kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


লিস্টার সিটি হতে পারবে রহমতগঞ্জ?

শাহজাহান কবির

১৪ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



লিস্টার সিটি হতে পারবে রহমতগঞ্জ?

কামাল বাবু আগেই নিজেকে চিনিয়েছেন। ছোট দলের বড় কোচ বলা হয় তাঁকে।

এই মৌসুমে সেই নামের স্বার্থকতা তিনি এমনভাবে রেখে চলেছিলেন এই বিশেষণেও হয়তো আর কুলোবে না। রহমতগঞ্জকে প্রিমিয়ারে চ্যাম্পিয়ন করিয়ে দিলে কী হবে—স্রেফ রূপকথা। গত মৌসুমে ইংল্যান্ডে লিস্টার সিটি যা করেছে। বাংলাদেশের ঘরোয়া ফুটবলে যে দলটি এর আগে কখনোই পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে উঠতে পারেনি, এবার তারা শুধু শীর্ষেই নয়, এই পর্যন্ত খেলা ৯ ম্যাচেই তারা অপরাজিত। এর মধ্যে ফেভারিট চট্টগ্রাম আবাহনীকে তারা হারিয়েছে, শেখ রাসেল বধ তো শুরুতেই, হারিয়েছে মুক্তিযোদ্ধাকেও। শেখ জামাল, মোহামেডানও তাদের হারাতে পারেনি।

প্রথম লেগ শেষ হতে আর দুটি ম্যাচ বাকি, কামাল বাবুর দলকে খেলতে হবে ব্রাদার্স ও আবাহনীর বিপক্ষে। আগের যেকোনো সময় হলে এ দুটি দলই ছিল ফেভারিট রহমতগঞ্জের বিপক্ষে। এখন আর তা বলা যাচ্ছে না। এমন না রহমতগঞ্জ শক্তিমত্তায় অনেক এগিয়ে গেছে, খোলনলচে পাল্টে চট্টগ্রাম আবাহনীর মতো তারা নতুন পরাশক্তির চেহারা নিয়েছে। রহমতগঞ্জ আছে আগের মতোই। ক্লাবের স্বাভাবিক বাজেটেই সোয়া কোটি টাকার দল গড়েছেন কামাল বাবু। ৯-১০ কোটির দল আবাহনী বা তিন কোটির দল ব্রাদার্স তাদের বিপক্ষে নামার আগে পয়েন্ট হারানোর শঙ্কায়, কারণ এই রহমতগঞ্জই খেলছে লিগে অন্যতম আকর্ষণীয় ফুটবল! সাধারণ মানের মাসুম, সোহেল, আলাউদ্দিনরা মিলে নিজেদের একটি লড়াকু ইউনিটে পরিণত করেছেন। প্রতিপক্ষ তারা বাছছেন না। কামাল বাবুর বরাবরই খ্যাতি আছে অখ্যাত খেলোয়াড়দের শীর্ষ পর্যা য়ে পরিচিত করিয়ে দেওয়ার। চ্যাম্পিয়নশিপ, প্রথম বিভাগ, দ্বিতীয় বিভাগ, এমনকি তৃতীয় বিভাগের সম্ভাবনাময়দের তিনি জহুরির চোখ দিয়ে তুলে এনেছেন। প্রিমিয়ার লিগে খেলাদের মধ্যেও ছোট দলে খেলে নিজেদের উজাড় করে দিতে জানে এমন খেলোয়াড়দেরই তিনি দলে নিয়েছেন। বড় দলের বিপক্ষে নিজেদের প্রমাণে তারা মরিয়া। কামাল বাবু তো আছেনই তাদের পথ দেখানোর জন্য, ‘আমি ওদের একটা কথাই বলি, মাঠে ছোট দল-বড় দল নেই। নিজেদের সেরাটা দিয়ে পারফর্ম করাই শেষ কথা। অনেকে বলে অভিজ্ঞতার একটা ব্যাপার আছে। আমি বলি খেলোয়াড়রা যদি নিজেদের প্রমাণেরই সুযোগ না পেল তবে অভিজ্ঞতা হবে কোথা থেকে। ’ স্রেফ অভিজ্ঞতা কোনো কাজের নয় বরং ফর্মটাই গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন তিনি, যে কারণে জাতীয় দলে জাহিদ হাসান বা আতিকুর রহমানদের নেওয়ারও তিনি বড় সমালোচক, ‘ফর্মের কথা চিন্তা করলে রহমতগঞ্জেরই কয়েকজনের সুযোগ পাওয়ার কথা ছিল জাতীয় দলে। আমরা এখন লিগ লিডার এটা আশা করাই তো স্বাভাবিক। সেখানে এমিলির মতো স্ট্রাইকার সুযোগ পায় মাত্র দুই ম্যাচ খেলে। শেখ রাসেল একের পর এক ম্যাচ হারছে অথচ তাদের স্টপার মিশুকে খেলানো হচ্ছে নিয়মিত। ’ কামাল বাবু নিজে জাতীয় দলের দায়িত্ব নিতে পারেন কি না এমন আলোচনাই হয়েছে বিভিন্ন সময়, একে তো ছোট দলগুলো নিয়ে তাঁর সাফল্য, তার ওপর জাতীয় দল যতবারই প্রস্তুতি ম্যাচ খেলেছে তাঁর দলের বিপক্ষে, কোনোবারই তাদের হারাতে পারেনি। সেই কামাল বাবু এবার প্রিমিয়ার লিগেই রূপকথার জন্ম দিলে তাঁকে নিয়ে আবার নতুন করেই ভাবতে হবে নিশ্চিত।

তবে প্রথম লেগের দুটি ম্যাচ ছাড়া পুরো দ্বিতীয় লেগ এখনো পড়ে আছে। রহমতগঞ্জ কি এই ছন্দ ধরে রাখতে পারবে? ইংলিশ লিগে লিস্টার শুরুর দিকে প্রচুর গোল করে শেষদিকে মনোযোগী হয়েছিল শুধু ক্লিনশিটের দিকে। তাদের কৌশল সফল হয়েছে। দারুণ আক্রমণাত্মক রহমতগঞ্জ রক্ষণেও যে সমান মনোযোগী, এর প্রমাণ ৯ ম্যাচে তাদের ৪টি ড্রয়েও। যেখানে শেখ জামাল, মোহামেডান, ফেনী সকার ও আরামবাগের সঙ্গে তারা পয়েন্ট ভাগাভাগি করেছে। লিগে এ পর্যন্ত গোল হজম করেছে মাত্র ৮টি। তাদের চেয়ে কম ৭ গোল হজম করেছে একমাত্র ঢাকা আবাহনী। কামাল বাবু লড়াইটা চালিয়ে যাওয়া নিয়ে তাই যথেষ্টই আত্মবিশ্বাসী, ‘শিরোপা জিতব—এ কথা বলব না। তবে শিরোপার লড়াইটা চালিয়ে যাব শেষ পর্যন্ত এই আত্মবিশ্বাস আমার আছে। ’ রহমতগঞ্জ কোচকে ভরসা জোগাচ্ছেন তাঁর খেলোয়াড়রাই। দলের সর্বোচ্চ গোলদাতা সিও জুনাপিও (৫ গোল) শেষ দুই ম্যাচে খেলতে পারেননি, তাতেও তাদের অগ্রযাত্রা। ওই দুই ম্যাচেই তারা জিতেছে। প্রথমটি বিজেএমসির বিপক্ষে ৩-২ গোলে, শেষটিতে মুক্তিযোদ্ধাকে হারিয়েছে তারা ২-১ গোলে। রিজার্ভ বেঞ্চে সমমানের একাধিক খেলোয়াড় আছেন বলেই লিগের লম্বা পথ পাড়ি দিতে তিনি ভরসা পাচ্ছেন।

চট্টগ্রামে মোহামেডানের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র দিয়ে তাদের লিগ অভিযান শুরু। দ্বিতীয় ম্যাচে শেখ রাসেলকে হারায় তারা। পরের ম্যাচে শেখ জামালের সঙ্গে পিছিয়ে পড়েও ১-১ গোলে ড্রর পরই নিজেদের নতুন করে আবিষ্কার করে দলটি। কামাল বাবু যেমন বলছিলেন, ‘আমার কাছেও মনে হয় শেখ জামালের সঙ্গে ওই ম্যাচটিই আমাদের আত্মবিশ্বাস জোগাতে সাহায্য করেছে। মোহামেডানের সঙ্গে ড্রটা অপ্রত্যাশিত ছিল না। শেখ রাসেলও ফর্মে ছিল না বলে আমরাই ছিলাম ফেভারিট। কিন্তু শেখ জামালের সঙ্গে ম্যাচটা আসলেই ছিল কঠিন। ওয়েডসন আনসেলমে ফেরায় ওরা পূর্ণ শক্তি নিয়েই মাঠে নেমেছিল। শুরুতে আমরা পিছিয়েও যাই, সেই গোল পরিশোধ করে আমরা যখন পয়েন্ট নিয়ে বেরিয়ে আসি, তখনই মনে হয়েছিল এই দল নিয়ে অনেক দূর যাওয়া সম্ভব। ’ সত্যিই এরপর আর পেছনে ফিরে তাকায়নি পুরান ঢাকার দলটি। সেই আত্মবিশ্বাসে তারা ফেভারিট চট্টগ্রাম আবাহনীকেও হারের স্বাদ দিয়েছে। যে ঝাঁকুনিতে শেষ পর্যন্ত কোচ বদলেরও সিদ্ধান্ত নেয় আবাহনী কর্তৃপক্ষ। পেশাদার লিগে এখনো পর্যন্ত সবচেয়ে ভালো অবস্থান রহমতগঞ্জের—সপ্তম। এর মধ্যে দুই বছর প্রিমিয়ারের বাইরেও ছিল তারা। কামাল বাবুই আবার তাদের শীর্ষে ফিরিয়েছেন। ছোট দলকে ওপরে তুলে নেওয়ার মাস্টার এই কোচ। এর আগে শেখ রাসেলকে দ্বিতীয় বিভাগ থেকে ধাপে ধাপে প্রিমিয়ারে তুলেছেন তিনি।

দিপালী যুব সংঘকে নিয়েও তাঁর একই রকম কীর্তি। সেই দলটিকেও তৃতীয় বিভাগ থেকে টানা সাফল্যে প্রিমিয়ারে তুলে দিয়েছেন। তবে শীর্ষ পর্যা য়ে প্রথম আলোড়ন ফেলেন তিনি ২০১১ সালে ফরাশগঞ্জকে স্বাধীনতা কাপ চ্যাম্পিয়ন করিয়ে। এবার পুরান ঢাকারই আরেক দল রহমতগঞ্জকে নিয়ে আরো বড় স্বপ্নের পিছু ধাওয়া করছেন তিনি।


মন্তব্য