kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


জয়তু মাশরাফি

পরিসংখ্যান তাঁর অনবদ্য। আবার স্রেফ পরিসংখ্যান দিয়ে তো আর মাশরাফি বিন মর্তুজাকে মাপা যায় না। লড়াই করে বেঁচে থাকার দুর্দান্ত প্যাকেজ তিনি। সেই প্যাকেজটাই আরেকবার বিশ্লেষণের চেষ্টা করেছেন সাইদুজ্জামান

১৪ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



জয়তু মাশরাফি

রবিবার রাতে মিরপুরের শেরেবাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে নতুন কিছু কী করেছেন যে কারণে তাঁকে মাথায় তুলে নাচছে গোটা জাতি? আটোসাঁটো বোলিং, শুরুতে উইকেট নেওয়া, প্রয়োজনে ব্রেক-থ্রু দেওয়া এবং প্রতিপক্ষের ইনিংসে যতি টানা; তাঁর ১৬ বছরের ক্যারিয়ারে নতুন কিছু নয়। ব্যাটে কেন আগের মতো ঝড় তুলতে পারছেন না, সাম্প্রতিক এ প্রশ্নেই লেখা যে একদা চার-ছক্কা যথেষ্টই মারতেন তিনি।

আর মাঠে বুদ্ধিদীপ্ত অধিনায়কত্বও মাশরাফির প্রোফাইলে পুরনো সংযোজন। তবু দর্শকের মনজুড়ে, মিডিয়ার শিরোনামজুড়ে ও দেশজুড়ে মাশরাফি বিন মর্তুজার জয়ধ্বনি।

যেটুকু চিনি-জানি, তাতে এ মাতম দেখে তাঁর খারাপ লাগার কথা নয়। তাই বলে প্রচণ্ড স্নায়ুচাপের ম্যাচে ২২ জনকে টপকে ‘সুপার হিরো’র মর্যা দা প্রাপ্তি নিয়ে উচ্ছ্বাসের রক্তকণিকা যেভাবে উন্মাতাল ছোটাছুটি করার কথা, মাশরাফির অভিব্যক্তিতে সেসবও নেই। কেমন একটা স্থিতাবস্থা, যদিও জীবনের এমন সব দিনে সামান্য সময়ের জন্য হলেও আবেগ ডাউন দ্য উইকেটে খেলার ঝুঁকি নেওয়ার বিলাসিতা অনুমোদিত। কিন্তু তিনি মাশরাফি, নিজের সেরা দিনেও অতীত কিংবা বর্তমানের দুঃখবোধ উঁকি দেয় তাঁর মনে। জীবনে দুঃসময় এতবার এসেছে যে সুসময়েও সেসব দিনের কথা ভেবে আরো সতর্ক হন তিনি। যেমন ২০১১ বিশ্বকাপ স্কোয়াডে জায়গা না পাওয়ার ঘটনা। হাঁটুতে সাতটা অস্ত্রোপচার করিয়েছেন, প্রতিটিতেই ছিল ক্যারিয়ার ধ্বংসের হুমকি। তবু মাশরাফির ক্রিকেটজীবনে বেদনার বিষাদসিন্ধু ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ দর্শক হয়ে থাকা, যা দেশের ক্রিকেট ইতিহাসেরও অন্যতম ঐতিহাসিক ভুল।

ফিটনেস তাঁর জীবনের সেরা মন্ত্র, যা সমালোচকদের জন্য প্রধানতম অস্ত্র! ফিটনেসের ধুয়া তুলে তাই ২০১১ বিশ্বকাপ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল মাশরাফিকে। অথচ ২০১৫ বিশ্বকাপে এমন দুজনকে নেওয়া হয়েছিল, ফিটনেস পরীক্ষায় যাঁরা ‘বেনিফিট অব ডাউট’ পেয়েছিলেন। কিন্তু মুস্তাফিজুর রহমানের আবির্ভাবের আগে পর্যন্ত নির্দ্বিধায় দেশের সর্বকালের সেরা পেসার মাশরাফিকে কোনো ‘গ্রেস’ দেওয়া হয়নি। সে-ও চার বছর আগে, যখন এমন কোনো হাতি-ঘোড়া ছিল না বাংলাদেশের ক্রিকেট! একটা ব্যাপার অবশ্য ছিল, সিস্টেমের অকারণ ধুয়া তুলে পুরো সিস্টেমটাকে অকার্যকর করে দেওয়ার অপচেষ্টা! কালের কণ্ঠ সেদিনও সোচ্চার ছিল, আজও তাই।

অবশ্য সব মন্দেরই একটা ভালো দিক আছে। সেসব নিজের জীবন থেকে মাশরাফি যেমন জেনে গেছেন সুসময়ের ঠিক উল্টো পিঠেই লেখা দুঃসময়। দুঃসময়ে কেউ পাশে থাকে না এমনকি, দর্শক ও পাঠকের কথা ভেবে পিঠটান দেয় মিডিয়াও। অগত্যা, সদা সতর্ক মাশরাফি ব্যক্তিগত সাফল্যের দিনেও নিস্তরঙ্গ। একার অলরাউন্ড নৈপুণ্যে ম্যাচ জেতার পরও বলেন, ‘জয়ী দলের যেকোনো একজন ম্যান অব দ্য ম্যাচ হয়। আজ যেমন আমি হয়েছি। ’ মানে, কাল ‘এক্স’, ‘ওয়াই’, ‘জেড’ হবে। আদতে এটাই দলীয় সাফল্যের স্বীকৃত ফর্মুলা।

অবশ্য মাশরাফির জীবন তো আর ফর্মুলা মেনে চলেনি। এ যুগের মুস্তাফিজ তো সে যুগের মাশরাফির প্রতিচ্ছবিই। তাঁর আর্বিভাবে যেন ইস্কাপনের টেক্কা পেয়ে যান অধিনায়ক। যত্রতত্র ব্যবহারে ক্ষয় হন তিনি। ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় বছরেই তাই প্রথমবার অপারেশনের টেবিলে শুতে হয়েছিল মাশরাফিকে। এরপর আরো ছয়বার হাঁটু সারিয়ে অর্থোপেডিক সার্জারিতে ‘এমএলএফ’ করা হয়ে গেছে তাঁর! কারো স্ক্যান রিপোর্ট আসার আগে ইনজুরির ধরন দেখেই বলে দেন অস্ত্রোপচার করাতে হবে কি না, সারতে ঠিক কত দিন লাগবে। চোটগ্রস্ত ক্রিকেটারদেরও দেখা গেছে দারুণ আস্থা মাশরাফির অর্থোপেডিক্স সম্পর্কিত জ্ঞানে। ফার্স্ট হ্যান্ড এক্সপিরিয়েন্সের একটা কদর আছে না!

যাই হোক, মাশরাফি প্রায়ই দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘ক্যারিয়ারের সেরা সময়গুলোয়ই ইনজুরি হানা দিয়েছে। যখন মনে হতো যে ইনজুরি সারিয়ে আবার নিজের সেরা ফর্মে ফিরছি, তখনই আবার চোট। দুর্ভাগ্য ছাড়া আর কী বলব?’

এই মন্দের থেকেও ভালোটা বের করে নিয়েছেন মাশরাফি। ২০০১ সালে ফিটনেস সম্পর্কে অজ্ঞাতবাসে থাকা মাশরাফি নিরন্তর বোলিং করে ফুরিয়েছিলেন নিজেকে। আবার ফিরেছেন, বারবার ফিরেছেন নতুন কিছু শিখে। এখন যেমন অকাট্যে স্বীকার করেন তারুণ্যে নিজের যত্নটা সেভাবে নেননি। এক রাতের ছুটি পেলে গাড়ি ভাড়া করে এমনকি, নাইটকোচে করেও ছুটেছেন নড়াইল। শৈশবের দিনগুলোর মতো হুল্লোড়ে মেতে থেকেছেন বন্ধুদের সঙ্গে। পর দিন ঢাকায় ফিরেই হাড়ভাঙা ট্রেনিং কিংবা ম্যাচ। তখন তো আর জানতেন না অযত্নে তারুণ্যেরও ক্ষতি হয়। তাই অজান্তে হানা দিয়েছে ইনজুরি, বারবার।

যাঁরা ঠেকেও শেখেন না, তাঁদের জন্য আছেন মাশরাফি। তিনি শিখেছেন, ‘এখন যে কষ্টটা করি, আগে সেটা করলে তো...’, আক্ষেপ থেকে বাক্যটা আর শেষ করেন না তিনি। তবে তাঁর দর্শনে জীবনে ‘দেরি হয়ে গেছে’ বলে হাত-পা গুটিয়ে ফেলা জাতীয় কিছু নেই, ‘কালকের দিনটা চাইলেও আপনি ফিরিয়ে আনতে পারবেন না। যেটা পারবেন সেটা হলো আগামীকালটা যেন ভালো যায় আজ সেই চেষ্টা করা। ’ এরিস্টটল-প্লেটোদের মতো মনীষীদের উচ্চারিত এ ভাবধারা পাঠ্যবইয়ের সুবাদে সবারই জানা। তবে জানা আর জীবনে প্রয়োগ করার মধ্যে বিস্তর পার্থক্য। সে পার্থক্যটা ঘুচিয়ে দিয়েই ত্রিশোর্ধ্ব মাশরাফিও মাতিয়ে দেন দেশ।

তবে তিনি অতিমানব নন মোটেও। চারপাশের মানুষকে ভালোবাসা, শত্রুকেও বুকে আগলে রাখা তো মানবীয় গুণের অংশ বলেই জানি। সেসব তিনি খুব করেন, সংসারে, দলে, আপামরে। আর সাধারণ মানুষদের একজন বলেই কি না, মাশরাফির মনেও ছোট্ট একটা ঘুণে পোকা আছে।

তাঁর সন্দিগ্ধ মনের কথা বলছি। ক্রিকেটজীবনে যেমন ঢালাও প্রশংসিত হয়েছেন, সামান্য নিন্দা-মন্দও হয়েছে। পরের অংশটার কারণেই কি না, ইদানীং কেউ কিছু বললে নীরবে যাচাই করেন খুব। কথাটার পেছনে ভিন্ন কোনো ‘উদ্দেশ্য’ নেই তো! কিছু মানুষ ‘উদ্দেশ্য’ ‘বিধেয়’র জঞ্জালে সারা জীবনই নিজেকে জড়িয়ে রাখবে। আপনি কেন সেসবে বিচলিত হবেন?

এটা অহেতুক। সারা জীবনের পুণ্যের ফল গত দুই বছরে বিস্তর পেয়েছেন, সেসব আপনার নিজেরই অর্জিত। এবং এ পর্যন্ত আপনি যা করেছেন, তা এক ফুৎকারে কিংবা বিবর্ণ অস্তাচলে নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার নয়।

অনাগত সেদিনেও আপনার কানে বাজবে স্তুতি, জয়তু মাশরাফি! তাই ক্যারিয়ারের বাকি দিনগুলো খেলে দিন রবিবারের ব্যাটসম্যান মাশরাফির মতো করে।


মন্তব্য