kalerkantho


স্বাগত ২০১৭

সনৎ বাবলা   

৬ জানুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



স্বাগত ২০১৭

ব্রাজিল বিশ্বকাপ ফুটবলের কথা। ব্রাজিলে গিয়ে পরিচয়পর্বেই গলদঘর্ম হতে হতো বাংলাদেশি সাংবাদিকদের।

ওই অঞ্চলের লোকজনের জ্ঞান ভারত-পাকিস্তান পর্যন্ত। বাংলাদেশ নামেই ধন্দে পড়ে যায়। এই দেশ আর খুঁজে পায় না। এটা কি ভারতের ভেতরে না বাইরে? বলে কী! রক্ত দিয়ে মুক্ত করা স্বাধীন বাংলাদেশ, গলায় ঝোলানো কার্ডে দেশের নাম দেখানোর পর কিছুটা দমে। একটু বুঝি নতুন এক দেশ আবিষ্কারের আনন্দও। এমন বিরূপতার মাঝে বাংলাদেশ শুনে কেউ হাসিমুখে হাত বাড়িয়ে দিলে তো বিশেষ ঘটনা। দক্ষিণ আফ্রিকার দুই সাংবাদিক কার্ড দেখেই বলে ওঠেন, ‘আরে। আপনারা তো ক্রিকেট নেশন। ’ এরপর ক্রিকেট নিয়ে খনিকের আলাপে আপাত বন্ধুত্বের বন্দোবস্ত হয়ে যায়।

ফুটবলের কী অবস্থা?

একসময় অবস্থাপন্ন ছিল? দুই জনপ্রিয় দল আবাহনী-মোহামেডানে দেশ বিভক্ত ছিল। এখনকার বিভক্তি ব্রাজিল-আর্জেন্টিনায়, দুই দেশের পতাকা উড়িয়ে মানুষ বিশ্বকাপ ফুটবল প্যাশন প্রকাশ করে।

কিন্তু ক্রিকেটে তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে!

এটা বাংলাদেশের এক নম্বর খেলা। মানুষ খুব আলিঙ্গন করে নিয়েছে খেলাটিকে।

ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে বসে ক্রিকেটের আলোচনায় সেদিন শির উন্নত হয়েছিল বাংলাদেশি সাংবাদিকের। একটা খেলা হয়ে গেছে দেশ-জাতির পরিচয়ের স্মারক। দেশের বাণিজ্য-অর্থনীতি কিংবা অন্যান্য বিভাগেও হয়তো সাড়া জাগানো উন্নতির সূচক আছে। তাতে বিশ্ব জনতার কী যায় আসে। তাদের বিনোদন মাঠের খেলায়, হার-জিতের আনন্দে। সেই কাঙ্ক্ষিত আনন্দ অন্য কেউ ছিনিয়ে নিলে যন্ত্রণার পাশাপাশি প্রতিপক্ষকের ছবিটাও মনে গেঁথে যায়। এভাবেই বাংলাদেশ ক্রিকেটের ছবিটা ধীরে ধীরে বড় হয়েছে। যোগ হয়েছে অহংকার আর গৌরব। গত বিশ্বকাপ থেকে মানুষের ক্রিকেট অহংকার এমন জায়গায় পৌঁছেছে, নিজেদের দলকে জয়ের সরণি ছাড়া চিন্তাই করতে পারে না। গেল বছরটিও দুর্দান্ত কেটেছে। সর্বশেষ ইংরেজ ক্রিকেট কৌলীন্যকে নাকাল করে ছেড়েছে।

তবে নিউজিল্যান্ডে গিয়ে হঠাৎ আবার সৃষ্টিছাড়া ক্রিকেটে মেতেছে বাংলাদেশ। নতুন বছরের শুরুটাও হয়েছে হারে। কিউই কন্ডিশনও একটা কারণ। ওদের জল-হাওয়ায় গিয়ে তাল মেলানো কঠিন কিনা। ক্রিকেট এমনই, যেখানে খেলা হবে সেই দেশ নিজস্ব সুযোগ-সুবিধায় খেলার আগেই এগিয়ে থাকে। সেদিক থেকে এ বছর বেশ কঠিন যাবে ক্রিকেটের। তবে মার্চে আবার উপমহাদেশে ফিরলে, অর্থাৎ শ্রীলঙ্কা সফরে কন্ডিশন আর প্রতিবন্ধক হয়ে থাকবে না। স্বমহিমায় ফিরবেন সাকিব-মুস্তাফিজরা, দলও ফিরবে সাফল্যের ধারায়। তারপর ইংল্যান্ডে চ্যাম্পিয়নস ট্রফি আর আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজ খেলবে। অক্টোবরে সবচেয়ে কঠিন সিরিজ আছে দক্ষিণ আফ্রিকায়। ওখানে গিয়ে শক্তিমানরাই হালে পায় না, আর উপমহাদেশের নতুন ক্রিকেট শক্তির জন্য ব্যাপারটা আরো কঠিন হবে। কিন্তু বড় শক্তি হতে গেলে যে কঠিনকেও ভালোবাসতে হবে। বিপন্নতাবোধ ঝেড়ে ভুল আর সংশোধনের মধ্য দিয়েই একদিন আরো বড় হবে দেশের ক্রিকেট।

নতুন বছরের কাছে ফুটবলের অনেক চাওয়ার আছে। ঐতিহ্যগতভাবে বাঙালির ফুটবল প্যাশন আছে, খেলাটা এ জাতিকে একসময় যেভাবে আনন্দে ভাসিয়েছে হালের গৌরবের ক্রিকেট সেই আনন্দযজ্ঞে পৌঁছাতে পেরেছে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। অবশ্য কালে কালে মানুষের স্বাদ, ভালো লাগা এবং তার প্রকাশভঙ্গি বদলায়, ক্রিকেট মাঠের জনারণ্য দেখে মনে হয়, এটিই-বা কম কিসে। তবে আমাদের ফুটবল প্যাশনটা অনন্যোপায় হয়ে বাঁক বদলে ইউরোপমুখী হয়ে মনের ক্ষুধা মেটায়। দেশের ফুটবল শাসকদের চূড়ান্ত ঔদাসীন্যে আমাদের ফুটবলটা আর মধ্যবিত্তের জীবনের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা নেই, ঠিক যেন মাঠে নেই। মাধ্যাকর্ষণের শিকল ছিঁড়ে কয়েক ইঞ্চি ওপরে ভেসে রয়েছে। মধ্যবিত্ত জগতের একদম বাইরে, অচেনা কক্ষপথে ফুটবলের অলৌকিক জীবনযাপন চলছে। এই অলৌকিকতায় কখনো এশীয় মানে, কখনো-বা কাতার বিশ্বকাপ পর্যন্তও ছুটে যাচ্ছে!

বাস্তবে আসলে পুরনো আভিজাত্যের গ্ল্যামার হারিয়ে ফুটবল হাবুডুবু খাচ্ছে দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের মধ্যে। এই লড়াইয়েও গ্রুপের বেড় অতিক্রম করে আগে বাড়তে পারে না। ডিসেম্বরে তার আরেক দফা পরীক্ষা হবে ঢাকায় সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে। দেশের মাঠে অন্তত সেমিফাইনালের চৌকাঠ ছুঁলেও কম নয়। সব নির্ভর করছে এ বছর জাতীয় দলের চেহারায় কী পরিবর্তন আসছে, তার ওপর। যে দলটা এখন আছে তার ওপর ভরসা রেখে লাভ নেই, ন্যূনতম সামর্থ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক সাফল্য পাওয়া যায় না। ভাগ্য বদলাতে নতুন প্রতিভা লাগবে। তাই বছর শুরুর বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ খুব গুরুত্বপূর্ণ নতুন এক দল গঠনের জন্য। সূচি অনুযায়ী ফেব্রুয়ারি-মার্চে এ টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত নতুন বৈশিষ্ট্যের জাতীয় দল দাঁড় করানো, যারা অন্তত ফুটবল খেলতে পারে। যুব ফুটবলেও এ বছর এএফসির প্রতিযোগিতা আছে, ওসবে ভবিষ্যতের ফুটবলের একটা চিত্র মিলবে। সব হারিয়ে বাফুফে অবশেষে তৃণমূল আর যুব ফুটবল উন্নয়নে ব্রতী হয়েছে, হিরে-মতি না হলেও কিছু তো অন্তত পাওয়া যাবে।

ছেলেরা পেছাচ্ছে আর মেয়েদের ফুটবল পৃথিবী দিন দিন বড় হচ্ছে। গত বছর ঢাকায় অনূর্ধ্ব-১৬ ফুটবল দলের বিস্ফোরণের পর এ বছর থাইল্যান্ডে খেলবে চূড়ান্ত পর্বে। লড়বে এশিয়ার সেরা দলগুলোর সঙ্গে। এ লড়াইয়ে ফল যা-ই হোক দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের নারী ফুটবলে নতুন পরাশক্তি হিসেবে বাংলাদেশের নাম খোদাই করে দিয়েছে সাবিনা-কৃষ্ণারা। আগে ছেলেদেরও এমন দিন ছিল, অযত্ন-অদূরদর্শিতায় সেই সুদিন ফুরিয়েছে। শুরু হয়েছে মেয়েদের পায়ে সুরভিত ফুটবল দিন।

বাংলাদেশের হকি সব সময় অস্বস্তি আর উদ্বেগের জায়গা। সব সময় কোনো না কোনো সমস্যা তার আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকে। এর মধ্যেও খেলাটিকে সম্ভাবনার জায়গায় উঁচু করে রেখেছে খেলোয়াড়রা। গেল বছরের সাফল্যের জোরে তারা এবার এশিয়া কাপ হকি খেলবে, অবশ্য প্রায়শ এ টুর্নামেন্ট খেললেও কোনো আয়-উন্নতি নেই। শেষের দিকেই পড়ে থাকে এবং আবার এএইচএফ কাপ হকি খেলে এশিয়া কাপ খেলে এশিয়া কাপের টিকিট কাটে। এবারের বিশেষত্ব হলো আগামী অক্টোবরে এশিয়া কাপ হকি হবে ঢাকায়, সেই ’৮৫ পর দীর্ঘ বিরতি দিয়ে ফিরছে। আবার যদি সেরকম কিছু হয়! ৩১ বছর আগে এ টুর্নামেন্টের প্রভাব এবং স্বাগতিক দলের পারফরম্যান্সে দেশে যেমন হকির হাওয়া লেগেছিল। সেই উদ্দীপনা ফেরানোর কাজটা করতে পারে বাংলাদেশ দল তার পারফরম্যান্স দিয়ে। তারুণ্য আর অভিজ্ঞতার মিশেলে তৈরি এই দলের সামর্থ্য আছে, চমকে দেওয়ার ক্ষমতা আছে। তা ছাড়া একজন বিদেশি কোচ থাকলে দলটা আরো নিখুঁত হবে। কাজটা শুরু হবে এর আগে, মার্চে ঢাকায় ওয়ার্ল্ড হকি লিগের দ্বিতীয় রাউন্ডের পারফরম্যান্সে বোঝা যাবে বাংলাদেশ হকি দলের মতি-গতি।

জনপ্রিয়তার নিক্তিতে ক্রিকেটের পর ফুটবল-হকি চলে আসে বটে। তবে সেই নিক্তিরও বোধ হয় পরিবর্তন দরকার। আবেদন হারিয়ে হালের ফুটবল-হকির নিয়তি হয়ে গেছে শূন্য স্টেডিয়ামে বসবাস। হাওয়াই জনপ্রিয়তার কথা বাদ দিয়ে সাফল্যের বিচারে গেলে সম্ভাবনার জায়গায় দাঁড়িয়ে শ্যুটিং, দারুণ কিছু করার ইঙ্গিত আছে এ বছর। ইরানে এশিয়ান এয়ারগান চ্যাম্পিয়নশিপে দুটি রুপা জিতে বছর শেষ করা শ্যুটিং আলোর পথের দিশারী হিসেবে পেয়েছে ক্লাভস ক্রিস্টেনসেনকে। এই ডেনিশ রাইফেল কোচ এবং মন্টেনেগ্রোর পিস্তল কোচ মার্কো সকিচকে নিয়ে ফেডারেশন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সাজিয়েছে। লক্ষ্য নতুন শ্যুটারদের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার জন্য তৈরি করা। তাঁদের দিয়েই আন্তর্জাতিক পদকের সুলুকসন্ধান করবে শ্যুটিং। বড় স্বপ্ন ২০২০ সালের টোকিও অলিম্পিকে ওয়াইল্ড কার্ড বাদ দিয়ে নিজেদের যোগ্যতায় অংশ নেওয়া। ট্রেনিং প্রোগ্রাম সচল থাকলে অবশ্যই এ বছর সাফল্য-সোহাগা হবে দেশের শ্যুটিং।

ফেডারেশনের দূরদর্শিতাই শ্যুটিংকে সম্ভাবনার জায়গায় দাঁড় করিয়েছে। তেমনি সাঁতার, দাবা, ভলিবলের সুন্দর আগামীও হয়তো উঁকি মারছে। কিন্তু দেশের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় কি সাফল্যের কথা খুব ভাবে? সেটা বোধ হয় নয়। ক্রীড়া সাফল্যে যে এ দেশ নতুনভাবে বিজ্ঞাপিত হতে পারে, এটা তারা বিশ্বাস করে বলেও মনে হয় না। বিশ্বাস করলে অন্তত ক্রীড়ার জন্য আলাদা মন্ত্রণালয় থাকত। আলাদা পরিকল্পনা থাকত। ফেডারেশনগুলোকে আড়মোড়া ভেঙে জাগানোর চেষ্টা করত। সরকারি তরফ থেকেই যখন তেমন চাওয়া নেই তখন সামনের দিকে পরিষ্কার করে কিছু দেখাও যায় না। কেবল প্রত্যাশা করা যায়, আনন্দ-গৌরবে কাটুক বছরটি।


মন্তব্য