kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


দুই চাকার ‘হিরো’

মাসুদ পারভেজ   

২১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



দুই চাকার ‘হিরো’

ব্যাটসম্যানের দাপুটে স্ট্রোকে বল ছুটছে সীমানার দিকে তো ছুটছেন ফিল্ডারও। প্রাণপণে দৌড়েও যখন আর নাগাল পাওয়ার আশা নেই, তখন ডাইভ দিয়ে বাউন্ডারি ঠেকানোর চেষ্টা।

এমন চেষ্টায় বাউন্ডারি রোপের ইঞ্চিখানেক দূর থেকে বল ফেরানোর দৃশ্য আধুনিক ক্রিকেটে মোটেও অভাবিত কিছু নয়। তখন ডাইভ না দেওয়াকেই বরং অপেশাদারির নমুনা বলে ধরা হয়। তবু আবু বক্কর ছিদ্দিক নামের এক অচেনা তরুণের ডাইভ দিয়ে চার বাঁচানোর সহজ, সাধারণ ও চেনা ছবিটাই প্রত্যক্ষদর্শীদের চোখে অসাধারণ হয়ে যায়। হতে বাধ্যও। কারণ নিজের পায়ে চলতে-ফিরতে অক্ষম তরুণ সেই ডাইভটি দিয়েছেন তাঁকে দুই চাকায় চলার সক্ষমতা দেওয়া হুইলচেয়ার থেকে! মুখে মুখেও তাই এই গল্প ছড়িয়ে পড়ে। পৌঁছে যায় তাঁদের কানেও, যাঁরা সেই দৃশ্য দেখেনওনি।

তাঁদের অন্যতম খালেদ মাসুদ তো গল্প শুনে রীতিমতো তাজ্জব বনে যান। গত মঙ্গলবার শহীদ ক্যাপ্টেন মনসুর আলী হ্যান্ডবল স্টেডিয়ামে দিনব্যাপী পুরনাভা প্রথম জাতীয় হুইলচেয়ার ক্রিকেট টুর্নামেন্টের খেলোয়াড়দের উত্সাহ জোগাতে যাওয়া বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ককে হঠাৎই দেখা গেল খুব ব্যস্ত। তাঁকে ঘিরে যে ততক্ষণে সেলফি তোলার হিড়িক পড়ে গেছে। একের পর এক হুইলচেয়ার ভিড়ছে তাঁর কাছে। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ডাইভ দিয়ে চার বাঁচানো সেই ফিল্ডার আবু বক্করও। যেখানে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নিউ সিনেমা রোডে নগর ইলেকট্রনিকস নামের দোকান মালিককে আর দশজনের থেকে আলাদা করারও উপায় ছিল না। তবু তিনি আলাদা হয়ে গেলেন হুইলচেয়ার ফেলে রান বাঁচানোর প্রাণান্ত চেষ্টার জন্য। কেউ একজন তাঁকে চিনিয়ে দিতেই মাসুদ উল্টো নিজেই তাঁর সঙ্গে একটা সেলফি তুলে রাখলেন। এরপর হুইলচেয়ারে করে ক্রিকেট খেলা আরো অনেককে পেছনে নিয়েও নিজেকে সেলফিতে ধরে রাখলেন এ জন্যই যে ‘তাঁরা প্রত্যেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতার বিপক্ষে জিতে এসেছেন আগে। বিষণ্নতায় না ভুগে ক্রিকেটের মাধ্যমে বিনোদনও খুঁজে নিয়েছেন। আমার চোখে তাঁরাও একেকজন হিরো। ’

কিছুক্ষণ তাঁদের খেলা দেখার পর মাসুদও নিশ্চিত যে হুইলচেয়ারে করে ক্রিকেট খেলার চেয়ে কঠিন অন্তত তাঁর ক্রিকেট ছিল না, ‘তাঁদের অনেকেরই শরীরের নিচের অংশে জোর নেই। যে জন্য ব্যাটিংয়ের সময় দুই হাতে জোরও পান না। তবু দেখুন এক হাতে ব্যাটিং করেও দিব্যি ছক্কা মারছেন কেউ কেউ। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নেই, এমন কারো পক্ষেও এভাবে এক হাতে ছক্কা মারা কঠিন। ’ কঠিন কাজও সহজভাবে করার উপায় খুঁজে নেওয়া এই ক্রিকেটাররা এত দিন সারা দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়েই ছিলেন। এবার তাঁরা এসেছেন হুইলচেয়ার ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ নামের ছাতার নিচে। যে ছাতাটি মেলেছেন এ দেশে শারীরিক প্রতিবন্ধী ক্রিকেটের প্রতীক হয়ে যাওয়া মোহাম্মদ মোহসিন। এই টুর্নামেন্ট উপলক্ষে ঢাকার বাইরের এমন জনাপঁচিশেক ক্রিকেটারকে তিনি একজোট করেছেন, যাঁরা দুই চাকায় ভর দিয়ে খেলা ক্রিকেটে আনন্দ খুঁজে নেন। সেই সঙ্গে ঢাকায় যাঁরা আছেন, তাঁদের নিয়ে দিব্যি চারটি দলও দাঁড়িয়ে যায়। এরপর ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সংস্থা ইমেগোর টুর্নামেন্ট করার উদ্যোগে পৃষ্ঠপোষক হতে এগিয়ে আসে ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রেনেটার ব্র্যান্ড পুরনাভাও। কাজেই টুর্নামেন্ট করতে আর বিলম্ব কেন! কিন্তু ছোট্ট সমস্যা হয়ে যায় একটি দলের নাম নিয়ে। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) নতুন ফ্র্যাঞ্চাইজি খুলনা টাইটানসের আনুষ্ঠানিক যাত্রার আগেই হুইলচেয়ার ক্রিকেট টুর্নামেন্টের একটি দলের একই নাম ঠিক হয়েছিল। পরে সেটি পাল্টে করা হয় খুলনা সাইক্লোন। নামের সঙ্গে মানানসই ছিল এই দলটির পারফরম্যান্সও। ফাইনালে আবু বক্করের চিটাগাং রাইডার্সকে ৬ উইকেটে হারিয়ে শিরোপা জিতেছে তো খুলনাই। যে দলের উজ্জ্বলের ব্যাটে দেখা মিলেছে টুর্নামেন্টের একমাত্র ফিফটিরও। তবে দুই চাকার ‘হিরো’র অভাব ছিল না এই টুর্নামেন্টে। ফাইনালেই উঠতে না পারা রাজশাহী ওয়ারিয়র্সের জামাল যেমন হয়েছেন টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়। দল ব্যর্থ হলেও তাঁর নামের পাশে ১০৭ রান ও ৪ উইকেট। তাঁর মতো এই টুর্নামেন্টের সিংহভাগ ক্রিকেটারই ছোটবেলায় নানা রোগে হারিয়েছেন চলার শক্তি। কিন্তু দমে যাননি কেউই। হার না মানার সে মানসিকতার অনন্য উদাহরণ হিসেবে হুইলচেয়ার ক্রিকেট টুর্নামেন্টে আলোও ছড়িয়েছেন নাহিয়ানের মতো অনেকে। বাংলা একাডেমির উপপরিচালক ডক্টর আমিনুর রহমান সুলতানের একমাত্র সন্তান পড়ছেন ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার প্রকৌশল বিভাগে। ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় মেরুদণ্ডের জটিল এভিএম রোগে দুই পায়ে চলার শক্তি হারালেও নাহিয়ান হারাননি মনোবল। তাই দুই চাকায় সওয়ার হয়ে ক্রিকেটই শুধু খেলতে পারেন না, দিতে পারেন শারীরিক সীমাবদ্ধতা জয় করার ঘোষণাও!


মন্তব্য