kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


লাইটস ক্যামেরা ক্রিকেট

সামীউর রহমান   

২১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



লাইটস ক্যামেরা ক্রিকেট

‘বুঝতে পারছিলাম না সিনেমা হলে আছি না প্রেস বক্সে আছি’—নীরজ পান্ডের  ‘এমএস ধোনি, দ্য আনটোল্ড স্টোরি’ দেখার প্রতিক্রিয়ায় এমনটাই লিখেছেন গৌতম ভট্টাচার্য। আনন্দবাজার পত্রিকার ঝানু ক্রীড়াসাংবাদিক, এককালে বিনোদন সাংবাদিকতার জগতেও ছিল সদর্প বিচরণ।

তাঁর চোখও যখন ধন্দে, তখন বুঝতে হবে সফল পরিচালক। ভারতের বিনোদনের দুটি বড় নিয়ামক হচ্ছে ক্রিকেট ও বলিউড। এই দুয়ের যুগলবন্দিতে বাণিজ্যলক্ষ্মীর কৃপা পাওয়ার জোরালো সম্ভাবনা। ফলে এই রাস্তায় হেঁটেছেন অনেকেই। কেউ সফল, কেউ ব্যর্থ, কেউ সমালোচিত। তবে এটুকু বলা যায়, ধোনির বায়োপিক যেভাবে সমালোচক, ক্রিকেট মহল ও বক্স অফিস মিলিয়ে অলরাউন্ড সাফল্য পেয়েছে, তেমনটা পায়নি আর কোনো ছবিই।

বলিউডের সাম্প্রতিক ট্রেন্ড স্পোর্টস বায়োপিক। রাকেশ ওম প্রকাশ মেহরার ‘ভাগ মিলখা ভাগ’ ছবিতে ‘ফ্লাইং শিখ’ সেজেছিলেন ফারহান আখতার। সপ্তাহে ছয় দিন জিমে ছয় ঘণ্টা করে খেটে ‘অ্যাথলেটিক বডি’ বানানোর পুরস্কারও পেয়েছিলেন ফারহান। ২০১৩ সালে জাতীয় পুরস্কার, ফিল্মফেয়ার পুরস্কারসহ অনেক সম্মাননা ও পুরস্কার ঘরে তুলেছিল ‘টিম মিলখা’। বক্স অফিসেরও ছিল আনুকূল্য, দেশে ও দেশের বাইরে সব মিলিয়ে ১৫০ কোটি রুপির ওপরে ব্যবসা করে ছবিটি। ধোনির বায়োপিক দেখার পর বলিউডের বাণিজ্য বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘এমএস ধোনি, দ্য আনটোল্ড স্টোরি’ সব রেকর্ড ভেঙে দেবে। ধোনির চরিত্রে সুশান্ত সিং রাজপুত পুরস্কারের জোর দাবিদার, পরিচালক নীরজ পান্ডেকেও নিরাশ করবে না ফিল্মফেয়ারের ‘ব্ল্যাক লেডি’।

পরিচালকের কৃতিত্বটা হচ্ছে, তিনি ধোনিকে মহামানব না বানিয়ে ছোট শহরের সাধারণ এক তরুণের ক্রিকেটার হয়ে ওঠার স্বপ্নের বাস্তবায়ন দেখিয়েছেন। অন্তত ইন্টারভেলের আগে রাঁচির আর ১০টা তরুণের সঙ্গে তাঁর পার্থক্য সামান্যই। বন্ধুদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলা, বাইক নিয়ে রাস্তার পাশের ধাবায় খেতে যাওয়া, রেলের চাকরিতে এসে স্বপ্নভঙ্গ—সব কিছুই যেন খুব চেনা কারো গল্প। পরিচালক নীরজ পান্ডে বাস্তবের কাছাকাছি যাওয়ার জন্যই শুটিং করেছেন ধোনির স্কুল, খড়গপুর রেলস্টেশনসহ এমন অনেক জায়গায়, যেখানে সত্যিই অনেক স্মৃতি মিশে আছে ক্যাপ্টেন কুলের। ছবিতে উঠে এসেছে ধোনির জীবনের প্রথম প্রেম, যে স্মৃতি সংগোপনে নিজের বুকেই চেপে রেখেছিলেন ‘এসএসডি’। প্লেনে পরিচয় হওয়া সেই তরুণীর দুর্ঘটনায় অকালমৃত্যুর ঘটনা জানতেনই না ঘনিষ্ঠ বন্ধু দীপ দাসগুপ্তের মতো সাবেক ক্রিকেটারও। ধোনি চরিত্রে সুশান্ত অনবদ্য। কিপিংটা তাঁকে হাতে ধরে শিখিয়েছেন কিরণ মোরে। আর সুশান্ত নিজে রপ্ত করেছেন ধোনির হাঁটা!

বন্ধুকে শিঙাড়ার লোভ দেখিয়ে শেখা হেলিকপ্টার শট, হোটেলের চাবি খুঁজতে গিয়ে সাক্ষীর সঙ্গে পরিচয় ...ধোনির জীবনের এমন অনেক অজানা ঘটনাও উঠে এসেছে সেলুলয়েডে। উঠে এসেছে ধোনির ‘বং কানেকশন’ও। বাঙালি স্পোর্টস টিচার ব্যানার্জি স্যারই তো ধোনিকে গোলকিপার থেকে বানিয়েছিলেন উইকেটকিপার! আর খড়গপুরে রেলের রিজিওনাল ম্যানেজার এ কে গাঙ্গুলির কথায়ই স্পোকেন ইংলিশে দখল বাড়ানোর চেষ্টা ধোনির। বিশ্বকাপ ফাইনালে ছক্কা মেরে দলকে জেতানো লোকটার পেছনের না বলা গল্পটাই ফিল্মের ভাষায় বলেছেন নীরজ। ফল, বক্স অফিসেও ছক্কা! প্রশংসা সবদিকে আর বক্স অফিসে ১৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ব্যবসা!

ধোনির টুইটার পরিচিতিতে লেখা, ‘বাটার চিকেনের মাসালার জন্য সব সময়ই ক্ষুধার্ত’। তাঁর বায়োপিক যদি উত্তর ভারতীয় এই ডিশের মতোই সুস্বাদু হয় তাহলে ‘আজহার’ একেবারে আলুনী! সঙ্গীতা বিজলানির ভূমিকায় নার্গিস ফখরিকে নিয়ে বাজে রান্নায় ঠুসে লঙ্কা দেওয়ার চেষ্টাই করেছেন পরিচালক টোনি ডি সুজা। এ বছরের মে মাসে মুক্তি পায় আজহারউদ্দিনের বায়োপিক। তাতে নাম ভূমিকায় ইমরান হাশমি, আজহারের প্রথম স্ত্রী নওরিনের ভূমিকায় প্রাচী দেশাই আর আলোচিত জুয়াড়ি শন ওরফে মিস্টার শর্মার চরিত্রে রাজেশ শর্মা। এ ছাড়া আজহারকে ঘিরে অনেক ক্রিকেটারকেও দেখা যায় ছবিতে। কিন্তু কোনো চরিত্রই ফুটে ওঠে না। গোটা ব্যাপারটায় বাস্তবের কোনো সংশ্লেষ নেই। আজহারের ক্রিকেটার হয়ে ওঠা বা ম্যাচ পাতানো বিতর্কের চেয়ে পরিচালক সঙ্গিতা-আজহারের রোম্যান্স দেখাতেই ছিলেন বেশি উদগ্রিব। ভারতের বেশির ভাগ সিনে ম্যাগাজিন ও ওয়েবসাইটেই ছবি সম্পর্কে নেতিবাচক শব্দই লেখা হয়েছে বেশি। সুশান্ত যেমন ‘ধোনি’ হয়ে উঠেছেন পর্দায়, ইমরান হাশমি সেখানে আজহার হতে একদমই ব্যর্থ। পর্দার আজহারের হাতে ব্যাট নয়, মনে হয় গদা ধরিয়ে দিয়েছিলেন পরিচালক! আজহারউদ্দিন বিখ্যাত হয়ে উঠেছিলেন কব্জির মোচড়ের শৈল্পিক শটের জন্য, আর আজহাররূপী ইমরান ব্যাট চালিয়েছেন এলোপাথাড়ি। আদালতেও উদ্ভট সব প্রসঙ্গের অবতারণা করে ‘কোর্টরুম ড্রামা’ থেকেও দর্শকদের বঞ্চিত করেছেন পরিচালক। তাই ভারতের নন্দিত ও নিন্দিত এই অধিনায়কের বায়োপিকে ক্রিকেট হারিয়ে গেছে গ্ল্যামার আর অতি নাটুকেপনার আড়ালে।

ভারতে দু-দুজন অধিনায়কের জীবন নিয়ে ছবি হয়ে গেল, পাকিস্তানও কি কম যায় নাকি! ইমরান খানের জীবনটায় কোনো আলাদা ক্লাইম্যাক্স যোগ করার দরকার নেই, এমনিতেই তাতে ব্লকবাস্টার হিটের রসদ ঠাঁসা। কর্নারড টাইগার তত্ত্বে ১৯৯২ সালের বিশ্বকাপে নাটকীয় জয়, জেমাইমার সঙ্গে প্রেম, বিচ্ছেদ, মায়ের জন্য ক্যান্সার হাসপাতাল তৈরির তহবিল সংগ্রহ, রাজনীতি ...আর কী চাই একটা মানুষের জীবনে! চলছে ইমরান খানের বায়োপিক ‘কাপ্তান’-এর নির্মাণ। ইমরানের ভূমিকায় আব্দুল মান্নান আর জেমাইমার ভূমিকায় আছেন কাশ্মীরি পাকিস্তানি সুপার মডেল সাইদা ইমতিয়াজ। ছবিতে থাকবে বেনজীর ভুট্টোর চরিত্রও।

ধোনি, আজহার কিংবা ইমরানের জীবনের মতো বহুমাত্রিক না হলেও বাংলাদেশের অনেক ক্রিকেটারের জীবনেও কিন্তু সিনেমাটিক এলিমেন্টের অভাব নেই! বারবার চোট আঘাত পেয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে দলকে নেতৃত্ব দিয়ে মাশরাফি বিন মর্তুজা হয়ে উঠেছেন ‘সুপার ম্যাশ’। যে ছেলের ক্রিকেট ব্যাট দা দিয়ে কেটে ফেলেছিলেন বাবা, সেই সাকিব আজ ‘অলরাউন্ডার নাম্বার ওয়ান’। তেঁতুলিয়া গ্রাম থেকে ভাইয়ের মোটরসাইকেলে চড়ে সাতক্ষীরায় ক্রিকেট খেলতে আসা মুস্তাফিজ ‘দ্য ফিজ’-এর বোলিং রহস্যের অন্য নাম। হয়তো একদিন তাঁদের কারো জীবনের গল্পও দেখা যাবে রুপালি পর্দায়, যা দেখে অনুপ্রাণিত হবে আরো হাজারও তরুণ। কারণ দিন শেষে, এই সবই তো আসলে তাদের স্বপ্ন পূরণের গল্প আর কে না জানে, মানুষ তো তার স্বপ্নের চেয়েও বড়।

 


মন্তব্য