kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


পদত্যাগেই সমাধান নয়

২১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



পদত্যাগেই সমাধান নয়

এশিয়ান কাপ প্রাক বাছাইয়ে ভুটানের কাছে বাংলাদেশ দলের হারে সবাই লজ্জিত, আমিও। বেশি চোখে লাগছে ব্যবধানটা, ৩-১! এ লজ্জার চেয়ে আরো বেশি হতাশার পরবর্তী তিন বছর ফিফা কিংবা এএফসি আয়োজিত কোনো ম্যাচে লাল-সবুজের পতাকা উড়বে না।

জাতীয় দলের সাবেক খেলোয়াড় হিসেবে তাই আমি লজ্জিত ও ব্যথিত। আমাদের সময়ে ভুটান-মালদ্বীপের মতো দলের বিপক্ষে ৮-৯ গোলে জিততাম। এখন সেই ওরাই আমাদের হারিয়ে দেয়; অবসর জীবনে এমনটা দেখতে হবে, ভাবিনি।

আমরা যখন খেলতাম, সেই সত্তরের দশকে ফিফা র্যাংকিংয়ে ১৪৫-১৪৬ ছিলাম। সেখান থেকে নামতে নামতে এখন ১৮৫ নম্বরে। আগামী তিন বছর যেহেতু খেলার সুযোগ নেই, নিশ্চিতভাবেই র্যাংকিংয়ে আরো অবনমিত হবে বাংলাদেশ। বাফুফে ভবনের সামনে বিক্ষুব্ধ জনতার একটি প্ল্যাকার্ডের ছবি দেখেছি টিভিতে, সেখানে লেখা র্যাংকিংয়ে ২০০তম হওয়ার অপেক্ষায় ফুটবল। আমি নিজেও ঘরোয়া ক্রিকেটের শীর্ষ আসরে খেলেছি। তবু এই ফুটবলের এই ‘ডাবল সেঞ্চুরি’ করা সংক্রান্ত তীর্যক বক্তব্য আমার বুকে শেল হয়ে বিঁধেছে।

ফুটবল গোলের খেলা, এ ছাড়া জেতার অন্য উপায় নেই। আধুনিক ফুটবলে তো একমাত্র গোলরক্ষক ছাড়া সবাইকেই গোল করতে দেখা যায়। বাংলাদেশ দলের মূল সমস্যা এখানেই, স্ট্রাইকারদের গোল করার সামর্থ্যেও কমতি রয়েছে। সত্যি বলতে কি, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ দলের খেলা দেখে গোল করার মতো কোনো খেলোয়াড় আমার চোখে পড়েনি। গোল করার জন্য যে আক্রমণাত্মক খেলা খেলতে হয়, সেটাই দেখিনি বাংলাদেশের খেলায়। শুধু মাঝমাঠে বল নিয়ে কাড়াকাড়ি করতে দেখেছি। গোলের জন্য আক্রমণ, পরিকল্পনার ছাপ ছিল না খেলায়।

প্রশ্ন হলো, কেন এত দীর্ঘ সময়েও এ সমস্যার সমাধান হলো না? ভাবতে হবে, এর কারণ খুঁজে বের করতে হবে। ভাবতেও অবাক লাগে, বিশ্বের ছোট ছোট ফুটবল দেশগুলো ক্রমাগত এগিয়ে যাচ্ছে আর আমরা কেবল নামছিই। কেন?

উত্তরটা অনেকাংশে সবারই জানা। একমাত্র ঢাকা ছাড়া আর কোথাও ফুটবল খেলা হয় বলে আমার জানা নেই। শুধু ঢাকায় খেলালেই কি ফুটবলার তৈরি হবে? কোনো সম্ভাবনা নেই। সারা দেশে যে ফুটবল থেমে আছে, এর জন্য দায়ী কে? অবশ্যই বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)। এ দায় বাফুফের এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সংস্থার প্রধান কাজী সালাউদ্দিনের পদত্যাগের দাবিও উঠেছে। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো, একজন সালাউদ্দিন পদত্যাগ করলেই কি রাতারাতি ফুটবলের উন্নতি হবে? সালাউদ্দিন তো একজন ব্যক্তি মাত্র, সিস্টেম নন। আর রাতারাতি কোনো কিছু বদলে ফেলা সম্ভবও নয়। বরং এটাই উপযুক্ত সময় গভীর উপলব্ধি থেকে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার।

খেলাটা একসময় মন দিয়ে খেলেছি বলেই আমার নিজের কিছু প্রস্তাবনা আছে। সেসব প্রস্তাবনার সবটাই আমার খেলোয়াড়ি জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া।

১. ফুটবল মাঠের খেলা। ফুটবলকে তাই মাঠেই রাখতে হবে, টেবিলে বসিয়ে রাখা যাবে না।

২. সারা দেশে খেলা চালু রাখতে হবে। দেশের প্রতিটি বিভাগীয় শহরেই শুধু নয়, জেলা-উপজেলা ও স্কুল-কলেজে ফুটবল লিগ বা টুর্নামেন্ট আবার চালু করতে হবে। তবেই খেলোয়াড় উঠে আসবে। প্রতিবছর অন্তত ৬৪টি জেলায় লিগ হলে যদি প্রতিটি লিগ থেকে একজন করে খেলোয়াড়ও উঠে আসে, তা হলে বছরে অন্তত ৬৪ জনকে নিয়ে ভাবার সুযোগ পাবেন জাতীয় দলের কোচ। এতে করে খেলোয়াড়দের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও হবে, কেউ ধরেই নিতে পারবে না জাতীয় দলে তার জায়গা নিশ্চিত।

৩. বিভাগ ও জেলা পর্যায়ের স্থানীয় সংগঠকদের ফুটবল উন্নয়নে সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। সেসব সংগঠকেরও কর্তব্য ফুটবল আয়োজনে বাফুফের ওপর চাপ অব্যহত রাখা। কিন্তু বিগত বছরগুলোয় দেখা গেছে শুধু নির্বাচন এলেই স্থানীয় সংগঠকদের ব্যাপারে আগ্রহী বাফুফে এবং স্থানীয় সংগঠকরাও ভীষণ তত্পর নির্বাচনকে ঘিরে!

৪. যেসব জেলায় ফুটবল নিয়মিত হয় না, সেসব জেলার কাউন্সিলরশিপ বাতিল করতে হবে। এমন শর্ত জুড়ে দিলে স্থানীয় সংগঠকরা বাধ্য হয়েই লিগ চালু রাখবেন।

৫. ফুটবল একাডেমি অনতিবিলম্বে চালু করতে হবে। একাডেমির কোনো বিকল্প নেই। বরং একাডেমির সংখ্যা বাড়ানোও জরুরি।

৬. সর্বোপরি, একটা লিগ নিয়ে সারা দেশ ঘুরলে হবে না। প্রতিটি জেলায় আলাদা লিগ আয়োজন করতে হবে। এতে করে খেলোয়াড়ের সংখ্যা বাড়বে।

সবশেষে, অতীত তো আর পাল্টে দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে বর্তমানে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ সব সময়ই আছে। খেলায় যেমন হার-জিৎ আছে। তাই হারলেই তো খেলা ছেড়ে দেওয়া যাবে না। এ দুঃসময় কেন এলো, সেটা খতিয়ে বের করে উপযুক্ত ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ধরে এগিয়ে নিতে হবে ফুটবলকে। এটা খুবই সম্ভব।

খেলোয়াড়, স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল


মন্তব্য