kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

হায় ফুটবল!

সনৎ বাবলা   

২১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



হায় ফুটবল!

গ্যাঁড়াকলে পড়লে বাঙালির মন উচাটন হয়। ফিরে যায় অতীত পানে—গোলা ভরা ধান আর পুকুর ভরা মাছের গল্পে।

ভুটান-কলঙ্কের পর সব ফুটবল আলোচনায় ফিরে ফিরে আসছে সোনালি দিন। সত্তর থেকে নব্বইয়ের দশকের ফুটবল। তখন ছিল সবই—তুখোড় ফুটবলার, রমরমা ক্লাব ফুটবল ও দর্শক। ঘরোয়া ফুটবলে এত থাকার পরও ছিল না শুধু জাতীয় দলের সবিশেষ সাফল্য।

আসলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুষমা মণ্ডিত করার মতো ফুটবল কোচ ও কোচিংয়ের ঘাটতি ছিল। জমজমাট ঘরোয়া ফুটবলের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সাফল্যের যোগে দেশের ফুটবল যে নতুন উচ্চতায় উঠবে, সেটা উপলব্ধি করার মতো লোকই ছিল না তখনকার ফেডারেশনে। বোঝদার লোক কাজী সালাউদ্দিন দায়িত্ব নিয়ে জাতীয় দলকে আলিঙ্গন করেছিলেন ভালোভাবে। কিন্তু আট বছরের এই আলিঙ্গন নিষ্ফলা। আশি-নব্বইয়ের দশকের উর্বরা ফুটবল ভূমি বিনা কর্ষণে পড়ে আছে দিনের পর দিন। সেখানে এখন ফুটবল হয় না, প্রতিভাও জন্মায় না। ফুটবলের সামগ্রিক বন্ধ্যারই স্মারক সালাউদ্দিনের জাতীয় দল।  

১.

আটটি বছর কাজী সালাউদ্দিন পড়েছিলেন শুধু জাতীয় দল নিয়েই। তারা মাঠে ভালো খেলবে আর সেটা তিনি ফেরি করবেন। এই প্রত্যাশায় জাতীয় দলকে সবই দিয়েছেন। ইউরোপের কোচ, বিশাল কোচিং স্টাফ—সব কিছু। দিলেই যেন দেশি ফুটবল ‘মেড ইন ইউরোপ’ হয়ে যাবে! সেটা যে হওয়ার নয় মামুনুল-জাহিদ-রায়হানরা বারবার ব্যর্থ হয়ে সংকেত দিয়েছিলেন। তিনি সাফের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর বাংলাদেশ দল কখনো সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের গ্রুপ পর্ব টপকাতে পারেনি। এর পরও বাফুফে সভাপতি মেতেছিলেন ওই জাতীয় দল ও সেই ফুটবলারদের নিয়ে। এই ফুটবলারদের দিয়ে যে হবে না, সেটা একরকম বোঝা হয়ে গিয়েছিল ২০১৩ সালে কাঠমাণ্ডু সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে। ডাচ কোচ লোডউইক ডি ক্রুইফ ও তাঁর কোচিং স্টাফ দিয়ে দুই মাস প্র্যাকটিস করিয়েও একটি ম্যাচ জেতাতে পারেননি নেপালে। তিন বছর পর সেই ফুটবলারদের হাতেই রচিত হয়েছে বাংলাদেশ ফুটবলের সবচেয়ে বড় কলঙ্ক। দেশের মাঠে ভুটানের সঙ্গে ড্রয়ের পর থিম্পুতে গিয়ে হার। এমনই পতিত ফুটবল যে সর্বশেষ মাথা নোয়াতে হয়েছে ভুটানের কাছেও।

ফুটবলীয় ঐতিহ্য দিয়ে দেখলে এটা আপসেট। বাস্তবে দুই প্রতিপক্ষের ব্যবচ্ছেদ করলে সামর্থ্যে ভুটানই এগিয়ে থাকবে। ম্যাচ ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য ওদের চ্যানচোর মতো একজন স্কোরার আছে আর বাংলাদেশের গোল করার ফুটবলার নেই।

 বেলজিয়ান কোচ টম সেইন্টফিটও বিস্মিত হয়েছিরেন এমন ধারা দেখে, ‘গোলের খেলায় গোল করতে না পারলে খেলে লাভ কী!’ স্ট্রাইকার বাদে দলের অন্যরাও যে উঁচুমানের ফুটবল খেলেন তা নয়, তাঁদের গোল করতে হয় না বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। আসলে জাতীয় দলের ক্ষয়ে যাওয়ার চিত্রটা গত পাঁচ-ছয় বছর ধরে জারি আছে, সর্বত্রই ক্ষয়রোগের চিহ্ন রেখেছিলেন ফুটবলাররা। তাঁরা ৯০ মিনিট দৌড়াতে পারেন না, লড়াই করতে পারেন না, ওয়ান টু ওয়ানে ড্রিবল করে এগোতে পারেন না, নেই কোনো ম্যাচ উইনার, সর্বোপরি ১১ জনের মধ্যে ভরসা করার মতো কোনো ফুটবলার খুঁজে পাওয়া যাবে না। তাহলে এটা কেমন ফুটবল দল! কেন-ই বা তারা জিতবে! গোলশূন্য ড্র-ই তো এই দলের জন্য সবচেয়ে ভালো ফল।

বছরের পর বছর এমন ধারা দেখার পর কাজী সালাউদ্দিন ছিলেন তাঁদের নিয়েই। সাবেক ফুটবলার হয়েও একটা ফুটবল দলের সামর্থ্য মাপতে না পারাটাই তাঁর অপরাধ। তাঁর হাতে অবশ্য কোনো বিকল্পও ছিল না। এর আগে যে তিনি বড় অপরাধ করে রেখেছেন ঢাকার বাইরের ফুটবলে উদাসীনতা দেখিয়ে। ঢাকায় ফুটবল চললেও জেলার ফুটবল ব্রাত্য, ভোটাধিকার টিকিয়ে রাখতে কোনো কোনো জেলা ১০-১৫ দিনে ফুটবল লিগ সম্পন্ন করে বাফুফের ভোটার তালিকায় নাম লেখায়। জেলায় ফুটবল চর্চা বন্ধ থাকা মানে নতুন প্রতিভারও উন্মেষ নেই। বলা হয়, নতুন অবকাঠামোয় জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (ডিএফএ) একটা বড় বাধা। কারণ জেলা প্রশাসকহীন এই সংগঠন। পাশাপাশি বেশির ভাগ ডিএফএ হয়েছে ক্রীড়া সংগঠক বর্জিত স্থানীয় রাজনীতিবিদের পুনর্বাসনের জায়গা, খেলার চেয়ে অন্য কিছুতে তাঁদের আগ্রহ বেশি। তাঁদের অনাগ্রহ আর বাফুফের উদাসীনতায় জেলার ফুটবল মরে গেছে। তাই কয়েক বছর ধরে ঢাকায় যাঁরা খেলছেন তাঁরাই ভরসা জাতীয় দলের। পায়ে-মাথায় ফুটবল না থাকলেও তাঁদেরই নিতে হবে। ঢাকা বড় ক্লাবগুলোও নাচে তাঁদের নিয়ে। এমনকি তাঁদের পাওয়ার জন্য আদালত পর্যন্ত চলে যাচ্ছে । তাঁদের না হলে চলবেই না! এই করে ক্লাবগুলো সামর্থ্যহীন ফুটবলারদের দাম তুলে দিয়েছে ৬০ লাখ পর্যন্ত! পুরোপুরি হাওয়াই ফুটবলের জগতে বাস করছি আমরা। এত এত পারিশ্রমিক পেয়ে অকেজো ফুটবলাররা পারলে নিজেদের বিশ্বসেরা ভাবেন। আর তাঁদের দিয়েই সালাউদ্দিন বিশ্বকাপ যাত্রার (ভিশন-২০২২) অঙ্ক কষেন। সমৃদ্ধ ফুটবল ঐতিহ্যকে ধুয়েমুছে বাংলাদেশকে এ রকম ফাঁপা ফুটবল জাতিতে পরিণত করার দায় নিতে হবে সালাউদ্দিন অ্যান্ড গংকে।

এ দেশের না হয় ইউরোপীয় ঘরনার অনেক কিছুই ছিল না। ছিল একটি প্রকৃতিজাত ফুটবল চক্র। সত্তর-আশির দশকেও জেলায় রমরমা ফুটবল হতো। লিগ ছাড়াও বিভিন্ন টুর্নামেন্টে জেলার ফুটবল জমজমাট। সংগঠকরা জেলায় গিয়ে খেলোয়াড় বাছাই করে নিয়ে আসতেন ঢাকায়। ছোট ক্লাবে দু-এক বছর খেলে, সম্ভাবনা দেখিয়ে সেই ফুটবলাররা নাম লেখাতেন বড় দলে। তারপর জাতীয় দলে ঢোকার জন্য কি তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা, একেক পজিশনে চার-পাঁচজন করে প্রতিদ্বন্দ্বী। এই ফুটবল ফেডারেশনের কর্মকর্তা সালাম, আসলাম, বাদল, রুপুরা এভাবেই ঢাকা মাঠে তারকা হয়েছেন। এখন তাঁদের হাতে সেই প্রাকৃতিক ফুটবল চক্রের দফারফা হয়ে গেছে। ফুটবল হয়ে গেছে ঢাকাকেন্দ্রিক। নাম দিয়েছে পেশাদার ফুটবল। আদতে পেশা ও নেশা কোনোটিই নেই এই ফুটবলে। ক্লাব থেকে টাকা নেওয়ার বেলায় শুধু পেশা; কিন্তু বিনিময়ে ফুটবলারদের তরফ থেকে পাওয়ার আশা খুব থাকে না। আফ্রিকানরা ভালো-মন্দ খেলে গোলটোল করেন বলে একটা দল চ্যাম্পিয়ন হয়ে লিগটা শেষ হয় কোনো রকমে। এমন খেলায় দর্শকেরও নেশা ধরার কোনো কারণ নেই।              

২.

২০০৮ সালে দেশের ফুটবলের মহা আসনে কাজী সালাউদ্দিনের অধিষ্ঠান। চারদিকে আশার ফানুস—এবার ফুটবল দুর্গতির একটা গতি হবে। সভাপতিও ইউরোপ-লাতিনের গল্প বলে নানা স্বপ্ন দেখান। উন্নতি করতে হলে একটা ফুটবল একাডেমি গড়তে হবে। সে রকম একাডেমি—আয়াক্স-অ্যামাস্টারডমের একাডেমির মতো স্বপ্ন দেখেন। প্রথম মেয়াদ শেষে দ্বিতীয় মেয়াদে সুযোগ পেলেন সিলেট বিকেএসপি হাতে পেয়ে। তিনি কী করলেন? ‘কর্মজীবী হোস্টেলের’ মতো কিছু একটা দাঁড় করালেন, পাশের মুদিখানায় খুলে গেল তার বকেয়ার খাতা। কয়েক মাসে বকেয়ার অঙ্ক বড় হওয়ায় দোকানি চাল-ডাল দেওয়া বন্ধ করে দিল। বোঝা গেছে নিশ্চয়ই, আয়াক্সের স্বপ্ন সিলেটের মুদিখানায় গিয়ে মুখথুবড়ে পড়েছে। সত্যি বললে, ফুটবলারদের কোনো রকমে থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্ত করা হয়েছিল ওখানে। সেটাও মাত্র ১০ মাস, বরাদ্দ পাওয়া পাঁচ বছরের মধ্যে একাডেমি সচল ছিল মাত্র এটুকু সময়! অথচ ফিফা এ জন্য অর্থ বরাদ্দও দিয়েছিল।

ফুটবল সভাপতির এখনকার আহ্বান ক্লাবগুলোয় একাডেমি গড়ার। সঙ্গে যথারীতি ইউরোপীয় ফুটবল ক্লাবের উদাহরণ। ফুটবলারের জন্ম, বেড়ে ওঠা সবই হয় ক্লাবে, এটা সবাই জানে-বোঝে। দুর্ভাগ্য ঢাকার ক্লাবগুলোয় এই সংস্কৃতি শুরু হয়নি। বড় দলগুলো বেশি দামে অকেজো ফুটবলার কিনে মাশুল দেয় মৌসুমজুড়ে। ফি বছরই হয় এমন অভিজ্ঞতা; তার পরও ফুটবলার তৈরির দিকে ঝোঁকে না।

৩.

ফিফা-এএফসির মতোই বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন সভাপতিশাসিত সংগঠন। আট বছর আগে কাজী সালাউদ্দিন এর দায়িত্ব নেওয়ার সময় চারদিকে ছিল ইতিবাচক বাতাবরণ। ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে বড় লিজেন্ড তিনি, দেশের বাইরে পেশাদার ফুটবল খেলা একমাত্র ফুটবলার। চোখে স্বপ্ন আর মুখে ইউরোপীয় ফুটবলের গল্প, ফুটবল উন্নয়নের আদ্যান্ত বুঝি তার নখদর্পণে। আগের সভাপতিদের তুলনায় অনেক অনেক এগিয়ে। তার পরও খুব ক্ষীণ কণ্ঠে হলেও একটা প্রশ্ন উঠেছিল। লিজেন্ড ফুটবলার কি সংগঠক হিসেবেও সফল হবেন? মিশেল প্লাতিনির উদাহরণ টেনে কাজী সালাউদ্দিন খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ‘হ্যাঁ’ বলেছিলেন। সভাপতির চেয়ারে তিনি আট বছর কাটিয়ে উপহার দিয়েছেন ভুটান-কলঙ্ক। এখন কণ্ঠে সেই জোরও নেই, জাতির কাছে দুঃখ প্রকাশ করে তিনি তৃতীয় মেয়াদে শেষ চেষ্টার সুযোগ চেয়েছেন। কাজী সালাউদ্দিনের মেয়াদ পুরো হোক, কারণ বাংলাদেশ ফুটবলের আর হারানোর কিছু নেই।


মন্তব্য