্প্রিন্টারকে অবশ্য রাডারে দেখা যাচ্ছে না। কানাডিয়ান আন্দ্রে দ্য গ্র্যাসের মধ্যে অপার সম্ভাবনা অবশ্য দেখছেন অনেকে। কানাডার প্রথম স্প্রিন্টার হিসেবে এক অলিম্পিকে তিনটি পদক জিতে নিজের সে প্রতিভার প্রমাণও রেখেছেন ২২ বছরের এ তরুণ রিওতে। ব্রাজিলের আসরে ১০০ মিটারে ব্রোঞ্জ জয়ের পর ২০০ মিটারে উসাইন বোল্টের পেছনে থেকে দৌড় শেষ করে জেতেন রুপা; এরপর ৪ী১০০ মিটার রিলেতে জেতেন ব্রোঞ্জ। দুর্দান্ত এ ছন্দ ধরে রেখে বোল্টপরবর্তী জমানায় ট্র্যাকের নতুন তারকা হিসেবে গ্রাসে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পারেন কি না তার কিছুটা ঝলক হয়তো দেখা যাবে ২০১৭ সালেও।


মন্তব্য