kalerkantho


অপার সৌন্দর্যের নিউজিল্যান্ডে...

৬ জানুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



অপার সৌন্দর্যের নিউজিল্যান্ডে...

প্রথমবার এলে তো কথাই নেই, পুরনোদের জন্যও নিউজিল্যান্ড অপূর্ব। ৯ বছর আগের নিউজিল্যান্ড কতটা বদলেছে, সেসব ভাবার সময় মেলেনি এখনো।

পাহাড়-সমুদ্র-সবুজ-নীলের ওপর স্বচ্ছ আকাশ দেখে বিভ্রম হতে পারে, এ আমাদের পৃথিবীরই অংশ তো? বিভ্রমটা বাড়াবাড়ি, আসলে মনে হবে পৃথিবীর একটা অংশ এত্ত সুন্দর! এটাই রিয়েলিস্টিক; ঘরের মাটিতে দাপটে হোয়াইটওয়াশ করা বাংলাদেশ যে নিউজিল্যান্ড এসে ধুঁকবে, এটাই বাস্তবসম্মত।

এ ফিচার যখন লিখছি, তখন তিন ওয়ানডে আর একটি টি-টোয়েন্টিসহ ৪-০ ব্যবধানে পিছিয়ে বাংলাদেশ দল। গতবারের সঙ্গে স্কোরলাইনে কোনো হেরফের নেই। তবু কোথায় যেন নীরব বিপ্লব ঘটে গেছে। ২০০৭-০৮ মৌসুমে হারটা নিয়তি ছিল, ব্যবধান যথাসম্ভব কমানোই লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের। এবারও হারে ব্যত্যয় ঘটেনি, তবে জয়ের বিশ্বাসটা ক্রিকেটারদের শরীরী ভাষায় দৃশ্যমান। সফরকারীদের নিয়ে আগে যেমন শালীনতা বজায় রেখে অচ্ছুতের মতো আচরণ করত নিউজিল্যান্ডাররা, এবার সেটাও নেই। প্রায় প্রতিটি ম্যাচে জয়ের সুযোগ তৈরি করেও হারের ক্লান্তির মধ্যে এটুকু সান্ত্বনা কিন্তু আমাদের দিয়ে চলেছেন মাশরাফি বিন মর্তুজারা। এক-দুজন তো আর নয়, বাংলাদেশি সাংবাদিকদের কন্টিনজেন্টটা ক্রিকেটারদের লটবহরের চেয়ে কোনো অংশ কম নয়—জনাবিশেক তো হবেই, সংখ্যাটা বাড়ছেই।

তাতে প্রতি ম্যাচেই প্রেসবক্স বাংলাদেশের দখলে। নেলসনে তাও পাঁচ-ছজন কিউই সাংবাদিককে দেখা গিয়েছিল, নেপিয়ারে সেটা প্রায় অর্ধেকে কমে এসেছে। মাউন্ট মঙ্গানুইয়ের প্রেসবক্সেও আমরা বিজয় পতাকা ওড়াব—ম্যাচ পূর্বাভাসে এই একটা ফল আগাম বলে দেওয়া যাচ্ছে নিশ্চিত করেই!

বিদেশে এলে আমরা নানাভাবে আক্রান্ত হই, মনোজগতে। মেজাজটা খিঁচড়ে যায় ভিন দেশের গোছানো ক্রীড়া-স্থাপনা দেখে। তবে দেখতে দেখতেই কি না, নিজেদের দৈন্য আর অব্যবস্থাপনা দেখে আগের মতো বিচলিত হই না। ৫০ হাজার জনবসতির নেলসনে স্যাক্সন ওভাল নামের ক্রিকেট স্টেডিয়ামকে ঘিরে যে ক্রীড়া কমপ্লেক্স তৈরি হয়েছে পাহাড়ের কোলঘেঁষে, তার তুল্য কিছু নেই ঢাকায়, এমনকি পুরো বাংলাদেশে। নেপিয়ারের ম্যাকলিন পার্কে ক্রিকেটের পাশাপাশি রাগবিও হয় বলে জানতাম, প্রথম টি-টোয়েন্টির পর সংবাদ সম্মেলনে গিয়ে দেখি বাস্কেটবলের চারটা কোর্টও আছে স্টেডিয়াম সংলগ্ন ইনডোরে। স্থাপনাগুলো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য খুব বেশি লোকজন চোখে পড়েনি, তবু কি ঝকঝকে সব কিছু। না, এসব দেখে আর আক্ষেপ করি না। বরং ভালোই লাগে খেলাধুলার এমন চমত্কার পরিবেশ দেখে। এ তো আর শুধু পেশাদারদের জন্য গড়ে তোলা ক্রীড়া স্থাপনা নয়, সাধারণ শহরবাসীর জন্যও নগর কর্তৃপক্ষ খেলার মাঠগুলো এমন পরিপাটি করে রেখেছে যে চমকে যাবেন যেকোনো নবাগত। এদের জনসংখ্যা কম, জায়গা ও সংগতি বেশি বলেই কি এমন ক্রীড়া পরিবেশ? কিছুটা তো বটেই, তবে সব কিছুর মূলে সদিচ্ছা। ওটা ষোলোআনা নিউজিল্যান্ডারদের ও বিশ্বের অনেক দেশেরও। আমাদের ওসবের বালাই নেই তো কি!

যাক, সাংবাদিকদের কন্টিনজেন্টে নিউজিল্যান্ডে নবাগতের সংখ্যাই বেশি। তারা সম্ভবত সব দেখে আরো চমত্কৃত। স্পোর্টস কমপ্লেক্স থেকে চোখ সরালেই হরেক রঙের ফুল, ছবির মতো বাড়িঘর আর মিহি সরল রৈখিক পথ দেখে বিস্মিত তারা। আর মোহিত নিউজিল্যান্ডারদের বন্ধুবাত্সল্যে। সাহায্যের জন্য হাত বাড়ালে স্থানীয়রা নিজের কাজ ুফেলে ছুটছেন সমস্যা সমাধানে। কোনো কিছু খোয়া যাওয়ার ভয় নেই, কিছু হারালেও নির্ভার অপেক্ষায় থাকা যায়, কারো হাতে পড়লে নিশ্চিতভাবেই ফেরত পাওয়া যাবে। এমন মূল্যবোধের সঙ্গে তো আর আমাদের কারোরই তেমন একটা পরিচয় নেই। তাই আমরা আলোড়িত হই সবাই। ক্রাইস্টচার্চ টু নেলসন থেকে নেপিয়ার হয়ে তাওরাঙ্গা—প্রায় হাজার কিলোমিটারের প্রতিটি ফ্রেমই মুগ্ধতা ছড়াবে মনে। মনে হবে, আহা যদি জীবনটা আরো দীর্ঘতর হতো!

এমন অপার সৌন্দর্যের কারণেই নিউজিল্যান্ড শুধু ক্রিকেট ডেস্টিনেশনই নয়, পর্যটকের কাছে দুর্নিবার আকর্ষণও। অবশ্য নিউজিল্যান্ডারদের কাছে ক্রিকেট বড় কোনো আকর্ষণ নয় মোটেও। ছোট্ট নেলসনও কেমন ঘাপটি মেরে ছিল বাংলাদেশ দলকে নিজেদের আঙিনায় পেয়ে। আমরা নেলসনে নেমে অলিগলিতে ক্রিকেট খুঁজি। কিন্তু কিসের কি, নিউজিল্যান্ড-বাংলাদেশ সিরিজের শেষ দুটি ওয়ানডের চেয়ে নিউ ইয়ার সেলিব্রেশন আর কনসার্ট নিয়েই মজে নেলসন। ম্যাচে দর্শক হয়েছিল বটে, তবে ওটা স্রেফ ছুটির দিনের কিছুটা সময় কাটানোর উপলক্ষ নিয়ে। বড় শক্তি হয়েও নিউজিল্যান্ডে রাগবির অর্ধেক ঔজ্জ্বল্যও ক্রিকেটের আছে কি না, সেটি সংশয়াতীত নয়। সে কেন উইলিয়ামসনকে বিশ্বের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান বলে যতই দাবি করুক না কেন কিউই মিডিয়া। অবশ্য সে দাবিও ঠাঁই পায় পত্রিকার অনুল্লেখ্য জায়গায়। বড় ইভেন্ট ছাড়া ক্রিকেটের কদর নেই স্থানীয় মিডিয়ায়। সেখানে নিউজিল্যান্ড-বাংলাদেশ দ্বৈরথের বিপণন প্রত্যাশিতভাবেই বেশি হচ্ছে না।

অবশ্য বাংলাদেশি মিডিয়ায় মনে হয় ভালোই বিকোচ্ছে এ সিরিজ। বাংলাদেশ এক-দুটি ম্যাচ জিতে গেলে কাটতি যে আরো বাড়ত, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে বাংলাদেশ হারের কবলে পড়লে খবরের অভাব হয় না, অবশ্য এর সবটাই নেতিবাচক! দ্বিতীয় ওয়ানডেতে জয়ের বন্দরের খুব কাছে গিয়ে মাশরাফিদের ভরাডুবির পর যেমনটা শুরু হয়েছে। একাদশ নির্বাচনকে ঘিরে কোচ বনাম অধিনায়ক টানাপড়েন বেড়ে গেছে বোর্ডের শীর্ষকর্তার একটি মন্তব্যে। অনুমান করা যায়, হারের ধারা অব্যহত থাকলে জানুয়ারির ২৪ তারিখ এ সিরিজ শেষ হওয়ার নির্ধারিত সময়কালে আরো ‘খবর’ হবে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে। সাফল্যের রথে চড়ে বসা চন্দিকা হাতুরাসিংহে, মাশরাফি বিন মর্তুজা কিংবা বিসিবির সুখী চেহারার কি হাল হয় তখন—সেটাই দেখার!

সিরিজের গাড়ি যেভাবে চলছে, তাতে মাশরাফিদের ভাগ্যের মোড় ঘোরার সম্ভাবনা খুব একটা নেই। ওয়ানডেতেই সবচেয়ে বড় সুযোগ ছিল, মিলেছিলও নিউজিল্যান্ডের মাটিতে প্রথম জয়ের দেখা পাওয়ার। টি-টোয়েন্টিতে ছোট-বড়র ব্যবধান কমে যাওয়ার একটা থিওরি চালু আছে। তবে বাংলাদেশ বনাম নিউজিল্যান্ড টি-টোয়েন্টি দ্বৈরথে এ তত্ত্ব কখনো প্রমাণিত হয়নি, হবে এমন আশ্বাসও মিলছে না। আর সিরিজ শেষ হবে দুই টেস্টের সিরিজ দিয়ে। সে দুটিতে দুই দলের ব্যবধান আরো স্পষ্ট।

অগত্যা স্কোরলাইন একদিকেই ক্রমাগত ভারী হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। তবে প্রত্যাশা একটাই, নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়া চারটি ম্যাচের মতো সাময়িক প্রতিদ্বন্দ্বিতা অন্তত অব্যাহত রাখুন বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা। নিউজিল্যান্ডের মাটিতে কাজটা কঠিন, তবে অসম্ভব নয় মোটেও।


মন্তব্য